টপিকঃ বন্ধুত্ব একটি সত্যি বন্ধুত্বের গল্প ...।।

লোকে বলে বন্ধুত্ব এমন এক সম্পর্ক যেখান বিশ্বাস ভালবাসা আর নির্ভরতা হাত ধরে চলে | কিন্তু আজ সম্পর্করা তাঁদের মাধুর্য হারিয়েছে l সম্পর্ক আজ এক স্বার্থসিদ্ধির কৌশল মাত্র l সুযোগ পেলে আত্মীয়রা অনাত্মীয় থেকে বেশি ক্ষতিকর l এরা আত্মীয় নামে এক একটি বিষধর সাপ, সুখের পাখি l উপর উপর সব ঠিক কিন্তু এদের দাঁত নখ বাড়িয়ে আসে যখন আপনি বিপদে পড়বেন হয়েতো অফিস কল্লিগে পাশে থাকবে এরা পালবে যদি সাহায্য করতে হয়..... আপনি ফিনিসিয়াললি উইক হলে তো কথাই নেই শুধু ফোনএ এক্সেকিউসে মারে আপনাকে কাটিয়ে দেবে
সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ ............।
আজকের গল্প বন্ধুত্ব একটি সত্যি বন্ধুত্ব গল্প

বন্ধুত্ব

"আরে অরিত্র না ? হ্যাঁ অরিত্রই তো ! আমায় চিনতে পারছিস ?" ফ্ল্যাটের সামনে ক্যাব থেকে অরিত্র নামতেই এই প্রশ্নবাণ..। এবারে প্রায় ছয় বছর বাদে অস্ট্রেলিয়া থেকে কলকাতায় এলো অরিত্র । গত ছয় বছরে তিন তিনবার প্রমোশনের ধাক্কায় পজিশন আর টাকা যেমন বেড়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দায়িত্ব । দেশ শহরের প্রতি টান থাকলেও সময় করে আসাটা কঠিন হয়ে পড়েছে । ফ্ল্যাটে ঢোকার মুখটাতে ম্যাটাডোরটাকে পাশ দিতে গিয়ে বুড়োটে মার্কা দেখতে লোকটা দাঁড়িয়ে পড়েছিল । অরিত্র দূর থেকে দেখে চেনার চেষ্টা করল, কিন্তু পারলো না ।
"নাহ্ ! আপনাকে তো ঠিক চিনতে পড়লাম না !" অরিত্রর এই কথা শুনে লোকটা এগিয়ে এলো । একেবারে অরিত্রর দু ফুটের মধ্যে । ভাঙা চোয়াল, কাঁচা পাকা চুল হাল্কা হয়ে পড়েছে । সস্তার ফ্রেমের চশমা পরা লোকটিকে অরিত্রর কাছ থেকে চেনা মনে হচ্ছে তবুও চিনে উঠতে পারছে না । আসলে এতগুলো বছর দেশের বাইরে থেকে কলকাতাটাই এখন বড্ড অচেনা লাগে ।
"আমি সৌমেন রে । একসঙ্গে ক্লাস ওয়ান থেকে এইট অবধি পড়লি... ভুলে গেলি ?" লোকটা আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো নিজেকে চেনানোর । অরিত্রর মনে পড়ে গেল সৌমেনকে । ক্লাস এইট অবধি পড়ে হঠাৎ স্কুল-পড়া ছেড়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল । সিক্সে পড়ার সময়েই সৌমেনের বাবা মারা গিয়েছিল । ওর কাকারা পড়াশোনার দু বছর খরচ চালিয়ে ছিল । এইটের পর নাইনে উঠতেই কাকাদের হাত সৌমেনের মাথার ওপর থেকে উঠে যায় । সৌমেনকে নিয়ে ওর মা মামার বাড়িতে গিয়ে ওঠে । অরিত্রর পুরানো কথাগুলো সব মনে পড়ে যেতে লাগলো । ক্যাবের ভাড়া মিটিয়ে সে সৌমেনের দিকে তাকিয়ে বলল, "তোকে তো চিনতেই পারিনি । কিরকম বুড়োটে চেহারা করে ফেলেছিস !"
