সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন ঝামেলা (১০-০২-২০১১ ১০:৪১)

টপিকঃ হৃদরোগ চিকিৎসার নামে যা হচ্ছে...

হার্টের রক্তনালীতে ব্লক হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে_ ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা (LDL. Triglyceride, Total Cholesterol) বেশি অথবা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা (HDL) কম, পরিবারে হার্ট অ্যাটাক রোগের ইতিহাস অন্যতম। কারণগুলোর কোনোটি না থাকলে শুধু বয়স বৃদ্ধির (পুরুষের ক্ষেত্রে ৪৫ ও নারীদের ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বে) কারণেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক হলে ১ ঘণ্টার মধ্যেই ২৫ ভাগ রোগী মারা যায়। সে কারণেই হার্ট অ্যাটাকের রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব হার্টের হাসপাতালে নিয়ে সঠিক চিকিৎসা দিতে হয়। বর্তমানে সারা বিশ্বেই হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে সঙ্গে এনজিওগ্রাম করে হার্টের ব্লক ছুটিয়ে দেওয়া হয়। এর নাম প্রাইমারি এনজিওপ্লাস্টি। এতে মৃত্যুর হার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কম হয়। তাছাড়া যেসব রোগীর সঙ্গে সঙ্গেই প্রাইমারি এনজিওপ্লাস্টি করা সম্ভব হয় না, তাদের ক্ষেত্রে ওষুধ দিয়ে প্রথমে রোগীকে স্ট্যাবল করে পরবর্তীতে এনজিওগ্রাম করে রোগীভেদে নিম্নোক্ত পদ্ধতির যে কোনো একটি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পদ্ধতিগুলো হলো_

১। শুধু মেডিসিন, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পরিবর্তন (১০ থেকে ৩০ ভাগ পর্যন্ত ব্লক থাকলে অথবা ১০০ ভাগ ব্লক থাকা সত্ত্বেও যদি ন্যাচারাল বাইপাস তৈরি হয়)। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বলতে গরু, খাসি, চিংড়ি, ডিমের কুসুম, কলিজা, মগজ তথা চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার করা এবং শাকসবজি ও সামুদ্রিক মাছ বেশি খাওয়া। একই সঙ্গে প্রতিদিন ১ ঘণ্টা হাঁটাহাঁটির অভ্যাস করা। ২। এনজিওপ্লাস্টি প্লাস্ট স্ট্যানটিং (অনেকে একে রিং লাগানো বলেন)। ৩। বাইপাস সার্জারি। ৪। ইসিপি : যেসব রোগীর ক্ষেত্রে বাইপাস বা এনজিওপ্লাস্টি করা যায় না সে ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে পদ্ধতিতে হার্টের ব্লক ছুটানো কখনোই সম্ভব হয় না। কম্পিউটারের মাধ্যমে পায়ে অত্যধিক চাপ সৃষ্টি করে হার্টের ছোট ছোট রক্তনালীর ভেতর দিয়ে রক্ত সরবরাহ করার চেষ্টা করা হয়।

উল্লেখ্য, এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারি শুধু গুরুত্বপূর্ণ ব্লকের ক্ষেত্রেই করা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো_ এনজিওগ্রাম করে হার্টের ব্লক ছুটানোর ব্যবস্থা না নিলে রোগীর কোনো সমস্যা হয় কি-না? সোজাসাপ্টা উত্তর হলো_ অবশ্যই সমস্যা হয়। ব্লক বড় বা গুরুত্বপূর্ণ হলে ব্লক আক্রান্ত রক্তনালী যেদিকে রক্ত সরবরাহ করত, হার্টের ওই অংশ রক্ত না পাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে যায়। ওই অংশের কোষগুলোও মারা যেতে থাকে। পরবর্তীতে কয়েক বছরের মধ্যে হার্টের আকৃতি বড় হয়ে যায় এবং হার্ট দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। রোগীর আকস্মিক মৃত্যু ছাড়াও হাঁটতে গেলেই বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং এমন সময় আসে যখন শুতে গেলেও শ্বাসকষ্ট হয়। এ অবস্থাকে মেডিক্যাল সায়েন্সের ভাষায় IDCM বলে। হার্ট বড় হওয়া শব্দটি সাহিত্যের ভাষায় ভালো লাগতে পারে। কিন্তু মেডিক্যাল সায়েন্সের ভাষায় হার্ট বড় হওয়ার অর্থ অতি শীঘ্রই মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়া। সদ্য প্রয়াত সাংবাদিক পথিক সাহার অকাল মৃত্যুই বলে দেয় হার্ট অ্যাটাকের সঠিক চিকিৎসা সময়মতো না নিলে কী ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়!

