টপিকঃ আমার গানের একাল সেকাল

গানের সেকাল

আমার গানের সেকাল জানতে হলে পাঠকদের যেতে হবে ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে। আমি তখন পড়ি ক্লাস টুতে। আমার বড় ভাই ক্লাস থ্রিতে। বাবার চাকুরী সূত্রে থাকি জয়পুরহাটে। বাবা গান পছন্দ করতেন ভীষণ। নিজে গাইতেন না কিন্তু খুব গান শুনতেন। বাসায় ক্যাসেট প্লেয়ারে গান বাজছে আর বাবা তার শখের ফুলের বাগানে কাজ করছেন, আমাদের শৈশবে এ ছিল অতি পরিচিত দৃশ্য। আর আমাদের পরিবারও অত্যন্ত সাংস্কৃতিক-মনা ছিল। গান, কবিতা আবৃত্তি, অভিনয় সব কিছুতে ছিল বেজায় উৎসাহ। এমন পরিবেশের কারণে হয়তো গানের প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্মালো।

সে সময় জয়পুরহাটের সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিলো অসাধারণ। জেলা শিশু একাডেমী ছিল জমজমাট। তখন তো মোবাইল ফোন বলে কিছু ছিল না। আর টিভির দৌরাত্ম্য ছিল সীমিত। ফলে এ ধরনের কার্যক্রমে পরিবারগুলির স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণ থাকতো। মায়ের উৎসাহে আমরা দুই ভাই শিশু একাডেমীতে গান শেখার ক্লাসে ভর্তি হলাম। বাবার উৎসাহে কবিতা আবৃত্তি আর নিজেদের উৎসাহে অভিনয়ের ক্লাসে ভর্তি হলাম। আর ইয়ে আমি নাচ শেখার ক্লাসেও ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। তবে সেখানে যা হলো..... সে এক কাণ্ড বটে। পরে কখনও সময় সুযোগ করে আমার নাচ শেখার লোমহর্ষক(!) কাহিনী শোনাব।

যাইহোক, শিশু একাডেমীতে গানের ক্লাস সপ্তাহে একদিন। এক সাথে ৪০/৫০ জন গান শিখি। অধিকাংশই মেয়ে আর তাদের আধিপত্য খুব। তারা গান ভালো গায়, অনুষ্ঠানে একক সংগীত পরিবেশন করে। আমরা যে কয়জন ছেলে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলাম, আমাদের কাজ ছিল মূলত কোরাসে অংশ নেওয়া। তখন প্রচুর অনুষ্ঠান হতো। আমাদের ব্যস্ততা ছিল বছরব্যাপী। যারা একক গান গায়, তাদের নিজস্ব গানের মাস্টার আছে। তাদের খুব বেশি সময় দিতে হতো না। ক্লাসের মূল ব্যস্ততা ছিল কোরাস টিম প্রস্তুত করা। কখন গান ধরতে হবে, কখন থামতে হবে। স্টেজে সবাই কীভাবে উঠবো, কিভাবে দাঁড়াবো ইত্যাদি। গানের কোন অংশে মাথা নাড়াবো, কখন দেহ দুলবে এসব নিয়ে খুব অনুশীলন চলতো। সবাই গলা ছেড়ে গাইতাম- আমরা সবাই রাজা, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, মাগো ভাবনা কেন, এসো হে বৈশাখ ইত্যাদি। তো আমি কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলাম কোরাস টিমে নিজের জায়গা পাকা করা তেমন কঠিন বিষয় না। শুধু দুটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। এক, গানের সময় আন্তরিকতার সাথে দোল দিতে হবে। দুই, মুখ নাড়াতে হবে। গান শুরু হওয়ার সাথে সাথে মুখ নাড়াতে হবে। গান ধরতে না পারলে বা ভুলে গেলেও সমস্যা নেই। প্রয়োজনে নিঃশব্দে হলেও মুখ নাড়াতে হবে। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গান জানলে ভাল, না জানলে কোন সমস্যা নেই। ঠিক মত মুখ নাড়াতে জানলেই হবে। অর্জিত জ্ঞানের বদৌলতে কোরাস টিমের অপরিহার্য সদস্য হিসাবে দিন সুখেই কাটছিল। কিন্তু ঐযে গানের কথায় আছে না, “সবার জীবনে নাকি সুখ সয় না।” আমার হলো সে অবস্থা।

