সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন tutor.academy2 (০৪-১১-২০১৮ ১৭:৪৭)

টপিকঃ কচি কাচা

সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সামান্য শিক্ষক পরিমলবাবু। একমাত্র মেধাবী ছেলেকে ডাক্তার তৈরি করতে জীবনে স্কুল ছাড়াও আরও অনেক কিছু করতে হয়েছে। যখন যা পেয়েছেন, তাই করেছেন। জমি মাপা, মুড়ি ভাজা, এছাড়া ছাত্র পড়ানো তো ছিলই। এখন অবসর নিলেও গ্রামে বেশ গন্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। লোকেদের আপদে বিপদে পাশে দাঁড়ান। ছেলে, বউমা আর ছোট্ট নাতনি কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে সেটলড। স্ত্রীর আবদারে আর কিছুটা চিকিৎসার জন্যেও বাঁকুড়ার গ্রামের বাড়ি থেকে মাসখানেকের জন্যে ছেলের কাছে এসে ওঠেন পরিমলবাবু ও তার স্ত্রী সুমিত্রা দেবী।
পরিমলবাবু এসে থেকেই লক্ষ্য করেন বউমা সুদেষ্ণার মেজাজ বেশ সপ্তমে। শুধু এটা বুঝতে পারেন না, সেটা তাদের আসার জন্য নাকি অন্য কোনো কারণে। কিন্তু ছেলেকে এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতে তার রুচিতে বাধে। ছেলে অর্ঘ্য বেশ শান্ত প্রকৃতির। তাছাড়াও খুব ব্যস্ত ডাক্তার। সকালে আটটায় বেরিয়ে যায় , ফিরতে ফিরতে রাত নটা। অনেক সময় আরও বেশি রাত হয়। দুএকদিন থাকার পর পরিমলবাবু বুঝলেন, না তিনি যা ভাবছিলেন তা নয়। ছেলের সংসারে অশান্তি তাদের নিয়ে নয়। অশান্তির কেন্দ্র বিন্দু ছোট্ট তিন্নী। মানে তিয়াসা মিত্র। পুত্রবধূ সুদেষ্ণা যারপরনাই চিন্তিত তিন্নীর স্কুলে ভর্তি নিয়ে। সাড়ে চার বছরের তিন্নী নাকি তার বাবা মার চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
এতদিন স্কুলে পড়িয়ে একটা ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে এত কিসের দুশ্চিন্তা তার থৈ পাননা পরিমলবাবু। বেশ স্নেহের সঙ্গেই বলেন একদিন সুদেষ্ণাকে
“বৌমা মা এসে থেকেই দেখছি তুমি আর অর্ঘ্য দুজনেই খুব চিন্তিত। শেষ বার যখন তোমায় দেখেছিলাম তার চেয়ে তোমার চেহারাটাও বেশ খারাপ হয়ে গেছে। মা আমি তো তোমার বাবার মতন। তুমি আমাকে বলতে পারো তোমার সমস্যাটা। দেখি আমার বয়স, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা দিয়ে সমাধান করতে পারি নাকি”।
“বাবা আর বলবেন না। আপনার ছেলেকে তো দেখছেন। কোনো দিকে খেয়াল নেই। সকাল আটটা বাজতে না বাজতে বেরিয়ে গেল। মেয়ে, সংসার সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে ফেলে। আর এই এক মেয়ে হয়েছে। হাড় মাস আলাদা করে দিল আমার। জানেন বাবা এই বছরে কলকাতার তিনটে নামী স্কুলে ফর্ম তুলেছিলাম। তার দুটোতেই হয়নি। হাতে আর একটা আছে। এটাতে না হলে আমি যে কি করবো বাবা আমি নিজেও জানিনা। পনেরো দিন পর পরীক্ষা। আর মেয়েকে দেখুন এখনও নেচে বেড়াচ্ছে”।
“তা মা তোমার কি সংসার করতে খারাপ লাগছে? মেয়ে, স্বামী এদের সেবা করতে যদি তোমার খারাপ লাগে তাতে তো অন্যায়ের কিছু নেই। সবার তো সব কিছু ভালো লাগেনা মা! তাহলে তুমি এক কাজ কর। এসবের জন্যে বরং লোক রেখে দাও। আর তুমি তো উচ্চশিক্ষিতা মেয়ে। তুমি একটা চাকরি বাকরির চেষ্টা কর। তুমি নিশ্চই পাবে। তাতে কিন্তু তোমার মানসিক চাপটা কমবে। কি সুন্দর হাসি খুশি মেয়ে ছিলে তুমি মা! এতদিন পর এখানে এসে তোমাকে এত উতলা দেখতে আমাদেরও কি ভালোলাগছে?”
“তাহলেই হয়েছে বাবা।" সুদেষ্ণা উত্তর দেয়। "আমি যদি চাকরি করতে বেরোই, আপনার নাতনির কিচ্ছু হবেনা। এমনিতেই প্রি স্কুলেই সারাক্ষন কমপ্লেইন।।এই পারে না। ওই পারে না। ইংরিজি তে কথা বলে না। আমি সত্যিই খুব চাপে বাবা। এই স্কুলটা তেও যদি না হয়...”

1 minute and 7 seconds after:

