টপিকঃ দণ্ডবিধির #৩০৪(খ) / ২৭৯ ধারা চালকের মুচকি হাসি:

https://encrypted-tbn0.gstatic.com/images?q=tbn:ANd9GcR3vqs8FdSdAzrY8xWEsM5gZbIoRo9TkJa6kA&usqp=CAU

এক. দৃশ্যটা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের। বেশ কিছু বানর একটা নদীতে পানি
খাচ্ছে। হঠাৎ একটা কুমির একটা বানরছানাকে খপ করে ধরে পানিতে না ফিরে সোজা
ডাঙ্গা বরাবর দৌড়, কিন্তু বানররা নাছোড়বান্দা। প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি বানর একের পর
এক চড় ও কিল দিতে থাকে কুমিরটাকে। শেষ অবধি কুমির বানর শাবকটিকে মুখ থেকে ফেলে
দিতে বাধ্য হলো। কিন্তু ততক্ষণে বানরছানাটি মারা গেছে। উদ্ধারকারী একটা বানরের
একটা হাতও ভাঙল। অন্য একটা হাত দিয়ে বানর শাবকটিকে নেড়েচেড়ে দেখল, ওটা মারা
গেছে। কিছুক্ষণ পর মৃত বানরটাকে ফেলে রেখে বানরগুলো চলে গেল। কুমির বানরকে ধরতেই
পারে। কেউ হয়তো বলবেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু প্রজন্মকে রক্ষা করার পশুকুলের যে
প্রয়াস, তা মনুষ্য সমাজের জন্য একটা বার্তা বটে। উদ্ধারকারী হাতভাঙা ওই বানরটা মৃত
বানরছানার মা-বাবা, নাকি বানর গোষ্ঠীর গোত্রপ্রধান তা জানা যায়নি। তবে উদ্ধারে
কোনো ভূমিকা রাখেনি এমন কোনো বানরকে ওখানে দেখা যায়নি। দুই. উইল্স লিটল
ফ্লাওয়ার স্কুলের শিশু হামীমের বাসের চাকায় মর্মান্তিক মৃত্যুতে (৩ ফেব্রুয়ারি) বা সাত
বছরের সুমি, ফাইযা বাসের তলায় পিষ্ট হওয়া (৫ ফেব্রুয়ারি) অথবা সাইফ আহম্মদ ওরফে
অর্ণবের ট্রাকের তলায় অকালমৃত্যু বা ১১ই ফেব্রুয়ারী মেধাবি শিক্ষার্থী আদনান তাসিন
জেব্রা ক্রসিঙ্গের উপর ক্ষোভ অ আক্রোশে হত্যা করে... আব্রার, ফাইজুল, তাঞ্জিলা,
সাব্বির, আরিফ, সিল্পি, অয়াসিম, সালাউদ্দিন, লাবণ্য আআআর কত হত্যাকাণ্ড, আরো এ
ধরনের মৃত্যু শুধুই কি স্বাভাবিক? একেকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা? এ মর্মান্তিকতা কি এ জাতির
হৃদয়বান মানুষকে একটুও নাড়া দেয় না। অপরিপক্ব, আধাশিক্ষিত হেলপার বা চালক শামসুর
রহমানের দাম্ভিকতাপূর্ণ উক্তি লক্ষণীয়, 'আমাকে আটক রাখবার পারবেন না। মালিক আমার
কোটিপতি, দুই দিনে বাইর কইরা লইয়া যাইব গা।' সে আরো বলেছে, 'রাস্তাঘাটে এমন
দুর্ঘটনা হতেই পারে, মালিক জানলেই ছাড়িয়ে নেবেন।' সব অস্বাভাবিক মৃত্যুই এ দেশে
এখন শুধু শামসুর রহমানের কাছে নয়, আমার, আপনার মতো শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের
কাছেও যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে পাখির মতো মানুষ
মারা যাচ্ছে ব্রাশফায়ারে, ক্রসফায়ারে, ইউনিভার্সিটির চত্বরে, রাস্তাঘাটে। সব
অস্বাভাবিক মৃত্যুই এখন এ দেশের স্বাভাবিক। মায়ের আঁচল অথবা শক্ত হাতও সন্তানের জন্য
নিরাপদ নয়। ভুক্তভোগীর চোখের পানি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অনুভূতিকে স্পর্শও করতে
পারছে না। এর কারণ হয়তোবা অনেক। তবে মূল কারণ হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যোগ্য
চেয়ারে অযোগ্য লোক। চালক অযোগ্য হলে চালকের নিয়োগদাতা এবং অনুমোদক এর দায়িত্ব
এড়াতে পারেন না। পরিবহন ব্যবস্থা সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ রোড
ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) রয়েছে। আছে পরিবহন পরিদর্শকসহ আরো সব সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তা-কর্মচারী। কারোরই যেন কোনো দায়িত্ব নেই। পরিবহনের যান্ত্রিক ত্রুটি,
যেখানে-সেখানে পার্কিং এমনকি ফুটপাতের ওপর আড়াআড়িভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি
পার্ক করে রাখা প্রায়ই চোখে পড়ে। এসব যাদের বা যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর তদারক
করার কথা কর্তব্যের অবহেলার জন্য কোনো ব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়ে থাকলে
হয়তোবা দুর্ঘটনার হার অনেকটা কমানো যেত। পুরনো ত্রুটিপূর্ণ গাড়িগুলো রাস্তায় চলাচল
নিষিদ্ধ। এমন দু-একটা গাড়ি কর্তৃপক্ষ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, এ নজির দেখা
যায়নি। আইনে ভাইকারাস লায়াবিলিটি (ঠরপধৎরড়ঁং ষরধনরষরঃু) বলে একটা কথা আছে।
চালকের অবহেলা বা অযোগ্যতার জন্য মালিককে শাস্তি পেতে হবে। ভুয়া লাইসেন্স যাঁরা
দিচ্ছেন তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে কি? সুখের
