টপিকঃ কী হচ্ছে গণপরিবহনে

https://www.poriborton.com/upload/April-2018/22/1524328381.jpg

দেশের গণপরিবহন দিন দিন প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্যের কারণে প্রতিদিনই ঝরছে অসংখ্য প্রাণ। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সড়ক ব্যবস্থাপনা নয়, দায়ী হচ্ছে পরিবহন ব্যবস্থাপনা। আবার সরকারেরই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলছেন, সড়কের বেহালদশার কারণে অনবরত দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে।



সড়ক বা পরিবহন ব্যবস্থাপনা- যে বিভাগই দায়ী হোক না কেন, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঠেকাতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে বিভিন্ন মহল।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সারা দেশে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ১ হাজার ৭৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৪১ জনের প্রাণহানি ও ৫ হাজার ৪৭৭ জন আহত হয়েছে। পঙ্গু হয়েছে ২৮৮ জন। এছাড়া সারা দেশে ৭৯ লক্ষ চালকের মধ্যে বিআরটিএ লাইসেন্স আছে মাত্র ১৬ লক্ষ চালকের হাতে। তারা বলছেন, রাজধানীতে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাস ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে বেপরোয়া চলাচল করে। এর ফলে দুর্ঘটনায় কারও হাত, কারও পা, কারও মাথা হারাতে হচ্ছে। আবার কাউকে হারাতে হচ্ছে জীবন।

গত ৪ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুই বাসের চাপায় সরকারি তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের হাত হারানোর পর সারা দেশের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য নতুন করে আলোচনায় আসে। মূলত দুই বাসের মাঝখানে আটকে থাকা রাজীবের নিথর বিচ্ছিন্ন হাতটি দেশের মানুষের বিবেক নাড়িয়ে দিয়েছে। একই সময়ে পরপর আরও কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে দেশের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে। যাত্রীদের তরফ থেকে নানা পরামর্শ, দাবি উত্থাপিত হলেও এসব ব্যপারে সরকার, বাস মালিক, চালক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো বরাবরই নীরব ভূমিকা পালন করছে। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা, মানুষের প্রাণ ও অঙ্গহানির ঘটনা নিয়ে উপর্যুপরি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও কোনো ধরনের বার্তা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট চালক, মালিক ও সড়ক পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তারা।

প্রতিদিনই গণপরিবহনের রেষারেষিতে হয় প্রাণ হারাচ্ছেন, না হয় অঙ্গ হারাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতেও রাজধানীর বনানীতে বাসের চাপায় পা হারালেন গৃহকর্মী রোজিনা আক্তার (২১)। হাত হারিয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে পরাজিত কলেজছাত্র রাজীবের মৃত্যুর সপ্তাহ না পেরুতেই পা হারালেন রোজিনা। সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার বাসার এ গৃহকর্মীর ডান পা উরু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ইশতিয়াক রেজা নিজেই।

গতকাল শনিবারও গাড়িচাপায় মারা গেছে ১০ বছরের এক শিশু। চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ড উপজেলার ছোট কুমিরা এলাকার মকবুল আহমদের ছেলে ইবরাহিম খলিল নামে শিশুটি রাস্তা পারাপারের সময় গাড়িচাপা পড়ে।

এদিকে, রাজীবের হাত হারানোর একদিন পরেই রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় দুই বাসের চাপায় পড়ে কোমর হারাতে হয় গৃহবধূ আয়েশাকে। একই দিন সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মগটুলা ইউনিয়নের বৈরাটি গ্রামে। সেখানে বেপরোয়া বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান মা শিউলি আক্তার। আর চাকার নিচ থেকে মাকে বাঁচাতে বাস ঠেলেছেন সন্তান তুহিন। এর পরের দিন ৭ এপ্রিল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনটি পৃথক এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নরসিংদীতে প্রাণ যায় ৯ জনের। ১৭ এপ্রিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দুই যানের সংঘর্ষে রাজীবের মতোই হাত হারাতে হয় মোটর শ্রমিক হৃদয় শেখকে (২৬)।

