টপিকঃ বাংলাদেশে সূর্যবাদ – পাঠ দুই (শেষ পর্ব)

বাংলাদেশে সূর্যবাদ – পাঠ দুই  (শেষ পর্ব)

পাঠঃবাংলাদেশে সূর্যবাদ – পাঠ এক https://forum.projanmo.com/topic53830.html
>>আদি মুসাই মুসলমানি শরিয়তঃ 

আদি মুসাই মুসলমানি শরিয়ত শাস্ত্র পুস্তক' নামে একটি মুদ্রিত রচনায় তওরাতের বেশ কয়েকটি অধ্যায় এবং পদের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সৃষ্টিকর্তা সর্বগুণি সর্বশক্তিমান কথা কহিয়া শিক্ষা দিতে দর্শন দিতে সক্ষম।”

**১৯৩২ সালে লিখিত এই রচনাটিতে ঈমান ফকির দাবি করেছিলেন, ‘শ্রীযুক্ত ঈমানউদ্দিন মুসাই মুসলমান এবং মহাক্ষদি নহে। আবার, সৃষ্টিকর্তার শিষ্য সেবক শ্রীযুক্ত ঈমান উদ্দিন সত্য পয়েগাম্বরে ১৩০৮ সনে ২৩শা চৈত্র রাত্রে ১২টায় একলা কামতার মাঠে সৃষ্টিকর্তাকে আত্মসমর্পনে শুনিয়াছেন, সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং কহিয়াছেন, কাহারও নামাজ গ্রাহ্য হয় নাই!’


>>ঈশানী সূর্যবাদে জীবনাচরণঃ
ঈমান ফকিরের সূর্যবাদে জীবনাচরণের তেমন কোনো বিধিবিধান নেই। কিন্তু কিছু সংস্কার-বিশ্বাস আছে। এবং সেইসঙ্গে সামান্য খাদ্যাখাদ্য বিচার ।
এই সূর্যবাদ অন্তত একটি ক্ষেত্রে হিন্দুধর্মের সগোত্র। এর অনুসারীরা হিন্দুদের মতোই পূনর্জন্মে বিশ্বাসী। পরজন্মে কে কোন রূপে পৃথিবীতে আসবে, তা নির্ভর করে কর্মফলের ওপর । পুণ্যবানের পরজন্মে অবশ্যই মনুষ্যজন্ম হয় । কিন্তু যারা অসৎ কর্ম করে, পরজনে তাদের যোনিভেদ বা পেশাগত শ্রেণীভেদ ঘটে। অবশ্যি, এর ব্যতিক্রমও আছে। চোর পরজন্মেও চোর হয়। গোসুলভ কার্যকলাপের ফল পরজন্মে গোযোনি লাভ ।
**খাদ্য ও অন্যন্য বিধিনিষেধঃ
ঈমান ফকিরের সূর্যবাদীদের জন্যে খাদ্য হিসেবে শিং, ট্যাংরা, ঘাডুয়া, পাঙাস, চেলা, কাটালি, লেবু এবং ভাগনা মাছ নিষিদ্ধ। কিন্তু পূর্বোক্ত আদি মুসাই, মুসলমানি বেজি, শকুন, কাক, চিল, ভূতুম, সিং, ঘারুয়া, পাগাস, গোগলা, টেংরা, কাটালি, ভাগনা।"
রচনাটিতে অন্য কয়েকটি বিধিনিষেধের উল্লেখ আছে। যেমন, পোশাক হবে চিলা কোর্তা পায়জামা, কিন্তু মাথায় পাগরি হিন্দুর তরিক ও বাতাসের অভাবে মাথা খারাপ হয় । স্ত্রীলোকের মাথায় রুমাল । ... রোগে মরা পশু অশুচি অখাদ্য । পশু কোরবানি নিষিদ্ধ ।
সৎভাবে জীবনযাপনের জন্যে সব ধর্মেই কিছু উপদেশ-নির্দেশ দেওয়া হয়ে থাকে। এগুলি ধমীয় জীবনবিধি বা code of life-এর অঙ্গ।
ঈশান ফকিরের সূর্যবাদ বা সৌরধর্মেও এমনি কিছু উপদেশ-নির্দেশ পাওয়া যাবে, যদিও সেগুলি ঠিক গোছালো নয়। শ্রীযুক্ত ঈমান ফকিরের ৫ পাস জীবনী থেকে উদাহরণত অংশবিশেষ উদ্ধৃত —
কুসঙ্গে থাকা চেয়ে একাকি থাকা ভাল,
কুসঙ্গে নামাজ চেয়ে একা নামাজ ভাল।
কুশিক্ষা পাওয়া চেয়ে অশিক্ষীত ভাল,
কুবিবাহ চেয়ে অবিবাহ থাকা ভাল ।
পরের ধরে গরের বাহির করার চেয়ে
মরে নিজে ঘরের বাহিরে বসা ভাল। 
গাঙ্গে ভাঙ্গা চেয়ে ঘর ভাঙ্গি সরা ভাল,
রোগে মরা চেয়ে সূর্যকে দেওয়া ভাল।
মাটি ভিন্ন মূল গাছ বাচে না যেমন,
চাদ সূর্য ভিন্ন প্রাণী বাচে না তেমন।
কলা গাছ পাকা ফল মরে হবে মাটি,
গুপ্ত মাথা দ্বারা জন্ম শিষ্য পোলা খাটি ।
যিনি যত ভক্তি করে তত শক্তি পান
যিনি যত জলে নামে ততই ভিজেন ।
ভাল জলে ভিজিলে ভাল গুণ পায়েন
ভাল জনের সন্তান আলো প্রিয় হন।*
>>উপাসনাবিধি
ঈমান ফকিরের সৌরপুরাণ বলে, সৃষ্টির আদিতে ছিলো কেবল পানি। তারপর আসে মাটি এবং তার থেকে বিভিন্ন প্রাণী, গাছপালা ইত্যাদি সবই সূর্যের সৃষ্টি । এবং সূর্যই মানুষের আদি পিতা । আদি মাতা চন্দ্র ।
“”””যেহেতু নারী পুরুষের মিলন ভিন্ন সন্তানের জন্ম সম্ভব নয়, সেইজন্যেই সূর্য চন্দ্রকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন । এহেন সূর্যের উপাসনাবিধির আদিতম লিখিত উল্লেখ আছে আদি মুসাই মুসলমানি শরিয়ত পুস্তক’ শীর্ষক রচনাটিতে। সেখানে ঈমানউদ্দিন লিখেছেন---রাত্রে বা ঘরের গুরুর মতে, তাদের সৌরধর্মে উপাসনায় কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নেই। একত্রিশ বছর তার সৌরধর্ম প্রচার করে মুসাই মুসলমান ঈমানউদ্দিন তার শিষ্যদের যা বলে গেছেন, তার সারাংশ :

