টপিকঃ পুঁজিবাজার নিয়ে কিছু কথা ।

শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন নিয়ে চারদিকে হতাশা। নানা প্রশ্ন জনমনে। কারা জড়িত এই চাঞ্চল্যকর কারসাজির সঙ্গে? নানা সূত্রের মতে, এর সঙ্গে জড়িত স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)-এর কতিপয় কর্মকর্তা, কিছু ব্রোকারেজ হাউজ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু ব্যক্তি। বিভিন্নভাবে কারসাজি করে শেয়ারবাজার থেকে তুলে নেয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা। নিয়ম ভেঙে অনুমোদন দেয়া হয়েছে কেপিসিএল এবং ওসিএল’কে। আর এর শিকার হচ্ছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।
নিয়ম করে নিয়ম মানছে না এসইসি-ই। এ বছর মাত্র দু’টি কোম্পানি বুক বিল্ডিং পদ্ধতি অনুসরণ করে নিবন্ধিত হয়েছে। ২০০৯ সালে প্রতিটি ৭০ টাকার শেয়ার থেকে গ্রামীণফোন ৯৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। ২০১০ সালে আরএকে সিরামিক ৪৮ টাকার প্রতিটি শেয়ার বিক্রি করে সংগ্রহ করে ১৬৬ কোটি টাকা। সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বুক বিল্ডিং নিয়মকানুন সংশোধন করে এসইসি।

২০১১ সালে এসইসির নতুন নিয়মের অধীনে প্রতিটি ১০ টাকা ফেসভ্যালুর শেয়ার এমআই সিমেন্ট বুক বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে (বিডিং) ১১১ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করে। এভাবে এমআই সিমেন্ট সংগ্রহ করছে ৩৩৫ কোটি টাকা। মবিল-যমুনা প্রতিটি ১০ টাকা ফেসভ্যালুর শেয়ার ১৫২ টাকা ৪০ পয়সা বিক্রি করে। এতে তারা সংগ্রহ করছেন ৬১০ কোটি টাকা। প্রতিটির প্রাইস আর্নিং (পিই) রেশিও যথাক্রমে ৫০ ও ৭০। এমআই সিমেন্টের সাবস্ক্রিপশন সম্পন্ন হয়েছে। লটারি হয়ে গেছে। শেয়ারও বণ্টন করা হয়েছে। তবে এখনও তালিকাভুক্ত করা হয়নি। মবিল-যমুনার সাবস্ক্রিপশন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু লটারি হয়নি। শেয়ারও বণ্টন করা হয়নি। অধিকন্তু আরও প্রায় ৪০টি কোম্পানি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে পাইপলাইনে রয়েছে। শেয়ার বাজারের সামপ্রতিক অস্থিরতা ও তীব্র সমালোচনার মুখে এ বছর ২০শে জানুয়ারি এসইসি একটি নোটিশ ইস্যু করে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি সাময়িক স্থগিত করে। যেসব কোমপানি সফলতার সঙ্গে নোটিশ মেনে চলেছে তাদেরকে এসইসি নোটিশের আওতার বাইরে রেখেছে। এর অর্থ হলো এমআই সিমেন্ট এবং মবিল-যমুনাকে নোটিশের আওতার বাইরে রাখা।

প্রিমিয়াম যোগ করায় এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম পিই লেভেলে অত্যধিক। এই শেয়ার বর্তমান বাজারে তালিকাভুক্ত হলে সূচক অনুযায়ী কমপক্ষে তিন ভাগের দুই ভাগ লোকসান হবে। আইপিওতে দরিদ্র শ্রেণীর বিনিয়োগকারী কিছু লাভের আশায় দরখাস্ত জমা দেন। বলাবলি আছে, এসব কোম্পানি এসইসি’কে ২০ কোটিরও বেশি টাকা ঘুষ দিয়েছে অনুমোদন পেতে। আর সে জন্যই তাদের এসইসি তালিকা থেকে বাদ রেখেছে। এসইসি থেকে এক সদস্য পদত্যাগ করার পর প্রত্যাশা করা হয়েছিল, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। কিন্তু এসইসির ভিতরে বাণিজ্য একই ভাবে চলছে। অর্থমন্ত্রী এ পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করবেন কিনা এবং এই দু’টি কোম্পানির আইপিও বাতিল করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফিরে পাওয়ার নিশ্চিত ব্যবস্থা করবেন কিনা তাই এখন দেখার বিষয়। ২০১০ সালে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মূল্য ছিল তালগোল পাকানো। পিই অনুপাত ছিল অত্যধিক চড়া। আর বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল খুব কম। এতে প্রতীয়মান হয় যে, এসব শেয়ারে কারসাজি করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, এসইসি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বড় বড় ব্রোকারেজ হাউজের স্পন্সর বা পরিচালকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা বড় অঙ্কের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও জড়িত। এর ফলে কারসাজি হচ্ছে এসব শেয়ারে। অনেক ক্ষেত্রে এসইসি নির্দেশনা জারি করেছে। আবার কয়েক দিনের মধ্যেই বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা পাল্টে দিয়েছে। ওইসব নির্দেশনা জারির আগে বা পরে ওইসব কোম্পানির শেয়ারগুলো কে কিনেছে তা তদন্ত করে বের করলে সব তথ্য পাওয়া যাবে।

