টপিকঃ আত্মবিস্মৃত বাঙালী

আত্মবিস্মৃত বাঙালী
* “বঙ্গালের’ সন্তান দীনেশচন্দ্র সেন অনার্স পাশ করে তরুণ- বয়সে কলকাতার মেট্রোপলিটান স্কুলে দরখাস্ত করে চাকরী পাননি। দীনেশচন্দ্রের মুখে এ খবর শুনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বলেছিলেন- ‘তাই তো, তুই যে বাঙ্গাল। এখানকার ছাত্ররা তোর টিপরা জেলার ভিক্টোরিয়া স্কুলের ছাত্র নয় যে, তুই অনার্স পাশ শুনিয়া চমকিয়া উঠিবে। তোকে তো একদিন পাগল করিয়া ছাড়িবে।
*বৃটিশ-বাঙলার বিরল মেধাবী ছাত্র কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) মুছলমান হওয়ার কারণে ১৯১৫/১৬ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হতে পারেননি।
*আরেক ‘বাঙ্গাল” পবিত্ৰ কোরানের বাংলা অনুবাদক ভাই গিরিশ চন্দ্রকেও নানারকম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের চাবুক হজম করতে হয়েছে।
*উনিশ শতকে বৃটিশের আনুকূল্যে ওপারের বাবুরা যে “খাটি বাঙালী” হয়েছিলেন তার গরীমা এত উচ্চে উঠেছিল যে, সমসাময়িককালে, দুইজন বিখ্যাত ‘বাঙ্গাল’- রামলোচন ঘোষ এবং বিলাত-ফেরতা ডাক্তার সূৰ্যকুমার গুডিভ চক্রবতী বঙ্গাল দেশ থেকে কলকাতায় গিয়ে “ভদ্রলোক’ হওয়ার পরও ‘বাঙ্গাল” অপবাদ থেকে মুক্ত হতে পারেননি।”
*বাঙালী ভদ্রলোকদের দৃষ্টিভঙ্গী কীরকম ছিল, সে সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ‘বাঙালির জাতীয়বাদ” গ্রন্থে লিখেছেন--
“পূর্ববঙ্গের গন্ধ পর্যন্ত অসহ্য, তাদেরো অনেকের পক্ষে যারা পূর্ববঙ্গেয়  জন্মলাভ করেছেন। পূর্ববঙ্গ ছিল উপনিবেশ। দীনেশ সেনের পূর্বপুরুষদের জন্য যেমন, নবীন সেনের পূর্বপুরুষদের জন্যও তেমনি। পূর্ববঙ্গ অবশ্য শেষ পর্যন্ত প্ৰতিশোধ নিয়েছে; প্রথমে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, পরে একটি রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠা করেছে, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা এবং রাজধানী হচ্ছে রামমানিক্যের সেই “হাস্যকর ঢাকা শহর।“
এমনকি নদীয়ার ‘মহাপ্রভু’ নামে খ্যাত শ্ৰী চৈতন্য - যার পূর্বপুরুষরা ছিলেন বাংলাদেশের সিলেটের বাসিন্দা, সেই বাঙ্গাল দেশ সম্পর্কে চৈতন্যদেবের মনোভাব কেমন ছিল সে সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন---
“চৈতন্যদেব (১৪৮৫-১৫৩৩) প্রেমের বাণী নিয়ে এসেছিলেন, নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে তিনি ঐক্য চাইলেন। জন্মসূত্রে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে তার একটা যোগ ছিল। চৈতন্যদেবের পিতামহ উপেন্দ্র মিশ্রেীর আদি নিবাস ছিল সিলেটে। নিজেও তিনি সিলেটে গিয়েছিলেন একবার, সেখানে কয়েক মাস বিদ্যা বিতরণ করে নিজের বাসভূমি নবদ্বীপে [ নদীয়ায়] ফিরে এসে মহাপ্ৰভু সিলেটবাসীর উচ্চারণ ভাষা নিয়ে তাঁর নিজস্ব নির্দোষ পদ্ধতিতে বেশ কৌতুক করেছিলেন বলে জানা যায় : “বঙ্গদেশী বাক্য অনুসরণ করিয়া/ বাঙলের কদৰ্থেন হাসিয়া হাসিয়া'। ... তাঁর বাণী প্রেমের, কিন্তু পূর্ববঙ্গকে হাস্যকর না মনে করে তিনি পারেন নি।“
আর সে সময়ে বঙ্গাল দেশের (আজকের বাংলাদেশের) মুছলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ নির্বিশেষে আমজনতা সম্পর্কে ওপারের বামুন-কায়েতদের মনোভাব কীরূপ ছিল। তা আর বলার প্রয়োজন পড়ে না।
এসব ঘটনা তো দেড়-দু'শ' বছর আগেকার। আজকের একুশ শতকেও আধুনিক কলকাতার প্রগতিশীল বাবুরা নাটক-নভেল-টিভি সিরিয়ালে, বাংলাদেশের দিয়ে বাঙ্গালের জবানে ‘পুঙ্গির পুত” বলে ঠাট্টা-মসকরা ক’রে আমোদ পান।

২০১২ সালের দিকে ভাগ্যচক্রে ঢাকায় আলাপ হয়, ভোলার লালমোহন এলাকার সুকুমার দত্তের সাথে। এমএ পাশ। জিগাতলায় এক বন্ধুর বাসায় থেকে নিয়মিত টিউশনি করতেন। এখন আর নিয়মিত করেন না। এখন ছয় মাস ঢাকায়, বাকী ছয়মাস পশ্চিমবঙ্গের এক শহরতলী এলাকায় টিউশনি করেন। বললেন, ঢাকায় ছয় মাস ছাত্ৰ পড়িয়ে যে আয় হয়, ওপারে হয় তার তিনগুণ। কারণ প্ৰাইভেট টিউটর হিসেবে ওপারে তার খুব নাম-ডাক। সেখানেও এক মজার কাণ্ড । সুকুমার বাবু নিজেই বললেন, তিনি বাংলাদেশের লোক এ পরিচয় ওখানে গোপন রাখেন। নিরাপত্তার কারণে নয়। ওপারের ছাত্র-অভিভাবকরা যদি জানতে পারে তিনি বাংলাদেশের লোক তাহলে- “ক-অক্ষর গো-মাংসা’ পণ্ডিত মনে করে তার কাছে কেউ পড়তে আসবে না।