*বৃহস্পতিবাররে তরিকা’-র সবাই মিলে ঈমান-তরিকা’ (অর্থাৎ ঈমান ফকিরের সূর্যবাদ) নিয়ে আলোচনা এবং ভালো হওয়ার চেষ্টা করবে। উপাসনা তথা প্রার্থনার বিধি ; ভক্ত কোনো নির্জন মাঠে বা পবিত্র উঠোনে, পবিত্র হাওয়ায় বসে বা দাড়িয়ে চাদ-সূর্যের উদ্দেশে একবার নমস্কার এবং তারপর একবার সেজদা করবে। রৌদ্র, মেঘ, বৃষ্টি, শব্দ, গর্জন, তুফান, তাপ— এসবও নমস্কার এবং সেজদালাভের অধিকারী । কেননা, চাদ-সূর্য ভিন্ন এগুলো হয় না । রাত্রে অথবা অন্য কোনো সময় চাঁদ-সূর্য দৃশ্যমান না থাকলে দীপ জ্বলিয়েও তাকে চাদ-সূর্যের প্রতীক রূপে ধরে নিয়ে তার উদ্দেশে নমস্কার এবং সেজদা করা যাবে। ঈমান-তরিকা'-র উপাসনা তথা সাধনপদ্ধতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ জিকির । এর বর্তমান গুরুর মুখে শ্রুত উক্ত জিকিরের বাণী নিম্নরূপ—
এক এক—হক হক—
নামে কামে রূপে গুণে—হক হক
সৃষ্টিকর্তা চাদ-সূর্য—হক হক
শিক্ষাদাতা চাদ-সূর্য—হক হক
দীক্ষাদাতা চাদ-সূর্য—হক হক
আহারদাতা চাদ-সূর্য—হক হক ।
* শ্রীযুক্ত ঈমান ফকিরের ৫ পাস জীবনী, পৃঃ ২-৪