(২)
কাঁদতে কাঁদতে ফ্ল্যাটে ঢোকে ছোট্ট তিন্নী। সুমিত্রা দেবী বুঝতে পারেন, নিশ্চই স্কুলেই কিছু হয়েছে। সুদেষ্ণাও সমান তালে চেঁচাচ্ছে মেয়ের ওপরে। বেগতিক বুঝে ছোট্ট তিন্নী সোজা দাদুর কাছে গিয়ে বসে।
“কি হয়েছে দিদি ভাই?” সস্নেহে জিজ্ঞেস করেন পরিমলবাবু।
“মা মেরেছে দাদু। আমার ফ্রেন্ডস দের সামনেই মেরেছে। আমার খুব কষ্ট হয়েছে দাদু”।
“তা তুমি কি করেছিলে দিদিভাই? মা হঠাৎ মারল কেন?”
“আজ স্কুলে মক টেস্ট ছিল দাদু। আমি ওখানে কিছু বলতে পারিনি। মা আমাকে আনতে যেতেই মিস মা কে কমপ্লেইন করেছে। তাই মা মেরেছে”।
মক টেস্ট। নাম টা শোনা। হ্যাঁ খেয়াল পড়েছে। অর্ঘ্য যখন জয়েন্টের জন্যে পড়াশোনা করত, তখন বাঁকুড়া শহরে মাঝে মাঝে এই মক টেস্ট দিতে যেত বটে। কিন্তু এইটুকু ছোট্ট তিন্নী, সে কিসের পরীক্ষা দেবে.......
অগত্যা আর কথা বাড়ালেন না পরিমলবাবু। নাতনিকেই একটু সান্তনা দিয়ে বলেন “আচ্ছা দিদিভাই , কি আর করা যাবে ,আজ পারোনি কাল নিশ্চই পারবে। যাও তুমি এখন হাত পা ধুয়ে নিয়ে ভাত খেয়ে নাও”।
“কিকরে পারবো দাদু, আমি তো বুঝতেই পারিনা মিস কি বলছে , মিস তো বাংলায় বলে দেয় না দাদু”।
“ও, তাহলে তো মুশকিল দিদিভাই। কি আর করবে বলো আসতে আসতে তোমাকে অভ্যাস করে নিতে হবে। ঠিক পারবে”।
দুপুরে নাতনির খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর দেখে সুদেষ্ণা রেডি হচ্ছে। তিন্নীকে নিয়ে কোথাও বেরোবে। সুমিত্রা আর কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেসেই করে ফেললেন পুত্রবধূকে
“কোথায় বেরোবে মা? এই তো মেয়েটা স্কুল থেকে এসে ভাত খেলো। কোনো কাজ আছে বুঝি?”
“হ্যাঁ মা। ওই যে বলছিলাম না হাতে আর একটাই স্কুল আছে। ওতে যেভাবে হোক তিন্নীকে ঢোকাতেই হবে মা।।এখন আমরা যাচ্ছি Parents Schooling Class এ। ওখানে বাচ্চাকে Counselling ও করা হবে, আর ইন্টারভিউতে মা বাবা কেমন করে প্রশ্নের উত্তর দেবে, সেটাও শেখানো হবে”।
এবারে যথার্থই অবাক হন পরিমলবাবু। ভেবে পাচ্ছেন না , একটা ছোট্ট মেয়ে স্কুলে ভর্তি হতে যাচ্ছে? না যুদ্ধ করতে?
“Parent Schooling? মা তুমি উচ্চ শিক্ষিতা। বর্ধমানের নামী কলেজ , উনিভার্সিটি থেকে বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। কি এমন প্রশ্ন করবে স্কুল কর্তৃপক্ষ যে তার জন্যে তোমাকে আলাদা করে ক্লাস করতে হবে? নিজের ওপর একটু ভরসা রাখো মা”।
“হ্যাঁ বাবা।।কিন্তু আমি বাংলা মিডিয়ামের ছাত্রী। রেজাল্ট হয়তো ভালো। কিন্তু কলকাতার এসব স্কুল তো তা দেখবে না। আমিও যে খুব ভালো ইংরিজিতে কথা বলতে পারি না। সেটাই শিখতে যাচ্ছি বাবা”।
“তোমাকে যা প্রশ্ন করবে, তুমি সেটার উত্তর মাতৃভাষা তেই দেবে। তোমার উত্তর যথার্থ এবং যুক্তিযুক্ত যেন হয়। এটাই তো কাম্য।“
“না বাবা সে যুগ আর নেই। যাক গে, আমাদের ফিরতে দেরি হবে।।আপনারা সদর দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ুন”।

3 minutes and 34 seconds after:

tutor.academy2 লিখেছেন:

সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সামান্য শিক্ষক পরিমলবাবু। একমাত্র মেধাবী ছেলেকে ডাক্তার তৈরি করতে জীবনে স্কুল ছাড়াও আরও অনেক কিছু করতে হয়েছে। যখন যা পেয়েছেন, তাই করেছেন। জমি মাপা, মুড়ি ভাজা, এছাড়া ছাত্র পড়ানো তো ছিলই। এখন অবসর নিলেও গ্রামে বেশ গন্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। লোকেদের আপদে বিপদে পাশে দাঁড়ান। ছেলে, বউমা আর ছোট্ট নাতনি কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে সেটলড। স্ত্রীর আবদারে আর কিছুটা চিকিৎসার জন্যেও বাঁকুড়ার গ্রামের বাড়ি থেকে মাসখানেকের জন্যে ছেলের কাছে এসে ওঠেন পরিমলবাবু ও তার স্ত্রী সুমিত্রা দেবী।
পরিমলবাবু এসে থেকেই লক্ষ্য করেন বউমা সুদেষ্ণার মেজাজ বেশ সপ্তমে। শুধু এটা বুঝতে পারেন না, সেটা তাদের আসার জন্য নাকি অন্য কোনো কারণে। কিন্তু ছেলেকে এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতে তার রুচিতে বাধে। ছেলে অর্ঘ্য বেশ শান্ত প্রকৃতির। তাছাড়াও খুব ব্যস্ত ডাক্তার। সকালে আটটায় বেরিয়ে যায় , ফিরতে ফিরতে রাত নটা। অনেক সময় আরও বেশি রাত হয়। দুএকদিন থাকার পর পরিমলবাবু বুঝলেন, না তিনি যা ভাবছিলেন তা নয়। ছেলের সংসারে অশান্তি তাদের নিয়ে নয়। অশান্তির কেন্দ্র বিন্দু ছোট্ট তিন্নী। মানে তিয়াসা মিত্র। পুত্রবধূ সুদেষ্ণা যারপরনাই চিন্তিত তিন্নীর স্কুলে ভর্তি নিয়ে। সাড়ে চার বছরের তিন্নী নাকি তার বাবা মার চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
এতদিন স্কুলে পড়িয়ে একটা ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে এত কিসের দুশ্চিন্তা তার থৈ পাননা পরিমলবাবু। বেশ স্নেহের সঙ্গেই বলেন একদিন সুদেষ্ণাকে
“বৌমা মা এসে থেকেই দেখছি তুমি আর অর্ঘ্য দুজনেই খুব চিন্তিত। শেষ বার যখন তোমায় দেখেছিলাম তার চেয়ে তোমার চেহারাটাও বেশ খারাপ হয়ে গেছে। মা আমি তো তোমার বাবার মতন। তুমি আমাকে বলতে পারো তোমার সমস্যাটা। দেখি আমার বয়স, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা দিয়ে সমাধান করতে পারি নাকি”।
“বাবা আর বলবেন না। আপনার ছেলেকে তো দেখছেন। কোনো দিকে খেয়াল নেই। সকাল আটটা বাজতে না বাজতে বেরিয়ে গেল। মেয়ে, সংসার সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে ফেলে। আর এই এক মেয়ে হয়েছে। হাড় মাস আলাদা করে দিল আমার। জানেন বাবা এই বছরে কলকাতার তিনটে নামী স্কুলে ফর্ম তুলেছিলাম। তার দুটোতেই হয়নি। হাতে আর একটা আছে। এটাতে না হলে আমি যে কি করবো বাবা আমি নিজেও জানিনা। পনেরো দিন পর পরীক্ষা। আর মেয়েকে দেখুন এখনও নেচে বেড়াচ্ছে”।
“তা মা তোমার কি সংসার করতে খারাপ লাগছে? মেয়ে, স্বামী এদের সেবা করতে যদি তোমার খারাপ লাগে তাতে তো অন্যায়ের কিছু নেই। সবার তো সব কিছু ভালো লাগেনা মা! তাহলে তুমি এক কাজ কর। এসবের জন্যে বরং লোক রেখে দাও। আর তুমি তো উচ্চশিক্ষিতা মেয়ে। তুমি একটা চাকরি বাকরির চেষ্টা কর। তুমি নিশ্চই পাবে। তাতে কিন্তু তোমার মানসিক চাপটা কমবে। কি সুন্দর হাসি খুশি মেয়ে ছিলে তুমি মা! এতদিন পর এখানে এসে তোমাকে এত উতলা দেখতে আমাদেরও কি ভালোলাগছে?”
“তাহলেই হয়েছে বাবা।" সুদেষ্ণা উত্তর দেয়। "আমি যদি চাকরি করতে বেরোই, আপনার নাতনির কিচ্ছু হবেনা। এমনিতেই প্রি স্কুলেই সারাক্ষন কমপ্লেইন।।এই পারে না। ওই পারে না। ইংরিজি তে কথা বলে না। আমি সত্যিই খুব চাপে বাবা। এই স্কুলটা তেও যদি না হয়...”