বিও একাউন্ট খোলার জন্য আবেদনকারীর ছবি, ব্যাংক একাউন্টের বিবরণী দরকার হয়। ফলে কোন ভুয়া একাউন্ট খোলা আর সম্ভব নয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন হয় ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে। সব লেনদেনের রেকর্ড দেখাশোনা করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং সিডিবিএল। ফলে কে বা কারা কোন বিশেষ শেয়ার নিয়ে কারসাজি করছে তা উদঘাটন করা সহজ। দেখা গেছে, এসব কোম্পানির শেয়ার কেনা বা বেচার সঙ্গে জড়িত স্পন্সর/ডাইরেক্টর, বড় বড় ব্রোকারেজ হাউজ বেশি অঙ্কের বিনিয়োগকারী। তাদের কারসাজিতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা লোকসান গোনেন।
মাঝেমধ্যেই শেয়ারহোল্ডাররা এসইসি’র প্রতি এরকম শেয়ার হাতবদল নিয়ে তদন্তের অনুরোধ করেছে। তারা দাবি করেছে পিই রেশিও’র ওপর সার্কিট ব্রেকার আরোপ করতে। কিন্তু তা কাজে আসেনি। এসইসি এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিতে দৃঢ়সঙ্কল্পবদ্ধ ছিল। মূল অপরাধীরা এখন কঠোরভাবে চেষ্টা করছে এবং তারা সরকার ও বিরোধী দলকে ১৯৯৬ সালের নেপথ্য হোতাদের দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে নেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মূলে আসলে কারা তার তদন্তের জোর দাবি উঠেছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো হলো- সায়হাম টেক্সটাইল, সিএমসি কামাল, সাফকো স্পিনিং, ডেল্টা স্পিনিং, আর এন স্পিনিং, সোনারগাঁ টেক্সটাইল, মেট্রো স্পিনিং, ম্যাকসনস স্পিনিং, এইচ আর টেক্সটাইল, আমবি ফার্মা, ফার্মা এইডস, ম্যারিকো, কেয়া কসমেটিকস, কেয়া ডিটারজেন্ড, সামিট এলায়েন্স পোর্ট, ওসিএল, কনফিডেন্স সিমেন্ট, মেঘনা সিমেন্ট, আরামিট সিমেন্ট, আইএসএন, বিডি কম, অগ্নি সিস্টেমস, ড্যাফোডিল কম্পিউটারস, মন্নু সিরামিকস, বিজিআইসি, জনতা ইনস্যুরেন্স, সেন্ট্রাল ইনস্যুরেন্স, কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স, রূপালি ইন্স্যুরেন্স, পূবালী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রাইম ইন্স্যুরেন্স, অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া প্যাসিফিক, প্রগ্রেসিভ লাইফ, প্রাইম ইসলামী লাইফ, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স, স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, ঢাকা ইনস, প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, ইউনাইটড ইন্স্যুরেন্স, বিডি ওয়েল্ডিং, গোল্ডেন সন, বিচ হ্যাচারি, কেইসিএল, ফাইন ফুডস, ফু ওয়াং ফুডস, রহিমা ফুডস, চট্টগ্রাম ভেজিটেবল, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, বিডি থাই, কাসেম ড্রাইসেল, অলিম্পিক, ফিডেলিটি অ্যাসেটস, ন্যাশনাল হাউজিং, বিডি ফাইন্যান্স, বিআইএফসি ও ইসলামিক ফাইনান্স।

২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে সরকারি ৫টি ও বেসরকারি দু’টি  কোম্পানি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্ত হয়। এগুলো হলো- ডেসকো, পাওয়ারগ্রিড, যমুনা ওয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, তিতাস গ্যাস, শাইনপুকুর সিরামিকস এবং এসিআই ফর্মুলেশনস। এই সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০০৯ সালে একটি মাত্র কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হয়েছে। তা হলো নাভানা সিএনজি। পিই রেশিওতে ১০ টাকার শেয়ার গড়ে ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ওই কোম্পানি ৩৬৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।
এ ঘটনার সময় অতি উচ্চমূল্য ধরা এবং উচ্চ পিই রেশিও ধরায় বিভিন্ন মহল থেকে জোর সমালোচনা ওঠে। বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কমিটি থেকে এর সমালোচনা করা হয়।