এপারের ‘বাঙ্গালীদের সম্পর্কে ওপারের “ভদ্র-বাঙালীদের এরকম মনমানসিকতা আদিকাল থেকে আজ-তক বলা যায় প্ৰায় একই রকম। অতীতে বঙ্গাল দেশকে তারা পাণ্ডববর্জিত, স্লেচ্ছ—যবনের দেশ মনে করতেন। তার জের আজও আছে। এই মানসিকতা আজকের দিনে আরও ভয়ঙ্করভাবে রাজনৈতিক রূপ নিয়েও হাজির। এর অসংখ্য নজীরের মধ্যে এখানে মাত্র একটি নজীর তুলে ধরা যেতে পারে।
*২০১২-এর ফেব্রুয়ারীর দিকে ফারাক্কা বাধের ১০৮টি সুইস গেটের মধ্যে মাত্র তিনটিতে ফাটল ধরলে— ফাটল চুইয়ে কিছু বাড়তি পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করলে, পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তড়িঘড়ি করে দিল্লি গিয়ে প্ৰধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে এই বলে নালিশ করেন যে- চার মাসব্যাপী ওইটুকু বাড়তি পানি বাংলাদেশে চলে আসার ফলে পশ্চিমবঙ্গ নাকি বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়েছে। চল্লিশ বছর ধরে শুষ্ক-মৌসুমে ফারাক্কার সবগুলো সুইসগেট অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকার ফলে প্রতিবেশী বাংলাদেশের একতৃতীয়াংশ অঞ্চল যে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, তার জন্য দেশপ্রেমিক' মমতার মনে বিন্দুমাত্র বিবেকবোধ জাগ্রত হয় না।

এর মাঝেও অন্যান্য অনেক কারণের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে ক্রিয়া করে- “ওদের আবার গঙ্গার পানির দরকার কী, ওরা তো পাণ্ডববর্জিত, বাঙ্গাল'- এই রূপ আদি ও অকৃত্রিম ব্ৰাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা।
বাংলাদেশের অধিবাসীদের সম্পর্কে প্রতিবেশী ভারতের শাসকশ্রেণীর এইরকম মানসিকতার বহিঃপ্রকাশের নজীর আরও ভুরি ভুরি রয়েছে।

*এই হাল আমলে আমাদের কিশোরী ফেলানীকে বিএসএফ-এর লোকেরা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে সীমান্তের কাটাতারে ঝুলিয়ে রেখে যে নৃশংস বর্বরতা প্রদর্শন করেছে, তার বিচারের নামে কী প্ৰহসন-ই না হ’ল। কাঁটাতারে ঝুলানো ফেলানী তো ফেলানী নয়, এ তো স্বাধীন বাংলাদেশের থ্যাতলানো মানচিত্র। ফেলানী হত্যার আদালত হত্যাকারীদের “নির্দোষ” ঘোষণা করে বেকসুর খালাসের রায় দিয়েছেন। এর মধ্যেও যে মানসিকতা প্ৰকাশ পেয়েছে তা হ’ল- বাংলাদেশের ফেলানীদের হত্যা করা কোন দোষের কাজ নয়, কারণ ওরা যে “বর্বর’— ‘বাঙ্গাল’ ।