একবার কোনো এক গানের কোরাস কিছুতেই মিলছে না। কে যেন বেসুরে গান ধরে সব গুবলেট করে দিচ্ছে। কিন্তু কে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তো গানের শিক্ষক এক এক করে কোরাস শিল্পীদের একা গান গাওয়াতে লাগলেন অপরাধীকে(!) চিহ্নিত করার জন্য। আমার গান গাওয়ার পালা এলো। বুঝুন অবস্থা। আমার মতো কোরাস বিশেষজ্ঞ কিনা একা একা গান গাইবে! গলা শুকিয়ে কাঠ। তো যাইহোক, চোখ বন্ধ করে গান ধরলাম। গান শেষে চোখ খুলে দেখি সবাই চুপচাপ। বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। যাকে বলে একেবারে পিনপতন নীরবতা। আমি ভাবলাম, আমার গানে মুগ্ধ হয়ে সবাই বোধহয় বাক্যহারা হয়ে গেছে। স্বর্গীয় অনুভূতি। গানের শিক্ষকের কথায় বাস্তবতার মাটিতে নামলাম- “এটা কি হলো! এ্যাঁ, এই ছেলে এটা কি গান হলো? না কবিতা, না গল্প বললা।” তিনি রীতিমত উত্তেজিত। আর শিক্ষকের কথায় রুমের হাসির বাণ ছুটে গেল। ছোট ছোট মেয়েরা যে এত জোরে হাসতে পারে সেদিনের আগে জানা ছিল না। হাসি আর থামে না। এদিকে আমার অবস্থা তো করুণ। লজ্জায় কান লাল হয়ে গেল। বাকি ক্লাস কীভাবে শেষ করেছিলাম তা মনে নেই।

আমার প্রাতিষ্ঠানিক গান শেখার ইতিহাস সেখানেই সমাপ্ত। এরপর নিজেকে একজন সফল বাথরুম সিংগার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করি। ঘরের বাইরে এরপর কখনও গান গাওয়া না হলেও বাসার সবাই আমার গানে মোটামুটি অস্থির থাকতো। আমার মা দাবি করেন তার যে মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা হতো তার কারণ নাকি ছিল আমার বেসুরা গান। (কি অপমান!)


গানের একাল

গান আমাকে প্রত্যাখ্যান করলেও আমি গানকে ছাড়ি নি। গানের প্রতি ভালোবাসা দিন দিন বেড়েছে। আমার মেয়ে গান খুব পছন্দ করে। আর সৌভাগ্যক্রমে মেয়ের মা চমৎকার গান করেন। আমার মেয়ে ঘুমায় মায়ের গান শুনে, আবার তার কান্না থামানোর অস্ত্রও মায়ের গান। বেশ কিছু দিন আগের ঘটনা। আমার মেয়ের বয়স দেড় বছরের মত। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল মেয়ের কান্নায়। তার মা উঠে কান্না থামানোর চেষ্টা করলো কিন্তু লাভ হলো না। কান্না বেড়েই চলছে। আমিও দুশ্চিন্তায় উঠে পড়লাম, কারণ মেয়ে সাধারণত এরকম কান্নাকাটি করে না। কোনো সমস্যা হলো নাকি! তার মা কোলে নিয়ে দোল দিলো, গান শুনালো কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আমি আবার কি মনে করে গান ধরলাম- “বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে।” কি আশ্চর্য মেয়ে একেবারে চুপ। এই দেখে তার মা গান ধরলো, সাথে সাথে তার কান্না। আমি গান ধরতেই আবার চুপ। আমিও এমন মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে হৃদয় উজাড় করে গাইতে থাকলাম যতক্ষণ না সে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায়।

সেই থেকে শুরু। আমরা এখন প্রায়ই এক সাথে গান গাই। আমাদের গান গাওয়া দেখে বউ হাসে। জীবন বড় সুন্দর মনে হয়। আমার গায়ক জীবন সার্থক, কী বলেন আপনারা?

https://lh3.googleusercontent.com/8dOTXqjj_bxrHPTGauLyHUYpN1udEJ_wgFE0ZV3W06n8osgLO6L0tBvPX_o_4N2t98eqpo4InanColFoQyJR93K_-u5qXOT8Ey7OBLhkewLxhWJVztE-GVCAPik0jKlCfzUVJp0T5Q=w724-h637-no

বাসার গানের আসরে বাপ-বেটি গান শুনছি। আমাদের পরিবারের জন্য দোয়া করবেন।

"সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। সংকটেরও কল্পনাতে হয়ও না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত কর ভয়। আপন মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়॥"