>>মরণচাদ মুনশীঃ
বাংলাদেশের এই অর্বাচীন সূর্যবাদের বর্তমান গুরু মুসীগঞ্জের মরণচাদ মুনশী। তার দেওয়া তথ্যাদি থেকে জানা যায়, ঈমানউদ্দিন ফকিরের প্রধান শাগরেদ ছিলেন মতলব উপজেলার গণি মিয়া আর দিল মোহাম্মদ সরকার, ছেঙ্গারচরের ছির দেওয়ান এবং পাচগাছিয়ার মুসলিম ফকির আর ইবরাহীম ফকির। মরণ মুনশী ওরফে মরণ ফকির একই সঙ্গে প্রথমোক্ত তিনজনের কাছে বায়েত নেন। তার পূর্বপুরুষরা পুরষানুক্রমে মসজিদের ইমামতি করেন। প্রথম জীবনে তার মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটে। তখন নানাজনের পরামর্শে রোগমুক্তির জন্যেই তিনি ঈমান ফকিরের প্রথমোক্ত তিন শাগরেদের কাছে বায়েত নেন। এই বায়েত তথা দীক্ষা নেয়ার বিশেষ কোনো পদ্ধতি ছিলো কি না, মরণচাদ মুনশী সে-সম্পর্কে কিছ বলেন না। কিন্তু তিনি জানান, তাকে দীক্ষা নিতে হয় বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না-করা এক শিরনি খেয়ে। শিরনির উপকরণ ছিলো ---আখের গুড়, দুধ এবং আতপ চাল। এগুলি রান্না করা হয় সারা রাত ধরে এবং মরণ মুনশী ভোরবেলা এই শিরনি খেয়ে চাদ-সূর্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন । এমনিভাবে সূর্যবাদ গ্রহণের পরই তার রোগমুক্তি ঘটে।
ঈমান ফকিরের সূর্যবাদ গ্রহণের পর মরণচাদ মুনশীকে নাকি বহুবিধ কষ্ট এবং ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এমনকি পৈতৃক বসতবাটী এবং জমিজমা তিনি রাখতে পারেননি। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের চাপের মুখে তাদের পঞ্চাশ হাজার টাকার বাড়ি নাকি মাত্ৰ পাচশো টাকায় এবং জমিজমা পানির দামে বিক্রি করে পৈতৃক ভিটে থেকে সরে যেতে হয়। যতো দূর জানা গেছে, ঈমান ফকিরের সূর্যবাদের অনুসারীর সংখ্যা এখন অতি নগণ্য। মরণচাদ মুনশীর দাবি, তার ছেলেরা সূর্যবাদী এবং ভাইয়েরা মনে মনে ঈমানতরিকা’র অনুসারী। অন্য কেউ তাদের সূর্যবাদ মানেন কি না, তিনি বলতে পারেন না।
>>ভক্তিমূলক গানঃ
লৌকিক এবং অভিজাত উভয় শ্রেণীর ধর্মেই সাধনার এক অনুষঙ্গ ভক্তিমূলক গান। ঈমান ফকিরের সূর্যবাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। যতো দূর জানি, ঈমান ফকির থেকে শুরু করে তার সর্বশেষ বিশিষ্ট অনুসারী মরণচাদ মুনশী অবধি সবাই কিছু-নাকিছু ভক্তিগীতি রচনা করেছেন। এ ছাড়াও আছে বেশ কিছু পদ্য জাতীয় রচনা—
যেগুলি এক দিকে তাদের মতবাদ প্রচারের প্রয়াস, অন্য দিকে অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের সমালোচনা কিংবা সেসব অনুসারীরা ঈমান-তরিকা-বিরোধী সমালোচনার জবাব । ঈমান ফকিরের তিনটি পদ্য এবং দুখানি গান আছে। মরণচাদ মুনশী কাছ থেকে পাওয়া গেছে বাইশখানি গান । এগুলির সবই তার রচনা কি না, সে-বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানা যায়না । লেখাগুলির গঠন দেখে  সন্দেহ করবার কারণ আছে, সব রচনা তার নয়।
*সন্দেহের প্রথম কারণ বিভিন্ন গানের মধ্যে ভাষার তথা রচনাশৈলীর কিছু পার্থক্য, যা সহজেই চোখে পড়ে। *দ্বিতীয়ত, ঈমান ফকিরের দুখানি এবং মরণচাদের দেওয়া গানগুলির তিনখানি ছাড়া বাকি সব গানেই রাগ-রাগিণীর উল্লেখ মেলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তালেরও । কিন্তু মরণচাদের উপরি-উক্ত তিনখানি গানে কোনো রাগ বা তালের উল্লেখ নেই। অতি কাচা হাতের রচনা, এগুলিকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন কেবল মারফতি গান’ নামে ।