"কি করবো বল ? দুই বছর হল কারখানাটা লক আউট হয়ে পড়ে রয়েছে । মালিক সরকার সকলে চুপচাপ । আমাদের কথা কেউ ভাবেই না । ছাড় আমার কথা । তোর কি খবর বল..." সৌমেন উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকালো । কে বলবে অরিত্র আর সৌমেন একই বয়েসী ! অরিত্রকে ভাল ছাত্র বলা কখনই যাবেনা । বরং সৌমেন বরাবর এক থেকে দশের মধ্যে থাকতো । অরিত্র গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেই সেলসের চাকরিতে ঢুকে পড়েছিল । এ কোম্পানী ও কোম্পানী ছাড়া ধরা করতে করতেই প্রাইভেটে এমবিএ টা করে ফেলেছিল । কলকাতায় ন'বছর আগে মেলবোর্নের একটা চোখের কন্ট্যাক্ট লেন্স কোম্পানীতে রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার হয়ে জয়েন করেছিল । ব্যস, অরিত্রকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি । দুবছর পর কোম্পানীর ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অরিত্রর মত কর্মী মেলবোর্নের হেডঅফিসে থাকাটাই কোম্পানীর পক্ষে মঙ্গল । সেই থেকেই দুই ছেলেমেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী । অরিত্রদের বাড়িটা ভেঙে অনেকদিনই ফ্ল্যাট হয়ে গেছে । বাবা সেই ছয় বছর আগেই গত হয়েছেন । মা, ভাইয়ের সংসারে রয়েছেন । প্রতিমাসে অরিত্র নিয়ম করে বেশ মোটা টাকাই মায়ের জন্য পাঠিয়ে দেয় । সৌমেনরা পাশের পাড়াতে থাকতো । তাই ছোটবেলায় স্কুল ছাড়াও সে খেলাধুলার সঙ্গীও ছিল । সেইসূত্রে একটা সময়ে অরিত্র ওদের বাড়ি বহুবার গেছে । ওর মা অরিত্রকে খুব ভালবাসত ।
"তোরা কি এখন তাহলে এই বাড়িতে চলে এসেছিস ? কাকিমা কেমন আছেন ?" অরিত্র ভদ্রতা বশতঃ পুরানো বন্ধুর কুশল প্রার্থী ।
"মা তো অনেকদিন... তা প্রায় পাঁচ বছর হল মারা গেছেন । বাবার বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাট হবার খবর পেতেই সম্পত্তির ভাগ নিতে মা এখানে এসে উঠেছিল । লড়াই করে একটা ছশো স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট আদায় হয়েছে । সেখানেই আমি পরিবার নিয়ে থাকি । 'ইন্ডিয়া কয়েল' ফ্যাক্টরিতে অনেক চেষ্টা করে বাবার চাকরিটা জুটিয়ে ছিলাম । সবই ঠিক ছিল মাঝে এই দু বছরের লক আউট সব গোলমাল করে দিল ।" পড়ন্ত বিকেলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দুই বন্ধুতে স্মৃতিচারণ করছিল । সে কথা মনে পড়তেই অরিত্র বাড়ির ভেতরে সৌমেনকে ডাকল । সৌমেন এখন রাত আটটা থেকে সকাল আটটা অবধি সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করে । সেখানে যাবার পথেই অরিত্রর সঙ্গে দেখা । সেই তাড়ায় সৌমেন চলে গেল । যাবার সময়ে ওর বাড়িতে একবারের জন্য হলেও যাওয়ার নিমন্ত্রণ করে গেল । অরিত্র ফ্ল্যাটের লিফটে উঠতে উঠতে ভাবল, সে একবার সৌমেনদের বাড়ি যাবে । আর এক সপ্তাহ ও কলকাতায় রয়েছে । এত বছর বাদে এসেছিল মামার বাড়ির সম্পত্তির ভাগ নিয়ে কথাবার্তা চূড়ান্ত করতে । সে কাজ আজই মিটিয়ে এসেছে । ওর মায়ের ভাগের সম্পত্তির অর্ধেক ছোট মামাকে লিখে দিয়ে এসেছে । ছোট মামার একটা ছোট্ট মুদি দোকানই সম্বল । মাথার ওপর অবিবাহিতা মেয়ে রয়েছে । আর বাকি ভাগটা মায়ের নামে থাকবে । ওটা মায়ের অবর্তমানে ভাইকে দিয়ে দেবে বলে ঠিক করে রেখেছে ।