এ ছাড়াও গত শুক্রবার নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলায় ট্রাকের চাপায় নিহত হয়েছেন দুই মোটরসাইকেল আরোহী- আব্দুল মালেক (৫০) এবং মান্দা উপজেলার পাজরভাঙ্গার তৈয়বুর রহমান (৪২)। একইদিন গাজীপুরে ট্রাক ও বাসের সংঘর্ষে মারা গেছেন ট্রাকের চালক মো. মুখর উদ্দিন (৪২)। আহত হন অন্তত ৩ জন। ফেনীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিকালে বাসচাপায় মারা যায় পল্লীবিদ্যুতের কর্মী রিয়াজুদ্দিন রনী ও রিয়াজুল ইসলাম। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার বগুড়ার সান্তাহার উপজেলায় ট্রাকের ধাক্কায় যাত্রীসহ এক ভ্যানচালকের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- ভ্যানের যাত্রী ভুলু (৫০) ও ভ্যানচালক নূর ইসলাম বাবু (৪৫)। একইদিন বগুড়া শহরে ব্যাটারিচালিত দুই অটো রিকশার পাল্লাপাল্লিতে রাস্তায় ছিটকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে সুরাইয়া তাসনিম প্রাপ্তি নামের ৬ বছরের এক শিশু। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন তার মা সাবিহা খাতুন (৩২)। মঙ্গলবার মুন্সীগঞ্জে বাস-সিএনজি অটোরিকশা সংঘর্ষে মারা যায় অজ্ঞাতনামা একজন।

এভাবে পরিবহনের বেপরোয়া চলাচলের কারণে সড়কে ভারী হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। কোনো বাদ-প্রতিবাদই আমলে নিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা। ফলে সড়কে মৃত্যুর শঙ্কা আরও বাড়ছে। গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক গোলটেবিল বৈঠকে এক তথ্যে বলেছে- রাজধানী ঢাকা শহরে গণপরিবহনের ৮৭ শতাংশই আইন অমান্য করে বেপরোয়া চলাচলসহ নানা ধরনের নৈরাজ্যের সঙ্গে জড়িত। আর সারা দেশের রাস্তায় চলাচল করা ৮১ লাখ যানবাহনের মধ্যে ৫০ লাখেরও বেশি অনিবন্ধিত। এর মধ্যে ৭২ শতাংশ পরিবহনই ফিটনেসবিহীন। এছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) লাইসেন্স আছে মাত্র ১৬ লাখ চালকের হাতে। পরিবহনের এমন অব্যবস্থাপনার কারণেই ঢাকাসহ দেশে সড়কগুলোতে প্রতিদিনই হতাহতের ঘটনা ঘটছে বলে তারা দাবি করেন।

রাজধানীতে গণপরিবহনের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে এবং প্রাণহানি ঠেকাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি ১০ দফা সুপারিশও করেছে সরকারকে। তার মধ্যে আমলাতন্ত্রের বাইরে এসে পেশাদারিত্ব সম্পন্ন গণপরিবহন সার্ভিস অথরিটি গঠন করা, ট্রাফিক বিভাগের কার্যক্রম জবাবদিহিতার আওতায় আনা, চালকের হাতে দৈনিক জমাভিত্তিক বাস ইজারা দেওয়া বন্ধ করা, বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা জনবান্ধব করাসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দেওয়া এক তথ্যে দেখা যায়, গত বছর (২০১৭) ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছোট-বড় ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে সর্বমোট ২৩ হাজার ৫৯০ জন যাত্রী, চালক ও পরিবহন শ্রমিক হতাহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন সর্বমোট ৭ হাজার ৩৯৭ জন, আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন। যার মধ্যে হাত-পা বা অন্য অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন ১ হাজার ৭২২ জন। বিগত বছরে দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় দেড় থেকে দুই শতাংশ।

২০১৭ সালে এক হাজার ২৪৯টি বাস, এক হাজার ৬৩৫টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ২৭৬টি হিউম্যান হলার, ২৬২টি কার-জিপ-মাইক্রোবাস, এক হাজার ৭৪টি অটোরিকশা, এক হাজার ৪৭৫টি মোটরসাইকেল, ৩২২টি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৮২৪টি নছিমন করিমন দুর্ঘটনায় পড়ে। সংঘটিত দুর্ঘটনার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ পথচারীকে চাপা, ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১১ দশমিক ৯ শতাংশ খাদে পড়ে, ২ দশমিক ৮ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে আহত ও নিহত হন।

২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে ৪ হাজার ৩১২টি। যার মধ্যে নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ৫৫ জন এবং ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ২২ দশমিক ২ শতাংশ এবং আহত ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।

সেন্টার ফর ইনজ্যুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)-এর এক জরিপে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৪ জন নিহত হন। প্রতিবছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ২৩ হাজার ১৬৬ জন। সড়ক দুর্ঘটনার ফলে বছরে বাংলাদেশের জিডিপির শতকরা দেড় ভাগ নষ্ট হয়- যার পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বলে জানা গেছে ওই জরিপে। তাদের হিসাবে গত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৫ হাজার মানুষ। আর দুর্ঘটনাজনিত মামলা হয়েছে প্রায় ৭৭ হাজার।

আরেকটি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০০১ সাল থেকে এ বছর জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৬৫ হাজার ৮৬২ জন মানুষ মারা গেছেন। গবেষকরা বলছেন সড়ক দুর্ঘটনার ৫৪ শতাংশই ঘটছে যানবাহনের ধাক্কায়। দুই যানের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটছে ১৩ শতাংশ, একটি অন্যটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে ১১ শতাংশ এবং গাড়ি উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে ৯ শতাংশ। এই চার কারণে মোট মৃত্যুর ৮৫ শতাংশই ঘটে থাকে বলে মনে করছেন গবেষকরা। গত এক যুগেই বাংলাদেশে ৪৪ হাজার ৭৭৪টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় বলে ওই পরিসংখ্যানে দেখানো হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। কোনো পরীক্ষা ছাড়াই খোদ সরকারের মন্ত্রীই ২৪ হাজার শ্রমিককে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য সুপারিশ যখন করেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না পরিবহন ব্যবস্থা কতটা নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পরিবহনে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির ক্ষেত্রেও সরকার কঠোর নয়। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিষয়টিকে নরহত্যা উল্লেখ করে দায়ী চালকদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আইন করা হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে সরকার সে সময় আইন সংশোধন করে। বিদ্যমান আইনে চালকের ভুলে দুর্ঘটনা হলে এক থেকে তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এ আইনটি খুবই দুর্বল এবং যাত্রীবান্ধব নয়। জানা গেছে, আইনটি যুগোপযোগী করার জন্য ২০০৭ সালে একটি কমিটি করেছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। আইনের একটি খসড়াও তৈরি হয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেটি আলোর মুখে দেখেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এরকম নানা অব্যবস্থাপনার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা এখন অন্যতম জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে রাষ্ট্রকে। বিশেষজ্ঞরা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং, নিয়ম না মানার প্রবণতা, দক্ষ চালকের অভাব, ভুয়া লাইসেন্সধারী চালক, একটানা নিদ্রাহীন গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং জনসচেতনতার অভাবকে দায়ী করেছেন।

অনেকেই বলছেন, অবিলম্বে রাস্তায় ডিজিটাল ক্যামেরা বসানো জরুরি। ক্যামেরা বসানো হলে ৫০ শতাংশ দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে তাদের ধারণা। এর যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, যখন ডিজিটাল ক্যামেরায় ধরা পড়বে আর চালকদের জরিমানা দেওয়া হবে তখন নিজ থেকেই সাবধানে গাড়ি চালাবেন চালকরা। এছাড়াও চালকদের নির্ধারিত বেতনভিত্তিক নিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার কথা বলেন অনেকে।

দুর্ঘটনা রোধে কথা কিংবা পরামর্শের তো অভাব নেই কিন্তু কে শুনে কার কথা! এসব ব্যাপারে গত ২৪ বছর ধরে বলে আসছি, সেগুলো না শুনছে সরকার, না শুনছে মালিকরা। তাই আমরা যারা এসব নিয়ে কাজ করি, তারা আসলে হতাশ। মালিকদের শক্ত হাতে ধরা দরকার। যে মালিকরা এ ড্রাইভারদের নিয়োগ দিয়েছেন সেই মালিকদের জরিমানা করা উচিত। কারণ তারা এসব অসভ্য ড্রাইভারদের নিয়োগ দিয়েছেন, এমনকি মালিকরা এসব ড্রাইভারদের কোনো ট্রেনিংও দেন না। ড্রাইভারদের হাতে গাড়ি তুলে দিয়েই দায়িত্ব খালাস।

মালিকরা রাস্তায় গাড়ি নামায় ব্যবসা করার জন্য, সেবা দেওয়ার জন্য নয়। তারা যদি কোনো একটা ইন্ডাস্ট্রি দিয়ে এ ব্যবসাটা করত, সেখানে সবচেয়ে অভিজ্ঞ লোকটাকে নিয়োগ দিতে চাইত, অথচ ড্রাইভার নিয়োগের সময় তারা যার-তার হাতে গাড়ি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছে। তাদের ভাবনাটা হলো, দুর্ঘটনায় পড়লে তো পাবলিক পড়বে, সে নিজে পড়বে না। ওদিকে গাড়ির ইন্স্যুরেন্স করা থাকে, তাই আর্থিক ক্ষতি নিয়েও কোনো ভাবনা নেই। এমন অবস্থায় সরকার কঠোর না হলে দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে না।

