সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন আউল (০১-০৭-২০২১ ১৬:৪৯)

টপিকঃ জোনাকি জ্বলে মিটিমিটি

জাস্ট শেয়ার করছি

https://images.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2021-06%2F71fa713b-0a22-46ff-9354-fc815814135a%2Ffe76756e705af0b21d5a7bd2a3282edb.jpg?rect=0%2C226%2C4338%2C2440&auto=format%2Ccompress&fmt=webp&format=webp&w=900&dpr=1.0

‘লেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে’—বাল্যকালের শিক্ষায় এমনি ধারার জোনাকি নিয়ে কত ছড়া না আমরা পড়েছি। সেই সময় জোনাকি নিয়ে আমাদের কৌতূহল-আগ্রহের অন্ত ছিল না। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রসংগীতের ‘ও জোনাকি, কী সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছ’ ধরনের পঙিক্তমালা আমাদের মুগ্ধ করেছে।

জোনাকির ইংরেজি প্রতিশব্দ ফায়ার ফ্লাই। এর অর্থ দাঁড়ায় আগুনের মাছি। এই মাছি শব্দটি আমাদের একটা ভুল বার্তা দেয়। আসলে জোনাকি মাছি বা ফড়িং-জাতীয় কোনো ইনসেক্ট বা পোকা নয়। বরং এটি একটি নরমদেহী বিটল। যেমন ক্রিকেট, লেডিবার্ড বিটল ইত্যাদি। আমেরিকায় এটাকে বলে গ্লো-ওয়ার্ম।

জীববিজ্ঞানের শ্রেণি বা জাত পরিচয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে জোনাকি কীটপতঙ্গ দলের পরিচিত সদস্য। বর্গ পরিচয়ে এটি কোলিওপটেরা। পরিবার ল্যাম্পাইরিডি (Lampyridae)। এখানে ধরা যেতে পারে ‘লাম-পরিবারের নামের প্রথম অংশ ‘Lamp’ কথাটা এই পরিচিতির ইঙ্গিতবহ। অর্থাত্ এটি জ্বলে বা আলো দিতে সক্ষম। এই আলো দেওয়ার ক্ষমতা যেসব জীবজ বস্তুর রয়েছে, তাদের আমরা বায়োলুমিনেসেন্ট (Bioluminescent) বলে চিহ্নিত করি। জীবজ গবেষণার ক্ষেত্রে এই আলো একটি বিস্ময়কর ও জটিল গবেষণার বিষয়।

জোনাকি পোকার দেহ-কাঠামো নরম এবং চামড়ার মতো আবরণে ঢাকা। ওড়ার পাখাটি থাকে সেলে বা ইলাইট্রার নিচে। ওড়ার সময় তা বেরিয়ে আসে। আমাদের সাধারণ ধারণামতে, এদের পাখায় কোনো আলো থাকে না। আলো জ্বলে উদর বা অ্যাবডোমেন থেকে। এই আলো হলুদ, সবুজ ও হালকা লাল রঙের হয়ে থাকে। সাধারণত এ প্রাণীগুলো নিশাচর। তবে কিছু কিছু দিবাচর প্রজাতিও রয়েছে, যাদের আলো থাকে না।

জীবনবৃত্তান্ত

জোনাকি পোকার আবাসস্থল প্রধানত উষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে। এসব অঞ্চলের ডোবা-নালা, ভেজা স্যাঁতসেঁতে বনভূমিতে এদের বেশি দেখতে পাওয়া যায়। কেননা, এসব সদস্যের শূককীট (অপরিণত অবস্থা) এসব জায়গায় প্রচুর খাবারের সন্ধান পায় এবং সহজে বেড়ে উঠতে পারে।

জানামতে, পৃথিবীতে দুই হাজার প্রজাতির জোনাকি পোকা রয়েছে। আমাদের দেশে এদের পরিসংখ্যান জানা নেই। তবে এগুলো ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশের সর্বত্র। এমনকি ঢাকার আশপাশের বন-জঙ্গলেও এদের উড়তে দেখা যায়। সাধারণত বেশির ভাগ জোনাকির স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ই উড়তে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু পুরুষ সদস্য ওড়ে। স্ত্রী জোনাকি উড়তে পারে না। শীতকালে এগুলো শীতনিদ্রায় (হাইবারনেশন) যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এরা গর্ত খুঁড়ে কয়েক বছরও এমনি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকতে পারে।

আমাদের অনেকের জানা নেই যে অন্য একধরনের জোনাকি সদস্য রয়েছে, যারা আলো উত্পাদন করতে বা বিচ্ছুরণ ঘটাতে পারে না। সেগুলো দিনের বেলায় উড়ে চলাচল করে। এ ক্ষেত্রে জোনাকির আলোর যে মুখ্য ভূমিকা, অর্থাত্ সংকেত আদান-প্রদান ও প্রজনন সময়কার যোগাযোগ রক্ষা করা, এ ক্ষেত্রে তা অন্যভাবে কার্যকর হয়। এসব দিবাচর জোনাকির বেলায় সেই কার্যকারণ সংঘটিত হয় ফেরোমোন নামের একধরনের হরমোনের সাহায্যে। এই ফেরোমোন বাতাসের মাধ্যমে এক সদস্যের কাছ থেকে অন্যটির কাছে যায়।

আলোর জ্বলার রহস্য

বিজ্ঞানীরা জোনাকির আলোকে ‘ঠান্ডা আলো’ নামে অভিহিত করে থাকেন। কারণ, এই আলোর কোনো উত্তাপ থাকে না। পৃথিবীতে যত আলোর উত্স রয়েছে, এর মধ্যে এই আলো সবচেয়ে বেশি কার্যকর বা সুদক্ষ। কেননা, এখানে যে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়, তা প্রায় ১০০ শতাংশ আলো তৈরি করে। অন্যদিকে আমাদের বৈদ্যুতিক বাল্ব কেবল ১০ শতাংশ আলোকশক্তিতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ার বাকি ৯০ শতাংশ তাপশক্তি পরিবেশে হারিয়ে যায়।

বায়োলুমিনেসেন্স রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জোনাকির দেহে এই আশ্চর্য ‘ঠান্ডা আলো’ তৈরি হয়ে থাকে। এই বিক্রিয়া সংঘটিত হয় জোনাকির সিমন উদরে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছে: ম্যাগনেশিয়াম আয়ন, ATP ও অক্সিজেনের উপস্থিতিতে লুসিফারেজ অ্যানজাইম লুসিফারিনের ওপর যে বিক্রিয়া ঘটায়, তাতেই জোনাকির আলোক-কণা তৈরি হয়।

প্রায় সব জোনাকির শূককীটে এই আলো জ্বলে। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, পরিণত জোনাকির আলো আর শূককীট আলো জ্বলার বৈশিষ্ট্যগত ভিন্ন কার্যকরণ রয়েছে। শূককীটের আলো মূলত অন্য শিকারি প্রাণীকে ভয় দেখানোর জন্য। কারণ, শূককীট অবস্থায় এগুলো সহজে অন্য পশুপক্ষীর শিকারে পরিণত হয়।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল থেকে এমনই ঠান্ডা বাল্ব বা আলো তৈরির চেষ্টা করে আসছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁরা সফল হতে পারেননি। সফল হলে সেটা হবে এক বিস্ময়কর বিজ্ঞান আবিষ্কার।

লেখক: সাবেক জ্যেষ্ঠ আণবিক বিজ্ঞানী ও খণ্ডকালীন অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

*লেখাটি ২০১৭ সালে #বিজ্ঞানচিন্তার সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত

"We want Justice for Adnan Tasin"

Re: জোনাকি জ্বলে মিটিমিটি

dream dream


জোনাকি পোকা নিয়ে এত্ত কিছু জানা ছিল না!  ছোট থাকতে  গ্রামের গিয়ে যা দেখেছি। জোনাকি নামে একটা পোকা আছে এটা তো ভুলেই গিয়েছিলাম!  tongue_smile