এর ফলে এসইসি নোটিশ দিতে বাধ্য হয় যে, সরাসরি আর কোন কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির অনুমতি দেয়া যাবে না। নোটিশ দেয়ার সময় তিনটি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির আবেদন স্থগিত অবস্থায় ছিল। এগুলো হলো খুলনা পাওয়ার (কেপিসিএল), ওশিন কন্টেইনার লাইন (ওসিএল) এবং ওয়েস্টিন হোটেল। কিন্তু ২০১০ সালে কেপিসিএল এবং ওসিএল’কে সব নিয়ম ভঙ্গ করে সরাসরি তালিকাভুক্ত করার অনুমতি দেয় এসইসি। এতে অনেকেই হতবাক হয়ে যায়। তবে অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো ওয়েস্টিন হোটেল এই অনুমোদন পায়নি। ওদিকে প্রতি ১০ টাকার শেয়ার থেকে পিই রেশিওতে ৯৮ ও ৮১ অবস্থানে থাকা কেপিসিএল এবং ওসিএল গড়ে যথাক্রমে ২২৫ টাকা ও ৩২৫ টাকা হিসেবে বাজার থেকে সংগ্রহ করে ১,৫৬০ কোটি টাকা। মাত্র কয়েক মাস আগে নাভানা সিএনজি নিয়ে তীব্র শোরগোল হলেও তাতে কেউ কান দেয়নি। এখন কেপিসিএল-এর শেয়ারের দাম ৯৫ টাকা। ওসিএলের দাম ১১৪ টাকা এবং নাভানা সিএনজির দাম ১৩২ টাকা। এতে দেখা যায়, কেপিসিএল এবং ওসিএলের দামের তিন ভাগের দুই ভাগেরও বেশি দাম হাওয়ায় মিশে গেছে। এই চড়ামূল্যের মাধ্যমে কেপিসিএল এবং ওসিএলে প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এসইসি, ডিএসই এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ না থাকলে তারা এমনটি করতে পারতো না। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ একটি তদন্ত হলে বেরিয়ে আসবে কারা আসলে এর সঙ্গে যুক্ত।

এদিকে  জাতীয় প্রেসক্লাবে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘মনিটরি পলিসি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাংলাদেশ ব্যাংক’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন " শেয়ারবাজারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ ও নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। এমন পদক্ষেপ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও পরে নিতে পারতো। কারণ এ সময় ব্যাংকগুলোতে সাধারণত তারল্য ঘাটতি থাকে। এর প্রভাব শেয়ারবাজারে পড়েছে।"  তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে যাওয়া উচিত নয়। এতে ব্যাংকের বিনিয়োগকারীদের লাভের পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দেশে শেয়ারবাজারের যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এমনটি হলে দেশের অর্থনীতি খারাপ হয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশেরও চরম ক্ষতি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি হলে বর্তমান এ পরিস্থিতি হতো না। ইআরএফ’র সভাপতি মনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এ সময় অন্যান্যের মধ্যে পল্লীকর্ম সংস্থান ফাউন্ডেশন’র (পিকেএসএফ) সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান, কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কাওছার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধু মনিটরি পলিসিতে কাজ হবে না। এজন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)কে কার্যকর করতে হবে। টিসিবি’র জনবল ও পরিধি বাড়াতে হবে। তাদের স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ৫ ভাগের মধ্যে থাকলে ভাল। এর ওপর হলে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৭ ভাগের ওপরে। সুতরাং তা গুরুত্ব সহকারে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বাধা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করেছে। তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারতো। তবে এমন কাজ আরও করা উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন।

অপরদিকে পুঁজি বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বিভিন্ন সময় রোড শো’র মতো কর্মসূচি পালন করেছে। তাদের উৎসাহে বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে শেয়ারবাজারের দিকে ছুটে এসেছে। সারা দেশের বিনিয়োগকারীদের ডেকে নিয়ে এসে এখন এসইসি ও ডিএসই ডাকাতের মতো পকেট কেটে টাকা রেখে দিয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী তাদের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ পুঁজি হারিয়েছে। বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিনিয়োগকারীরা এসব কথা বলেন। এ সময় তারা বলেন, বিভিন্ন সময় এসইসি’র সিদ্ধান্ত পরিবর্তনই আজকের এ অবস্থা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদেরও ভূমিকা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক মিজানুর রশিদ চৌধুরী তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, অবিলম্বে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি বলেন, শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। তেমনি প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে যারা অবস্থান করে তা রাও এমন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের আনাচে-কানাচে মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা সাধারণ মানুষ পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ করেছে। তাদের রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক এ কে এম ফিরোজ, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুর রাজ্জাক, এম ফয়সাল আহমেদ, শেখ আতিক ইখতিয়ার ও এম জিহাদ উপস্থিত ছিলেন। পুঁজিবাজার উন্নয়নে এ সময় ১৫ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করে বলা হয় আইনি জটিলতা এড়াতে ২০শে জানুয়ারির অস্বাভাবিক লেনদেন বাতিল করা হোক। একই সঙ্গে এসইসি’র নির্দেশে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ফোর্স সেল বন্ধ করতে হবে। ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলোর এফডিআরের ৫০ ভাগ লভ্যাংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগেরও আহবান করা হয়।

