টপিকঃ বিদ্রোহী নেত্রী লাল্লা ফাতিমা না’সোমার

00বিদ্রোহী নেত্রী লাল্লা ফাতিমা না’সোমার, জুরজুরা, আলজিরিয়া00
জুরজুরা আলজিরিয়ার উত্তরে কাবিলিয়া অঞ্চলে একটি পবর্তশ্রেণী । বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এই পবর্তশ্রেণীর মধ্য দিয়ে হজ্জের উদ্দেশ্যে তিউনিস গিয়েছিলেন।
জুরজুরা বিরঙ্গনা লাল্লা ফাতিমা না’সোমার ছিলেন আলজেড়ীয়াটে ইতালীয়  ঔপনিবেশ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রথমদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম।
ফাতিমার জন্ম আনুমানিক ১০ জুলাই ১৮৩০ খ্রি. কাবিলিয়ার প্রদেশের আইন আল হাম্মামের কাছে ওয়ারজা নামে একটি গ্রামে একটি মারবুত (সুফি) পরিবারে। তার প্রকৃত নাম ছিল ফাতেমা সিদ আহমেদ। কিন্তু তার দয়াশীলতা, দৃঢ়চিত্ততা এবং তিনি সামার গ্রামে থাকতেন বলে তার ডাক নাম হয় ন’সোমার । ফাতিমার পিতা সিদি আহমেদ নিকটবতী গ্রাম সোমারের একটি কোরান শিক্ষা স্কুল বা মাদ্রাসা পরিচালনা করতেন। এঈ মাদ্রাসার ছাত্রদের উচ্চস্মরে  বিভিন্ন সুরা তেলাওয়াত করা শুনে সম্পূর্ণ কোরান মুখস্থ করে ফেলেন। তার ঘনিষ্ঠরা বর্ণনা করেন, ফাতিমার স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ এবং তার জন্মগত অনেক গুণাবলী ছিল। ১৬ বছর বয়স হবার পর তার আত্মীয়স্বজন ফাতিমার বিয়ে ঠিক করেন তার মামাত ভাই ইয়াহিয়া ন আত ইবুখাওলেফ-এর সাথে। কিন্তু মাদ্রাসার পাঠ সমাপ্ত না করা পর্যন্ত ফাতিমা বিয়ে করতে রাজি হননি।
১৯ শতকের একজন কাবিলিয়া নারী হিসেবে স্ত্রী এবং মাতার ভূমিকা ত্যাগ করে পুরুষের মতো ধর্মিয় শিক্ষা গ্রহণ করা অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
পিতার মৃত্যুর পর তনি তার ভায় সি মোহান্দ তায়েবকে সাথে নিয়ে কোরআন শিক্ষা স্কুলটি পরিচালনা করতে শুরু করেন। শিশু এবং গরিবদের প্রতি তিনি বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। তার বিশেষ তির্ক্ষ বুদ্ধি এবং দয়াশীলতা জন্য ফাতিমা কাবিলার এলাকার মধ্যে পরিচিত হয়ে উঠেন। ফরাসি সেনা যখন কাবিলা দখল করেন তখন  ফাতিমা না’সোমার বয়স মাত্র ১৬ বছর । দেশের অন্য সব অঞ্চলের মতো এই এলাকাও প্রচণ্ড যুদ্ধ করার পর ফরাসিরা অধিকার করে । তবে লাল্লা ফাতিমার নেতৃত্বে এর বিরুদ্ধে যে গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে তা
এই নারী যোদ্ধার সাহসিকতা এবং বীরত্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
শত্রুরা তাকে জুরজুরার জোয়ান অব আর্ক অ্যাখ্যা দিয়েছিল, তবে ধর্মপ্ৰাণ ফাতিমার কাছে এই তুলনা গ্রহণযোগ্য ছিলনা। অটল ঈমানের জোরে তিনি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে শক্রসেনাদের পিছু হটিয়ে দেন।
১৮৫৪ খ্রি. যখন তার বয়স মাত্র ২৪ বছর, তিনি ফরাসি সেনাদলকে (সংখ্যায় এবং রসদের দিক দিয়ে তার চেয়ে অনেকগুণ শক্তিশালী) উয়েদ সেবাউ নামক একটি স্থানে তার সাহস এবং দৃঢ় সংকল্প মনোভাবের মাধ্যমে একটি শিক্ষা দেন। বিখ্যাত এই যুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধের নেতা এল আমজেদ ইবনে আবদেলমালেক ডাক নাম বোউবাঘা) যখন ফরাসি সেনাদলের কাছে প্রায় হেরে বসেছিলেন, তখন ফাতেমা একদল নারী পুরুষ যোদ্ধার নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধ জয় করেন। এই বিজয় কাহিনী পুরো কাবিলিয়ায় সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। মসজিদে মসজিদে, জাইয়াতে এবং সব কোরান শিক্ষার স্কুল জুরজুরার বীরাঙ্গনার বিজয়গাথায় মুখরিত হয়ে ওঠে।
