টপিকঃ অপ্সরা: দুর্গের দরজা (পর্বঃ ০১)

এক

মস্ত একটা ফটক। চারদিকে কুয়াশার মত একটা পরিবেশ। আবছা আবছা ভাবে দরজাটা চোখে পড়ছে কেবল। ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল তন্ময়। ভাল করে তাকাল দরজাটার উপর, নিচ, ডানে বামে। একপাশে একটা ফলক চোখে পড়ল তার। আর সেটাতে দুর্বোধ্য ভাষায় কি যেন চোখে লেখা। খুব কাছে গিয়ে পড়তে চেষ্টা করল ও। তামা দিয়ে খোদাই করা লেখাটা পড়া গেলনা। আগে কোথাও এই ভাষার কোথাও দেখেছে বলে মনে হয়না। ফলকটাতে আরেকটু ভাল করে নজর দিতে আরেকটা জিনিস চোখে পরল তন্ময়ের। একটা অদ্ভুত চিহ্ন। অনেকটা বাঁকানো ধনুকের মতো দেখতে। তীরের ফলার মত কিছু একটা পেঁচিয়ে আছে ওতে।প্রত্যেকটা তীরের ফলার মুখই বা দিক করে পেঁচানো। তারমানে এগুলো কি ওকে বাঁদিকে যেতে নির্দেশ করছে?
কিন্তু বাঁদিকে তাকিয়ে ঘন কুয়াশার আস্তরণ ছাড়া আর কিছুই চোখে এলোনা ওর। ফলক থেকে চোখ সরিয়ে এবার দরজার ফিকে নজর দিল ও।
একটা হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল দরজাটায়। কেপে উঠল ও। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা একটা স্রোত শরীরটাকে নিমিষেই অবশ করে দিতে চাইল যেন।
ভয় পেয়ে দ্রত হাত সরিয়ে নিল ও। পায়ের নিচের মাটি যেন উলটে গেল হঠাৎ। সাদা কুয়াশার চাদর মিলিয়ে গিয়ে স্থান করে নিল একরাশ অন্ধকার। তারপর খানিকটা সময় লাগল অন্ধকারটা চোখে সহ্য করে নিতে। নিজেকে শোয়ার ঘরে আবিষ্কার করল তন্ময়। এই কনকনে শীতের রাতেও প্রায় ঘেমে গোসল করে ফেলেছে যেন। গলা শুকিয়ে কাঠ। বিছানার পাশের একপেয়ে টেবিলের উপর রাখা জগ থেকে পানি নিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিল সে। অদ্ভুত এই স্বপ্ন টা প্রায়ই তাকে তাড়া করে ফিরছে। শুধু একদিন না, আবার রোজওনা। হঠাৎ হঠাৎ। কিন্তু অই পর্যন্তই। দরজার ওপাশটা এখনো তন্ময় এর কাছে অপরিচিত।

বাকি রাতটা জেগে কাটাল তন্ময়। ভোর ভোর উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। টুথব্রাশ মুখে চেপে বেরিয়ে এলো বাইরে। চিলেকোঠার ঘরে থাকার এই একটা মজা। ঘর থেকে বেরোলেই ছাদ। ধুলোবালি মাখা, হাজারো সমস্যার ডিপো ঢাকাকে ছাদের এককোনায় দাঁড়িয়ে এই ভোর বেলায় দেখলেই মনেই হয়না যে, ব্যাটা এত ডানপিটে। কেমন চুপচাপ চারদিক। বেশ কুয়াশা পড়েছে আজ। তাই ছাদে দাঁড়িয়ে পুরো শহর দেখার জো নেই আজকে। নিচে রাস্তায় একদল রিকশাচালক বোধ হয় বোধহয় শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে কাগজ কুড়িয়ে আগুন জেলেছে। গ্রামের কথা মনে পড়ে তন্ময়ের। রান্না ঘরে মা যখন শীতের সকালে উঠে রান্না চড়াত, সে মক্তব বাদ দিয়ে বসে যেত উনুনের পাশে। মা প্রায় দিনই জোরাজোরি করেও সরানো যেতনা তাকে। ফলে মক্তবে সে নিয়মিত ছাত্র ছিলনা কোনদিন। ছেড়া ফাড়া কায়দা হাতে নিয়ে ভাবুক চোখে বাইরে তাকিয়ে থাকা তন্ময়কে প্রায় দিনই হুজুরের বেতের কোপানলে পড়তে হতো।
হুজুর বেতের শাসানি সেরে পড়া দিয়ে যেতেন, আলিফ, বা, তা , ছা; পড় জোরে জোরে পড়।
তন্ময় বার পাঁচেক বেশ উদ্যমের সাথে পড়া শুরু করলেও সেই দম ফুরাত একটু পরেই। ফলে হুজুরের আওড়ে দেয়া পড়া ভুলে সে বিভোর হয়ে পড়ত আজ বিকেলে গোল্লাছুট খেলাটা হবে কিনা।
স্কুলের লেখাপড়ায় ও নেহাত খারাপ ছিলনা। যদিও রোল নম্বর দশ এর কোঠার বাইরেই থাকতো সবসময়।
তবে খেলাধুলায় ও মোটেই পটু ছিলনা। প্রায়ই সাধের গোল্লাছুট থেকে তাকে বাদ পড়তে হতো। যেদিন সুযোগ পেতো সেদিন হতে হতো “দুধভাত”। অর্থাৎ খেলায় তার কোন মূল্যই নেই।
তাই এই গোল্লাছুট আর হুটোপুটির বাইরে ওর আলাদা একটা জগত ছিল।
মোল্লাদের বড় পুকুরটা পেরোলেই ওপাশে মস্ত জঙ্গলের শুরু। তার মধ্যে দিয়ে একটা চিকন রাস্তা চলে গেছে বড়ই তলার হাটের দিকে। অন্যটা জঙ্গলের গহীনে। অবশ্য এটাকে ঠিক রাস্তা বলা যায়না। ঘন ঝুপ ঝাড় এলাকাটা পেরোলে লতা পাতা দিয়ে ঘেরা প্রায় ধ্বংস একটা পুরনো মসজিদ চোখে পড়ে। সেলিমদের সাথে গুলতে মারতে এসে প্রথম এটা চোখে পড়ে তন্ময়ের। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি, তাছাড়া আধভাঙ্গা দেয়ালে উঠে পা ছড়িয়ে বসে জঙ্গলের নিঃসঙ্গতার অদ্ভুত একটা আকর্ষণ খোজে পেত সে। কখনো কোন ভয়ার্ত পাখি কিংবা অজ্ঞাত পশুর আর্তনাদ ছাপিয়ে যেত জঙ্গলের এপার থেকে ওপার। ও শিউরে উঠতো কিন্তু পালিয়ে যেতনা কখনই।
মাঝে মাঝে ওর কানে বাজতো ছনছন করে ছুটে চলা নুপুরের শব্দ। ও কান পেতে থাকতো বাতাসে। কিন্তু ঠাউরে উঠার আগেই মিলিয়ে যেত যেন কোথায়।


এইচ এস সি শেষে প্রথম ঢাকায় পাড়ি। গ্রামের বাড়িতে তার ঢাউস সাইজের রুম ফেলে যখন সে এই শহুরে ঘিঞ্জি এলাকার চিলেকোঠার ঘরটাতে পনেরো হাজার টাকা ভাড়ায় উঠল তখন অবশ্য খানিকটা মূষরে গিয়েছিলো, চিরকাল গ্রাম অবধি পৌঁছানো চকচকে ঢাকাকে বাস্তবের সাথে মিলিয়ে নিতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল তার। হুটোপুটি করে বাসে উঠা, ঘন্টা ঘন্টা জ্যাম ঠেলে বাসে উঠা ছিল অসহ্যর চরম সীমার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
অবশ্য অদ্ভুত একটা অনুভূতি প্রথম এই চিলেকোঠায় এসে। প্রথমবারের মতো ও ভালো করে চিনতে পারলো অদ্ভুত সেই নুপুরের শুব্দটা। যেন দিগন্তের পর দিগন্ত আর গ্রামের পরের গ্রাম পেরিয়ে কত দূর সেই মোল্লবাড়ির পুরনো মসজিদের ভাঙ্গা ইটের ফাক গলিয়ে ওর কানে এসে লাগছে শব্দটা। একটানা, রিন রিনে সে সুর অনেকটা সময় তাকে অভিভূত করে রাখলো বেশ খানিকটা সময়। তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল যেন কোন অজ্ঞাত অজানা দেশে, যেখান থেকে সে এসেছিল।

তন্ময়ের জন্য বরাদ্দ চিলেকোঠার এই ঘরটা স্টোর রুম হিসেবেই ব্যাবহৃত হত আগে। জমে যাওয়া ময়লার স্তর পরিষ্কার করতে অন্তত বার তিনেক ধুতে হয়েছিল মেঝেটাকে। ময়লায় পুরো একাকার হয়ে যখন বেরোত তখন পাশের বাড়ির রেলিং এ দাঁড়িয়ে খিক খিক করে একটা মেয়েকে হাসতে দেখতো প্রায়ই। মাঝে মাঝে বিরক্ত হত। এই মেয়েটাকি সময় ধরে এসে দাড়িয়ে থাকে নাকি?
আবার ভালোও লাগতো, সাদা জামা গায় উন্মুক্ত চুলের হাস্যজ্জল রমণীটি দেখতে নেহাত খারাপ না। ভালোই বলা যায়।
একবার তন্ময় অনেকটা কৌতূহলী হয়েই বলেছিল,
কেমন আছেন?
ওপার থেকে কোন উত্তর আসেনি। খানিকটা সময় তন্ময় চিন্তিত হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা আদৌ মানুষ নাকি মূর্তি। কিন্তু একটু পরেই মেয়েটা নরেচরে উঠেছিল। দ্রুত পায়ে হেটে ঘরে ঢুকে, পর্দা টেনে দিল হুট করে। এরপর বেশ কয়েকদিন ও মেয়ের ছায়াও দেখা গেলনা। ইউনিভার্সিটিতে তন্ময়ের ভয়ঙ্কর সময় যাচ্ছিল তখন। ক্লাস প্রজেক্ট রেখে রাতদিন মুভি দেখা আর ড্রয়িং এ কাটানোয় এখন রাজ্যির এসাইনমেন্ট হার হিরহিরে শাঁকচুন্নির মতো এসে ভর করেছে ঘাড়ে। ভরটা বেশিই হয়ে গেছে। কিছুটা তিতলির ঘাড়ে ট্রান্সফার করতে পারলে মন্দ হয়না।
তিতলি হচ্ছে ফার্স্ট সেমিস্টারের তুখোর ছাত্রী। ওকে শুধু বাচাল বলা ভুল হবে, তন্ময়ের ভাষার ও হচ্ছে ‘ভয়ংকর রকম বাঁচাল’। তাই ওর ঘাড়ে এসাইনমেন্টের বোঝার কিয়দংশ চাপানো খুব একটা সহজ না।

ভার্সিটির লাউঞ্জে ঘুরিয়ে পেচিয়ে এসাইনমেন্টের কথাটা তুলতেই, তিতলি বলল,
এ আর এমনকি! কিন্তু ভাইয়া তুমি কিন্তু আমার ড্রয়িংটা এখনো কমপ্লিট করে দাওনি। সেই মাস খানেক আগে একবার বলেছিলে অর্ধেক করেছো তারপর তো আর তোমার দেখাই নাই।
তন্ময় এই ভয়টাই পাচ্ছিল। অর্ধেক কি একটা আচরও পরেনি ঐ ক্যানভাসে।
ঃ হয়ে যাবে। এক্সাম শেষেই পাবি।
ঃ প্রমিস?
ঃ প্রমিস।
অল্পতে গোঁজামিল দিয়ে তন্ময় এবার উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু তিতলির কবল থেকে এত সহজে পার পাওয়ার কথানা।
ঃ উঠছ কই? বস, তোমাকে ভয়ানক একটা তথ্য দেয়ার আছে। বেশ কয়েকদিন ধরে তোমাকে খোঁজে হয়রান।
তন্ময় কাচুমাচু করে বলে, পরে বললে হয়না। একটু ব্যস্ত ছিলাম।
ঃ সেকি! তোমার এসাইনমেন্ট তো করে দিচ্ছি বললাম। বিষয়টা জরুরি। তোমার সেই স্বপ্নের ব্যাপারে।
এবার করে আগ্রহ ফিরে পেল তন্ময়।
ঃ তোমাদের ক্লাসের আতিক আছেনা? মোটকু, কাঁঠালের মত দেখতে যে। ওর কাছে একটা জিনিস দেখেছি?
ঃ কি?
তিতলি খানিকটা সময় চুপ করে রইল। এই মেয়ের অন্যতম একটা সমস্যা হচ্ছে এটা। কেউ তার কথায় আগ্রহ দেখালেই সে, ঐ কথা বলবে পিঁপড়ার গতিতে। কথার মাঝখানে ঘাড়টা হাল্কা বাকা করে বলবেঃ গেইস করো তো দেখি?
তন্ময়ের এতোদিন মনে হতো এই মেয়ের মাথায় হালকা সমস্যা আছে, আজকে মনে হলো হালকা নয়। পরিস্থিতি ভয়ানক। যেকোনদিন হেমায়েতপুরের পাগলা গারদে ভর্তি করে দেয়া যাবে। একটা ঝারি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ও, তখুনি তিতলি বলতে শুরু করলো,
সেইযে একটা সিম্বলের কথা বলেছিলে। তোমার ড্রয়িং খাতাতে যে একেছ, ধনুকের মত বাকা কিছুতে তীরের ফলার মতো পেঁচানো। ঠিক সেটার মতো দেখতে একটা তামার সিম্বল দেখেছি আমি ওর কাছে। ব্যাটা ওটাকে চাবির রিং হিসেবে ইউজ করতেছে।
ঃ তুই ঠিক দেখেছিস? তন্ময়ের কন্ঠে সন্দেহের স্বর।
তিতলি প্রতিবাদ করে উঠলো, মিথ্যা কেন দেখব। ল্যাবে ব্যাগ ফেলে এসেছিলাম। নিতে গিয়ে দেখি চাবির রিংটা পাশে রেখে মোটকুটা কাজ করতেছে। তুমি নিযে গিয়েই দেখতে পারো।
তন্ময় উঠতে যাচ্ছিল।
তিতলি বলল, ও, আরেকটা ইনফরমেশন। জিনিসটা আমার কাছে বেশ পুরনো বলেই মনে হয়েছে।
তন্ময় ফিরে বলল, পুরনো যে, কিভাবে বুঝলি?
তিতলি তেমনি ঘাড় বাকিয়ে পিঁপড়ার গতিতে চলে গিয়ে বলল, গেইস করো।
তন্ময়দের ল্যাব সাত তলায়। হুরমুর করে লিফটের কাছে এসে দেখে লিফট বন্ধ। অজ্ঞতা সিড়ির দিকে দৌড়াল ও। তেতলার সিড়ির মাথায় পৌছাতেই তন্ময়ের মনে হলো সিঁড়ির মাথায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে, পাশ কাটিয়ে উঠতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে পরে অবস্থা। কিন্তু সংঘর্ষ এড়িয়ে পেছন ফিরে দেখে সিঁড়ি একেবারেই শুন্য। এতো দ্রুত কারো সিঁড়ী টপকে চলে যাওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কি ভুল দেখলো। খানিকটা সময় চমকে দাড়িয়ে রইল ও। নিচে উকি দিয়ে দেখল যতদুর দেখা যায়। দুতলার সিঁড়ির একটা পাশ দখল করে আড্ডা দিচ্ছে কতগুলো ছাত্র/ছাত্রী। এছাড়া আর কিছুই চোখে পড়লনা।
বিষয়টা নিয়ে আপাতত আর মাথা ঘামালোনা ও। দ্রুত পায়ে ছুটলো সাত তলার দিকে।

ল্যাবে আতিককে পাওয়া গেলনা। সেকেন্ড সেমিস্টারের ক্লাস চলছিল। পেছনের দিকে বসে কাজ করছিল তন্ময়দের ব্যাচের কয়েকজন।
ওরা জানালো আতিক একটু আগেই বেরিয়ে গিয়েছে। তন্ময় অবাক হয়ে গেল। ও নিজের চোখে দেখেছে লিফট বন্ধ। সিঁড়ি দিয়ে কাওকে নামতে দেখেনি, তাছাড়া অমন হোমরা চোমরা আতিক ওর পাশ গলিয়ে নেমে যাবে এটা শুধু অবিশ্বাস্য নয় রীতিমত অসম্ভব!

এলিফ্যান্ট রোডের এই এই জায়গাটা থেকে ভার্সিটিতে যেতে গেলে সবচেয়ে ভয়ানক যে ব্যাপারটি ঘটে তা হচ্ছে ট্রাফিক জ্যাম। ঘণ্টা ঘণ্টা জ্যামে বসে পিষ্ট হওয়ার চেয়ে হাটাই উত্তম। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ফুটপাত ধরে হেটে চলে সে।
রাস্তার এক জায়গায় মস্ত জটলা বেঁধেছে। কি হয়েছে দেখার জন্য ভীর এড়িয়ে উকি দিল ও। একটা লোক পড়ে আছে, রক্তাক্ত হয়ে। এক্সিডেন্ট এখানে মামুলি ব্যাপার। না হলেই বরং অস্বস্তি লাগে কেমন। ঝটলা এড়িয়ে তন্ময় দ্রুত পায়ে এগোতে লাগলো। যে করেই হোক আতিক কে তাকে পাকরাও করতে হবে আজ। সাড়ে আটটার থিউরি ক্লাসটা মিস করে গেলেও এর সুমন পাল স্যারের এনিমেশন ক্লাসটা মিস করাটা আতিকের ধাতে নেই। কলাবাগান পেরিয়ে এসে তন্ময় হাত ঘড়ি দেখলো। আটটা চল্লিশ। ক্লাসে ইতোমধ্যেই দশ মিনিট লেট হয়ে গেছে। হাটায় জোড় লাগালো তন্ময়। তবে এগোনোটা দুস্কর। কোন একটা রাজনৈতিক মিছিল যাচ্ছিল। রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাথ পর্যন্ত পৌঁছেছে জনস্রোত। প্রকট ভিরে চলতে চলতে হুট করে এক জায়গায় থেমে গেল ও। কান পাতলো বাতাসে। চোখের ভ্রু কুচকে গেল। ভীরের ধাক্কা এড়িয়েও ও ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। একটা শব্দ। খুব পরিচিত। রিনরিনে একটা নুপুরের ঝংকার। থেমে থেমে কানে বাজছে। একবার ওর মনে হচ্ছে খুব কাছ থেকে পাচ্ছে শব্দটা। পরক্ষনেই মনে হচ্ছে শব্দটা আশপাশ থেকে নয় দুর থেকে আসছে, অনেক দুর থেকে। মুখ ফিরিয়ে তন্ময় চারপাশে শব্দের উৎস খোঁজতে শুরু করল। যখনই মনে হয় ঠিক অই জায়গা সে পেয়ে গেছে তখুনি যেন উৎসটা সরে যায়। হাজারো পায়ের ভিরে সেই কাঙ্ক্ষিত নূপুরের শব্দে ছুটে চলা পদ্মচরনের খোঁজে তন্ময় মরিয়া হয়ে উঠল। ভীরটা যখন আস্তে আস্তে ক্রমশ বেড়ে চূড়ান্ত রুপ ধারন করেছে। ধাক্কায় হুমরে পরলো তন্ময়। আর ঠিক তখন। হাজারো পায়ের ভীরে তার চোখে এলো ব্যপারটা। এক জোড়া গোলাপি পা, নূপুরের ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে। অপার্থিব জ্যোতি যেন অন্য পায়ের ভীর থেকে এই পা’টাকে আলাদা করে দিচ্ছে। খানিকটা সময়ের জন্য তন্ময়ের সামনে হাজারো পায়ের ভীর উধাও হয়ে গিয়ে এগিয়ে এলো একরাশ দূর্বাঘাস আচ্ছাদিত একটা সবুজ মাঠ। হুরমুর করে গায়ে এসে ভীর করলো অপার্থিব জগতের বাতাস। বাতাসের বুকে ভর কর অজানা কোন ঝর্ণার কোল জলকণারা ছুটে এসে আলতো করে ছুয়ে গেলো ওকে। কাঠের মূর্তির মতো শুক্ত হয়ে পরে, দূর্বার ফোকর দিয়ে দেখতে লাগলো, সে পদ্ম যুগল তাকে যেন ইশারায় অদ্ভুত , অজানা, অপার্থিব জগতের সন্ধান দিয়ে যাচ্ছে।অদ্ভুত একটা ছন্দে সামনে পেছনে ডানে বামে চঞ্চল পদ্ম যুগলের ভ্রমন, আর সেই তালে নূপুরের ঝংকারে সৃষ্ট ব্যাখাতিত সুরের মূর্ছনায় ও অভিভূত হয়ে পরে রইল। সময় পেরোতে লাগলো।ঘড়ির কাটা যেন ছুটতে শুরু করল উল্কার বেগে। তন্ময়ের মনে হলো সময়টাকে থামিয়ে দেয়া প্রয়োজন। বড্ড দুর চলছে। একটা সময় ক্রমশ পায়ের দূরত্ব বাড়তে লাগলো। কমতে লাগলো নুপুরের ঝংকার। তারপর ক্রমশ অস্পষ্ট হতে হতে একসময় শুন্যে মিলিয়ে গেলো। একরাশ হতাশা ঝেকে ধরলো ও কে। সেই সবুজ মায়াবী প্রান্তর মিলিয়ে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠলো তাকে ঘিরে থাকা কৌতুহলী এক ঝাক মানুষের চোখ। আর ও রক্তাক্ত অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করলো রাস্তায়।



দুই

হুট করেই গায়ে জ্বর এসে পড়লো নিপুর। ভার্সিটি থেকে এসে গোসল করে বেরোতেই মনে হলো খুব ক্লান্ত লাগছে। একটু পরেই গা কেমন ম্যাজম্যাজ করতে শুরু করল। রাতে প্লেটে ভাত নিয়ে আর খেতে ইচ্ছে হলোনা। বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।
মা বললেন, কি রে শরীর খারাপ নাকি?
নিপু উত্তর দিলোনা। ভয়ানক রকম চোখ জ্বলছে ওর। বিছানায় গিয়ে কাথামুড়ী দিয়ে শোয়ে পড়ল। প্রচণ্ড রকম শীত ঝেঁকে ধরল ওকে। জ্বর টা বেশ আটগাঁট বেঁধে আসছে বলেই মনে হচ্ছে। নেমে দু কদম হাটলেই ড্রয়ারে প্যারাসিটামল পাওয়া যাবে। মায়ের ঘরও পাশেই। ডাকলেই মা এসে দিয়ে যাবে। একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নিলে ভালো হত, কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করলোনা ওর।মনে হলো জ্বরটা আসলেই যেন ভালো লাগবে। যেন জ্বর আসলেই ভালো কিছু ঘটবে একটা কিছু। নিপুর এই মুহূর্তে মোনা’পুকে জরিয়ে ধরে ঘুমোলে সবচেয়ে ভালো লাগতো। এই কদিন আগেও এক বিছানায় শোতো ওরা দু বোন। কিন্তু ইদানীং মোনাপুর পাগলামিটা বেড়েছে। আগে এই সময়টা চুপ করে বসে থাকতো। একা একা নিজের চুল টানতো। কেউ ডাকলেই স্বাভাবিক হয়ে যেতেন। হাওমাও করে কাঁদতে কাঁদতে দুর্বোধ্য ভাষার বুলি আওরাতেন। কিন্তু আজকাল হয়ে উঠেছেন অনেকটা হিংস্র।আশপাশে যা পান ছুরে মারেন। পাশে কাওকে পেলে গলা টিপে মেরে ফেলতে চেষ্টা করেন। মাঝখানে দুএকবার বেলকনি থেকে লাফিয়ে পড়তেও গিয়েছিলেন। তাই বাবা ভয় পেয়ে পাশের ঘরে তালা দিয়ে রেখেছেন ওনাকে। মাঝ রাত্তির হতেই ভয়ানক হই হট্টগোল বাঁধিয়ে দেন। শেকল ধরে টানা টানা করে হাত পা রক্তাক্ত করে ফেলেন একেকদিন। ক্ষত পেকে গিয়ে ঘা হয়ে যায়। নিপুর মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে শেকল খুলে দিতে মোনা’পুর। যেখানে ইচ্ছা সেখানে চলে যাক ওনি। চোখের সামনে ধুকে মরার চেয়ে ভালো অন্তত।

মোনাপু নিপুর আপন বোন নয়। নিপুর বয়স যখন দেড় দুই বছর তখন একদিন মা দরজা খোলে দেখেন টুকটুকে একটা মেয়ে বসে আছে দরজার সামনে। অদ্ভুত মায়াকারা চোখ আর সারুল্যে মাখা মুখ দেখে মা কোলে তুলে নিলেন। বাবা আশেপাশের এলাকায় মাইকিং করলেন। মসজিদে মসজিদে ঘোষনা দেওয়ালেন। পুলিশে খবর দিলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলোনা। পুলিশ তাদের জিম্মায় নিতে চাইল, এতিমখানা থেকে খবর পেয়ে লোক এলো। মা দিলেন না, বললেন এ আমার আরেক মেয়ে। আমার মেয়েকে আমি কোথাও দেবনা।
মোনা’পুর বয়স তখন দু আড়াই এর বেশি নয়। সুতরাং দুবোন একিসাথে বড় হতে থাকলো। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি সব একসাথে। বয়সের পার্থক্য বেশি না থাকলেও মোনা’পু ছিলেন নিপুর অভিভাবকের মত।
নিপু স্কুল থেকেই লেখাপড়ায় ছিল লবডঙ্কা। মোনাপু ছিল ঠিক ওর বিপরীত। ওনার লেখাপড়ার পেছনে বাবার খুব বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়নি। সেই ক্লাস ফাইভ থেকে শুরু। এরপর সরকারী বেসরকারি হেন কোন বৃত্তি নেইযে মোনাপু কব্জা করতে পারেননি। ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড সেমিস্টার পর্যন্ত সব ঠিক ঠাকই ছিল। মোনাপুর সমস্যাটা শুরু হতে থাকে থার্ড সেমিস্টারের শেষ দিকে। একদিনে রাতে নিপু ঘুম থেকে উঠে দেখে মোনাদি খিল খিল করে হাসছে। হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছে বিছানায়। ও প্রথমে ভাবলো হয়তো মজার কোন স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু আর যাই হোক এই রকম খিলখিলে হাসিটা ঠিক যেন মোনাপুর বৈশিষ্টের মধ্যে ঠিক পড়েনা। রাশভারি না হলেও ওনি ছোটকাল থেকে থেকেই অনেকটা গম্ভীর থাকতেন। ভয়ানক রসিকথায়ও যেখানে নিপু হেসে গড়াগড়ি দিত তখন মোনাপু বড়জোড় মুচকি হাসতেন। সুতরাং নিপু ওনাকে ওরকম হাসতে দেখে বেশ অবাকই হউএ গিয়েছিল। কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখতেই চমকে উঠলো নিপু। বরফের মত ঠান্ডা হয়ে আছে দেহ। এক মুহূর্তের জন্য নিপুর মনে হলো এ যেন মোণাপু নয়। এ যেন অন্যকেউ। কোন মৃত লাশ যেন মোনাপুর বেশে এখানে বসে আছে।
নিপু ভয়ে ডাকল, মা ... মা... বাবা...
একপলকের মধ্যে নিপুর মনে হল ও কোন দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে যেন এইমাত্র জাগল।
পাশ থেকে নিপুদি বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বললেন, কিরে কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছিস নাকি? ভয় পেয়েছিস?
পাশের ঘর থেকে মা বাবা ছুটে এলেন। লাইট জ্বালানো হলো। নিপুর মনে হলো ও সত্যিই স্বপ্ন দেখেছে।
কিন্তু ভুল ভাঙ্গতে বেশি সময় লাগলনা। ধীরে ধীরে মোনাপুর পাগলামো সবার নজরে আসতে শুরু করলো। একদিন মা দেখলেন মোনাপু বেলকনিতে দাড়িয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় কার সাথে যে কথা বলছে আর একটু পরপর হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
বাবা ভয় পেয়ে ডাক্তার নিয়ে এলেন। ডাক্তার কোন শারীরিক কিংবা মানুষিক কোন ধরনের রোগই পেলেন না। তাছাড়া এমনিতেও মোনাপুর চলাফেরা স্বাভাবিকই ছিল।
ধীরে ধীরে অবস্থার অবনতি হতে শুরু। ক্রমশ অস্বাভাবিকতা বাড়তে থাকে। প্রথমে জিনিস পত্র ছুড়ে মারতেন। তারপর শুরু করেন নিজের উপর অত্যাচার। সবসময় চুল এলোমেলো করে ঘরের অন্ধকার কোনে বসে থাকা শুরু করলেন। পাড়া প্রতিবেশী বলা বলি শুরু করলো যে আপুর উপর নাকি জীনের আছর পড়েছে। বাবা মৌলভি থেকে ওঝা, মানসিক ডাক্তার থেকে সাইক্রিয়াটিস্ট সব ভেজে ফেললেন। মোনাপুর মধ্যে কোন পরিবর্তনই দেখা গেলনা। শেষ মেষ বাবা হাল ছেড়ে দিলেন। তবে মোনাপু যে সবসময় পাগলামি করেন তা নয়। মাঝে মাঝে মাস খানেকের জন্য একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে যান। ভার্সিটিতে যান, সবার সাথে কথা বলেন, নিয়মিত পড়াশোনায় মনযোগ দেন। যেন কিছুই হয়নি, তিনি যেন সবসময়ই খুব স্বাভাবিক। পাগলামির কথা জিজ্ঞেস করলে গম্ভীর হয়ে যান। উদাস চোখে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকেন। নিপু লক্ষ্য করেছে, অইসময় ওনার চোখের এক কোনে অশ্রু ছলছল করে।
তাই, এখন আর কেউ এসব বিষয়ে কোন প্রশ্ন করেনা।


পুরো রাতটা এক ঘুমে কাঁটালো নিপু। এমনিতে প্রতি রাত্রেই মোনা’পুর চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে যায় ওর,আজ ভাঙ্গেনি। আজ কি তবে মোনা’পু চিৎকার করেনি! নাকি ও এতোটায় গভির ঘুমে ছিল যে শুনতে পায়নি।
জ্বরের প্রকোপ এখন পুরোপুরি সারেনি। চোখ বন্ধ করে বিছানায়ই পড়ে রইল ও। একবার টের পেল মা এসে কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
নিপু মাকে জিজ্ঞেস করে, মা মোনা’পু কি ভালো হয়ে গেছেন?
কিছুখন চুপ থেকে জরানো গলায় মা বললেন, কাল রাতেও অনেক হৈ চৈ করেছে। দেয়ালে ঠুকে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে। তোর বাবা ওষুধ লাগাতে গিয়েছিলেন, ওনার দিকে বই ছুড়ে মেরেছে।
নিপুর মনটা ভয়ানক খারাপ হয়ে গেল। আর কোন কথায় বললনা ও। নিপু এই প্রসঙ্গটা ভুলতে চাইল। এই জন্য অন্য কিছু নিয়ে ভাবা দরকার।


গতকাল রাতে নিপু একটা ভারি চমৎকার স্বপ্ন দেখেছে। অদ্ভুত একটা স্বপ্ন। নিপু ভাবলো স্বপ্নটা নিয়েই চিন্তা করা যাক। ছোটবেলা থেকে নিপু শুনেছে তার মেমোরি খুব দুর্বল। রাতদিন পড়েও সে পরীক্ষায় টেনে টুনে কোনমতে পাশ করত।
গ্রামে থাকতে দাদু প্রায়ই মাকে বলতেন, “ছোডটার মাথা বালানা। বিয়া দিয়া দাও”। এই “মাথা বালানা’র” কারণেই হোক আর যে কারণেই হোক স্বপ্ন দেখার পর সকাল বেলা কিছুই মনে থাকেনা ওর। শুধু মনে হয়, “স্বপ্ন দেখেছি”। “কি দেখেছি” তার রেশও মনে থাকেনা। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে গতকাল রাতের স্বপ্নের কথা তার মনে আছে। বেশ ভালো করেই মনে আছে। প্রকাণ্ড একটা মাঠে সাদা ধবধবে শাড়ি পরে বসে আছে নিপু। তার পায়ে মোনাদির মত শেকল পরানো। তার ঠিক সামনে একটা দরজা। তার মনে হলো দরজার ওপাশে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার তীব্র ইচ্ছা হলো একবার গিয়ে দরজা খোলে ওপাশের মানুষটাকে দেখুক। কিন্তু পায়ের শেকলের কারণে নড়তেই পারলোনা। একবার মনে হল ওপাশের মানুষটা দরজায় ধাক্কাচ্ছে। ক্যাচ ক্যাচ করে একটা মৃদু শব্দ হল। একটা পাখির ঝাঁক কিচির মিচির করে উড়ে গেল। নিপু অবাক হয়ে লক্ষ করলো এখানের আকাশ নীল নয়। গাঢ় গোলাপি। প্রকাণ্ড মাঠটার একপাশে অদ্ভুত সুন্দর একটা ঝরনা ঝরছে কলকল করে। স্বচ্ছ সে পানির জলে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত সুন্দর একটা হরিণ সদৃশ প্রাণী। মুখটা কেমন অদ্ভুত মায়াবী। নিপু হাত বাড়িয়ে ডাকল, আয় আয়। ওর মনে হল প্রাণীটা যেন খিলখিল করে হেসে উঠেছে।
আর তার পরেই সব শূন্য হয়ে গেল। চোখ মেলে দেখে সকাল।
দেড়টা নাগাদ বিছানা ছেড়ে উঠলো নিপু। জ্বর সেরে যাওয়ায় মনে হলো শরীরটা যেন হঠাৎ করে অনেক হালকা হয়ে গেছে। মোনা'পুর ঘরে উকি দিতে দেখল, মোনা’পু বেশ স্বাভাবিকভাবেই বসে আছে। উকি দিতেই মোনাপু ডাকলেন। নিপুর গাটা কেমন ছমছম করে উঠল হঠাৎ। এই অনুভূতিটা নতুন। আগে এরকম কখনও হয়নি। এমনকি বড্ড পাগল অবস্থার সময়ও ও মোনা’পুর সাথে অনায়াসে রাতে এক বিছানায় শোয়েছে। একবার তো মোনা’পু ওকে গলা টিপে মেরে ফেলেইছিলো প্রায়, তখনো এরকম লাগেনি।
ঃ ক্লাস নেই আজ তোর?
মোনা’পু বেশ স্বাভাবিকভাবেই বললেন।
ঃ ছিলো…রাত থেকে জ্বর তাই যাইনি।
উত্তর দিতে গিয়ে কেমন গলাটা কেপে উঠলো ওর। মোনা’পুর সামনে রীতিমত অস্বস্তি বোধ করছে নিপু। কোনরকমে পালাতে পারলেই যেন বাচে।
মোনা’পু কপালে হাত রাখলেন।
ঃ কই জ্বর তো নেই!
নিপু কি বলবে হঠাৎ যেন গুলিয়ে ফেলল। এবার বুঝতে পারল, ও ভয় পাচ্ছে। প্রচণ্ড একটা ভয় তাকে হঠাৎ তাড়া করে ফিরছে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে সে ভয়টা কিসের সেটা নিপু বুঝতে পারছেনা।
মোনা’পু নিপুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, শিকলটা একটু খুলে দিবি? বেলকনিতে যাব একটু!
নিপু একবার পায়ে পেঁচানো শেকলের তালার দিকে তাকালো। তারপর মুন আপুর মুখের দিকে তাকালো ফিরে। হিংস্রতার কোন ছাপ নেই ও মুখে।
শেকলের চাবি থাকে মায়ের কাছে। মোনাপুর ঘর থেকে বেরিয়ে একবার উকি দিল মা কোথায় দেখতে। রান্নাঘরে মা রান্নাবান্নায় ব্যাস্ত। এই সুযোগ। এক দৌড়ে নিপু ঢুকে পড়লো মায়ের রুমে। ড্রয়ারে রাখা কাপড়ের নিচে লুকোনো থাকে মায়ের চাবির গোছা। খোঁজে খোঁজে বের করল সেটা। খানিকটা সময় দাড়াল, ভাবল কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা। তারপর দ্রত পায়ে বেড়িয়ে গেল রুম থেকে।