সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন গিনি (১৫-০৯-২০১৮ ১৯:০৫)

টপিকঃ ফেসবুকে পুনর্মিলন

ফেসবুকে পুনর্মিলন
গিনি
অনিন্দ তুমি যদি ফেসবুকে ফ্রেন্ডস রিকোয়েস্ট না দিতে আজকে আমারা এই রেল গাড়িতে করে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হতো না।
অনিন্দ- যখন তোমার নামের সাথে তোমাদের গ্রামের বাড়ির ছবি দেখলাম তখন আমি নিশ্চিত ওটা তুমি। আমাদের আজ প্রায় ৪০ বৎসর পর দেখা। বল কিছু বল।
নমিতা- কি বলব। সেই পুরানো ছকে বাঁধা নারী জীবন। অল্প বয়সে প্রতিষ্ঠিত পাত্রের হাতে তুলে দেওয়া। তারপর সংসার। ছেলে মেয়ে। নাতি পুঁতি পালন। কিছু বড় পার্টি। দামি জিনিস পত্র। কালে ভাদ্রে বিদেশ গমন।
অনিন্দ- তা হলে মহা সুখেই ছিলে। বেচারা স্বামী স্বর্গ বাসি হয়ে একা করে গেছে।
নমিতা- যদি ধারনা কর তবে সুখ। বন্দি জীবন যদি সুখ হয়, যেমন, সোনার খাচায় পাখি। সে পাখি ঐ টুকু জায়গার মধ্যে কেন লাফালাফি করে সে ছাড়া আর বিধাতা ছাড়া কারো ধারনা করার উপায় নাই। বাইরে থেকে
মনে হবে সবই ত পাছে কি সুখ!
অনিন্দ- নমিতা আজ কাল রেল গাড়িতে খাবার ব্যবস্থা ভালো। কিছু অর্ডার করি।
নমিতা- ও সব নিয়ে চিন্তা করো না। আমার দূর সম্পর্কের জ্যাঠা র ছেলে রেলের অফিসার। সেই সব ঠিক করে রেখেছে। আমার পিতা ওদের পরিবার কে পালন করেছে। এখন ওরাই ঐ পুরাতন ঘর বাড়ি দেখে রাখে।
খাবার কামরায় এসে যাবে। আর ষ্টেশনে লোক থাকবে সব ম্যনেজ হয়ে যাবে। শুধু আরাম কর।
যে কথা বলছিলাম। স্বামী মানেই সব অধিকার তার। সে মদপ্য হয়। সে পিটায়। সে জানার মধ্যেই অন্য নারী নিয়ে ডিনারে যায়। মেয়ে হয়ে সব সব মুখ বুজে সহ্য করতে হবে। এটাই গতানুগতিক। আমিও সব মেনে নিয়েছি।
সেই জলহীন সুখ সাগরে ডুবে গেছি।
তোমরা কবে আমাদের গ্রাম থেকে চলে গেলে জানতে পারি নাই। কোনো যোগাযোগের সুযোগ ও ছিল না।
অনিন্দ- বাবা দারোগা ছিলেন। বদলির চাকুরি। অন্য এক বড় শহরে রাতারাতি চলে যেতে হয়। অনেক ভেবেছিলাম চিঠি দিব। সাহস হয় নাই। তারপর পরীক্ষায় ভালো করায় প্রকৌশলী হওয়া। আমেরিকায় পারি জমানো।
পরিবারের পছন্দে বিবাহ। কিন্তু একদিন স্ত্রী তার কলেজের প্রেমিকের সাথে চলে যায়। একখানি কাগজে শুধু সরি লিখে সেই শেষ। এর পর আর সংসার না করে গবেষণার কাজে লেগে যাই। তুমিও ত লন্ডনে স্থায়ী। কেমন যায় সেখানে।
নমিতা- মনে হয় ষ্টেশন এসে গেছে। ভোলা আসবে আর কে আসবে জানি না।
ভোলা- দিদি মনি। কেমন আছো। একদম শুকায়ে গেছো। ক দিন এখানে থাকো। খাটি দুধ আর ছানা খেলে সব ঠিক।
নমিতা- ভোলা শুধু আমার যত্ন নিলে হবে না। এ আমাদের ছেলে বেলার দারোগা সাহেবের ছেলে অনিন্দ। চিনতে পারো। এর কিন্তু অনেক সেবা করতে হবে। আমাদের বিশেষ মেহমান।
মনে আছে বাবা মেহমানদের জন্য কেমন করতেন।
ভোলা- দিদি অসব নিয়ে একদম চিন্তা নাই।
নমিতা- ভোলা দাদার ঘরটা দেখায়ে দাও আর চান করার ব্যবস্থা কর।
ভোলা- গরম জল সব রেডি। চান করে এসো খাবার দেই। তোমার আসার খবর শুনে আনেকে দূর থেকে এসেছে তোমাকে দেখবে বলে। বিকেলে নাস্তার সাথে ওদের সাথে একটু কথা বল। সবাই খুশী হবে।
