টপিকঃ চা এর ইতিকথা

https://i1.wp.com/tothocanvas.com/wp-content/uploads/2020/03/Tea.jpg?resize=897%2C675&ssl=1

ইংরজিতে চা-এর প্রতিশব্দ হলো Tea. গ্রীকদেবী থিয়ার নামানুসারে এরূপ নামকরণ হয়েছিল। চীনে ‘টি’-এর উচ্চারণ ছিল ‘চি’। পরে হয়ে যায় ‘চা’। ইংরেজি ভাষায় ‘চা’ কে Camellia sinensisও বলা হয়ে থাকে। এটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ওষুধ হিসেবে, তারপর পানীয় হিসাবে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

মজার ব্যপার হলো চীনা ভাষায় ‘শেন নাং’ নামটির অর্থ হলো ‘স্বর্গীয় কৃষক’। শেন নাংও যেনো স্বর্গ থেকে চেয়ে এনেছিলেন চা নামের প্রিয় পানীয়টি। সম্রাট শেন নাং ছিলেন দারুণ স্বাস্থ্যসচেতন। একবার তিনি আদেশ চালু করলেন যে তার প্রজাদের সবাইকে পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। একদিন বিকেলে রাজকার্যের ক্লান্তি দূর করার জন্য ক্যামেলিয়া গাছের নিচে বসে সম্রাট ফুটানো গরম পানি পান করছিলেন, কোত্থেকে যেন তার গরম পানির পাত্রে এসে পড়লো কয়েকটি অচেনা পাতা। পাতাগুলো পানি থেকে বের করার আগেই তার নির্যাস মিশে যেতে লাগলো পানির সাথে। নির্যাসমিশ্রিত এই পানি পান করার পর নিজেকে অন্যদিনের চাইতে অনেক বেশি চনমনে লাগলো তার। ঘুম ঘুম ভাব কেটে গেলো, ক্লান্তি দূর হলো আর সম্রাটও নতুন স্বাদ পেয়ে খুশি। পরবর্তীতে জানা গেলো এটা ‘ক্যামেলিয়া সিনেনসিস’ গাছের পাতা

https://i1.wp.com/tothocanvas.com/wp-content/uploads/2020/04/MNMN-1024x577.jpg?resize=782%2C439&ssl=1


চা বলতে এক ধরণের সুগন্ধযুক্ত ও স্বাদবিশিষ্ট পানীয়কেও বোঝানো হয়। এই পানীয় ‘ক্যামেলিয়া সিনেনসিস’ গাছের পাতাকে বিশেষ উপায়ে প্রস্তুতের মাধ্যমে গরম পানিতে মিশিয়ে তৈরি করা হয়। ক্যামেলিয়া সিনেনসিস গাছের সাধারণ নামও চা।

স্বাভাবিক রীতিতে একে বাড়তে দিলে ৩০-৪০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। কিন্তু ৪-৫ ফুটের মতো রেখে কেটে ছোট করা হয়, যাতে ঝোপালো হয়ে প্রচুর পাতার সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য বাগানের মাঝে মাঝে ছায়াদার গাছ লাগনো হয়। চা গাছ থেকে সাধারণত ১০০ বছর পর্যন্ত ভালোভাবে পাতা সংগ্রহ করা যায়। কোথাও কোথাও ১৫০ বছর পর্যন্ত বাচেঁ। এর বীজ গোল-লম্বাটে, বাইরের আবরণ খুব শক্ত।

চীনে চায়ের প্রচলন শুরু হয় ঔষধ হিসেবে। ইংল্যান্ডে নামকরা চায়ের ব্র্যান্ড হলো ‘টাইফু’, চীনা ভাষায় যার অর্থ ‘চিকিৎসক’। চাতে রয়েছে ৭% থিওফাইলিন ও থিওব্রোমিন যা শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির জন্য অনেক উপকারী। এতে রয়েছে ২৫% এরও বেশি পলিফেনলস, যা ক্যান্সার প্রতিরোধী। ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে জাপানে চায়ের অভ্যাস চালু হয়।

চীনের সিচুয়ান প্রদেশের লোকেরা সর্বপ্রথম চাপাতা সেদ্ধ করে ঘন লিকার তৈরী করতে শেখে। ১৬১০ সালে ইউরোপে চায়ের প্রবেশ ঘটে পর্তুগীজদের হাত ধরে এবং ১৬৫০ সালে চীনে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের উৎপাদন শুরু হয়। এর পর এটি উৎপাদনে ইর্ষান্বিত হয় ইংরেজরা। ১৭০০ সালের দিকে ব্রিটেনে চা জনপ্রিয়তা পায় এবং এদের মাধ্যমেই ভারতীয় উপমহাদেশে চায়ের প্রবেশ ঘটে। প্রথম দিকটায় ঝোঁকের বশে ইংরেজরা সোনার বিনিময়ে চীনের কাছ থেকে চা আমদানি করে এবং এতে করে ইংল্যান্ডের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়। এই ক্ষতি রোধ করতে ব্রিটিশ সরকার তাদের কোম্পানির মাধ্যমে ভারতে আফিম চাষ করে এবং চীনকে বাধ্য করে এই আফিমের বিনিময়ে চা রপ্তানী করতে।

যে চা আজ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি গৃহে অতিথির প্রথম আপ্যায়ন, সে চা’কে কিন্তু ভারতবর্ষে অতিথি হয়ে প্রবেশ করতে পোহাতে হয়েছে অনেক ভোগান্তি। সেসময়ের অন্যান্য সকল নতুন বিষয়ের মতই ১৮১৮ সালে চা’কেও ভারতবর্ষে পৌঁছে দেয় ব্রিটিশরা। ছোট ছোট দোকান খোলার উদ্দেশ্যে নামমাত্র মূল্যে, বাকিতে এবং সর্বোপরি বিনামূল্যে পর্যন্ত চা সরবরাহ করেছে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো।