Re: আমার গানের একাল সেকাল

শাকিরা ছোট বেলায় প্রচুর দুয়ো শুনতো তার আজব গলার জন্যে। কিন্তু এখন দেখেন। পৃথিবীর সেরা স্টারদের একজন সে। আপনার মধ্যে আপনার কলিজা সে সম্ভাবনাই হয়তো দেখে ফেলেছে  lol lol

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

Re: আমার গানের একাল সেকাল

তার-ছেড়া-কাউয়া লিখেছেন:

শাকিরা ছোট বেলায় প্রচুর দুয়ো শুনতো তার আজব গলার জন্যে। কিন্তু এখন দেখেন। পৃথিবীর সেরা স্টারদের একজন সে। আপনার মধ্যে আপনার কলিজা সে সম্ভাবনাই হয়তো দেখে ফেলেছে  lol lol

lol2বোধ হয় তাই-ই হয়ে থাকবে। অনেক দিন পর আরণ্যক কে দেখা গেল! সবাই নিজ নিজ ভূবনে ব্যস্ত হয়ে গেছি, তাই না?

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: আমার গানের একাল সেকাল

উদাসীন লিখেছেন:

অনেক দিন পর আরণ্যক কে দেখা গেল! সবাই নিজ নিজ ভূবনে ব্যস্ত হয়ে গেছি, তাই না?

হয়তো তাই। তবে প্রজন্মর বড় মায়া দাদা। এখনও খুব কম দিন আছে যেদিন অন্তত দু তিন বার "চলতি টপিক" এ ক্লিক করা হয়না।

"সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। সংকটেরও কল্পনাতে হয়ও না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত কর ভয়। আপন মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়॥"

Re: আমার গানের একাল সেকাল

গান জিনিস এমন, যে সকলেরই প্রিয়।কেউ নাচ জানুক বা না জানুক,গান জানবেই।আপনি যেমন বাথরুম সিংগার,আমিও।কন্ঠটা ভালো হলে ইনশাহআল্লাহ,গানের প্রতিযোগীতায় নাম লিখাতাম big_smile
গান আজীবন আপনার সাথে থাকুক,আর আপনি এই প্রজন্মের সাথে smile

ডিজিটাল বাংলাদেশে ত আর সাক্ষরের নিয়ম চালু নাই।সবটায় দেখি বায়োমেট্রিক।তাই আর সাক্ষর দিতে পারলাম না।দুঃখিত।

Re: আমার গানের একাল সেকাল

আর ইয়ে আমি নাচ শেখার ক্লাসেও ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। তবে সেখানে যা হলো..... সে এক কাণ্ড বটে। পরে কখনও সময় সুযোগ করে আমার নাচ শেখার লোমহর্ষক(!) কাহিনী শোনাব।

সেই কাহিনী শোনার অপেক্ষায়  hehe


শুধু দুটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। এক, গানের সময় আন্তরিকতার সাথে দোল দিতে হবে। দুই, মুখ নাড়াতে হবে। গান শুরু হওয়ার সাথে সাথে মুখ নাড়াতে হবে। গান ধরতে না পারলে বা ভুলে গেলেও সমস্যা নেই। প্রয়োজনে নিঃশব্দে হলেও মুখ নাড়াতে হবে। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গান জানলে ভাল, না জানলে কোন সমস্যা নেই। ঠিক মত মুখ নাড়াতে জানলেই হবে।

আহারে এটা আগে জানলে তো গান গাওয়াটা ছাইড়া দিতাম না!  worried
এক বালতি দুঃখ আমার নিজের  জন্য!  cry

আমরা এখন প্রায়ই এক সাথে গান গাই। আমাদের গান গাওয়া দেখে বউ হাসে। জীবন বড় সুন্দর মনে হয়। আমার গায়ক জীবন সার্থক, কী বলেন আপনারা?

একটা ভয়েস রেকোর্ড শুনান big_smile আমার শুনে শুনে একটু মাথা দুলাই big_smile  cool cool cool

Re: আমার গানের একাল সেকাল

বাবা আর মেয়ের সম্পর্কের যে মাধুর্য তা শুধু বাবা আর মেয়েই বোঝে । পৃথিবীর তাবৎ বাবাদের জন্য আর সেই সাথে আপনার আর আপনার লিটল প্রিন্সেস এর জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা  smile

এক টুনিতে টুনটুনালো সাত রানির নাক কাঁটালো