বড় হওয়া হার্টের চিকিৎসা অত্যধিক ব্যয়বহুল। অর্থাৎ শুরুতেই হার্টের ব্লকের চিকিৎসা হয়তো ১ লাখ টাকায় করা গেলেও হার্ট বড় হয়ে গেলে চিকিৎসা করতে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩-১৪ লাখ টাকা খরচ হয়। তারপরও ভালো ফলাফল পাওয়া যায় মাত্র শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে। তাই হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা সঠিক সময়ে নিতে না পারার কারণে ওই রোগী হার্টের দিক থেকে পঙ্গুত্ববরণ করে। এতে রোগী তার চাকরি/কর্মস্থল থেকে অবসর নিতে বাধ্য হন। দেশে বেকার সংখ্যা বাড়তে থাকে। রাষ্ট্র কর্মক্ষম থেকে কর্মহীন মানুষে পরিপূর্ণ হতে থাকে। দেশের উন্নয়নের চাকা পেছনে হটতে বাধ্য হয়।

ইদানীং কিছু চিকিৎসক দেশের মানুষের দারিদ্র্যতা ও অশিক্ষা তথা কুসংস্কারকে পুঁজি করে অপারেশন বা স্ট্যানটিং ছাড়া হার্টের ব্লক ছুটানোর মরণ খেলায় নেমেছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন নিজের পেশা ছেড়ে এদেশীয় বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিবর্গ। এদের রম্য বিজ্ঞাপনে মুগ্ধ হয়ে গত ৯ নভেম্বর ২০১০ সুদূর ইকুয়েডর থেকে হার্টের চিকিৎসার জন্য ছুটে এসেছিলেন মো. বাহার। হার্টের ডাক্তার নামধারী চর্ম রোগের একজন চিকিৎসকের অপচিকিৎসায় তার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তারপর প্রচলিত সঠিক চিকিৎসায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে এ যাত্রায় তিনি বেঁচে যান।

যদিও ইসিপি'র মাধ্যমে হার্টের ব্লক ছুটানো যায় না তবুও এ পদ্ধতির মাধ্যমে ব্লক ছুটানোর দাবিদার একটি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক নিজেই আরেকটি মেডিক্যাল সেন্টারে ৮ মে, ২০০৯ জাহানারা বেগম নামের এক রোগীর হার্টে তিনটি স্ট্যান্ট বা রিং বসান। আবার ১০ এপ্রিল ২০১০ মো. মফিজ উদ্দিন নামের আরেক রোগীর দেহে বসান একটি রিং। ইসিপি দ্বারা হার্টের ব্লক ছুটানো সম্ভব হলে কেন তিনি উপরোক্ত রোগীদের হার্টে রিং বসালেন?

বছরদেড়েক আগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একজন চিকিৎসক নিজেই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে আরেকজন চিকিৎসকের দ্বারা নিজের হার্টে স্ট্যান্ট (রিং) বসিয়ে সুস্থ জীবনযাপন করছেন। অথচ তিনিই হার্ট ব্লকের প্রচলিত চিকিৎসা অপারেশন অথবা রিংয়ের বিকল্প শুধু খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমেই এ ব্লকের চিকিৎসা করা যায় বলে প্রায়ই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন।

সর্বোপরি ভারতের একজন চিকিৎসকের অপারেশন বা স্ট্যান্টটিং ছাড়া শুধু তেল ছাড়া তরকারি খাইয়ে হার্টের ব্লক ছুটিয়ে দেওয়ার দাবি করে প্রায়ই পত্রিকায় বিজ্ঞাপনসহ জনপ্রতি ৭ হাজার টাকা প্রবেশ ফি নিয়ে সেমিনার করে যাচ্ছেন। আসলে তেল ছাড়া তরকারি খেলে হার্ট ব্লকের প্রবণতা কমে যায়। কিন্তু ব্লক একবার হয়ে গেলে তা কখনো ছুটে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গরু-ছাগলের মাংস খেলে হার্টে ব্লক হয় বলে আমরা এগুলো খেতে নিষেধ করি। কিন্তু গরু-ছাগল তো ঘাস খায়। তাহলে এদের দেহে চর্বি আসে কোত্থেকে? তাছাড়া বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের লোক তথা ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন তো মাংস খায় না। তাহলে তাদের হার্ট অ্যাটাক হয় কেন?