1 minute and 7 seconds after:

(২)
কাঁদতে কাঁদতে ফ্ল্যাটে ঢোকে ছোট্ট তিন্নী। সুমিত্রা দেবী বুঝতে পারেন, নিশ্চই স্কুলেই কিছু হয়েছে। সুদেষ্ণাও সমান তালে চেঁচাচ্ছে মেয়ের ওপরে। বেগতিক বুঝে ছোট্ট তিন্নী সোজা দাদুর কাছে গিয়ে বসে।
“কি হয়েছে দিদি ভাই?” সস্নেহে জিজ্ঞেস করেন পরিমলবাবু।
“মা মেরেছে দাদু। আমার ফ্রেন্ডস দের সামনেই মেরেছে। আমার খুব কষ্ট হয়েছে দাদু”।
“তা তুমি কি করেছিলে দিদিভাই? মা হঠাৎ মারল কেন?”
“আজ স্কুলে মক টেস্ট ছিল দাদু। আমি ওখানে কিছু বলতে পারিনি। মা আমাকে আনতে যেতেই মিস মা কে কমপ্লেইন করেছে। তাই মা মেরেছে”।
মক টেস্ট। নাম টা শোনা। হ্যাঁ খেয়াল পড়েছে। অর্ঘ্য যখন জয়েন্টের জন্যে পড়াশোনা করত, তখন বাঁকুড়া শহরে মাঝে মাঝে এই মক টেস্ট দিতে যেত বটে। কিন্তু এইটুকু ছোট্ট তিন্নী, সে কিসের পরীক্ষা দেবে.......
অগত্যা আর কথা বাড়ালেন না পরিমলবাবু। নাতনিকেই একটু সান্তনা দিয়ে বলেন “আচ্ছা দিদিভাই , কি আর করা যাবে ,আজ পারোনি কাল নিশ্চই পারবে। যাও তুমি এখন হাত পা ধুয়ে নিয়ে ভাত খেয়ে নাও”।
“কিকরে পারবো দাদু, আমি তো বুঝতেই পারিনা মিস কি বলছে , মিস তো বাংলায় বলে দেয় না দাদু”।
“ও, তাহলে তো মুশকিল দিদিভাই। কি আর করবে বলো আসতে আসতে তোমাকে অভ্যাস করে নিতে হবে। ঠিক পারবে”।
দুপুরে নাতনির খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর দেখে সুদেষ্ণা রেডি হচ্ছে। তিন্নীকে নিয়ে কোথাও বেরোবে। সুমিত্রা আর কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেসেই করে ফেললেন পুত্রবধূকে
“কোথায় বেরোবে মা? এই তো মেয়েটা স্কুল থেকে এসে ভাত খেলো। কোনো কাজ আছে বুঝি?”
“হ্যাঁ মা। ওই যে বলছিলাম না হাতে আর একটাই স্কুল আছে। ওতে যেভাবে হোক তিন্নীকে ঢোকাতেই হবে মা।।এখন আমরা যাচ্ছি Parents Schooling Class এ। ওখানে বাচ্চাকে Counselling ও করা হবে, আর ইন্টারভিউতে মা বাবা কেমন করে প্রশ্নের উত্তর দেবে, সেটাও শেখানো হবে”।
এবারে যথার্থই অবাক হন পরিমলবাবু। ভেবে পাচ্ছেন না , একটা ছোট্ট মেয়ে স্কুলে ভর্তি হতে যাচ্ছে? না যুদ্ধ করতে?
“Parent Schooling? মা তুমি উচ্চ শিক্ষিতা। বর্ধমানের নামী কলেজ , উনিভার্সিটি থেকে বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। কি এমন প্রশ্ন করবে স্কুল কর্তৃপক্ষ যে তার জন্যে তোমাকে আলাদা করে ক্লাস করতে হবে? নিজের ওপর একটু ভরসা রাখো মা”।
“হ্যাঁ বাবা।।কিন্তু আমি বাংলা মিডিয়ামের ছাত্রী। রেজাল্ট হয়তো ভালো। কিন্তু কলকাতার এসব স্কুল তো তা দেখবে না। আমিও যে খুব ভালো ইংরিজিতে কথা বলতে পারি না। সেটাই শিখতে যাচ্ছি বাবা”।
“তোমাকে যা প্রশ্ন করবে, তুমি সেটার উত্তর মাতৃভাষা তেই দেবে। তোমার উত্তর যথার্থ এবং যুক্তিযুক্ত যেন হয়। এটাই তো কাম্য।“
“না বাবা সে যুগ আর নেই। যাক গে, আমাদের ফিরতে দেরি হবে।।আপনারা সদর দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ুন”।
(৩)
বিকেলে তিন্নীরা ফিরে এলো। মেয়েটা একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বেচারি সোফা তে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে ডেকে তোলে সুদেষ্ণা। পড়তে বসতে হবে। ছোট্ট মেয়েকে প্রশ্ন করে সুদেষ্ণা
“What is our national animal?”
“বাঘ”
পরিমল অবাক হয়ে দেখলেন, সুদেষ্ণা পিঠে দুঘা বসিয়ে দিল মেয়ের। উনি ভেবে পেলেন না তিন্নী কি ভুল উত্তর দিয়েছে। খানিক্ষন পর সুদেষ্ণার চেঁচামেচিতে বুঝতে পারলেন, আসলে বাঘ বলা যাবে না। Tiger বলতে হবে। পরিমলবাবু যত দেখছেন, ততই অবাক হচ্ছেন। এ কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে Tiger কে বাঘ বললে তার ভর্তি আটকে যাবে? অর্ঘ্য তো ওর বয়সে প্রায় কিছুই জানতো না। আম বাগানে জাম বাগানে খেলে বেড়াতো। তাহলে কি তাঁরা ভুল ছিলেন? আরও ছোট থেকেই শিক্ষার জাঁতাকলে প্রবেশ করানো উচিত ছিল অর্ঘ্যকে? তাতে কি তার ভবিষ্যৎ আরও ভালো হত? আর কত ভালো হত? ...ঠিক উত্তর খুঁজে পান না পরিমলবাবু।