>>ভক্তিগীতির নমুনাঃ
ঈমান ফকির এবং মরণচাদ মুনশীর ভক্তিগীতির নমুনা হিসেবে এখানে দুখানি গান উদ্ধৃত করছি। প্রথমখানি ঈমান ফকিরের রচনা। এখানি পাওয়া গেছে মুদ্রিত আকারে—
খাম্বাজ ঠুংরি
সুন্দর সুন্দর করুণা সুন্দর , সুন্দর যৌতি সূর্যরী
আমি তাকে না দেখিলে শীতে মরি,
সূর্য ধন্য সূর্য মহামান্য আমি তাকে প্ৰণিপাত করি,
সূর্য ধন্য সূর্য মহামান্য ।
সুন্দর সুন্দর করুণা সুন্দর, সুন্দর চকচকে তিলপুস্প ধান্য যাহারী,
সুন্দর সুন্দর করুণা সুন্দর, সুন্দর পৃথিবী সূর্যের,
আমি তাহাকে ছজুদা করি, প্রভু সূর্য ধন্য।
সুন্দর সুন্দর করুণা সুন্দর, সুন্দর সূর্যমুখি পুষ্প সুগন্ধ সূর্যের ।
আমি তার সুগন্ধে স্বৰ্গপুরী। আমি তার চরণ চুম্বনকারী,  শ্রীযুক্ত ঈমান ফকির সাং তথা।”
এ-রচনায় কাব্য বা গীতময় বাণীর মাধুর্য নেই। কিন্তু লক্ষণীয়, রচকের ভাষাজ্ঞানের কিছুটা পরিচয় এতে আছে যদিও তা আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট । তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না— কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, খানিকটা ইংরেজি আর আরবি জানতেন ।* ঈমান ফকিরের জীবনী: পূঃ ৪
**তার ওপরে-উদ্ধৃত রচনার তুলনায় মরণচাদ মুনশীর রচনা একেবারেই তুচ্ছ। এখানে তার একখানি মারফতি গান উদ্ধৃত করা হচ্ছে—
ওগ সকালে উঠে আলো সূর্যর কিরণে
নিজ গুণে করে আছে আলো নিজ গুণে
আমি কুটি কুটি ছালাম জানাই গো
তার দয়া গুণে ওগ তার দয়া গুণে । ...

>>ঈমান-তরিকার গুরুত্ব বিচারঃ
সবশেষে প্রশ্ন ওঠে, ঈমান-তরিকা তথা ঈমান ফকিরের সূর্যবাদের গুরুত্ব কী? এখানে তার বিস্তারিত আলোচনা করবার কোনো অবকাশ নেই– প্রয়োজনও নেই বললেই চলে। বিশেষত, তার অনুসারীর নগণ্য সংখ্যা, জীবনবিধির অভাব ইত্যাদির কথা ভাবলে আলোচনার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু এক দিক থেকে দেখলে, এই সূর্যবাদটির গুরুত্ব অপরিসীম। ঈমান ফকিরের দাবি যেমনই হোক-না কেন, এটি আসলে তার সংস্কার-বিশ্বাসজাত একটি লৌকিক ধর্ম।
লৌকিক ধর্মই পৃথিবীর আদিতম ধর্ম, যদিও তার উদ্ভব সর্বত্র একই নামে বা একই সময়ে ঘটেনি। এদিকে, মানুষের ক্রমসঞ্চিত অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসারের ফলে অধিকাংশ লৌকিক ধৰ্মই ক্রমে ক্রমে অবলুপ্ত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য লৌকিক ধর্মের মধ্যে এখন টিকে আছে কেবল শিন্তো, তাও আবার একাধিক প্রবর্তিত তথা অভিজাত ধর্মের প্রভাবে তার মূল রূপ অনেকাংশে হারিয়ে । এমন পরিস্থিতিতে নতুন লৌকিক ধর্মের উদ্ভব অকল্পনীয়। কিন্তু ঈমান ফকিরের সূর্যবাদের উদ্ভব তো এমনি পরিস্থিতিতেই হয়েছে। এবং তার বয়েস বিচার করলে প্রায় নিঃসঙ্কোচেই বলা চলে, এটি পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ ধর্ম। এর সম্পর্কে তাই বিস্তারিত না হোক কিছুটা আলোচনা—এমনকি, গবেষণারও—প্রয়োজন অবশ্যই আছে।

---------------------শেষ


-----------------------------------------------------

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