টপিকঃ ~~ চাঁদ হয়ে রবো আকাশের গায় ~~

তখন প্রায় মধ্যরাত্রি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। মেঘের গুরুম গুরুম আর ঠাণ্ডা ঠান্ডা হাওয়া। চাপা ফুলের মাদক মাদক গন্ধে ভেসে যাচ্ছে সব। 

আমাদের বাড়িটা দোতলা। ছাদে একটা ছোট ঘর। যার নাম চিলেকোঠা। আমি এই ঘরটাতেই থাকি। চিলেকোঠায় সাধারণত একটা ছোট জানালা থাকে। থাকে সোজা হয়ে দাড়ানোর মত জায়গা। এই ঘরে ওসবের বালাই নেয়।

আর সবার মত আমারো বৃষ্টি ভালো লাগে। কিন্তু একটু বেশি হলেই ঘরে পানি ঢুকে যায়। বিছানা গুটিয়ে পানির মধ্যে চুপচাপ বসে থাকতে হয় তখন। আমার বিছানা বলতে দুটি কাথা। একটা গায়ের নিচে আরেকটা গায়ের উপরে।
মনেপ্রাণে প্রার্থনা করতে থাকি বৃষ্টি থেমে যাওয়ার জন্যে।
কিন্তু আমার প্রার্থনা তিনি কখনো শোনেননি।
বাবা বলতেন, "মন থেকে ডাকবি। চোখ বুজে কাঁদার চেষ্টা করবি। একবার চোখের পানি গড়িয়ে যেতে পারলেই ব্যাস। দাবী আদায় হয়ে গেলো।" বলেই বাবা হো হো করে হেসে উঠতেন। আর বাকি সবাই পেচামুখ করে তাকিয়ে থাকতো তার দিকে। এটা বাবার মুদ্রাদোষ ছিলো। সব কথার পড়েই বাবা একফাইল হেসে নিতেন।

কান্নাকাটি করার জন্যে আমাকে খুব একটা কষ্ট করতে হতোনা। আমার চোখ দিয়ে কারণে অকারণে পানি গড়াতো। রুবি আপা বলতেন, অল্প আলোতে পড়ার জন্যে এমন হয়েছে। আমার ঘরটিতে কোন বিদ্যুৎ এর লাইন নেই। মা বলতেন, "চিলেকোঠায় আবার লাইট লাগানো। যত্তসব হ্যাংলামো।" সব কথার শেষে মা এই শব্দটা যোগ করতেন।

স্কুলের গার্ডিয়ান মিটিং। - "মা কাল স্কুলে গার্ডিয়ান মিটিং। শাইলা আপা তোমাকে যেতে বলেছেন।"
মা গজরাতে গজরাতে বলেন, "মাস না যেতেই গার্ডিয়ান মিটিং। পেয়েছি কি ওরা। মানুষের কাজকর্ম নেই? সবাই কি ওদের মতো সারাদিন ঘাস কাটে? যত্তসব হ্যাংলামো"

বৃষ্টির পানির সাথে আরো একটা বড় সমস্যা ছিলো।  খুব বেশি বৃষ্টি হলে শখানেক পাওয়ালা কিছু পোকা কিলবিলিয়ে বিছানায় উঠে আসতো। তখন আর শুয়ে থাকা সম্ভব হতোনা। প্রথম প্রথম ভয়ে আড়ষ্ট  হয়ে যেতাম। গা ঘিনঘিন করতো। পরে পরে গা সয়ে গেল। বৃষ্টির পানিতে পোকাগুলোরও হয়তো থাকার জায়গা নেই আমারি মতো। তাদেরকে জায়গা করে দিতাম। পানি বেড়ে গেলে আমি বিছানা গুটিয়ে চেয়ারে পা তুলে বসে থাকতাম। আর পোকাগুলো পানিতে ভাসতে থাকতো। একটা ভাঙা চেয়ার আর একটা টেবিল ছিলো আমার ঘরে। আসবাব বলতে এই।

শীতের দিনেও সমস্যার অন্ত ছিলোনা। ঘরে কোন জানালা নেই। তারপরো কেমন করে যে ঠান্ডা বাতাস আসতো তা আমার ছোট মাথায় ঢুকতো না। কাথাটা গায়ে মুড়িয়ে থর থর করে কাঁপতাম। আর সকাল হওয়ার প্রার্থনা করতাম। একসময় সকাল হতো। সূর্যি মামার টকটকে আলো ঘরটা গরম করে তুলতো। ঘুমের দেশে হারিয়ে যেতাম আমি। ঘুম যে এত মারাত্মক সুখের হতে পারে তা কেও কখনো কল্পনাও করতে পারবেনা।

ঘুমে কাদা হয়ে যাওয়ার একটু পড়েই মা এসে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিতো। করবেই না বা কেনো। স্কুলের সময় যে চলে যাচ্ছে।

তবে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কোন কালেই আমি ভালো ঘুমাতে পারতামনা। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর ছাদে অদ্ভুত এক শব্দ হতো। কখনো মনে হতো ফিসফাস কথার শব্দ, কখনোবা ইদুরের কিচকিচ। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকতাম আমি। হবোনাইবা কেনো? আমি তখন ছয় বছরের শিশু। কোনকোন রাতে এসবের মধ্যেই ঘুমিয়ে যেতাম।

ঘরের টুকিটাকি কাজ ছাড়া সারাদিন আমার করার মতো তেমন কিছু ছিলোনা। পাড়ার ছেলেমেয়েরা আমাকে কেও খেলায় নিতোনা। কেন নিতোনা তা অনেককাল পড়ে বুঝেছিলাম।
কাজ নেই তাই খই ভাজ। আমি পড়ার টেবিলে বসে বসে খই ভাজতাম। স্কুলের বইগুলো কোনটা দুবার কোনটা বা চার-পাঁচবার পড়া হয়ে যেতো আমার। ফলাফল ও তাই।

কিন্তু পড়ালিখা আর হলোনা। পঞ্চম শ্রেণীতে সরকারি বৃত্তি নিয়ে পাস করলাম। কেও অবাক হলোনা। সবাই জানতো এমনটাই হবে।
বড় স্কুলে ভর্তি হবো। মনটা খুব ছটফট করছিলো। আমাদের সময় সবাই হাইস্কুল কে বাংলা করে বড় স্কুল বলতো। কেন বলতো তা আজো জানিনা। কিন্তু মা বললেন, "হয়েছে হয়েছে আর পড়তে হবেনা। একটু লিখতে পড়তে পারলেই হয়। এত পড়ে কি হবে বাপু। যত্তসব হ্যাংলামো।"

মায়ের সব কথা আমরা সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিতাম। এটাও মেনে নিতে হলো। কিছু করার নেই।
আমার দিনগুলো আর কাটেনা। ঘরের কাজকর্ম শেষ করে চিলেকোঠায় উঠে চুপচাপ বসে থাকা।

প্রচণ্ড রকমের নিঃসঙ্গ মানুষরা কিছু ছেলেমানুষি খেলা খেলে। তাদের কিছু কাল্পনিক সজন থাকে। আমারো কিছু বন্ধু দাঁড়িয়ে গেল। ছাদের নীল অপরাজিতার সাথে প্রায় প্রতিদিন কথা হতো।
"কিরে সকালের নাস্তা হয়েছে তোদের?"
অপরাজিতা গাল ফুলিয়ে বলতো, "নাস্তা আর কি। ওই গামলা পানি ঢেলে দিয়ে গেছে গতকাল। এখনো পর্যন্ত কোন পাত্তা নেই কারো।"
আমি ওদের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে বলতাম, "রাগ করিসনে আমি এক্ষুণি পানি এনে দিচ্ছি।"
"তোমার একটা ব্যাপার আমার ভালো লাগেনা বাপু।"
আমি অবাক হওয়ার ভান করে বলতাম, "ওমা! আমি আবার করলাম?"
"এই যে তুই তুকারি করো। গাছ বলে কি আমাদের কোন মানসম্মান নেই?"
আমি কৈফিয়ত দিতে যাবো এমন সময় নিচ থেকে চেঁচামেচির শব্দ আসে। বাবা কখনো কখনো একদম ভোর রাতে বাড়ি ফেরেন। তখন চিৎকার চেঁচামেচিতে বাচা দায় হয়ে পড়ে।

আর খেলার মধ্যে ছিলো গনগনে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা। কতক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় তাই দেখতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু এই করে করে চোখের বারোটা বাজিয়ে ফেললাম। আমি তখন ছোট মানুষ। অত কি আর বুঝি।

রুবি আপার ঝুলোঝুলিতে এক বছর ঘরে বসে থাকার পর আমি আবার ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম। আদুভাই টাইপের কোন সমস্যায় পড়লাম না। কেননা বয়সের মাপে আমি যথেষ্টই ছোট ছিলাম।

একদিন কাচা রাস্তাটার ধার দিয়ে গুটিগুটি পায়ে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ করে খেয়াল করলাম, পৃথিবীটা যেন দুলে উঠলো। তারপর সূর্যিমামা ডুবে গেল টুপ করে। ভয়ে আমার কলজে শুকিয়ে গেলো। হাতরে হাতরে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছিলাম। একসময় রাস্তার ধারের বিলে পড়ে গেলাম।

কাদা পানিতে বসে ঘন্টাখানেক ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম। তারপর ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে কখন যে অচেতন হয়ে গেলাম জানিনা।

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি ঘরে। গায়ে তখনো কাদা লেপ্টে আছে। কিভাবে আমি ঘরে এলাম কে আমায় নিয়ে এলো অতসব প্রশ্ন মাথায় এলোনা তখন। আমি আগের মতো সবকিছু পষ্ট দেখতে পাচ্ছি এতেই খুশি। নাচতে নাচতে গিয়ে জামা কাপড়  ছেড়ে গোসল সেরে নিলাম।

সেই থেকে শুরু। হঠাৎ হঠাৎ পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যেত। ঘন্টা দুই এক থাকতো এইরকম। তারপর সব স্বাভাবিক। একটা ছোট বাচ্চা ধিরে ধিরে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে তা ঘরের কেও টেরি পেলোনা।

অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা একটা সাদা জবা ফুলের মতো ছিলাম আমি। কেন ফুটফুটে, তুলতুলে একটা ছোট শিশুর যত্ন কেও নেয়নি তা আজো আমার মাথায় ঢুকেনা।

আমার দিনগুলো যদিওবা কাটতো। রাত আর কাটতোনা। শীতের দিনে প্রচণ্ড ঠান্ডা আর বর্ষায় মেঝেতে একহাত পানি। দু-তিন দিন নির্ঘুম রাত কাটানোর পরে বর্ষার পানি উপেক্ষা করে মড়ার মতো ঘুমিয়ে পড়তাম কোন কোনদিন। পানিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে যেতাম। ঠান্ডায় থরথর করে কাপতে কাপতে ঘুম ভাঙতো।

অবস্থা এমন দাড়ালো যে ক্লাসেই ঘুমিয়ে পড়তে লাগলাম। আর বেদম মাড় খেতে লাগলাম মাষ্টারদের হাতে। চোখের নিচে ফুলে ফুলে বুড়ো মানুষের মতো হয়ে গেলো। উষ্কখুষ্ক একমাথা চুলে পাগলের মতো দেখাতে লাগলো আমাকে।
ভুলে গেলাম নিয়মিত গোসল করা। খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলো এলোমেলো।

খাওয়া বলতে এক থালা সাদা ভাতের সাথে এক টুকরো মাছ। আমাদের কি বড্ড বেশি অভাব ছিলো? তা আমি কিভাবে বলি। তবে মাঝেই মাঝেই আমাকে এটো আর বাসি খাবার খেতে হতো। মা বলতেন, "খেয়ে নে জাদু। এতগুলো ভাত নষ্ট হবে।"
অনেক কষ্টে গিলতাম বিশ্রি ভাতগুলো।

কলা আমার খুবি প্রিয় খাবার ছিলো। রান্নাঘরের বেসিনে মাঝে মাঝে কলার খোসা পড়ে থাকতো। কলার খোসায় একধরনের সাদা সাদা মোটা সুতোর মতো থাকতো। কিযে স্বাদ তা বলার মতোনা। তবে আমি সেগুলো লুকিয়ে খেতাম। আমার ছোট মনে কে যেন বলতো বেসিন থেকে কুড়িয়ে খাওয়া খুবি লজ্জার ব্যাপার। মাঝে মাঝে আপেল বা সফেদার একটু আধটু পেতাম। সবার চোখ এড়িয়ে মুখে পুড়ে দিতাম।

আমার কোন বন্ধু ছিলোনা। তবে শত্রুর অভাব নেই। স্কুলের এক মেয়ের হাতে প্রায় প্রতিদিন মার খেতাম। আমার কান্না তাকে এক পৈশাচিক আনন্দ দিতো। তার মাড়ের করণে প্রায় সারাবছরি আমার ঠোট ফাটা থাকতো। এই মেয়ের মাড় থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় আমি খুজে পেতাম না। কোন শিক্ষকের কাছে নালিশ দিলেই রক্ষা পেতাম। কিন্তু আমার মগজে সেই বুদ্ধি যে কেন আসেনি তা বলতে পারিনা। আরো নানাভাবে সে আমাকে অপদস্থ করতো। সবচেয়ে কষ্টে পরে যেতাম শীতকালে। কনভাবেই কাটা ছেড়া জায়গাগুলো শুকাতো না। রোদে রোদে বসে বসে শুকানোর চেষ্টা করতাম। খুব একটা লাভ হতোনা।
তার নাম ছিলো কাজল। আমার ছোট এই জীবনে তার খুব বড় এক ভুমিকা আছে।

আমার বিশ্রি চেহারা আর রোগা শরীর নিয়ে নানান কথা শুনতে হতো সবার কাছ থেকে। কেও কখনো যানতে চাইতোনা ফুটফুটে একটা বাচ্চা এমন বিশ্রি কেন হয়ে গেল। ক্লাসরুমের শেষের দিকের একটা বেঞ্চ ছিলো আমার বসার জায়গা। আমার পাশে পারতপক্ষে কেও বসতোনা। শিক্ষকরাও আমাকে খুব একটা পছন্দ করতোনা। স্কুলের রোল নাম্বার ওয়ান হওয়ার পরও কারণে অকারণে মাড় খেতাম। ব্যাতক্রম রুবি আপা। আমার জন্যে অদ্ভুত এক মমতা ছিলো এই মহিলার হৃদয়ে।

নির্ঘুম রাত, শিক্ষদের হাতে মাড়, সবার দুর্ব্যবহার, চুরি করে খাওয়া ফলের উচ্ছিষ্ট,  অপরাজিতার সাথে দিনভর গল্প একরকম ঘোরের মধ্যে কেটে যাচ্ছিলো আমার দিনগুলো।
আর মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ভয় বাসা বাধলো। পৃথিবীর সবকিছুকেই ভয় পেতাম আমি। ভয়ের রাজ্যে একা একা বেড়ে উঠছিলাম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বন্ধু বলতে ওই নীল অপরাজিতা। নির্ঘুম রাতগুলোতে আমার সাথে অপরাজিতার ঝোপটিও জেগে থাকতো। আমাকে সাহস দিতো।

- তারপর?
তারপরের ঘটনা সংক্ষীপ্ত। আমার বয়স যখন দশ তখন আমি পুরোপুরি অন্ধ। আমি অন্ধ হয়ে গেছি সেটা বুঝতে সবার দু-তিন দিন সময় লাগলো। এই প্রথম আমাকে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো।   ডাক্তার গম্ভির স্বরে গমগম করে অনেক কথাই বললো।
আমার ছোট্ট মগজে তার কিছু কিছু ঢুকলো আর কিছু কিছু ঢুকলো না। তবে একটা কথা স্পষ্ট শুনলাম, "এ আর বাচবে না।"
মরে যাবো আমি? মরার পরে মানুষ কোথায় যায়? সেখানে কি ঘুমানোর জন্যে নরম বিছানা আছে? সেখানে কি আমাকে কেও খেলায় নেবে?
(প্রথম পর্ব শেষ)

Re: ~~ চাঁদ হয়ে রবো আকাশের গায় ~~

ভাল লাগছে। পরের পর্বগুলি দিন। আর আপনাকে স্বাগতম  hug

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন অপেক্ষা (০৯-০১-২০১৮ ১১:৪৬)

Re: ~~ চাঁদ হয়ে রবো আকাশের গায় ~~

অসাধারণ গল্প  thumbs_up
ফোরামে স্বাগতম smile

ডিজিটাল বাংলাদেশে ত আর সাক্ষরের নিয়ম চালু নাই।সবটায় দেখি বায়োমেট্রিক।তাই আর সাক্ষর দিতে পারলাম না।দুঃখিত।