রাতে খেতে বসে অর্ঘ্যরা। সুদেষ্ণা যথারীতি অভিযোগের ডালি নিয়ে বসে। মেয়ের স্কুলে টিচাররা কে কি বলেছেন মেয়ে সম্বন্ধে। এই সব। পরিমলের ছেলেকে দেখে মনে হয়না সে কিছু শুনছে বলে, ওই মাঝে হু, হাঁ করা ছাড়া তার বিশেষ কোনো উত্তর নেই। সেটাই বোধহয় সুদেষ্ণার রাগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ খেয়াল পড়ে যায় অর্ঘ্যর
“ও ভালো কথা সুদেষ্ণা, তিন্নীর স্কুল থেকে আজকে ফোন এসেছিল। আমার নম্বরটা বোধহয় দেয়া ছিল , তাই আমাকেই জানিয়েছে”।
“ফোন? ফোন করেছিল, কই তুমি এতক্ষণ বলোনি তো? কি জানিয়েছে? ইন্টারভিউ হবে তো নাকি ওরা তার আগেই তিন্নীকে বাদ দিয়ে দিল!”
“আরে না না, সেরকম কোনো ব্যাপার নয়। আসলে ওদের ইন্টারভিউটা নাকি World Grandparents Day র দিনে পড়েছে। তাই যাদের যাদের বাড়িতে দাদু, ঠাকুমা জীবিত আছেন, তাদেরকে ওনারা ওই দিন নিয়ে আসতে অনুরোধ করেছেন । কি celebration হবে। আর আরও বলেছেন বিগত দুবছরে নাকি ওদের স্কুলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু guardian অভিযোগ করেছিলেন, যে ভর্তির বিষয়ে বেশ কিছু কারচুপি হয়। তাই এবারে ওরা ইন্টারভিউ open to all করেছে। মানে হলে ইন্টারভিউ হবে। মাইক দিয়ে। সবাই সবার পারফরম্যান্স দেখতে পারবে। যাতে কারো না মনে হয়, ওর মেয়ে বা ছেলে কিছু পারেনি, আমার ছেলে সব পারলো তাও হলো না”।
“তুমি কি বলেছ? বাবা মা যাবেন?”
“হ্যাঁ তাই তো বললাম। ওনারা আছেন এখন কলকাতায়, নিয়ে যাব। আমরা চারজনেই যাব তিয়াসাকে নিয়ে”।
“দেখেছ? কেন রাগ করি তোমার ওপর? একটু যদি বুদ্ধি থাকে তোমার মাথায়! তুমি বলতে পারলে না, ওনারা এখানে থাকেন না? ওসব celebration বাজে কথা। আসল কথা হল, বাবা মা তো অনেকেরই ভালো ইন্টারভিউ দিচ্ছে। নে এবার দাদু দিদাকে ডাক। তাদেরও যোগ্যতা বিচার হোক”।
সুদেষ্ণাকে থামাতে ব্যর্থ হয় অর্ঘ্য। কিছুতেই বোঝাতে পারেনা যে ওরা ফোনটা এমনিই করেছিল। কোনো যোগ্যতা বিচার করার জন্যে নয়। শেষে ঠিক হয় পরেরদিন থেকে সুদেষ্ণার সঙ্গে সুমিত্রা দেবী আর পরিমল বাবুও Parent Schooling এ যাবেন নাতনির স্কুলে ইন্টারভিউয়ের ট্রেনিংএর জন্যে।সুমিত্রা দেবী ও পরিমলবাবু একটা নতুন জায়গায় এলেন বৌমা সুদেষ্ণা ও নাতনি তিন্নীকে নিয়ে।
Parent Schooling Centre। নামটা ভারী অদ্ভুত লাগে পরিমলবাবুর। যাক গে , মনে মনে ভাবেন, আমরা তো আগেকার মানুষ, এখন হয়তো এসবের প্রয়োজন আছে।
Good evening ladies and gentlemen,
Recently, we came to know that one of the renowned school of Kolkata , has decided to call Grandparents too in their interview curriculum. Now , as a founder of this institute , I feel this is a trap for eliminating the eligible candidates. Schools can now make out that parents are quite capable enough to manage the interview. So, it is bit easier for them to hit the grandparents. So, today we are going to arrange a workshop for grandparents.”
এতখানি শুনে, বেশ ঘাবড়ে যান সুমিত্রা দেবী। ফিসফিসিয়ে পরিমালবাবুকে জিজ্ঞেস করেন
“হ্যাঁ গো, কি বলছে? এই বয়েসে আবার আমাদের কি পরীক্ষা দিতে হবে ? দরকার নেই বাবা। তার চেয়ে তুমি কালই গ্রামের বাড়ি ফিরে চল। শেষে আমাদের জন্য যদি নাতনিটার ওই স্কুলে সুযোগ না হয়!”
“কিচ্ছু হবে না। অত ভয় পেও না। আমার বেশ লাগছে। একেবারে একটা অন্য রকম অভিজ্ঞতা হচ্ছে। আর শোনো আমার যা মনে হচ্ছে তা হলো, এরা একটু বেশিই ভাবছে।।আমাদের ইন্টারভিউয়ের ওপর তোমার নাতনির সুযোগ হওয়া বা না হওয়া নির্ভর করছে না”।
শুরু হল ওয়ার্কশপ
“মাসিমা , what will you do if your granddaughter shows tantrums?” একজন প্রশ্ন করেন সুমিত্রা দেবীকে।
“you will cool down her tantrums by consoling her.”
“মা, আমরা গ্রামের মানুষ। প্রশ্নটা একটু যদি বাংলায় কর”
“আপনি কি করবেন আপনার নাতনি অভদ্রতা করলে?”
“ও।।এই ব্যাপার। আমি তিন্নীকে কাছে ডাকবো।।আগে জিজ্ঞেস করবো, মা, তুমি কেন রাগ করেছ? ও তো কিছু বলবে তার উত্তরে। তখন আমি ওকে বলব, দেখ তুমি যা চাইছ সেটা এখন আমাদের কাছে নেই। কিন্তু আমরা তোমাকে পরে এনে দেবার চেষ্টা করব। তবে তুমি যদি এইরকম আচরণ কর, তাহলে কিন্তু তুমি কিছুই পাবে না। তোমাকে আগে তোমার ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তারপর অপেক্ষা করতে হবে। আমরা দিতে পারলে নিশ্চই দেব তোমাকে তোমার জিনিস”।
সুমিত্রা দেবী লক্ষ্য করেন, সবাই চুপ করে আছে। ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করেন পরিমলবাবুকে “হ্যাঁ গো, কিছু ভুল বললাম?”
পরিমলবাবু আস্বস্ত করেন, “একেবারেই না। খুব সুন্দর উত্তর দিয়েছ তুমি। ওরা যেটা ইংরিজিতে বললো সেটাই তুমি বাংলায় বললে, এবং খুব সুন্দর করে গুছিয়ে”।
একদিনের ওয়ার্কশপ শেষ। সবাইকে আগামী পরীক্ষার জন্য শুভেচ্ছা জানিয়ে ওয়ার্কশপ শেষ হল। পরিমলবাবু মনে মনে বললেন, যাক বাবা , নাতনিটা বাঁচলো। রোজ স্কুল থেকে এসেই খেয়ে দেয়ে ভর দুপুরে ওয়ার্কশপে অন্তত আসতে হবে না।
(৫)
অবশেষে বহু প্রতীক্ষার ইন্টারভিউয়ের দিন আজ। বাড়িতে বেশ সাজো সাজো রব। সুদেষ্ণা তো বেশ চিন্তিত। ছোট্ট তিন্নীও কেমন গুটিয়ে আছে। যথা সময়ে ছেলের গাড়ি করে তিন্নীর স্কুলে পৌঁছালো অর্ঘ্যরা। পরিমলবাবু দেখলেন বিশাল স্কুল। বহু অভিভাবক বেশ চিন্তিত মুখে প্রতীক্ষা করছে। উনিও নাতনিকে নিয়ে হল ঘরের বাইরে দাঁড়ালেন। হঠাৎ দেখেন একটি মা তার মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে যাচ্ছে। মায়ের চোখে জল চোখ এড়ালো না পরিমলবাবুর। এড়িয়ে যেতে পারতেন , কিন্তু গ্রামের মানুষ বলেই হয়ত জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন মেয়েটিকে
“তুমি কোথায় যাচ্ছ মা? ইন্টারভিউ তো এখনও শুরুই হয়নি”। পরিমলবাবু জিজ্ঞাসা করেন।
“আমাকে ইন্টারভিউ দিতে দেবে না মেসোমশাই। তাই চলে যাচ্ছি”।
“দেবে না। কেন? তুমি ফর্ম ফিল আপ করেছ, তাও তোমায় ইন্টারভিউ দিতে দেবে না কেন?”
“আমি যে single mother মেসোমশাই। Both Guardian না থাকলে ওরা ইন্টারভিউ বোর্ডে allow করবে না”।
পরিমলবাবু কি বলবেন ভেবে পান না। মা বাবা কোনো কারনে আলাদা হয়ে গেছে বলে শিশুটির পড়াশোনা করার অধিকার নেই! এরা কি Right to Education act 2009 র কথা জানে না!
যাকগে, ওনাদের বসার আমন্ত্রণ আসে। বাবা , মা , বাচ্চা একদিকে আর দাদু দিদা দের অন্যদিকে বসানোর ব্যবস্থা করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। যে বাচ্চার ডাক আসছে সেই বাচ্চার বাবা মায়ের ইন্টারভিউয়ের পর তার grandparent( যদি উপস্থিত থাকে) কে অনুরোধ করা হচ্ছে নাতি বা নাতনি সম্পর্কে কিছু বলার জন্য। পরিমলবাবু জানতে পারেন 100 আসনের জন্যে আবেদন প্রায় 300। আরও নাকি বেশি ছিলো, ওরা বেশ কিছু বাদ দিয়েই ইন্টারভিউতে ডেকেছে। বিশাল অডিটোরিয়াম। সকলের বসার দিব্যি জায়গা হয়েছে। air condition hall। কিন্তু ছোট শিশুদের আকর্ষণ পাশের পার্কটা। সুন্দর স্লিপ, দোলনা দিয়ে সাজানো।
একটি বাচ্চা ছেলেকে তার বাবা কিছুতেই বসিয়ে রাখতে পারছে না। সে খুব বায়না ধরেছে পাশের পার্কটায় খেলতে যাবে। পরিমলবাবু তার অভিজ্ঞতা দিয়ে জানেন এই রকম সময় বাচ্চাটির ইচ্ছে পূরণ করতে হয়। তা না হলে সে ইন্টারভিউ তেও কিছু বলবে না। পরিমলবাবু তার বাবাকে বললেন
“আপনার টোকেন নং কত?”
ছেলেটির বাবা উত্তর দেয় “53 মেসোমশাই। দেরি আছে”।
পরিমল বাবু বলেন” তাহলে যান না, ততক্ষণ ছেলেটিকে পার্কটায় খেলিয়ে নিয়ে আসুন না। ও দশ মিনিট খেলে নিলেই শান্ত হয়ে বসে পড়বে”।
“খেলতে দেবে না মেসোমশাই। নিয়ে গিয়েছিলাম তো। বললো Your child is very hyperactive. We need disciplined child. Go and make him sit at one place.”
"Hyperactive, মানে দুরন্ত। দুরন্ত বাচ্চাদের তো খেলতেই দিতে হয়। অন্তত আমি তো তাই জানতাম। খেলতে দিলে তাদের দিয়ে কাজটাও করিয়ে নেয়া যায়। নাঃ এখন দেখছি নিজের জানা বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে কিছুই মিল খাচ্ছে না।"
শুরু হল ইন্টারভিউ। পর পর নাম ডাকছে। মা বাবা বাচ্চা নিয়ে উঠছে। 5 নং এ যে বাচ্চাটি ছিল তার মা চাকরি করে। ইন্টারভিউ বোর্ডের একটি মহিলা বললেন” sorry to say mam, actually we don’t encourage working mothers. Actually we do involve mothers for project work. If the mother is engaged elsewhere, it is impossible for her to keep contact with school regularly. So..... Sorry mam”
এবারে পরিমলবাবু সত্যিই ভিরমি খেলেন। এত বড় স্কুল, এত নাকি মেধাবী ছেলেমেয়ে, বলে কি? প্রজেক্ট তো বাচ্চাদের স্কুলের সাহায্যে নিজেদেরই করার কথা। তাতে মা কি করবেন? আর মা যদি সাহায্য করেন ও তার সঙ্গে চাকরি করা বা না করার কি সম্পর্ক? তিনি তো চাকরি করেও সন্তানকে প্রজেক্ট দেখিয়ে দিতে পারেন।
অবশেষে 21 নম্বর টোকেন। “ Tiasa Mitra , Arghya Mitra and Sudeshna Mitra, please do come on stage with all your documents.”
পরিমল বাবু দেখলেন, কাঁপতে কাঁপতে 3 জন উঠলো স্টেজে। প্রথম প্রশ্ন
বেশ রাশভারি কণ্ঠে মহিলা তিন্নীকে জিগ্যেস করেন
“what is your name?”
“তিন্নী। না মানে তিয়াসা মিত্র”।
“All your answers should be in English.” বেশ ধমকেই বলেন মহিলা।
“How many colours are there in a rainbow?”
“রামধনু। সাতটা। মানে seven.”
Listen, we don’t have Bengali as a option here. We only teach Hindi and English. I told you not to speak Bengali.