ফরাসি জেনারেল র্যা নডন এই পরাজয় সহজভাবে নিতে পারেননি । তিনি আজাজগার অধিবাসীদের বলেন ফাতিমা ন’ সোমারের ঠিকানা সন্ধান দিতে, যাতে তার কাহিনী এবং অপকৰ্ম” এখানেই শেষ করা যায়। কিন্তু অধিবাসীরা তার দূতকে এই বলে বিদায় দেন “ফিরে যাও তার কাছে যে তোমাকে পাঠিয়েছে এবং তাকে বল বিশ্বাসঘাতকতার ভাষা আমাদের কানে পৌঁছে না।” এর উত্তরে জেনারেলের প্রতিক্রিয়া ছিল ‘যেহেতু ওরা আমার আহবানে কর্ণপাত করেনি, আমি ওদের আমার কামানের অ্যাওয়াজ শুনতে বাধ্য করবো ।”
কিন্তু ফাতিমা ন'সোমার হাল ছেড়ে দেননি । আজাজগার পতনের পরও এবং র্যা নডনের সৈন্যদের নিষ্ঠুর দমননীতি সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধের জন্য লোকজন সমবেত করে।
জন্য এবং স্বাধীনতার জন্য জেহাদ করুন। এগুলো অপরিবর্তনীয় এবং পবিত্র । এসব ব্যাপারে কোন ছাড় দেওয়া যায় নাম এবং কোন ধরনের দর কষাকষি চলে না।”
তার কঠিন ব্যক্তিত্ব পুরো কাবিলিয়ার অধিবাসীদের মধ্যে প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করে।
যা পরিস্ফুট হয় যুদ্ধে লোকজনের আত্মত্যাগের মাধ্যমে। ইখেরিডেন এবং তাখারিতে শত্রুরা পরাজিত হয় ১৮ জুলাই ১৮৫৪ খ্রি, । শত্রুপক্ষের ৫৬ জন অফিসারসহ মোট ৮০০ জন সৈনিক মারা যায়। ২৬ ডিসেম্বর ১৮৫৪ খ্রিঃ বোউবাঘা নিহত হন। ১৮৫৫ খ্রি.-এর প্রথম দিকে কাবিলিয়ার প্রতিরোধ সংগ্রামের বিভিন্ন গোত্রপতি এবং যুদ্ধের কমান্ডাররা একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে ফাতিমা লাল্লা এবং তার ভাইকে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। জেনারেল র্যা নডন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন এবং ফাতেমা তা মেনে নেন। যুদ্ধ বিরতিকালীন তিনি সেনাদলের শক্তিবৃদ্ধি করার জন্য পরিকল্পনা করেন। জমি চাষ করা হয় এবং এলাকার বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্ৰ কারখানা স্থাপন করা হয়। কিন্তু অন্যান্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির মতো ফরাসি পক্ষ এই চুক্তি ভঙ্গ করে আবার শক্তিসঞ্চয় বড় শহরগুলোতে আক্রমণ চালায় । ১৭ মে ১৮৫৭ খ্রি. জেনারেল র্যা নডন আবার শক্তিসঞ্চয় করে ৪৫০০০ সৈন্য নিয়ে কাবিলিয়া আক্রমণ
করেন ।
ফাতিমা আপ্রাণ চেষ্টা করেন শক্ৰদের প্রতিরোধ করতে, কিন্তু বিশাল এই সেনাদল এবং বড় বড় কামানের বিরুদ্ধে শেষপর্যন্ত পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায় ফাতিমা এই যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন এবং নির্দেশ দেন যোদ্ধারা যেন একে অপরের সাথে কোমরে দড়ি বেঁধে রাখে যাতে কেউ পালাতে না পারে। ১১ জুলাই জুরজুরার এক উচ্চ পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত এক গ্রাম থেকে তাকে বন্দি করা হয় ।
আরো দুইশতজন নারীসহ তাকে তাবলাতে একটি ডিটেনশন শিবিরে বন্দি করে রাখা হয়। অকুতোভয় সুফি এই মহিয়সী নারী ১৮৬৩ খ্রি. মারা যান। ১৯৯৫ খি, তার দেহাবশেষ রাজধানী আলজিয়ার্সের এল আলিয়া জাতীয় বীরদের সমাধিক্ষেত্রে স্থানান্ত রিত করা হয় ।
https://en.wikipedia.org/wiki/Lalla_Fatma_N%27Soumer

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