পরের দুটো দিন ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যে দিয়েই গেল । সপরিবারে এলে নানানরকম ঝামেলা লেগেই থাকে । অরিত্রর একমাত্র শ্যালিকা তার বর আর মেয়েকে নিয়ে দুর্গাপুর থেকে এসে দু দিন কাটিয়ে গেল । সন্ধ্যেবেলায় ওদের গাড়িতে তুলে দিয়ে অরিত্র একটু হাঁটতে বের হল । ওদের পুরানো সেই পাড়াটা এখন যেন আর চেনাই যায়না । চারিদিকে কংক্রিটের জঙ্গলে ছেয়ে গেছে । হাঁটতে হাঁটতে কখন সে নিজের পাড়া পার হয়ে পাশের পাড়ায় ঢুকে পড়েছে খেয়ালই করেনি । হ্যাঁ, এই জায়গাটাতেই সৌমেনদের বাড়িটা ছিল । পাশে একটা অনেক পুরানো মুদি দোকান ছিল । এখন আর নেই । উঠে গেছে বোধহয় । ওদের বাড়ির জায়গাতে একটা বড়সড় অ্যাপার্টমেন্ট দাঁড়িয়ে রয়েছে । বাড়িটা থেকে সাইকেল নিয়ে একটা লোক বের হচ্ছিল । তাকেই সৌমেনের নাম বলতেই চিনতে পেরে ফ্ল্যাটটা দেখিয়ে দিল । গ্রাউন্ড ফ্লোরের পিছন দিকে গিয়ে অরিত্র সৌমেন মিত্র নামটি দেখে কলিং বেলটা বাজিয়ে দিল । আজ রোববার তাই এই সময়ে সৌমেনের বাড়িতেই থাকার কথা । বেলের শব্দে একটা সতেরো আঠেরো বছর বয়েসী মেয়ে এসে দরজা খুলে নাম জিজ্ঞেস করল । এ নিশ্চয়ই সৌমেনের মেয়ে । কি মিষ্টি দেখতে হয়েছে । হলুদ রংয়ের সালোয়ার পরে রয়েছে । অরিত্রর নাম শুনতেই মেয়েটি আসুন আসুন করে ভিতরে ডেকে নিলো । "বাপি ! দেখো তোমায় ইনি খুঁজছেন ।" ঘরের ভিতরে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসতে দিয়ে বেরিয়ে গেল । ছাপোষা মধ্যবিত্তের ঘর যেমন হয় । একটা খাট, টেবিলে আগেকার ঢাউস রঙিন টিভি, একটা লোহার আলমারি আর টুকিটাকি কিছু আসবাব পত্রে ঘরটা ভর্তি । সৌমেনের বৌ হাসিমুখে ঘরে এলেন । "আপনার কথা গত পরশু থেকে খুব শুনছি । উনি একটু বাথরুমে গেছেন । আপনি বসুন, উনি আসছেন ।" বলতে বলতেই লুঙ্গি আর একটা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে সৌমেন ঘরে এলো । "তাহলে সত্যিই গরীবের ঘরে এলি ! তোমায় বলেছিলাম না ! ও ঠিক আসবে...।" গিন্নির দিকে তাকিয়ে সৌমেনের গলায় অরিত্রকে ঘিরে আত্মবিশ্বাসের সুর । সৌমেন এরপর নিজের বৌ মেয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে অরিত্রর জয়গান গাইতে শুরু করে দিল । "বুঝলে আমাদের ব্যাচে একমাত্র কৃতি বন্ধু..." ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা, আর প্রচুর স্মৃতিচারণ চলল । তিনবার চা আর তেলেভাজা দিয়ে সে এক স্মৃতিমেদুর আড্ডায় দুই বন্ধু গা ভাসিয়ে দিয়েছিল । কথায় কথায় অরিত্র জানতে পারলো, এই বছর উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর সৌমেনের মেয়েকে আর কলেজে ভর্তি করার সঙ্গতি হয়নি । সুন্দর মায়া মাখানো মুখের অধিকারিণী মিষ্টি মেয়েটির ভবিষ্যৎ অজানা । প্রায় রাত পৌনে এগারোটা নাগাদ অরিত্র ওদের কাছে বিদায় নিয়ে ফিরে এসেছিল । তারপর আরো দিন চারেক কলকাতায় কাটিয়ে আবারও সপরিবারে অস্ট্রেলিয়ায় উড়ে গিয়েছিল ।
দিন পনেরো বাদে সৌমেন তখন বাড়িতে ছিল না, ক্যুরিযার এসে একটা খাম সৌমেনের বৌয়ের হাতে দিয়ে গিয়েছিল । মা কিংবা মেয়ে সে খামে হাত দেয়নি । অনেক পরে সৌমেন এসে খামটা খুলে দেখলো, ভিতরে একটা ব্যংকের চেক আর একটা ছোট্ট চিঠি । অরিত্র তার বন্ধুকে পাঠিয়েছে । দুই লক্ষ টাকার চেক । আর চিঠিতে লেখা কয়েকটা কথা...

"চেকটি নিজের অ্যাকাউন্টে জমা করে দিস । ভাবিস না যেন টাকার গরম দেখালাম, তাই তোকে দয়া করেছি । টাকাটা তোর মেয়েকে পড়বার জন্য দিয়েছি । ওকে কলেজে ভর্তি করাস । যতদূর পড়তে চায় পড়াবি । চিঠিতে ফোন নম্বর দিয়েছি । দরকার পড়লে ফোন করিস । টাকাটা নিতে দ্বিধা হলে, ধার হিসেবে নিস । চাকরি পেয়ে তোর মেয়ে শোধ দিতে চাইলে নিয়ে নেব । মেয়েকে অনেক অনেক বড় করিস, আমার আশীর্বাদ রইলো ॥