বাকি উত্তর তিয়াসা কি দিল বোঝা গেল না। তবে সুদেষ্ণা যে বেশ ঘাবড়েছে তা ওর মুখ দেখেই আন্দাজ করে ফেললেন পরিমলবাবু। অর্ঘ্য ভাবলেশহীন। এবার পরিমলবাবুর ডাক এল। Grandparents Day celebration. নাতনি সম্পর্কে মাইকে কিছু বলতে হবে। উঠলেন স্টেজে পরিমলবাবু।
"নমস্কার। উপস্থিত সকল অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে আমার প্রনাম জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শুরু করছি। আমি আমার বক্তব্য রাখবো পুরোপুরি আজকের অভিজ্ঞতা থেকে
প্রথমত বলি, আমি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। 37 বছর শিক্ষকতা করেছি। এখানে থাকি না। আমার ছেলে পেশায় চিকিৎসক। কিছুটা গিন্নীর চিকিৎসার কারণেই এখানে আসা। এসে দেখলাম ছেলে বউএর সংসারে প্রবল অশান্তি। ঠিক কি কারণে প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলাম ছোট্ট তিন্নীর স্কুলে ভর্তিকে কেন্দ্র করে এত অশান্তি। ওর নাকি কলকাতার 3 নামী স্কুলের মধ্যে 2 স্কুলই হাতছাড়া হয়ে গেছে। বেঁচে আছে শুধু এই স্কুলটি। এখানে এসে দেখলাম আমার বৌমার মত অবস্থা এখানে বহু মায়ের। স্কুলে ভর্তি করানোটা এখনকার মা বাবাকে মোটামুটি মানসিক নির্যাতনে ফেলে দিচ্ছে।