বিষয়, হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ গত ৭ ফেব্রুয়ারি পরিবহন কর্তৃপক্ষের বা সরকারের
বিরুদ্ধে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন পরিচালনা, অদক্ষ চালক, ট্রাফিক আইনের প্রয়োগহীনতা
সংক্রান্তে একটি রুল জারি করেছেন। এবার সংশ্লিষ্ট আইনের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক।
আমাদের দেশে 'ছারপোকার' মতো আইনের জন্ম হয়। সকালে একটা তো বিকেলে আরেকটা।
সন্তান জন্ম দিয়ে যেমন লালন-পালন করার প্রয়োজন হয়, তেমনই আইনের জন্ম দিয়েও তার
দেখভাল করার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ আইনটির সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কি না, প্রয়োগ হলেও
তার প্রায়োগিক সুফল কতটুকু ইত্যাদি। আইন কমিশনের মতো একটি সংস্থা আমাদের দেশে
বিদ্যমান। কোনো আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ করে সেগুলো সংক্রান্তে সরকারের কাছে
সুপারিশ পাঠানো এ সংস্থার প্রধান কাজ। দণ্ডবিধির ২৭৯ ধারা, বিশেষ করে ৩০৪ (খ)
ধারার আশু সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কেননা আইনটি বর্তমানে যে অবস্থায় আছে,
তা চলতে থাকলে শামসুর রহমানের মতো চালকদের উক্তি একটুও মিথ্যা হবে না। দ্বিতীয়ত,
কোনো সুচতুর খুনি অস্ত্র বা অন্য কোনো উপকরণ হাতে না নিয়ে যদি গাড়ির স্টিয়ারিং
হাতে নিয়ে কাউকে হত্যা করে এবং সেটাকে দুর্ঘটনা বলে স্বীকারও করে, তবে মাত্র তিন
বছর পর (যদি শাস্তি হয়ও) জেল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। দণ্ডবিধির ধারা ২৭৯-তে
বলা হয়েছে, জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমনভাবে রাস্তায় বেপরোয়া ও অবহেলার সঙ্গে গাড়ি
চালালে তার তিন বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন এক হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ পাঁচ
হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। প্রায়ই দেখা যাবে ১৬ থেকে ১৮ বছরের একজন চালক
সজোরে আর একটা গাড়িকে 'ওভারটেক' করছে, কিন্তু ২৭৯ ধারার কোনো মামলা হতে
সচরাচর দেখা যায় না। প্রতিরোধক এই ধারায় দু-একটা মামলা হলে চালক সতর্ক হতে
বাধ্য হতো। দণ্ডবিধি আইনের ৩০৪ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি রাস্তায়
বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়, তবে তার তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
অথবা জরিমানা অথবা দুই-ই; উল্লেখ্য, এই ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য এবং জামিনযোগ্য
অপরাধ সংঘটনের জন্য জামিন পাওয়ার অধিকার অপরাধীদের রয়েছে। এই হচ্ছে আইনটির
বর্তমান অবস্থা। ফলে একজন গাড়িচালক ঠিকই জানেন, তাঁকে এ আইনের আওতায় আটকে রাখা
যায় না। আইনটির পূর্বাপর অবস্থা : ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইনের ৩০৪ (খ) ধারাটি
১৯৮২ সালের ৯ নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংযোজন করা হয় এবং ১৫ জুন ১৯৮২ থেকে এটা
কার্যকর হয়। ওই সময় এ ধারার অপরাধের জন্য শাস্তি ছিল ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
এবং ধারাটি ছিল অজামিনযোগ্য এবং দায়রা জজ কর্তৃক বিচার্য। পরে ১৯৮৪ সালের ২২
নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে শাস্তির পরিমাণ ১৪ বছরের স্থলে সাত বছর করা হয় এবং
ধারাটি জামিনযোগ্য করা হয়। ২০ মার্চ ১৯৮৪ সাল থেকে এভাবে চলতে থাকে। এরপর
১৯৮৫ সালের ৪৯ নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে (৮ অক্টোবর ১৯৮৫ থেকে) শাস্তির পরিমাণ
সাত বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয় এবং জামিনযোগ্য রাখা হয় এবং প্রথম শ্রেণীর
ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য। বর্তমানে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য। সুতরাং
দুর্ঘটনা কমাতে হলে এ আইনের সংস্কার যেমন অপরিহার্য, তেমনই চালক, মালিক এবং
পরিচালন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে তার সঠিক প্রয়োগ
নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বেপরোয়া চালকদের হাতে খুন হতে হবে আরো অনেককে।

#লেখক : #এমশামসুলহক #আইনজীবী, #বাংলাদেশসুপ্রিমকোর্ট ( ঈষৎ পরিবর্তিত)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সকাল ১১:১৬

"We want Justice for Adnan Tasin"