নমিতা- অনিন্দ দেখেছো এখনও গাঁয়ের লোক আমাদের জমিদার ভাবে। ভাবে আমরা ওদের অনেক কিছু দিয়াছি করেছি। বিকেলটা খুব ব্যস্ত গেল।
অনিন্দ দেখো দেখো আজ জ্যোৎস্নায় চারি পাশ ভেসে যাচ্ছে। কি নির্মল সুন্দর। চলো দোতলার বারন্দায় যাই। অনিন্দ তোমার মনে পরে এক ঝড়ের দিন আমি সামনের বারন্দায় একা বৃষ্টির ছাট নিচ্ছি আর হটাত করে তুমি
পেছন থেকে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে একখানা চুমু খেয়ে দেওয়াল টপ কে পালিয়ে গেছিলে। আর আমি চিৎকার করে কেঁদে ঘরে যাই। তখন প্রচণ্ড বাজ পরছিল। মা ভেবে ছিলেন আমি বাজের ভয়ে কাঁদছি। মা বেশ কেয়কবার
জিজ্ঞাস করেছেন কিন্তু আমি কিছুই বলতে পারি নাই। তখন আমি ক্লাস এইটে আর তুমি হয়ত দশে। আর একবার ঢেলা মেরে একখানা কবিতা পাঠিয়ে ছিলে। আমার আজ মনে আছে।
প্রিয় নমিতা আমার নমিতা,
স্বপনে ভাসে যার ছবি,
তুমি সেই ললিতা।
হব চির সাথি তোমার,
গান হবে কবিতা আমার,
এক বার আড় চোখে ঈশারায় যদি ভালোবাসি
বলি তা।
এখন ভাবি, সেদিন তা হয়ত ভালো লেগে ছিল বলেই মা কে বলিনি।
অনিন্দ আজ এই সুন্দর খনে আবার একবার কি আমরা সেইখানে ফিরে যেতে পারি। একটু কি তোমার বুকে মাথা রেখে বুঝতে পারি ভালোবাসা আসলে কি। এই ভালোবাসা ত আমার জীবনে কখন ও আসে নাই। বিধাতা আজ তোমাকে আমাকে
এই ত সুযোগ দিলেন। রাত্রি মুগ্ধতায় সাজালেন।
অনিন্দ- নমিতা , আজ এ সময় কোনো সুযোগ নয়। এটা এখন মরীচিকা। তোমার মনেও আমার জন্য কোনো ভালোবাসা নেই, আর আমি এসব বুঝি না। আমারা শুধুই বন্ধু।
নমিতা- শুধু ই বন্ধু। কত সহজে তোমরা পুরুষেরা বলে দিতে পারো। তোমারা ইচ্ছা করলে গালে চুমু খাও। মারো। চোখের সামনে অন্য নারীর সঙ্গ নেও। তোমরা সন্তানের ভার কাধে দিয়ে অট্ট হাসো। আড় আমরা শুধু প্রেম খুজি, আমারা কাঙ্গাল,
আমরা মাটির প্রদীপে সলতে। শুধুই উজ্জল আলো দিবো আড় নিজে জ্বলে খার হবো। পোরা কালি। এতো পথ এসে বললে শুধুই বন্ধু। তোমরা ঠগ, চতুর। সুবিধা মত চল।
ভোলা- দাদা বাবু, বেলা ত অনেক হল। গত রাতে বোধ হয় সূরা একটু বেশী হয়েছে।
অনিন্দ- দিদি মনিকে বল আমি আসচি।
ভোলা- দিদি মনি আঁধার ভোরে আমাকে ডেকে তুলেছেন, বলেন অনার কি জরুরী কাজ আছে তাই ভোরের ট্রেনে যেতে হবে। আমিত ওনাকে ট্রেনে তুলে দিয়েছি।
অনিন্দ- বল কি। তবে পরের গাড়ি কখন। টেলিফোনটা দাও চেষ্টা করি। না হচ্ছে না।
ভোলা- আর ঘণ্টা দুই পরে। আপনি চান করে নেন। আমি খাবার দেই, পরে ট্রেনে তুলে দিব।
এরপর আর দশ বৎসর যায়।
নমিতার খোঁজ আর কেউ পায় নায়। ওর নাতিরা হয়ত লন্ডন পুলিশের খাতায় নাম লেখায় তাই কিছু দিন পর একটা খবর ছিল, Honorable Indian lady went to India and Since than missing, একটা ছবিও ছিল।
অনিন্দ বয়সের ভারে একটু কুঁজো। গুল্কোমার জন্য সব আবছা দেখে। আমেরিকার বিশাল বাড়িতে একা থাকে। মাঝে মাঝে আহেতুক চিৎকার শুনা যায়। আবার গভীর রাতে বেহালায় সুর বাজে, হয়ত বাজে,
নমিতা নমিতা,
তুমিই ছিলে আমার প্রিয় ললিতা।
কাছে পেয়েও কাছে হয় না পাওয়া,
আবেসে শুধু রও, অলিক মধু ছাওয়া,
এ প্রেম যেন পাপড়ি ছোয়া মৃদু হাওয়া।