এখানে এসে গুটি কতক ঘটনার মধ্যে দিয়ে যা বুঝলাম, এই স্কুল হয়েতো অনেক মেধাবী ছাত্র ছাত্রী তৈরি করে, কিন্তু মানসিকতার দিক দিয়ে এরা অনেক পিছিয়ে। গেটে ঢুকতেই দেখলাম একটি মা চোখে জল নিয়ে তার মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, তার মেয়েকে ইন্টারভিউ দিতে দেয়া হবে না। তার অপরাধ? তিনি নাকি single mother. বাবা মা কোনো কারণে নিজেদের সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে আলাদা হয়ে গেলে শিশুটি বড় স্কুলে পড়ার অধিকার পাবে না , এ কেমন বিচার? এখানে অধিকাংশ বাবা মা দুজনে মিলে একটি শিশুকে নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। সেখানে তার মা একা এই গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আমাদের তো তাকে আরও বেশি করে সাহায্য করা উচিত। আর উচিত অনুচিতের কথা যদি বাদ ও দিই, তারপরেও বলি ,এই কাজ আইনবিরুদ্ধও বটে।

দ্বিতীয় ঘটনা। একটি বাচ্চা ছেলে, সে বোধহয় খুব বায়না করছিল পাশের সাজানো পার্কটায় খেলবে বলে। এখানে এতক্ষন অপেক্ষা করতে কারোরই ভালো লাগছে না। বাচ্চাটার ও বিরক্তি লাগছে। তাকে পার্কটিতে খেলতে চাওয়ায় স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়েছে তারা ‘disciplined’ বাচ্চা চায়। এক জায়গায় বসে প্রয়োজন হলে সারাদিন অপেক্ষা করতে হবে। বেশ, অপেক্ষা করার ব্যাপারটা বুঝলাম। এত লোক। অপেক্ষা তো করতেই হবে। কিন্তু পার্কটি তে খেলতে না দেবার যুক্তি টা ঠিক কি? পার্কটা কি আমাদের মত বৃদ্ধদের জন্যে সাজানো আছে? ছোট শিশুরা ওখানে খেলবেনা তো কারা খেলবে?

