টপিকঃ পারিজাতের পরিচয়

https://i.imgur.com/dHuURZxh.jpg

হিন্দুধর্মগ্রন্থ মহাভারতে আছে অমৃতের সন্ধানে দেবতা ও অসুররা মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড এবং শিবের স্কন্ধসঙ্গী নাগরাজ বাসুকীকে মন্থনরজ্জু হিসাবে ব্যবহার করে সমুদ্র থেকে তুলে এনেছিলেন একের পরে এক আশ্চর্য সব বস্তু। সেই মন্থনে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন লক্ষ্মীদেবী, ঐরাবত হস্তী, উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব, অপ্সরাকুল, কামধেনু, চন্দ্র ইত্যাদি, এবং অবশ্যই হলাহল বিষ ও অমৃত। এসব ছাড়াও সেই মন্থনে উঠে এসেছিল এক আশ্চর্য বৃক্ষ, যার নাম পারিজাত। দেবরাজ ইন্দ্রের স্বর্গের নন্দন কাননে পারিজাত স্থান পেয়েছিলো। পারিজাত স্বর্গের শোভা হয়ে নিজের ঘ্রাণে মুগ্ধ করতো দেব দেবীদের।

https://i.imgur.com/LPQbQiNh.jpg

স্বর্গ থেকে পারিজাত গাছটি পৃথিবীতে নিয়ে আসা নিয়ে পৌরাণিক কাহিনী দুই দিকে বাঁক নেয়। একদিকে পারিজাত গাছটিকে পৃথিবীতে আনে শ্রীকৃষ্ণ। কৃষ্ণের দুই স্ত্রী সত্যভামা ও রুক্মিণীর খুব ইচ্ছে তাদের বাগানও পারিজাতের ঘ্রাণে আমোদিত হোক। কৃষ্ণ স্ত্রীদের খুশি করতে লুকিয়ে স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ থেকে একটি ডাল ভেঙ্গে এনে সত্যভামার বাগানে রোপণ করে। যার ফুল রুক্মিণীর বাগানেও ঝরে পরে সুগন্ধ ছড়ায়।

অন্যদিকে আরেকটি কাহিনীতে বলা হয় অর্জুন তার মা কুন্তীর জন্য স্বর্গ থেকে পারিজাত গাছটি পৃথিবীতে নিয়ে আসে।  পান্ডবদের বনবাস কালে, তাদের মা কুন্তী যাতে পারিজাত ফুল দিয়ে শিবপূজা করতে পারেন সেই জন্য অর্জুন পারিজাত বৃক্ষটি পৃথিবীতে নিয়ে আসে।


তাছাড়া মহাভারত-এর অন্যতম চরিত্র পাণ্ডবমাতা কুন্তীর নাম থেকে উত্তরপ্রদেশের বরবাঁকি জেলার একটি গ্রামের নামকরণ হয় কিন্তুর। কিংবদন্তি অনুযায়ী, এখানকার অসংখ্য প্রাচীন মন্দিরের একটি নাকি স্বয়ং কুন্তী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। মনে করা হয়, কুন্তীকে এখানেই দাহ করা হয়েছিল এবং তার চিতাভস্ম থেকেই জন্ম নেয় একটি পারিজাত বৃক্ষ।

https://i.imgur.com/kiwbEQQh.jpg

এই গাছটিকে সম্মান জানিয়েছে ভারত সরকারও। ভারতীয় সরকার ১৯৯৭ সালে এই পারিজাতের ছবিওয়ালা একটি ৫ টাকা মূল্যের ডাকটিকেট এবং এই পারিজাতের ফুলের ছবিওয়ালা একটি ৬ টাকা মূল্যের ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

https://i.imgur.com/0v6TlL7h.jpg

এই পারিজাত গাছটি আসলে একটি বাওবাব (Baobab) গাছ, এবং খুব সম্ভবতঃ আফ্রিকা থেকে আনা। এই নির্দিষ্ট বৃক্ষটি ছাড়া অন্য কোনো বাওবাব গাছকে কিন্তু পারিজাত বলা হয় না।
এতোক্ষণে আপনার একটি পারিজাতের দেখা পেলেন।

https://i.imgur.com/wwvXGBBh.jpg


আমাদের সকলের অতি পরিচিত শিউলি বা শেফালি ফুলের আরেক নাম পারিজাত। উপরের হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলির বর্ননা অনুযাই তাদের পারিজাত হচ্ছে এই শিউলি ফুল (আমার মতে)। ফুলটির হওয়ার কথা শ্বেত-শুভ্র এবং সুগন্ধী যুক্ত। বাওবাবের ফুল সাদা হলেও সুগন্ধী অবশ্যই নয়। বরং এর ঘ্রাণ আমার কাছে বেশ বাজেই মনে হয়েছে।

https://i.imgur.com/oxZvyhzh.jpg

শিউলি ফুল নিয়ে আরো একটি মিথ আছে।
পারিজাতিকা নামের এক রাজকুমারী সূর্যকে ভালোবেসে ফেলে। কিন্তু সূর্যের সাথে মিলন হবার নয় বলে সে মনের দুঃখে আত্মহত্যা করে। সেই রাজকন্যা পারিজাতিকার চিতাভষ্ম থেকে জন্ম নেয় শিউলি ফুলের গাছ। তাই শিউলি ফুলের আরেক নাম পারিজাত। পারিজাত মনের দুঃখে ক্ষোভে সূর্যের মুখ দেখতে চায় না বলেই সকাল বেলায় সূর্য উঠার আগেই ঝরে পড়ে গাছ থেকে।


তৃতীয় আরো একটি ফুল পারিজাত নামে পরিচিতো।
সেটি হচ্ছে মান্দার বা মাদার।
অবহেলিত কাঁটাযুক্ত গাছে রূপসী মান্দার লোকের অবহেলার জবাব দেয় নিজের রূপে। মান্দার গাছ পাতা ঝরায় বসন্তে এবং ফুল ও ফোটে ঠিক এই সময়ে। ফুলবতী মান্দারের দিকে যেকোনো লোক দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য হবে।

https://i.imgur.com/9GzaMTIh.jpg

মান্দারের পোষাকি নাম পারিজাত হলেও পুরানে বর্ননা করা পারিজাতের ফুলের সাথে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে একটি মিল আছে। শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গ থেকে একটি ডাল এনে পৃথিবীতে লাগিয়ে ছিলো। শিউলির ডাল লাগালেই চারা হয়ে যায় না, কিন্তু মান্দারের ডাল লাগালেই চারা হয়ে যায়।

https://i.imgur.com/VfcENnJh.jpg

ইদানিং ভুল করে অনেকেই আরো একটি ফুলকে পারিজাত ফুল নামে ডাতকে শুরু করেছে। ফুলটি হচ্ছে সুপ্তি ফুল। ইংরেজী নাম Rose of Venezuela আর বৈজ্ঞানিক নাম Brownea coccinea. এর প্রকৃত নাম সুপ্তি ফুল, কেউ কেউ পাখি ফুল নামেও ডাকে।

ছবি সূত্র : কয়েকটি ছবিতে সংগৃহীত লেখা রয়েছে, সেগুলি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
বাকি ছবিগুলি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে গিয়ে আমি তুলেছি নিজের ক্যামেরায়।

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের নিমন্ত্রণ।