*ভারত ও ভারতীয় বাঙলার উচ্চবণীয়রা (বর্ণহিন্দুরা) প্রাচীনকাল থেকেই বঙ্গালদেশের (বাংলাদেশের) জনগোষ্ঠীকে যে, ‘বাঙ্গাল’ বলেন- এই বাঙ্গাল শব্দটি তারা বাঙালী অর্থে বলেন না, বলেন পাণ্ডববর্জিত দেশের স্লেচ্ছ—যবন অর্থে (হাল আমলে ‘মৌলবাদী’, ‘সাম্প্রদায়িক’, ‘জঙ্গী’, ‘সন্ত্রাসী’ অর্থে)। অথচ বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস একেবারেই তার উল্টো। সেই ইতিহাসটা আমাদের সকলের জানা দরকার ।
**বাঙলা, বাঙালী জাতি, বাঙলা ভাষা-লিপি ও বাঙালী সংস্কৃতি নিয়ে গত দু'শ' বছর ধরে এত মিথ্যাচার হয়েছে যে, আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে রীতিমতো অবিশ্বাস্যই মনে হবে- বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী ভারতীয় বাঙলা (পশ্চিমবঙ্গ) ১৩ শতক থেকে ১৮ শতক-তক, সুলতানী আমলের আগে কখনো এক ছিল না। ভূ-খণ্ড, জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি কোন দিক দিয়েই এক ছিল না। দুই ভূ-খণ্ডের নাম ছিল ভিন্ন। জাতির নাম ছিল ভিন্ন। দুই ভূ-খণ্ডের ভাষা ও সংস্কৃতিও ছিল ভিন্ন। এখনকার বাংলাদেশ-ভূ-খণ্ডের অতীত নাম ছিল ‘ভাটি’, তারপর  “বঙ্গাল’ বা ‘বাঙ্গালা।
>অন্যদিকে আজকের পশ্চিমবঙ্গের নাম ছিল প্ৰথমে “বঙ্গ', ‘রাঢ় বঙ্গ” ও পরে ‘গৌড়-বঙ্গ”। অতীত বঙ্গালের (আজকের বাংলাদেশ-ভূ-খণ্ডের) জনগোষ্ঠীর মূলভাষা ছিল “আদি-বাঙালাভাষা’। অন্যদিকে গৌড়-বঙ্গে’র (আজকের পশ্চিমবঙ্গের) ভাষা ছিল গৌড়ীয় ভাষা (তাও আবার নানা অঞ্চলে নানা নামে বিভক্ত)। বঙ্গালের অধিবাসীরা জাতি হিসেবে ছিল ‘বাঙ্গালী” (আদি বাঙালী)। অন্যদিকে গৌড়বঙ্গের অধিবাসীরা জাতি হিসেবে ছিল গৌড়ীয় বা গৌড়ীয়া। গৌড়ের অধিবাসীরা বাঙ্গাল দেশকে ব’লত পাণ্ডববর্জিত দেশ, হরিনামহীন দেশ, স্লেচ্ছ-যাবনের দেশ। তারা বঙ্গালের অধিবাসীদের তুচ্ছ অর্থে ব’লত ‘বাঙ্গাল’। অন্যদিকে বঙ্গালের অধিবাসীরা (আদি বাঙালীরা) গৌড়ীয়দের ব’লত ‘ঘটি” (গৌড়ীয়ের সংক্ষিপ্ত রূপ)। দুই ভূ-খণ্ডের অধিবাসীদের ধর্ম ও সংস্কৃতিও ছিল বহুলাংশে ভিন্ন।” বাংলাদেশে আজ থেকে সাড়ে তেরোশ’ বছর আগে ঘটেছিল এক ব্যতিক্রমিক ঘটনা। অতীত বঙ্গালে আরবের ইছলাম এসেছিল সুলতানী আমলেরও পাঁচশ' বছর আগে- সাত শতকে-ই। তাছাড়া আরবীয় বণিকরা বাণিজ্যসূত্রে সমুদ্রপথে বঙ্গাল দেশে আগমন করেছিল এবং অনেকে এখানে স্থায়ী বসতিস্থাপন করেছিল। ইছলাম আসারও বহু আগে- খৃষ্টপূর্ব ৫০০ সালে বা তারও আগে। এখন পরিষ্কার বোঝা যায়— বঙ্গাল ভূ-খণ্ডে (আজকের বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে) সুপ্রাচীনকালেই স্থানীয় অধিবাসীদের আদি-বাঙলা ভাষার পাশাপাশি নতুন বসতি-স্থাপনকারী আরবীয়দের ভাষা-আরবী ভাষারও ব্যাপক প্ৰচলন ঘটেছিল। সম্প্রতি প্ৰাচীন বঙ্গালের ব্ৰহ্মপুত্র অববাহিকা অঞ্চল। লালমনিরহাটে সাড়ে তেরশ’ বছর আগে নির্মিত মছজিদ আবিষ্কার এবং একই অববাহিকা অঞ্চল নরসিংদীর ওয়ারীবটেশ্বরে প্রায় তিন হাজার বছর আগের বঙ্গাল-সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কার- সে কথাই প্ৰমাণ করছে।
*বঙ্গাল অঞ্চলে এই প্ৰাচীন-সভ্যতা গড়ে ওঠার পেছনে আরব বণিকদের অবদানের কথা নিশ্চিতভাবে জানা যায়। সম্প্রতি বৃটিশ প্রত্নতাক্তিক টিম স্টিল লালামনিহাটে সাড়েতেরশ আগের মসজীদ আবিষ্কার করে জানান---
“প্রাচীনকালে ব্ৰহ্মপুত্র ও তিস্তার পাড় ধরে সিকিম হয়ে চীন পর্যন্ত আরব বণিকদের যাতায়াতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। টিমের গবেষণায় আরও প্ৰমাণ মেলেখৃষ্টপূর্বকাল থেকেই ব্ৰহ্মপুত্র অববাহিকা দিয়ে সুদূর চীন থেকে রোমান ও আরবরা পণ্য নিয়ে যেত। গবেষক টিম স্টিল প্ৰাচীন রোমান সভ্যতার সাথে প্ৰাচীন বাঙ্গালার (বাংলাদেশের) যোগাযোগ থাকার প্রমাণ হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব-বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের ওয়ারীবটেশ্বর-সভ্যতা নিয়ে গবেষণাকর্মের কথাও উল্লেখ করেন। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের বরাত দিয়ে টিম আরও জানান- নরসিংদী থেকে কিশোরগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে প্রাচীন সভ্যতার যে নিদর্শন পাওয়া গেছে, তাতে এটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে পড়ছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল— এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে। ওয়ারী-বটেশ্বর-সভ্যতা এবং লালমনিরহাটে আবিষ্কৃত প্রাচীন মসজিদের ওপর আরও ব্যাপক গবেষণাকর্মের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে টিম স্টিল এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে— বাংলাদেশের সুপ্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে প্রাচীন বিশ্বসভ্যতার সম্পর্কের নতুন ইতিহাস জানার পথ খুলে যাবে। তিনি আরও জানিয়েছেন— রোমান, চৈনিক, আরব ও বাঙ্গালা (বাংলাদেশ)- এই চার অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতার যোগসূত্ৰতা আবিষ্কার হলে হয়ত পৃথিবীর ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে হবে।“

কী দারুণ রোমাঞ্চকর খবর! অথচ দুঃখজনক ব্যাপার হ’ল, প্ৰত্নগবেষক টিম স্টিলের এই গবেষণা-কর্মটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোন প্রকার সরকারী উদ্যোগ নেই। এমনকি, টিম স্টিল তার লালমনিরহাটের মসজিদ আবিষ্কারের প্ৰত্নকর্মে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগিতা চেয়েও পাননি- এ অভিযোগ টিম স্টিল নিজেই করেছেন। আরও বিস্ময়কর বাস্তবতা হচ্ছে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের, প্ৰায় তিন হাজার বছর আগের ওয়ারী-বটেশ্বর সভ্যতার ওপর গবেষণা-কর্মেও কোন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই, সাহায্য-সহযোগিতা নেই। থাকবে কীভাবে? আমরা যে ‘বাঙ্গাল’ এবং আমাদের রাষ্ট্র তো অন্যের কথায় ভিন্ন স্বার্থে চলে।
**কথাগুলো অনেকের কাছেই বানোয়াট, মিথ্যাচার বা অবিশ্বাস্য মনে হলেও প্রখ্যাত ভারতীয় লেখক-গবেষক সুরজিৎ দাশগুপ্ত তাঁর ‘ভারতীয় মুসলমানদের সংকট' গ্রন্থে ভারত ও বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস নিয়ে কী লিখেছেন দেখুন---
“মুহাম্মদ (সা.) আবির্ভাবের পূর্বেই সেমিটিক বংশোদ্ভূত পৌত্তলিক আরবরাও এসেছিল দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন বন্দরে। মহম্মদের (সা.) পরে আরব মুসলমানরা এসেছিল, শান্তির বাণীর বাহকরুপে। তারাও ভারতে বসবাস শুরু করেছিল এবং তার প্রত্যক্ষ প্ৰমাণ কোচিন থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে ক্র্যাঙ্গানোরে ৬৪৩ খৃষ্টাব্দের মসজিদটির ধ্বংসাবশেষ।”
*সুরজিৎ দাশগুপ্তের উক্ত গ্রন্থের মাধ্যমে আরও জানা যায়- আরবীয় মুছলমানরা যে বখতিয়ার খিলজীর গৌড় বিজয়ের অনেক আগেই গৌড়বঙ্গ ও ভাটি-বাঙ্গালার বিভিন্ন স্থানে আগমন করেছিলেন এবং বসতি স্থাপন করেছিলেন তার বহু প্ৰমাণ রয়েছে। শ্ৰী দাশগুপ্তের লেখাতেই পাওয়া যাচ্ছে- চৌদ্দ শতকের মধ্যভাগে শ্ৰীলংকা থেকে চীন যাওয়ার পথে ইবনে বতুতা চট্টগ্রাম বন্দরে নেমে হবঙ্ক তথা সিলেটে হজরত শাজালাল (রহঃ) এর সাথে দেখা করতে যান।
তখন তিনি চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি মছজিদ ও অনেকগুলো কবর দেখতে পান। বলা দরকার, ইবনে বতুতা যখন চট্টগ্রামে আসেন তখনও পর্যন্ত কোন মুছলমান শাসক বা অভিযানকারী চট্টগ্রাম দখল করেননি। যদি তাই হয়, তবে ইবনে বতুতার ভ্রমণকালে সেখানে মছজিদ ও গোরস্থান আসলো কেমন করে? এর উত্তর একটাই— দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুমাত্রা, জাভা, বালি প্রভৃতি দ্বীপের  আরবের মুসলিম সদাগররা থামতো এবং সেখানে তাদের নিজস্ব আস্তানায় বাস করতো। অনেকে আবার স্থায়ীভাবেও বসবাস করতো।
*পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম লীলাভূমি এবং মুছলিম সুলতানী আমল ও তারও আগের ইছলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির আলোতে আলোকপ্ৰাপ্ত বঙ্গাল ভূখণ্ডকে- গৌড়বঙ্গ ও ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের ব্ৰাহ্মণ্যবাদীরা হীনউদ্দেশ্যে- পরিত্যক্ত, পাণ্ডববর্জিত, অসভ্য, বর্বর দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন  এবং এই দেশে কেউ আগমন করলে তীর্থযাত্ৰা করে পাপমোচনের বিধান জারি করেছিলেন- যা হাজারবার লিপিবদ্ধ হয়েছে ব্ৰাহ্মণ্যবাদীদের ধর্মীয় শ্লোকে, নানা কাব্যে ও সাহিত্যে।

*যাহোক, বঙ্গাল ও গৌড়বঙ্গ নামে ভিন্ন দুই ভূখণ্ড, বাঙালী ও গৌড়ীয় নামে ভিন্ন দুই জাতি এবং বাঙালা-ভাষা ও গৌড়ীয়-ভাষা নামে দুই ভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী একমাত্র সুলতানী আমলেই এক দেশ- বাঙ্গালাদেশ, এক জাতি- বাঙালী জাতি এবং এক ভাষা— নতুন বাঙালা-ভাষার জন্ম হয়। উল্লেখ্য, মুছলিম সুলতানরা তাদের প্রতিষ্ঠিত বাঙলার যে সীমানা ঠিক করে দেন, সেটিই আজকের দুই বাঙলার সীমানা।
খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হ’ল মুছলিম সুলতানরা বাঙলা ও গৌড় একত্র করে যে এক দেশ গঠন করেন, তার নাম দেন এপারের ‘পাণ্ডববর্জিত’ বাঙ্গালার নামানুসারে- “বাঙ্গালাদেশ” এবং যে অভিন্ন ভাষার জন্ম দেন তার নাম দেন বঙ্গালের ভাষার নামানুসারে— বাঙালাভাষা।

আদি বাঙালাভাষার সাথে আরবীফারহী-উরদু শব্দের স্বাৰ্থক সংযোজনের মাধ্যমে কালক্রমে জন্ম হয় ফারহী-উর্দু ভাবাপন্ন নতুন বাঙালা-ভাষা (ফারহী-বাঙালা)।

এর ফলে গৌড়বঙ্গ এই প্রথম বাঙলা নামে পরিচিতি লাভ করে, গৌড়ীয় জাতি৷ এই প্রথম বাঙালী জাতি হিসেবে পরিচিত হয় এবং ভাষাগতভাবে গৌড়ীয়রা স্বতঃস্ফৰ্তভাবে এবং রাষ্ট্ৰীয় উদ্যোগে ফারহী-ভাবাপন্ন বাঙালা-ভাষার অধিকারী হন।
এর পরের ইতিহাস- বাংলাদেশ, বাঙালী জাতি ও বাঙালা-ভাষার বিরুদ্ধে বৃটিশ ও গৌড়ীয় ব্ৰাহ্মণদের ঘোরতর ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে আমরা পরে যাব ।
সুলতানরা শুধু নতুন দেশ, নতুন জাতি ও নতুন ভাষা তৈরী করেই ক্ষান্ত হননি। তারা সব ধর্মের, সব বর্ণের লোকদের ঐক্যবদ্ধ করে ‘বাঙ্গালাদেশ” নামের নতুন রাষ্ট্রেরও জন্ম দেন। এভাবে মুসলিম সুলতানরা ওই সামন্ত-যুগে, তাদের নবগঠিত রাষ্ট্রকে একটি জাতীয় রাষ্ট্রে রূপ দেন।
চৌদ-পনেরো শতকে দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলে একটি ‘জাতীয় রাষ্ট্রের’ উত্থান ছিল বিস্ময়কর। আর সেই রাষ্ট্র শুধু জাতিরাষ্ট্র রূপেই গড়ে ওঠেনি। সেটি হয়ে উঠেছিল, অনেকটা মদিনা রাষ্ট্রের অনুরূপ— জাতি, উপজাতি, ধমীয়-সম্প্রদায় ও গোষ্ঠী (গোত্র) নিরপেক্ষ রাষ্ট্র।
মূলত সেটা হয়ে উঠেছিল মুছলিম-বৌদ্ধ-বৈষ্ণব এবং বিভিন্ন স্থানীয় ধর্মগুলো মিলে এক কওমে (জাতিতে) পরিণত হওয়া রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে সরকারী চাকরী, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ধর্ম ও সংস্কৃতি-চৰ্চায়ে সকল ধর্মের লোকদের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় নীতি এতটাই উদার ছিল যে, সে আমলে ভিন্নধর্মাবলম্বী শ্রীচৈতন্যের নেতৃত্বে বৈষ্ণব ধর্মের আন্দোলন (নদীয়ার ভাবান্দোলন) সুলতান হোছেন শাহ'র পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। মধ্যযুগে মুছলিম সুলতানরা যখন ‘বাঙ্গালা’ নামের একটি বহুজাতিক সুসংহত রাষ্ট্র গঠন করেন, তখন ইউরোপে জাতিরাষ্ট্রের ধারণাই জন্ম নেয়নি।
**এই প্রসঙ্গে মধ্যযুগে ইউরোপের খৃষ্টীয় পশ্চাৎপদতার সাথে বৃহত্তর আরব বিশ্বের এবং ভারত-উপমহাদেশের ইসলামী প্রগতির তুলনামূলক বিচার করে একটি বিষয়ে এইখানে গুরুত্ব সহকারে বলা দরকার- আজকে কথিত গাল দেওয়া হয়, সেটাকে যদি ইছলাম বোঝানো হয় তাহলে তার প্রতিবাদে বলতে হয়- ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে গোড়ামী আছে, ধর্মান্ধিতাও আছে, প্রতিক্রিয়াশীল অর্থে ‘মৌলবাদ নেই।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিক্রিয়াশীল অর্থে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান ঘটেছিল মধ্যযুগে, ইউরোপীয় দেশসমূহে খৃষ্টীয় সমাজে। আর ঐ একই সময়ে (মধ্যযুগে) ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল। সকল প্রকার ধর্মান্ধিতা, সাম্প্রদায়িকতা, বর্বরতা ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে।
*মধ্যযুগের ইউরোপে খৃষ্টীয় মৌলবাদের চেহারা ছিল— অ-খৃষ্টানদের খুঁজে বের করে হত্যা করা। মেরে-কেটে নিশ্চিহ্ন করে অ-খৃষ্টানমুক্ত ইউরোপ গড়ে তোলার এই বর্বরতাকেই ইতিহাসে বলা হয় ‘ইনিকুইজিশন’।

ব্রুনোর মত বিজ্ঞানীকে পুড়িয়ে মারাও হয়ে ওঠে। মধ্যযুগে খৃষ্টীয় মৌলবাদীদের আরেক ধর্মীয় উন্মত্ততা।
*পক্ষান্তরে মধ্যযুগে ইউরোপের খৃষ্টীয় মৌলবাদের বিপরীতে ইসলামের উদ্ভব হয়েছিল। ইনছাফ ও ন্যায়ের ধর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার আলোক-বর্তিকা হাতে নিয়ে। সাত শতকে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে “মদিনা রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্রে পর ধর্মের প্রতি কেবল সহিষ্ণুতাই নয়, মদিনা রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল ভিন্নধর্মাবলম্বী ইহুদী ও নাছারাদের (খৃষ্টানদের) সঙ্গে নিয়ে, সকলের সম-অধিকারের ভিত্তিতে।
এ ধরনের একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম। পরবতীতে আরবীয় মুসলমানরা বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্য জয় করার পর আব্বাসীয় শাসকদের নেতৃত্বে বাগদাদে, উমাইয়াদের নেতৃত্বে দামেস্কে এবং ফাতেমীয়দের নেতৃত্বে মিসরে যে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল, তাতে মুছলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি সঙ্ঘাত ঘটলেও সেগুলোও ছিল পরধর্ম ও পরমতসহিষ্ণু রাষ্ট্র এবং সেসব রাষ্ট্রে গড়ে উঠেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান, মুক্তবুদ্ধি ও দর্শনচর্চার প্রাণকেন্দ্র। এছাড়াও মুসলমানরা খোদ ইউরোপের স্পেন জয় করার পর সেখানে তাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজধানী কর্ডোভাকেন্দ্রিক আন্দালুসীয় রাষ্ট্র— যেখানে খৃষ্টান ও ইহুদীসহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা শুধু স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধৰ্ম-কর্ম মুছলমানদের সঙ্গে শামিল হয়ে সম্মানের সাথে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলেন।
*ইবনে সিনার নেতৃত্বে কর্ডোভায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার যে বিশাল কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। তার অধিকাংশ শিক্ষার্থী ছিলেন ইউরোপীয় খৃষ্টান ও ইহুদীরা। এভাবে মুসলমানরাই গোটা ইউরোপকে জ্ঞানবিজ্ঞান-দর্শনের আলোকে এবং সেই সাথে সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকলার আলোকে আলোকিত করেছিলেন। অথচ স্পেনে ৯শ' বছরের মুসলিম (মুরীয়) শাসনের পতনের পর ইউরোপীয় খৃষ্টানরা কর্ডোভা দখল করে ইনকুইজিশনের ঘোষণা দিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর যে নিষ্ঠুরতম হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল তা ইতিহাসে নজীরবিহীন।

*এদিকে ভারত উপমহাদেশের মধ্যযুগ কেমন ছিল? একথা মোটামুটি সকলেরই জানা— ইসলাম ও মুসলমানদের আগমনের পূর্বে ভারতবর্ষ ছিল ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় পণ্ডিত এম. এন. রায় ও বিনয় ঘোষের ভাষায়- চরম অর্থনৈতিক দুৰ্গতি, রাজনৈতিক অত্যাচার, বর্ণবিদ্বেষ, বিচারবুদ্ধির স্বেচ্ছাচারিতা, অনাচার আর ব্যভিচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত এক দেশ। সেই বর্বর দেশে  ইসলাম ও কোরআনের বার্তা বহনকারী মুছলমানরা এসে সভ্যতার আলো জ্বালালেন। এই ইতিহাস ভারত ও বাংলাদেশের ব্ৰাহ্মণ্যবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদপ্রভাবিত পণ্ডিত-বুদ্ধিজীবী নামধারী একশ্রেণীর মতলববাজরা অস্বীকার করলেও প্রকৃত ইতিহাসে এর সাক্ষ্য আছে।”
*ভারত ও বাঙলায় এ সময়ে (মধ্যযুগে) মুসলিম তুরকী, পাঠান, মোগলরা তাদের শাসনকার্যে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হননি, পরধর্ম ও পরমত সহিষ্ণুতার বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন। আগেই বলা হয়েছে, বাঙলায় মুসলিম সুলতানরা সেই মধ্যযুগে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নিরপেক্ষ এক অখণ্ড স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট- বাঙ্গালা রাষ্ট্র। বাঙলার সুলতানী-নবাবী আমলের প্রায় সাড়ে পাঁচশ' বছরের ঐশ্বৰ্য্যমণ্ডিত ও গৌরবান্বিত ইতিহাস বৃটিশ ভারতের ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ধামাচাপা দিলেও, মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাস দিয়ে কলঙ্কিত করলেও- বিদেশী পরিব্ৰাজকদের লেখায় সত্য ইতিহাস লিপিবদ্ধ রয়েছে। অর্থাৎ মুসলিম শাসনাধীন বাঙলা ও ভারতের সাড়ে সাতশ’ বছরের মধ্যযুগ ছিল গৌরবের যুগ, সোনালী যুগ। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, মধ্যযুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন চর্চায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন শুধু আরব ও স্পেনের মুছলমানরাই করেননি। ভারত উপমহাদেশসহ অন্যান্য দেশের মুছলমানরাও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মুসলিম সুলতানী-নববী শাসনামলে সুবা-বাঙলায় (বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যায়) ইছলামী ধারার শিক্ষাকেন্দ্র গুলিতে  ধর্মিয় বিষয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষা, সাহিত্য,ইতিহাস, ভূগোল,   
জ্যামিতি ও দর্শনের ওপর উচ্চমানের শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা ছিল, যার খ্যাতি ছিল  সারা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে। এমনকি সেই খ্যাতি ১৭৫৭ সালের পর বৃটিশ শাসনের শুরুর দিকেও অক্ষুন্ন ছিল।
*এ প্রসঙ্গে সুরজিৎ দাশগুপ্তের লেখা “রামমোহন : ব্যক্তিতন্ত্র ও বিশ্বতন্ত্র’ গ্রন্থে উল্লেখিত একটি তথ্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। রামমোহন  রায়ের প্রথম জীবনের শিক্ষা-অৰ্জনের ঘটনা প্রসঙ্গে শ্ৰী দাশগুপ্ত লিখেছেন---
নয় বছর বয়সে পাটনা সাহেবে। ফারসী শিক্ষার জন্য গিয়ে তিনি [রামমোহন] দেখেন সেখানে আরবি শিক্ষারও দুর্লভ সুযোগ। এখন তিনি ভালো করে আরবিও শিখলেন। আরবি শিক্ষার সূত্রে তিনি গ্রিক থেকে আরবিতে অনুদিত প্লেটো, এ্যারিষ্টটল প্রভৃতির দার্শনিক রচনাবলী, ইউক্লিডের জ্যামিতি, টলেমীর ভূগোল ইত্যাদি অধ্যয়ন করেন।”
*মধ্যযুগের ভারত ও বাঙলায় মুছলিম শাসকদের শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় বিদ্যুৎসাহিতার এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি এখানে বিশেষভাবে  তুলে ধরা হল----
রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবী মহলের ইছলাম-বিদ্বেষ, আরবী-ফারছি বিদ্বেষ এবং যা কিছু ইসলাম ও মুসলমানের তার প্রতি অবজ্ঞা— এই প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা সম্পর্কে এবং একইসাথে দেশের ইসলামপন্থীদের বিদ্যা-শিক্ষা অর্জনের আজকের চরম দৈন্যদশা সম্পর্কে পাঠকদের সচেতন করার জন্য।
**কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হ’ল— বাংলাদেশের ব্ৰাহ্মণ্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীপুঁজিবাদী ভাবধারা কবলিত এবং মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাস চেতনার দ্বারা প্রভাবিত মধ্যবিত্ত রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী এবং পেটিবুর্জেীয়া সমাজতন্ত্রীরা প্রাচ্যের মধ্যযুগের গৌরবোজ্জ্বল কালকে “বর্বর’, ‘মধ্যযুগীয়া”, “অন্ধকার যুগ’ বলে প্রচার চালিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষকে ইসলাম-বিদ্বেষী করে তোলার প্ৰয়াস চালান।
**ইতিহাস-বিস্মৃতি ও ইতিহাস-বিমুখতা আমাদেরকে এমনভাবে পঙ্গু করে রেখেছে যে, পয়তাল্লিশ বছর ধরে আমরা বাংলাদেশের মানুষ একটি গণতান্ত্রিক জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলছি। কেউ বলছি পাশ্চাত্যের অনুকরণে বুর্জেয়া জাতিরাষ্ট্র কেউ বলছি মধ্যপ্রাচ্যের অনুকরণে ইসলামী রাষ্ট্রের কথা। অথচ সাড়ে সাতশ’ বছর আগে আপেক্ষিকভাবে এই বাঙলার মাটিতেই যে একটি জাতীয় রাষ্ট্রের মনোযোগী হইনি।
*১৮ শতকে ইংরেজরা বাঙ্গালা কে দখল করে তারা সুলতানি নবাবি আমলের বাঙলাকে চুরমার করে দেয়। সেইসাথে সাড়ে পাঁচশ' বছরে গড়ে ওঠা ও বিকশিত হওয়া মূল বাঙালা-ভাষা ও ইতিহাস-সংস্কৃতি ধ্বংস ক’রে দিয়ে বৃটিশরা ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতরা মিলে যে আর্টিফিশিয়াল বাঙলা, বিকৃত বাঙালা-ভাষা (সংস্কৃত-বাঙালা) চাপিয়ে দেয়- তা পুরনো গৌড়বঙ্গের উচ্চবণীয় ব্ৰাহ্মণক্ষত্রিয়দের জন্য আশীৰ্বাদ হয় বটে। কিন্তু মূল বাঙলার বাঙালী জাতির ইতিহাসঐতিহ্য, ভাষা-লিপি, সাহিত্য-সংস্কৃতি মিছমার হয়ে যায়। তার জায়গায় দখলদারিতৃ প্ৰতিষ্ঠিত হয় ইঙ্গ-ব্ৰাহ্মণ্যবাদী ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, লিপি ও সাহিত্য-সংস্কৃতির। ভাষা ও লিপির ওপর গবেষণাকর্ম আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্যবাংলাদেশের জনগণের, বিশেষত বাঙালী মুছলমানের বাঙলা ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির বৃটিশ পূর্বকাল, বৃটিশকাল ও তার পরবর্তীকালের ইতিহাস পর্যালোচনা। তবে বৃটিশ-ভারতে বাঙালী জাতির মূল বাঙলা ভাষা ধ্বংস করে তার ওপর সংস্কৃত বাঙালা চাপিয়ে দেওয়ার কথা এখানে যখন উঠলো তখনবাঙলা ভাষার ওপর বৃটিশ পণ্ডিত বিশ্বখ্যাত ভাষা-গবেষক স্যার জর্জ গ্ৰীয়ার্সনের গবেষণাকর্ম থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরা যেতে পারে বৈকি। এই উদ্ধৃতিটি পাঠ করলে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারব, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের মাধ্যমে বৃটিশদের সহায়তায় ব্রাহ্মণ সংস্কৃত-পণ্ডিতরা কীভাবে মূল বাঙলা ভাষাকে ধ্বংস করে তার ওপর সংস্কৃত চাপিয়ে দিয়েছিলেন। **বাঙালা গদ্য-ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে জর্জ গ্ৰীয়ার্সন তাঁর গবেষণা গ্রন্থে লিখেছেন
When the advent of the English there arose a demand for Bengali) prose literature and the task of supplyer it fell into the hands of Sanskreet-readen pandits. Anything more monostrous than this prose dialect, as it existed the first half of the nineteenth century, it is difficult to conceive, books were written excellent in their subjects, eloquent in their thoughts, in a language from which something like ninety percent of the genuine Bengali
vocabulary was excluded, and its place supplied by words borrowed from Sanskreet, which the writers themselves could not pronounce."
**বাঙালা অনুবাদ ঃ ইংরেজদের আগমনের পর বাঙালা গদ্য ভাষার চাহিদা দেখা দেয় এবং তা যোগান দেওয়ার ভার পড়ে সংস্কৃতনিষ্ঠ পণ্ডিতদের হাতে। উনিশ শতকের প্রথমভাগ অবধি সংস্কৃত পণ্ডিতরা যেসব বাঙালা| গদ্য ভাষা তৈরী করেন তার চেয়ে অধিকতর দুর্বোধ্য ও দানবীয় আর কিছুর কথা ভাবা যায় না। বইপত্র যা লেখা হয়- বিষয়বস্তুতে চমৎকার, চিন্তাধারায় সমুন্নত, কিন্তু তা লেখা হয় এমন ভাষায়, যে ভাষা থেকে শতকরা নব্বইটি প্রকৃত বাঙালা শব্দ বাদ দিয়ে সেসব জায়গায় সংস্কৃত থেকে শব্দ নিয়ে বসিয়ে, যা লেখকদেরও উচ্চারণ করতে কষ্ট হতো।