তৃতীয় ঘটনায় তো আমি স্তম্ভিত। একটি মা কে বলে দেওয়া হল সে চাকুরিরতা বলে নাকি তার সন্তানকে স্কুল নিতে পারবে না। কারণ তিনি বাচ্চাকে প্রজেক্টে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারবেন না। প্রজেক্ট কি মায়েদের করার জিনিস? ওটা তো স্কুল বাচ্চাকে শেখাবে, বাচ্চা করবে। আর মা যদি সাহায্য করেন ও তা তো তিনি চাকরি করেও করতে পারেন। এখান থেকে যে এত মেধাবী মেয়ে পাশ করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বড় অফিসার হচ্ছে, তারা কি তাহলে তাদের সন্তানের জন্য চাকরি ছেড়ে দেবেন? এখানে এত মহিলা টিচার। তারাও তো মা । আমার প্রশ্ন তাহলে তারা কি তাদের বাচ্চাদের স্কুলের প্রজেক্টে সাহায্য করেন না?

আর চতুর্থ এবং আমার মনে হয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটাই। মাতৃভাষাকে অবহেলা করতে শেখানো। আমি জানি এটা ইংরিজি মাধ্যম স্কুল। হোক না। তাতে তো কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু মাতৃভাষা তে কেউ কোনো জিনিস প্রকাশ করলে, সেটা অপরাধ তো নয়। তাকে সেটা ইংরেজিতে অনুবাদ করতে শেখাতে হবে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, সাড়ে চার বছরের শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষাই যেখানে সম্পূর্ন হয়নি, তাদের কাছে একটি সড়গর দ্বিতীয় ভাষা আমরা আশা করতে পারি না। আমার ছেলে আমার নাতনির বয়েসে কিছুই পড়তে লিখতে জানতো না। ইংরেজি তো ছেড়েই দিলাম । সে এই বয়েসে তো দূরে থাক, গোটা স্কুল জীবনেও ইংরেজি বলতে পারেনি। কিন্তু এখন বিদেশি ডাক্তারদের সঙ্গে cornference করতে তার তো কই আটকায় না। আমার ছেলের কথা যদি ছেড়েও দিই, আমার স্কুলে আমার আরও অনেক ছাত্র, যারা এই বয়েসে ইংরেজির ABCD ছাড়া কিছুই জানতো না, তারাও এখন ইংরেজির অধ্যাপক। যে স্কুলে 70%ছাত্র ছাত্রী বাঙালি সেই স্কুলে বাংলা শেখানোর ব্যাবস্থা কেন থাকবে না? আমার ছেলে বিদেশ থেকে ফিরলে ওর সাথে আমি গল্প করে জানতে পারি, পৃথিবীর যে কোনো উন্নত দেশে বাচ্চার ফর্মাল এডুকেশন শুরুর আগে তারা মা বাবার কাছে জানতে চায় , সেই বাচ্চাটির মাতৃভাষা শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে কিনা। তবেই তারা অন্য ভাষা শেখানো শুরু করবে। তার আগে নয়। তাহলে কি তারা ভুল? নাকি আমরা ভুল? একটা সাড়ে চার বছরের শিশু ক্লাস ওয়ানের সিলেবাস শেষ করে এসে ভর্তি হবে কেন? তাহলে সে স্কুলে কি শিখবে?

নমস্কার। আমার আর কিছু বলার নেই। আশা রাখি স্কুল কর্তপক্ষ আমার এই প্রস্তাব ভেবে দেখবেন। তা না হলে আমরা দামি শিক্ষা দিয়ে মানুষের বদলে ফানুস তৈরি করবো যা অচিরেই মাঝ আকাশে গিয়ে ফেটে যাবে।"

গোটা হল স্তব্ধ। পরিমলবাবু নেমে এলেন। সুদেষ্ণার মাথায় হাত। শেষ স্কুলটাও হাত থেকে চলে গেল। এত অপমানের পর তিন্নীর নাম যে ওরা কিছুতেই সিলেক্ট করবে না , তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হঠাৎ পরিমলবাবুকে অবাক করে আরও একটি Grandparent উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেন। তাকে দেখে আরও একজন। তারপর আরও একজন। একে একে গোটা হল উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। অভিভাবক দের হাততালি তে চোখে জল এসে যায় পরিমলবাবুর। নাঃ গোটা সমাজটা এখনও বিকিয়ে যায়নি তাহলে। শিরদাঁড়া এখনও কিছু মানুষের আছে । আমি পেরেছি সেই শিরদাঁড়াটা সোজা করাতে। এটাই তো শিক্ষকের কর্তব্য।

(৬)
আজ নার্সিংহোম থেকে ছুটি নিয়েছে অর্ঘ্য। বাবা মা কাল চলে যাবে। তাই এই দুদিন ও যাবে না নার্সিংহোম। সুদেষ্ণার অনুরোধে আরও একটা স্কুলের ফর্ম তুলে এনেছে অর্ঘ্য। আজ সুদেষ্ণা বাড়ি নেই। ঠিক কি কারণে নেই জানে না অর্ঘ্য। কিছুখন পরেই ফিরে এল সুদেষ্ণা।
“কোথায় গিয়েছিলে?” প্রশ্ন করে অর্ঘ্য।
“পাড়ার ইংরিজি মাধ্যম স্কুলটায় ফর্ম দিচ্ছে। আজ শেষ দিন । তাই তুলতে গিয়েছিলাম”।
“ও। তা তুমিই তো বলতে স্কুলটা খুব একটা ভালো না...”
“হ্যাঁ বলতাম তো। এখনও বলছি। কিন্তু উপায় কি? বাবা যা বলে এসেছেন, ওই স্কুল তিন্নীকে আর কিছুতেই নেবে না। ভর্তি তো করতে হবে কোথাও একটা মেয়েকে! অগত্যা এটা বাড়ির কাছে, এটাই তুললাম”।
“ওভাবে বোলো না সুদেষ্ণা। বাবা অযৌক্তিক কিছুই বলেননি”।
“না বলেননি। আমিও মানি সে কথা, ওনার প্রত্যেকটা কথা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু গোটা কলকাতার শিক্ষা ব্যবস্থাকে কি তুমি সেটা বোঝাতে পারবে? ওরা প্রাইভেট স্কুল। নিজেদের মর্জিতে চলবে”।
“গোটা কলকাতার স্কুলকে কেন বোঝাতে যাবো সুদেষ্ণা? তুমি, আমি আর তিন্নী বুঝলেই তো হল। আর শোনো এত চাপ নিয়ো না। অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমি তো সময়ই পাইনা। তিন্নীর তো তুমিই ভরসা। তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লে, ওকে কে দেখবে? দেখ, কলকাতায় স্কুলের অভাব নেই। কোনো না কোনো একটায় তিন্নীর ঠিকই হয়ে যাবে। আর এটা তো পাড়ার স্কুল। এটা কিছুতেই ওকে বাদ দেবে না। আর দেখ, আমাদের পক্ষেও সুবিধা। যাওয়া আসার কোনো হেপাই নেই। তিন্নীর বড় হবার হলে দেখবে এখান থেকেও বড় হবে”।
“হুমম। আচ্ছা আমি একটা অন্য কথা ভাবছিলাম”।
“বল। কি ভাবছ?”
“বলছি পাড়ার এই ইংরিজি স্কুলটায় বিজ্ঞানের শিক্ষিকা চাইছে। আমি ফর্ম তুলতে গিয়ে দেখলাম। দেখার পর প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখাও করে এলাম। বললাম আমি রসায়নে স্নাতকোত্তর। বি এড ও আছে। কিন্তু আমি বাংলা মিডিয়ামের ছাত্রী। খুব ভালো ইংরেজিও বলতে পারিনা। ওই কাজ চালিয়ে নিতে পারি। উনি কিন্তু বলেছেন কাল আমাকে আমার সমস্ত ডকুমেন্টস নিয়ে দেখা করতে। বলেছেন অসুবিধা নেই। প্রয়োজনে প্রথমে নীচু ক্লাস দেবে। পরে আসতে আসতে উঁচু ক্লাস। আমি কি যাবো?”
“নিশ্চই যাবে সুদেষ্ণা। কেন যাবে না? তিন্নী তো এখন বড় হয়ে গেছে। তোমার প্রতি নির্ভিরশীলতা ওর আসতে আসতে কমানোটাই তো উচিত! আর একদম পাড়ায় স্কুল। কিচ্ছু অসুবিধে নেই। আর দেখবে তাতে তোমার তিন্নীকে পড়াতেও সুবিধাই হবে”।
স্বামী স্ত্রীর কথোপকথনের মাঝেই অর্ঘ্যর ফোনে একটা ফোন এল। ফোন ধরতেই অবাক অর্ঘ্য। তিন্নীর স্কুল থেকে ফোন। যে নামী স্কুলটায় ও ইন্টারভিউ দিয়ে এল, সেই স্কুল কমিটির একজন ফোন করেছেন। আর অর্ঘ্য নয়, উনি কথা বলতে চান পরিমলবাবুর সঙ্গে।
পরিমলবাবুও বেশ অবাক হয়েই কথা বলতে শুরু করেন। গোটা বাড়ি হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কেউ আশা করেনি এমনটাও ঘটতে পারে। ওপ্রান্ত থেকে কি বলছে বোঝা যাচ্ছে না, তবে পরিমলবাবুর মুখটা বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। মিনিট দশেক কথা হওয়ার পর ফোন রাখলেন পরিমলবাবু। বললেন “ স্কুল কর্তৃপক্ষের আমার প্রত্যেকটা কথা যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। ওরা জানালো ওরা আজ 90 জনের নাম বের করবে। 100 জনের পরিবর্তে। 10% সিট ওরা single parent দের জন্যে সংরক্ষিত রাখবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাদের ওরা শুধু এই কারণে ইন্টারভিউ দিতে দেয়নি, তাদের ওরা আবার ডাকবে। এবং তার মধ্যে থেকে 10জন বাচ্চাকে বেছে নেবে। এই 90 জনের মধ্যে বেশ কিছু চাকুরিরতা মা এর বাচ্চাদের নাম ও আছে। আর সর্বোপরি সব চেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত ওরা বাংলা বিষয় পড়াবে স্থির করেছে। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে অপশন থাকবে। হিন্দি এবং বাংলা। যার যেটা পছন্দ সে সেটা নেবে। আজ সকাল দশটার পর ওরা রেজাল্ট বের করবে”।
ঘড়ি দেখে সুদেষ্ণা। বেলা এগারোটা। সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপ অন করে অর্ঘ্য। 21নং এ জ্বলজ্বল করছে তিন্নীর নাম। তিয়াসা মিত্র।
আনন্দে চোখে জল এসে যায় সুদেষ্ণার। জড়িয়ে ধরে পরিমলবাবুকে।
“আবার কবে আসবেন বাবা?”
মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করেন বৌমাকে পরিমলবাবু। "আসবো মা। মাঝে মাঝে আমি না আসলে কলকাতা শহরের ইট,কাঠ, পাথর যে দমবন্ধ করে দেবে ছোট্ট মেয়েটার। আমি যতদিন বেঁচে আছি, ওকে মানুষ করার চেষ্টা করবো। কিছুতেই মাঝ আকাশে ফানুসের মত ফেটে যেতে দেব না। আর তুমিও খুব ভালো করে ইন্টারভিউ দাও মা। শিক্ষা কাজে লাগাতে হয়। হেলায় নষ্ট করতে নেই”।
আনন্দের সঙ্গে দাদু, দিদাকে বিদায় দেয় অর্ঘ্য, সুদেষ্ণা আর ছোট্ট তিন্নী। এখন থেকে শুধু তিন্নী নয়, সুদেষ্ণাও দিন গুনতে থাকে আবার কবে টাটকা হাওয়া ভরিয়ে দেবে ওর বদ্ধ ফ্ল্যাটটাকে।

-সমাপ্ত-