অনেক মালিক আশা করে বসে থাকেন, সরকার তার ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ দেবে। গাড়ি চালাবে আপনার অথচ প্রশিক্ষণের আশা করবেন সরকারের কাছে, এটা কেন? এ চিন্তা থেকে মালিকদের বেরিয়ে আসতে হবে।
যে কেউ যখন তখন রুট পারমিট নিয়ে রাস্তায় গাড়ি নামিয়ে দিচ্ছে। এতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক পুরো ঢাকার পরিবহন সিস্টেমকে ৫টি কোম্পানির আওতায় আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর তার এ স্বপ্নটিও শেষ হয়ে যায়।

বাস মালিকরা অনেক সময় রিকশা বা সিএনজির মতো দৈনিক ভিত্তিতে বাস ভাড়া দিচ্ছে। এভাবে বাস ভাড়া নিয়ে সে ভাড়ার টাকা ও তেলের খরচ তোলাসহ হেল্পারের খরচ এবং একজন ড্রাইভার তার নিজের লাভ তুলতে গিয়েই তো এত বেপরোয়া হচ্ছে।

বলাবাহুল্য, সড়কে এখন নৈরাজ্য চলছে। সংশ্লিষ্ট অনেকের মধ্যেই একটা খামখেয়ালিপনা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এত কিছুর পরও কারও কোনো বিকারও নেই, দুর্ঘটনাগুলো যেন হওয়ারই কথা। মৃত্যু হলে আমরা একটু নড়েচড়ে বসি, যেন মৃত্যু না হলে সেটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। ভোগান্তির সঙ্গে ছোটখাটো ঘটনাগুলো আমরা ধর্তব্যের মধ্যে আনছি না। ফলে থেমে থেমে ঘটছে হাত-পা হারানো ঘটনাগুলো। রাস্তায় নামতেই মানুষের মধ্যে ভর করে আতঙ্ক।

ঢালাওভাবে চালকের দিকে আঙুল তোলা ঠিক নয়। নেপথ্যে যে মালিকরা থাকেন তাদের অনেক গাফিলতির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। হয়তো সেটা পরোক্ষ কিন্তু অগুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই এসব দুর্ঘটনার পর মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা উচিত। শাস্তি হিসেবে জেলের পাশাপাশি জরিমানার ব্যবস্থাও করতে হবে।

মনে রাখা দরকার, অনেক সময় যাত্রীর অসাবধানতার জন্যও দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। যদি অন্য গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে কিংবা চালকের কোনো প্রকার গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে চালককে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। এমনকি ওই দুর্ঘটনাকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বিবেচনা করে এক সময় আমরা এ ব্যাপারে চালকের মৃত্যুদণ্ডের কথাও বলেছিলাম।

মালিকের কথা যখন আসে তখন বাদ যায় না সরকারের কথাও। আমাদের পরিবহন মালিকরা যেমন আন্তরিক নন, তেমনি সরকারও আন্তরিক নয়। পরিবহন শ্রমিক আর মালিকদের মধ্যে একধরনের যোগসাজশ থাকে, তাই অনেক সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারের দায়িত্বটা এখানেই, তাদের ব্যাপারে আরও কঠোর হতে হবে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়াও যেসব সংস্থা গণপরিবহনকে নানাভাবে তদারকি করে তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে।

কেকে/এএস

"We want Justice for Adnan Tasin"

Re: কী হচ্ছে গণপরিবহনে

পড়লাম , বেশ মনোযোগ সহকারেই । বিশেষ করে যাত্রীর অসাবধানতার কারণে দূঘর্টনার বিষয়টি তুলে ধরার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ । দোষ না থাকলেও বেচারা ড্রাইভার গণধোলাই এর শিকার ।

সমস্যার মুলে গিয়ে সমাধান এর কথা কিংবা কাজ আমরা কেউই করছিনা ।

তন্দ্রার ভেতরে আমি শুনি ধর্ষিতার করুণ চিৎকার,
নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশ
মুন্ডহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বিভৎস্য শরীর

Re: কী হচ্ছে গণপরিবহনে

বাসস্টেন্ডে দাড়িয়ে থাকা শিক্ষাথীর উপর গাড়ি উঠিয়ে দেওয়াকে যারা দুর্ঘটনা বলছে ,
এরা শুধু মুর্খ না! গন্ড মুর্খ।

"We want Justice for Adnan Tasin"