আসলে দেহের ছর্বি শতকরা ৭০ ভাগই তৈরি হয় লিভার থেকে। বাকি ৩০ ভাগ আমরা খাবার থেকে গ্রহণ করি। অর্থাৎ রক্তের চর্বির ৩০ ভাগের ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। কিন্তু বাকি অতিরিক্ত চর্বি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ ওষুধ স্ট্যাটিন প্রয়োগের পরও চর্বিজনিত কারণে হার্ট ব্লকের চিকিৎসায় স্ট্যান্টিং (রিং) ও বাইপাস করার প্রয়োজন হয়।

এখন প্রশ্ন হলো_ ৭০ ভাগ চর্বি যা লিভার থেকে তৈরি হয় তা কি খাবার থেকে আহরিত ৩০ ভাগ চর্বি থেকে বেশি নয়? তারপরও চর্বিজাতীয় খাবার না খেলে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা কমে। কিন্তু চর্বি বা তেলজাতীয় খাবার না খেলে হার্ট অ্যাটাক হবে না_ এ তথ্য একেবারেই মিথ্যা। কিন্তু এসব অসথ্য তথ্য নজরকাড়া বিজ্ঞাপনসহ কিছু ব্যক্তির মিডিয়ায় দিনের পর দিন কোন অদৃশ্য মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে উপস্থাপন করে চলেছেন তা বোধগম্য নয়। তবে এ অসত্য প্রচারণায় এদেশের কোমলমতি, দরিদ্র মানুষ তথা হৃদরোগীরা বিভ্রান্তিতে পড়ে আত্মাহুতি দিচ্ছেন এবং আরও দেবেন। আর যারা সঠিক সময়ে হার্ট অ্যাটাকের সঠিক চিকিৎসা না নিয়ে বেঁচে থাকবেন তারা অচিরেই হার্টের রোগের কারণেই পঙ্গু রোগীর মতো জীবনযাপনে বাধ্য হবেন।

উল্লেখ্য, হার্ট অ্যাটাকে ব্যয়বহুল আধুনিক চিকিৎসা বাইপাস সার্জারি ও স্ট্যান্টিং (রিং) এর দাম কমিয়ে সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার জন্য সরকার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারে। তাই চলুন আমরা দেশের জনগণকে বিভ্রান্তিতে না ফেলে আসল তথ্য প্রচার করি। অন্ধত্ব বিতরণ না করে আলো বিতরণ করি।



সুত্র:  ডাঃ রাকিবুল ইসলাম লিটু

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

হৃদরোগ বিভাগ

উত্তরা আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।

ই-মেইল : drlitu.card@yahoo.com

জীবনে চলার পথে কখনও কখনও উদাসীন হতে হয় , তা না হলে জীবন জটিল হয়ে যায় ।

লেখাটি CC by-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: হৃদরোগ চিকিৎসার নামে যা হচ্ছে...

সূত্রঃ http://www.bangladesh-pratidin.com/?vie … s_id=50078

লেখাটি LGPL এর অধীনে প্রকাশিত

Re: হৃদরোগ চিকিৎসার নামে যা হচ্ছে...

ধন্যবাদ। গুরুত্বপূর্ন পোষ্ট।

Re: হৃদরোগ চিকিৎসার নামে যা হচ্ছে...

দ্যা ডেডলক লিখেছেন:

সূত্রঃ http://www.bangladesh-pratidin.com/?vie … s_id=50078

সুত্র হিসেবস কি মুল লেখক কি চলেনা?

জীবনে চলার পথে কখনও কখনও উদাসীন হতে হয় , তা না হলে জীবন জটিল হয়ে যায় ।

লেখাটি CC by-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত