টপিকঃ বিজ্ঞাপন গুনতেও ভাল লাগত যখন !

ঝির ঝির করা সাদাকালো টিভিতে নায়িকা বলতে আমরা তখন কবরী, শবনম, শাবানা, সুচরিতা, দিতী, পপি এদেরকেই চিনতাম... ববিতা তখন মাঝে মাঝে রোমান্টিক ছবিতে অভিনয় করতো... এন্টেনা ঠিক করে পাড়ার ছেলেরা তাদের ছবি দেখত...
'দিপু নাম্বার টু' দেখে আমাদের তখন তারেকের জন্য খারাপ লাগতো... রহস্য নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম.. বুলবুল আহমেদের বাবার অভিনয় আজো মনে দাগ কেটে যায়...
তখন বাংলার শেষ নবাবের অভিনয় করে কালজয়ী হয়ে আছেন আনোয়ার হোসেন...
বিটিভির শুক্রবার বলতে শুধু বাংলা ছায়াছবি বুঝতাম...
চাষী নজরুল ইসলাম, আমজাদ হোসেন, জহিরুল হক, এরা অল্প স্বল্প ছবি বানাতো তখন..পোস্টারে এদের নাম দেখলেই হাউজফুল হয়ে যেতো...ছবিতে কে কে আছে তা জানা লাগতো না...এইসব পরিচালকের ছবি মানেই অন্য কিছু...
'অবুঝ মন' সম্পূর্ণ সাদাকালো ছবিতে রাজ্জাক শাবানা জুটি 'বাঁধনহারা' হয়নি. 'পুরস্কার' 'দায়ী কে' সবই সাদাকালো ছবি ছিলো.
আমরা এগুলোই দেখতাম...
সামাজিক, পারিবারিক ছবি বেশি নির্মাণ হতো তখন...পরিচালকরা আমাদের দেখিয়েছে 'আবার তোরা মানুষ হ' 'ওরা এগারো জন' 'আলোর মিছিল' 'সূর্যদীঘল বাড়ি' 'নয়নমণি' সব ই সামাজিক ছবি, পরিবার নিয়ে বসে দেখার মতো ছবি ছিলো... 'তিতাস একটি নদীর নাম', 'ধীরে বহে মেঘনা', সবই এখন 'হারানো সুর'...
'সীমানা পেরিয়ে' যৌথ প্রযোজনায় আমাদের ছবি বানাতে হতো না... হল কাপিয়ে গেছে রাজ্জাক, সালমান, কবরী... 'বাবা কেন চাকর' ছবির কথা বললে আজও অনেকে আফসোস করা করে.
ব্যাচেলররা ডিম খায়, কষ্টে থাকে, সেই 'ব্যাচেলর' দের ছবি করে গেছে ফেরদৌস...
আমরা 'শ্রাবণ মেঘের দিন' 'মনপুরায়' চঞ্চল ছিলাম...'নীল আকাশের নিচে' দাঁড়িয়ে 'অপুর সংসার' দেখেছি... সালমান শাহ 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' আজ ও কেউ ভুলতে পারে নি...'পথের প্যাচালি' হয়ে আছে সব...
রঙিন ছবি আসছে ৮০'র দশকে... রাজ্জাক কবরীর 'রঙিলা' ছবি খুব চলত.. পাবলিক ভালো মতোই গিলত ছবির কাহিনী.. 'কুসুমকলি', 'ওস্তাদ-সাগরেদ', 'লটারী', 'বৌমা', 'বারুদ', 'অন্ধবিশ্বাস', 'শিশমহল', 'বড় বউ', 'মেঝো বউ' দেখলাম...বিয়ের পর শ্বাশুড়ি খারাপ হলে তাকে 'দজ্জাল শ্বাশুড়ি' বলে হলে গিয়ে জানলাম...
'জ্বিনের বাদশা' ছবিতে এটিএম শামসুজ্জামানের চেয়ারম্যানের অভিনয় আজও মনে পড়ে...
মাঝে মাঝে হাসির চরিত্রে থাকা এটিএম এর পরে যার নাম আসতো তিনি ছিলেন দিলদার...
হাসানোর জন্য আমাদের দিলদার ছিলো... দিল দিয়ে হাসিয়ে গেলো মানুষ টা.. 'আব্দুল্লাহ' নামের ছবিতে দিলদার একক নায়কের ভূমিকার ছিলো...
ছবিতে মারামারি অ্যাকশন আনলো জহির রায়হান 'রংবাজ' ছবি দিয়ে.. শুরু হলো সামাজিক অ্যাকশন ছবি... ইয়া ডিসুম ডিসুম খুবই পরিচিত আওয়াজ ছিলো এফডিসিতে... আজমল হকের 'দোস্তি' ও তেমন ছবি ছিলো...মারামারিতে নায়ক রুবেল কে এক নামে সবাই চিনতো.. রাতে স্ত্রীর জন্য রক্ত আনতে বের হওয়া জসিম এফডিসির রাস্তায় ভালোই মারামারি করত...
আলমগীর, ওমরসানী, মান্না মারামারি শুরু করলো... ইলিয়াস কাঞ্চন মাঝে মাঝে মার খেতো...ওমর সানী সব চেয়ে বেশি মার খেয়েছে মৌসুমীর জন্য...
আর্টফিল্ম আমাদের খুবই কম আছে... 'ভাত দে' নামের ছবি 'চ্যালেঞ্জ' ছুড়ে 'দুরদেশ' 'দেশ বিদেশ' ইন্ডাস্ট্রি তে 'স্বাক্ষর' রেখে গেছে...
রাজনৈতিক ছবি বলতে একজনকেই বুঝতাম, পরিচালক কাজী হায়াত কে... তার ই পরিচালিত 'দাঙ্গা'য় 'ত্রাসের' রাজনীতি করে 'চাঁদাবাজ' হয়ে গেছে কিছু 'দেশপ্রেমিক'...
তখন দেওয়ান নজরুল, আজমল হুদা মিঠু, শহিদুল ইসলাম খোকনের মতো কিংবদন্তী পরিচালক সিনেমা জগৎ চষে বেড়িয়েছে... আমাদের ৭০'র দশক, ৮০'র দশক, ৯০'র দশক এর মুখে শুধু এইসব নাম ই থাকত... হিন্দি, ইংলিশ মুভি সিরিয়াল আমরা তখন চিনতাম ও না...
পাবলিক হলমুখী ছিলো... স্কুল, কলেজ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে হলে যেতো... মেয়েরা বোরকা পড়ে ছবি দেখতে যেতো...
রিভিউ দেখে কেউ হলে যেতো না... প্রতিটা পাবলিক ই একেক টা জ্বলজ্যান্ত মুভি রিভিউয়ার ছিলো...
ছবির সাথে সাথে গান গুলো আমাদের মনে গেঁথে আছে... 'ওরে নীল দরিয়া', 'হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস', 'বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না', 'আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার', 'একদিন মাটির ভিতর হবে ঘর'... কালজয়ী সব গান ছিলো আমাদের...
আমাদের শাবানার সেলাই মেশিন ছিলো... আলমগীরের গার্মেন্টস ছিলো... আমাদের হুমায়ূন আহমেদের '৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত' ছিলো...
'দারুচিনি দ্বীপে' আমরা হারিয়ে যেতাম... 'আমার বন্ধু রাশেদ' যেভাবে দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে হারিয়ে গেছে... ঠিক সেভাবেই...
এখন আর হারাতে ইচ্ছে করে না... এখন আর বিটিভিতে 'ছায়াছবির বাকি অংশ দেখবেন আছরের আজানের পর' দেখা লাগে না... অথচ একটা সময় বিজ্ঞাপন দেখতেও ভালো লাগতো...
৪০ টা বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর ছবি শুরু হতো..
অনেক গুলো সময় আমরা ভুলে গেছি...
বিজ্ঞাপন গুনতে গুনতে সময় গুলো গুনতেই ভুলে গেছি...

Re: বিজ্ঞাপন গুনতেও ভাল লাগত যখন !

কিছু সময় সব ভুলে অতীতে চলেগিয়েছিলাম ।