টপিকঃ মহা নগরীর জীবন

মহা নগরীর জীবন
গিনি
স্যাত স্যাতে পরিবেশে বেড়ে উঠলেও জীবন চির স্যাত স্যাতে থাকে না। পথের যেমন আঁক বাঁক আছে জীবন চলায়েও অনেক গতি পরিবর্তন ঘটে।
রমেনের পিতা সুশীল পাল নদী ভাঙ্গার কারণে জমিজমা হাঁড়ায়। তাই পরিবার অর্থাৎ সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী নিয়ে আর সাথে কয়েক পুটলি কাপড় জামা, টুং টাং নিয়ে আসে ঢাকা শহরে। এ যাত্রায় কিছু পথ পায়ে হেটে কিছু নৌকায়। নৌকা এসে ভিরে ব্যাক ল্যান্ড বাঁধের কাছে। এই ঘটনা আজ থেকে প্রায় ৭০/৭৫ বৎসর পূর্বের।
বাঁক ল্যান্ড বাঁধের ধার ঘেঁসে এক খান রাস্তা। বেজায় ভিড়। ঘোরা গাড়ি, সাইকেল, ঠেলা গাড়ি, গরুর গাড়ি, বস্তা কাধে মানুষ ভিড় আর ভিড়। পাশের দালান গুলা খড়ো স্রোতা বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে আছে।
নৌকা থেকে পরিবার নিয়ে নামার কিছু পরে এক দালাল পিছু নেয়। সে বলে থাকার ঘর ভাড়া আর এমনকি কাজের ব্যবস্থাও করে দিবে। কোনো টাকা লাগবে না। বাড়ির মালিক বলে স্বল্প ভাড়ায় আছে জায়গা আছে। তারপর ওদের নিয়ে আসে এক গেটের মত স্থানে।অনেক উচা ছাদ।
সেখান দিয়ে অনেক মানুষের চলাচল। এরই দুপাশে কিছুতা উঁচু ঢিবির মত। ঐ ঢিবি গুলিই থাকার স্থান। তার দেওয়ালে মাঝে মাঝে কুণ্ডল আছে জিনিস পত্র রাখার জন্য। কোনো উপায় নাই অগত্যা এখান থেকেই শহুরে জীবন শুরু। ঢিবির এক পাশে শোবার ব্যবস্থা হয় অন্য পাশে কাঠের চুলায় রান্না। প্রক্ষ্যালনের জন্য দূরে
একটা পায়খানা আছে। স্নানের জন্য নদীর পারের সিঁড়ি , মাঝে মাঝে নিকটেই একটা কুয়া।
ঐ দালাল পরদিন সুশিল কে এক আরতদারের কাছে মুটের কাজের জন্য নিয়ে আসে, কাজ হয়, কিন্তু দালাল কে প্রতি রাতে এক সিকি করে দিতে হবে।
ঐ চলার পথের দুপাশ ঘিরে সুশিলের সংসার স্থায়ী হয়।
দিন আর রাত্র সারাক্ষণই দু এক জন পথচারী তাদের ঘরের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে।
এই মহা নগরীর অনেক প্রাচুর্যের কাহিনী সে শুনেছে। এক দিন সখ করে তার স্ত্রী কে নিয়ে যায় বাহাদুরশাহ পার্কার নিকট আজাদ সিনেমা হলে, ছবির নাম, জাগো হুয়ে সাবেরা।
তার সংসার বারে। পুত্র সন্তান হয় নাম রাখে রমেন পাল।
সময় তার পুরাতন নিয়মে সব কিছু পিছে ফেলে ঝড়ের বেগে এগিয়ে যায়।
রমেন কে বিদ্যালয়ে দেয়। তার ইচ্ছা পুত্র ঐ উকিলদের মত গাড়িতে চড়বে। সবাই সম্মান করবে। বড় দালানে থাকবে এই এমন স্যাত স্যাতে স্থানে না।
বিদ্যালয়ে রমেন তার মেধার পরিচয় দেয়। শিক্ষকদের সে প্রিয়। ঐ চলার পথের উঁচু ঢিবিতে রমেনের একটা আলাদা স্থান হয়। বই পুস্তক রাখে এক কুণ্ডলিতে। বেশী কিছু রাখা যায় না, চুরি হয়ে যায়।
বেশীর ভাগ পড়াশুনা ন্রথব্রুক হল রাস্তার লাইব্রেইরিতে করে। ওটা তার পোগোস স্কুলের নিকট। তার মেধার জন্য স্কুলের ফি আধা। স্কুল ছেরে যখন ঢাকা কলেজে আসে তখন থেকে টিউশনি শুরু করে। এবার সে ঐ গেট বাস স্থান ছেড়ে হোস্টেলে চলে আসে। এখন কিছু কিছু অর্থ