*জর্জ গ্ৰীয়ার্সন তার গবেষণা গ্রন্থে বাঙ্গালা ভাষা থেকে ব্রাক্ষন পণ্ডিত দারা শতকরা নব্বইটি যে প্রকৃত বাঙালা শব্দ বাদ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর অধিকাংশই ছিল আরবী-ফারহী-উরদু থেকে উদ্ভূত বাঙালা শব্দ, তার সাথে কিছু প্রাকৃত ও অন্যান্য শব্দও হয়তো ছিল। স্যার গ্ৰীয়ার্সন তাঁর দেওয়া উপরোক্ত হিসাবের নিশ্চয়তা দিতে পাদটীকায় বলেছেন- ‘This estimate is based on actual counting. (এই হিসেব সঠিক গণনার ভিত্তিতে দেওয়া)।
*এখানে প্রশ্ন ওঠে, সংস্কৃত জানা হিন্দু লেখকরা যে গদ্য ভাষা থেকে শতকরা নব্বইটি প্রকৃত বাঙালা শব্দ বাদ দিয়েছিলেন সেই গদ্য ভাষা তারা পেলেন। কোথায়? তাহলে নিশ্চয়ই সেরকম বাঙালা গদ্য ভাষার অস্তিত্ব তখন ছিল এবং সেগুলো রচিত হয়েছিল নিশ্চয়ই বাঙালী মুসলমান লেখকদের দ্বারা। (দ্রষ্টব্য : ডক্টর এস. এম. লুৎফর রহমান : বাঙালীর লিপি ভাষা বানান ও জাতির ব্যতিক্রমী ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ১৪৫-১৯০)।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ’ল, যে বাঙলা ভাষা থেকে শতকরা নব্বইটি প্রকৃত বাঙালা শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর রূপ কী ছিল তা গ্ৰীয়ার্সন উল্লেখ করেননি। সম্ভবত ব্ৰাহ্মণদের দ্বারা মূল বাঙলা ভাষা (ফারছি-বাঙালা) ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রমূলক কাজে বৃটিশরা সহায়তা প্রদান করেছিল বলেই গ্ৰীয়ার্সন সাহেব ঐ নব্বইভাগ প্রকৃত বাঙালা শব্দের নাম বা নমুনা উল্লেখ করেননি। যত বড় পণ্ডিতই হোন, সে সময়ে ভারতউপনিবেশে আসা প্রায় সকল ইংরেজদের চরিত্র ও দৃষ্টিভঙ্গী এরকমই ছিল।
**এ থেকে আরেকটি বিষয় অনুমান করা যায়— মধ্যযুগে হিন্দু কবিরা বাঙালা ভাষায় যে-সব কাব্য-গাথা রচনা করেছিলেন তার অধিকাংশই রচিত হয়েছিল আরবী-ফারাছি শব্দ-মিশ্রিত বাঙালায় (ফারাছি বাঙালায়) এবং আরও অনুমান করা যায় ব্ৰাহ্মণ পণ্ডিতরা সেখানেও হাত লাগিয়েছিলেন। তারা সে-সব কাব্যে ব্যবহৃত
আরবী-ফারাছি মিশ্ৰিত শব্দ বাদ দিয়ে তার বদলে সংস্কৃত বা সংস্কৃত-ঘেষা শব্দ বসিয়ে দিয়েছিলেন।
*মধ্যযুগের প্রথমভাগে হিন্দু কবি রামাই পণ্ডিতের “শূন্য পুরাণ'-এর অন্তৰ্গত ‘নিরঞ্জনের রুষ্ণা” কবিতায় (কবিতাটির মূল নাম ‘কলিমা জাল্লাল”) অসংখ্য ফারছি-বাঙালার শব্দের ব্যবহার দেখে আমাদের অনুমান আরও দৃঢ় হয়। এদিকে অতীতের হিন্দু কবিদের কথিত বৈদিক ভাষা’ নামে এক দুর্বোধ্য ভাষায় লিখিত রামায়ণ-মহাভারতসহ বহু লেখালেখিকে পরবতীতে ম্যাক্সমুলারের তৈরী আধুনিক সংস্কৃতে রূপান্তরিত করার একটা চমকপ্ৰদ গুজব তো আছেই। রামাই পণ্ডিতের ‘কলিমা জাদুল্লাল” কাব্যের বাঙালা ভাষা ছিল এইরকম----
রামাই কহে বাবি আন।
হারাম কো উপর হালল কো থান ৷
জেতা লোক বৈঠ কহ রামকা নাম ৷
আদিকা পণ্ডিত রামাই কহে।

তিন হাজার বছর আগের সভ্যতার লীলাভূমি বাংলাদেশ তার আপন ইতিহাস আপন ঠিকানা হারিয়ে ফেলে কখন কি ভাবে ব্রাক্ষণ্য বাদের কবলিত দেশে পরিণত হ্যে পড়ে  এ বাত জুদা লাহে ৷ তিন হাজার বছর আগের সভ্যতার লীলাভূমি বাংলাদেশ তার আপনি ইতিহাস, আপন ঠিকানা হারিয়ে ফেলে কখন, কীভাবে ব্ৰাহ্মণ্যবাদ-কবলিত দেশে পরিণত হয়— সেই শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাসের জগতে পাঠকদের  যেতে ব্যতিক্রমী এই ইতিহাস-পাঠ অনেকের বুকের ভেতর রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তবুও দুশ' বছর ধরে চেপে-রাখা ইতিহাস আমাদের পুনরুদ্ধার করতেই হবে।
**বইঃ আত্মবিস্মৃত বাঙালী – ইঙ্গ- ব্রাক্ষণ্যবাদ ও বাঙালীর ভাগ্য বিপর্যয়ের পর্যালচনা
**লেখকঃ রইসউদ্দিন আরিফ

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