ব্রিটিশরা চেয়েছিলো এদেশের মানুষের মর্মে চা কে প্রবেশ করাতে, তাদেরকে চাতে অভ্যস্ত করে তুলতে। যাতে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের তালিকায় চা স্থান পায়। কিন্তু চা’কে এদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য বা জনপ্রিয় করে তোলাটা এত সহজও ছিলো না। প্রথম চা কোম্পানী ‘অসম চা কোম্পানী’ প্রতিষ্ঠার পরপরই ইংরেজরা এর আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞাপনে জোর দেয়। প্রথম কাজ ছিল বিশেষজ্ঞদের দিয়ে চায়ের বিজ্ঞানসম্মত উপকারিতা বের করা। তারপর এর সাথে আকর্ষণীয় ভাষার বিজ্ঞাপন তৈরি।

চিনে প্রাচীন কাল থেকে মশলা সহযোগে চা খাওয়ার উদ্ভব হয়। আমাদের দেশে অনেকে আদা, পুদিনা, লেবু, এলাচ, লবঙ্গ ইত্যাদি দিয়ে চা খান। বর্মায় চায়ের পাতার ভর্তা জনপ্রিয়। ওরা এই ভর্তা প্যাকেট করে বিক্রি করে।সঙ্গে নানা ধরণের ডাল ভাজা, উৎকৃষ্ট তেল বা মাখন দিয়ে ভেজে পাকেটে দেওয়া হয়। চাকে বার্মায় বলে লাপপে। মারমা ভাষায়ও তাই। ভাত খাওয়ার পর ওরা তন্দ্রা বা আলস্য কাটার জন্য এই ভর্তা খায়।

পানির পরেই এটি বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত পানীয়। এর একধরণের স্নিগ্ধ, প্রশান্তিদায়ক স্বাদ রয়েছে এবং অনেকেই এটি উপভোগ করে। প্রায় ছয় ধরণের চা রয়েছে। সাদা , হলুদ, সবুজ, উলং, কালো এবং পুয়ের চা। তবে সর্বাধিক পরিচিত ও ব্যবহৃত হলো সাদা, সবুজ, উলং এবং কালো চা। প্রায় সবরকম চা ‘ক্যামেলিয়া সিনেনসিস’ থেকে তৈরি হলেও বিভিন্ন উপায়ে প্রস্তুতের কারণে এক এক ধরণের চা এক এক রকম স্বাদযুক্ত।

চায়ের অসাধারণ বর্ণনা আছে জাপানি সাহিত্যে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইসুনারি কাওয়াবাতার ছোট একটি অসাধারণ উপন্যাসের নাম ‘সেমবাজুরু’। বাংলা অর্থ ‘হাজার সারস’। এতে চায়ের কেতলি, চায়ের রাকু বাটি, জলদানি, ফুলদানি, শিনো ও খারাৎস্যু চিনে-মাটির পাত্রের কথা বার বার ঘুরে ফিরে আসে। ওকাকুরা কাকুজো-রচিত দ্য বুক অব টি’ বইটি জাপানি সাহিত্যের এক অসাধারণ বই।

রাশিয়ায় চায়ের আরক তৈরি করে বোতলে ভরে রাখে। তারা পানি ফুটিয়ে সেই পানিতে পারিমাণ মতো চায়ের ঘন আরক মিশিয়ে খেয়ে থাকেন। চীন, জাপান, মিয়ানমার, মঙ্গোলিয়া ও কোরিয়ায় দুধ-চিনি ছাড়া সবুজ চা সারাদিন কাপের পর কাপ পান করে। যাদের এসিডের সমস্যা তাদের জন্য এই চা ওষুধ। দুধ-চিনি সহযোগে চা খাওযা আমরা শিখেছি ইংরেজদের কাছ থেকে।। এটি চায়ের আধুনিক তৈরি পদ্ধতি। তবে এতে চায়ের অনিষ্টকর কেফিন নষ্ট হয়।

ইউনানী মতে চা হৃদরোগ, দুঃখ ও ভ্রম নিবারণে উপকারি। এটি রক্তাল্পতা এবং জলোদরে খুব উপকারী। মূত্র সৃষ্টিকারী বলে এটি কামনা ও মূত্ররোধে কাজ করে। পাতা বেটে গরম করে প্রলেপ দিলে গ্রন্থি ও অর্শের বেদনা দূর হয়।

মেয়েদের কোনো কিছুতেই চুল ওঠা বন্ধ না হলে, চাপাতা পানিতে সেদ্ধ করে ঠাণ্ডা করার পর প্রতিদিন একবার ঐ পানি দিয়ে মাথা ধুয়ে ফেলতে হবে। মাসখানেক এভাবে ব্যবহার করলে উপকার পাবেন। চা তৈরির পর চায়ের গরম পাতাগুলো পাতলা পরিষ্কার কাপড়ে পুঁটলি করে ভাপ চোখে লাাগলে চোখ ওঠা প্রশমিত হবে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৩ সালে বিশ্বে চা উৎপাদিত হয়েছিল ৩.২১ মিলিয়ন টন। ২০০৮ সালে বিশ্বে উৎপাদন ৪.৭৩ মিলিয়ন টনেরও বেশি হয়েছিল। সর্ববৃহৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে – চীন, ভারত, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং তুরস্ক অন্যতম।


#সংগৃহীত

"We want Justice for Adnan Tasin"