মাতা পিতার সংসারে দেয়। মেধা তালিকায় প্রথম হয়ে সে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করে।
সামনে ইপিসিএস পরীক্ষা। এই পরীক্ষা পাস করায় তাকে নিয়ে আসে ফরেন সার্ভিস বিভাগে।
মাতা পিতা এখন বৃদ্ধ। তাদের নিয়ে উঠে সরকারি ভবনে।সরকার থেকেই বাসার কাজের জন্য জনবল পায়। বিদেশ যাত্রা এক নিত্য দিনের বিষয়।
তার মাতা অল্প বুঝলেও এই টুকু বুঝে পুত্র এখন বড় আফিসার। বয়সের কারণে পিতা কানে কম শুনে, চোখেও অল্প দেখে, আর বোঝাটা একদম ঘোলাটে।
তাদের পুরানো এলাকার এক ঘটক আসে এক আরতদারের মেয়ের প্রস্তাব নিয়ে, সে অষ্ট শ্রেণী পড়া। রমেন বলে শিক্ষিত মেয়ে চাই।
রমেনের বই পড়ার প্রতি সখ তার সংগ্রহে অনেক পুস্তক। কি এক নুতন বইয়ের খোঁজে নিউমার্কেটের মল্লিক ব্রাদার্সের দোকানে আসে। এখানে সবাই তাকে চেনে।
হুল স্থুল পরে যায়। স্যারের জন্য চেয়ার আসে, আসে চা। তখন ফেব্রুয়ারি মাস। এক মেয়ে হ্লুদ শাড়ি লাল পাড় ঢোকে দোকানে। জিজ্জাসা করে জিসি দেবের দর্শনের এক পুস্তকের কথা। দোকানি বলে ঐ বই এখন শেষ। মাস ছয় পরে পাওয়া যাবে।
রমেনের কানে বই এর নাম টা বাজে। সে জানে বই টা তার সংগ্রহে আছে। সে মেয়ে টিকে বলে, আচ্ছা বলেন ত বই টা কেন দরকার।
সে যুগে অচেনা মেয়েদের সাথে কথা বলা বড় সাহসের বিষয়, কারণ সেই মেয়ে ত বটেই আসে পাশের জনতা তাকে রক্ষায় নেমে যাবে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশের কারণে হল না। মেয়ে টা বলল, আমার থিসিসের জন্য। চলে যাওয়ার পূর্বেই রমেন বলল ওটা আমার কাছে আছে আমি পাঠিয়ে দিব।
এক কথায় দু কথায় রমেন তার পরিচয় এমন কি পিতৃ পরিচয় অ জেনে নিল।
পরদিন হোস্টেলে ফেরার সাথে সাথে হলের ম্যাত্রন আপা তলব করলেন যুথিকাকে।
রমেন পাল , সিএস্পি, যে তোমার পরিচিত আগে বলনাই কেন। এই নেও তোমার বই। আর আজ থেকে তুমি আমার ঐ বিশ্রামের ঘরে একা থাকবে। আপা আপনি। আমার কথা তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।
রমেন এক দিন রথ খোলার মরন চাঁদের দোকান থেকে এক হাড়ি মিষ্টি নিয়ে রওয়ানা দেয় গেন্দেরিয়ার রজনী চৌধুরি রাস্তার জন্য। রজনী চৌধুরি রাস্তা টা ছোট তাই গাড়িটা প্রধান রাস্তায় রেখে মিষ্টির হাড়ি হাতে হাটা দেয়। কেতা দুরস্ত জামা কাপড়। মাথায় সাহেবি কায়দায়
ফেলটের হ্যাট আসে পাশের কারোই বুঝতে অসুবিধা হয় না ইনি এক জন কেউকেটা। পাশ কাটিয়ে যেই যায় সালাম কিম্বা নমস্কার করে সরে যায়। ঐ গলি পথের অনেকেই মনে করে হয়ত ফুটবলের রেডিও জকি জনাব হামিদের কাছে এসেছেন, কিন্তু সেই দালান পাড় হয়ে রমেন এসে দাঁড়ায়
১৫ নম্বর রজনী চৌধুরি বাসায়। রাস্তা থেকে বারন্দা টা একটু উঁচু। উঠে এসে দরজায় করা নাড়ে। যুথিকার পিতা একজন সাধারন সরকারি চাকুরে, রমেনের পরিচয় পেয়ে শ শ ব্যস্ত হয়ে উঠে। তারপর, তারপর যখন শুনে রমেনের আসার কারণ তখন কান্নায় ভেঙ্গে পরে।
তার জন্য এ হাতের মুঠায় চাঁদ।
এখন সময় অনেক গেছে। হয়ত সেই রমেন ও নেই। সেই সাথে শেষ হয়ে গেছে খসা স্যাত স্যাতে দেওয়ালে রমেনের জীবন পালটানো প্রথম পেন্সিলের আঁচড়টি।