‘মিউচুয়াল ফান্ডের কাজ হলো মার্কেট ধরে রাখা। অথচ বাজারে তাদের কোন ভূমিকা নেই। ২২ হাজার কোটি টাকার আইপিও সংগ্রহ করে সব টাকা তারা এফডিআর করে রেখেছে। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, কালো টাকা ৩ বছরের জন্য লকিং থাকবে পুঁজিবাজারে। সেই টাকাগুলো কোথায়? আমাদের মতো বিনিয়োগকারীরা পথে বসে গেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোন উদ্যোগ নেই।’ ট্রেড বন্ধ থাকলেও গতকাল ডিএসই- এর সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন বিনিয়োগকারী মুগদার আলী আজগর, তারাব’র আহমেদ হোসেন আর ফকিরাপুলের মুনির হাসান। এদের সবাই জানতে এসেছেন কবে থেকে ট্রেড চালু হবে। মুনির হাসানের দাবি হলো, ‘যে দেশের প্রধান বিচারপতি তার সম্পদের হিসাব দিতে পারেন সে দেশের ডিএসই কর্মকর্তা আনোয়ারুল কবির ভূঁইয়া, জিয়াউল হক খন্দকার কেন তাদের সম্পদের হিসাব দেবেন না। তাহলেই বের হয়ে আসবে গত কয়েকদিনে কত টাকা তারা সরিয়েছেন।’ বৃহস্পতিবারের রের্কড ধসের পরে গতকাল পুঁজিবাজারে ট্রেড বন্ধ ছিল। তারপরও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বিনিয়োগকারীদের যথেষ্ট পরিমাণ উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সবারই জানা ট্রেড বন্ধ। তারপরও অনেকে এসেছেন ব্যালেন্স শিট মেলাতে, কেউ এসেছেন খোঁজ নিতে কবে নাগাদ ট্রেড চালু হচ্ছে। মধুমিতা সিনেমা হলের উপরের সবগুলো ব্রোকার হাউজ ছিল বন্ধ। গেটের তালাও খোলেনি। রাজধানীর ডেমরার বড়ভাঙা এলাকা থেকে আসা মো. মহিউদ্দীন ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে গত দু’দিনে ৪৫ হাজার টাকার (বুধবার ১৮ হাজার আর বৃহস্পতিবার ২৭ হাজার) ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘শর্ট সেল হলে আমাদের ফোন করা হয়। আর এত বড় বিপর্যয় হলো তার খোঁজ অর্থ উপদেষ্টা রাখলেন না। বাবার পেনশনের ৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন শেয়ারবাজারে তাইফুর। এখন বিও একাউন্টে পড়ে আছে মাত্র ২৭ হাজার টাকা। গতকাল তিনি এসেছিলেন ব্রোকার হাউজে। তার মতে, ‘বুক বিল্ডিং পদ্ধতি কোন কাজে আসেনি। যমুনা লুব্রিকেন্টের ১০ টাকার শেয়ার ১৪২ টাকার প্রিমিয়ামে কিনতে হয়েছে। আর আমার মতো মানুষ নিঃস্ব হয়েছে। এখন আল্লাহ আর প্রধানমন্ত্রী যদি চান তবে বাজার ফিরতে পারে।’ এদের মতো গতকাল যারা এসেছেন তাদের সবাই শেয়ারবাজারে ভরা হাতে এসে খালি হাতে ফিরে গেছেন। গত কয়েকদিনের চেয়ে গত দিনের মতিঝিল অনেক বেশি শান্ত। বিশৃঙ্খলা এড়াতে দাঙ্গা পুলিশের ২২ জনের একটি দল পাহারা দিচ্ছে ডিএসই ভবন। আর বিনিয়োগকারীরা জানালেন তারা সময়কে পাহারা দিচ্ছেন কখন আবার ট্রেড চালু হয়ে বাজারের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে আর তাদের টাকা তাদের হাতে ফিরে আসবে।






সুত্রঃ বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ।