টপিকঃ সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন: চাপের মুখে কি নতি স্বীকার?

#সড়কহত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ হচ্ছেনা, ধরা হচ্ছেনা বলেই
অনুপ্রাণিত হয়ে সড়কহত্যা বেড়েই চলেছে,তার উপর ২০১৮ সালে পাসকৃত "সড়কআইন" নমনীয় শিথিল করা হচ্ছে ! কিন্তু কোন প্রতিবাদ নেই


আইনটি বাস্তবায়নের আগে থেকেই শাস্তি কমানোর এমন দাবি করে আসছিলেন নেতারা৷ আইন সংশোধনের এ উদ্যোগে তাই প্রশ্ন উঠেছে যে, পরিবহন নেতাদের চাপের মুখে কি নতি স্বীকার করছে সরকার?

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পরিবহন সেক্টরে যারা আছেন তারা সরকারি দলের নেতা৷ আইনটি পাশ হওয়ার পর তারা এটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নই করতে দেননি৷ তারা  সংশোধনের জন্য লেগে ছিলেন৷ তারা যেটা চাইছেন, সেটাই হচ্ছে৷ আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল, তারপর অসুবিধাগুলো দেখে  প্রয়োজনে সংশোধন করা যেত৷ পরিবহন সেক্টরে যে নৈরাজ্য চলছে, সেখানে শৃঙ্খলা ফেরাতে আমরা কোনো আশা দেখছি না৷ কিন্তু আমরা দেখছি, পরিবহন সেক্টরের লোকজন যা চাচ্ছে তাই হচ্ছে৷ এখন করোনা মহামারি চলছে, লকডাউন চলছে৷ অফিস আদালত বন্ধ৷ এখন কেন এটা করতে হবে?’’

অনেক বাধা পেরিয়ে সংসদে পাশ হওয়ার পর ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮'-এর গেজেট জারি করা হয়৷ এর পরও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে আইনটি বাস্তবায়ন করতে পারছিল না সরকার৷ পরে ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে সরকার সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের ঘোষণা দেয়৷ যদিও সেখানে কিছু ধারা শিথিল করার কথা ট্রাফিক পুলিশকে বলা হয়৷ সেভাবেই এতদিন আইনটি বাস্তবায়ন করছিল ট্রাফিক পুলিশ৷

তবে এই সংশোধনেও খুশি নন শ্রমিক নেতারা৷ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা ৩৪টি ধারা সংশোধনের জন্য বলেছিলাম৷ তার অনেকগুলোই হচ্ছে না৷ আমাদের যে দাবি ছিল, তার ৫০ থেকে ৫৫ ভাগ হচ্ছে৷ এভাবে সংশোধন হলে আমরা মানব না৷ প্রয়োজনে আবারও আন্দোলনে যাব৷’’

জানা গেছে, সংশোধিত আইনের খসড়া প্রণয়ন করে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়৷ আগামী ১৩ মে পর্যন্ত মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে৷ মতামত নেওয়া শেষ হলে আইনের খসড়া মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমরা আইনের খসড়া মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছিলাম৷ তাদের সুপারিশ অনুযায়ী এখন ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে৷ মানুষের মতামত দেওয়া শেষ হলে এরপর এটি আবার মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে পাঠিয়ে দেওয়া হবে৷’’

এদিকে শ্রমিক নেতা ওসমান আলী যে ৩৪টি ধারা সংশোধনের কথা বলেছিলেন এর মধ্যে জরিমানা ও শাস্তি সংক্রান্ত ২৯টি ধারাই সংশোধন হচ্ছে৷ খসড়া অনুযায়ী আইনটির সংশোধন হলে সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন এবং চালকের অবহেলার কারণে দুর্ঘটনায় কেউ আহত হলে চালককে দায়ী করে বিচার করা যাবে না৷ তবে কেউ দুর্ঘটনায় মারা গেলে তখন শুধু এটি প্রয়োগ করা যাবে৷ খসড়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে৷ অষ্টম শ্রেণির পরিবর্তে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই একজন চালক নিবন্ধনকৃত থ্রি-হুইলার বা তিন চাকার গাড়ি চালাতে পারবেন৷

অন্য পরিবহনগুলো চালানোর জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা অপরিবর্তিত থাকবে৷ অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণি পাশ হতে হবে৷ তবে একজন হেল্পার বা সুপারভাইজারের ১০ বছর গাড়িতে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থাকলে এবং ড্রাইভিং সক্ষমতা বোর্ডে পাশ করলে তার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ কয়েকটি শর্ত মানা প্রয়োজন হবে না বলে আইনটির খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে৷

এই ধারাটির সংশোধন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন৷ তিনি বলেন, ‘‘যেখানে বলা হচ্ছে হেল্পার বা সুপারভাইজার গাড়ি চালাতে পারবেন না৷ তাহলে ১০ বছর তিনি গাড়িতে চাকরি করলেই কিভাবে পরীক্ষার জন্য মনোনীত হন৷ তাহলে তো এখানে ফাঁক থেকেই যাচ্ছে৷ অর্থাৎ যাত্রী নিয়ে তারাও গাড়ি চালিয়ে চালানো শিখবেন৷ এটা আরো ভয়ঙ্কর ঝুঁকি তৈরী করবে৷’’

বিদ্যমান আইনের ১২৬টি ধারার মধ্যে কমপক্ষে ২৯টি ধারা সংশোধনের উদ্যেগ নেওয়া হয়েছে৷ ভারি ও মাঝারি মোটরযানের সংজ্ঞাসহ আটটি বিষয়ের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হবে৷

শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন আইনটি পাশ হয়৷ কিন্তু, ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সরকার এটি কার্যকর করেনি৷ আইনটি পাশ হওয়ার পর পরই এটি পরিবর্তনের দাবিতে পরিবহন শ্রমিকরা দুই দফায় ধর্মঘট ডাকে৷ এর ফলে আইনটি কীভাবে প্রয়োগ করা যায় এ বিষয়ে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রীর সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়৷ পরে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে সরকার আইনটি প্রয়োগের উদ্যোগ নিলে পরিবহন সংগঠনগুলো আবারও ধর্মঘট ডাকে৷ তাদের মূল দাবিগুলো মধ্যে ছিল - আইনটির অধীনে সব অপরাধ জামিনযোগ্য করতে হবে এবং জরিমানার টাকা কমাতে হবে৷

আইনটির ১০৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কেউ যদি মোটরযান দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হন বা মারা যান, তাহলে তা ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী অপরাধ বলে বিবেচনা করা হবে৷

পেনাল কোডের ৩০৪/বি ধারায় যাই বলা থাকুক না কেন কারও নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি চালানোর ফলে বা অবহেলাজনিত কারণে কেউ যদি দুর্ঘটনার শিকার হন এবং এতে যদি কেউ মারা যান বা মারাত্মকভাবে আহত হন তাহলে তাদের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড কিংবা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় শাস্তি হবে৷ কিন্তু, খসড়ায় ‘মারাত্মকভাবে আহত' বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে এবং জরিমানা তিন লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে৷ তবে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিষয়টি রাখা হয়েছে৷ খসড়ায় বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীর পরিবারকে জরিমানার টাকা সম্পূর্ণ বা আংশিক পরিশোধের জন্য আদালত আদেশ দিতে পারবে৷

বর্তমানে আইনের ৮৪, ৯৮ ও ১০৫ ধারা অজামিনযোগ্য অপরাধ৷ কিন্তু আইনটি সংশোধন হলে ৮৪ ও ৯৮ ধারা জামিনযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে৷ ৮৪ নম্বর ধারায় অবৈধভাবে মোটরযানের আকৃতি পরিবর্তনে শাস্তির কথা বলা হয়েছে৷ ৯৮ নম্বর ধারায় ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গাড়ি চালানোর শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে৷ খসড়া অনুযায়ী ৯৮ ধারাকে আপোষযোগ্য বলা হয়েছে৷

তবে খসড়া অনুযায়ী, ১১টি ধারার নির্ধারিত জরিমানা এবং চারটি ধারার কারাদণ্ডের শাস্তি কমানো হবে৷

এদিকে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অনির্ধারিত জায়গায় গাড়ি পার্ক করলে বা যাত্রী ওঠানামা করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে৷ কিন্তু সংশোধনের জন্য করা আইনটির খসড়ায় বলা হয়েছে, এ অপরাধের জন্য মাত্র এক হাজার টাকা জরিমানা করা হবে৷

ট্রাফিক সংকেত না মেনে চলার শাস্তি বর্তমানে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে৷ চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক এক পয়েন্ট কাটা হবে৷ খসড়ায় কারাদণ্ড উঠিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা৷

DW

"We want Justice for Adnan Tasin"