টপিকঃ এতো ত্যাগের মূল্য কোথায়?

বিগত দিনগুলিতে দেশে অব্যাহত শিশু নির্যাতনের নির্মমতার মিছিলে যুক্ত হলো আরও একটি নাম সুবর্ণা (৬)। মাতৃহীন এই শিশুটিকে পোষ্য হিসেবে নিয়েছিল মুন্সীগঞ্জ সদরের বল্লালবাড়ী এলাকার সিরাজ মাদবরের স্ত্রী কল্পনা বেগম। কিন্তু বিকৃত মানসিকতার শিকার এই শিশুটি কপালে স্নেহের পরিবর্তে জুটেছে গৃহকর্মীর জীবন। ভাগ্যের পরিহাস মেনে এই অবোধ শিশুটি তার ছোট ছোট হাতে প্রাণপন চেষ্টায় গৃহস্থালীর সকল কাজ করার পরও নিশ্চিত করতে পারেনি তার ছোট পেটের দুমুঠো খাবার, পরনে জোটেনি কোনদিন কোন ভাল কাপড়। নির্মম নির্যাতনে অতীষ্ট প্রতিবেশীরা শিশুটিকে উদ্ধারের পর জানা গেছে তাকে দিনের পর দিন অমানুসিক নির্যাতনের কলঙ্কময় ইতিহাস। সাড়া শরীরে তার জখমের চিহ্ন। মাথায় কোপের আঘাত, ঘাড়ে ছেঁকা, গলায় মারধরের কালো দাগ, বুকে পোড়া দাগ, চোখে কালো দাগ। তার ছোট শরীরে নির্মম নির্যাতনের অসংখ্য ক্ষতের বিভৎসতায় চ‌রম লজ্জায় পতিত হয়েছে মানবতা। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক জানিয়েছেন, মেয়েটি দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নির্যাতনের শিকার – তার চোখেও  ইনফেকশন হয়ে গেছে। এ বিষয়ে কল্পনা বেগমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পরম ঔদ্ধত্যে জবাব দিয়েছে, ‘ও আমার মেয়ে। ওকে আমি মারব, কাটব সেটা আমার ব্যাপার। ঘরের মেয়ে ঘরের কাজ না করে কি অন্যের বাড়িতে কাজ করবে? মাইরের কাজ করেছে তাই মেরেছি।’ কি অদ্ভুত বৈপরীত্যের সহাবস্থান এই বাংলাদেশে। রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা গণতান্ত্রিক সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক নেতৃত্বের বিশ্ববিজয়ী সাফল্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিষ্ময়কর অগ্রযাত্রা যখন বিশ্বের আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে ঠিক তখনই মানবিক মূল্যবোধের এই চরম অধঃপতন আমাদের সব জাতীয় অর্জনকে যেন ম্লান আর অর্থহীন করে তুলেছে। বিগত বছরের তুলনায় দেশবাসীর মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় ১৫০ ডলার, জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭ এর উপরে – কিন্তু দেশে মানবিকতার চূড়ান্ত বিপর্যয়ে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অব্যাহত আগ্রাসন। কি হবে এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে যদি সমাজে নারী আর শিশুদের নিরাপত্তা না থাকে? সমাজে মানবিক মূল্যবোধের সুস্থ বিকাশ না ঘটে? ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত আর ৩ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক চেতনা হৃদয়ে লালন করা বাংলাদেশের এতো ত্যাগের মূল্য কোথায়? ব্যক্তির জীবনে যেমন স্বাচ্ছল্যের চেয়ে স্বাচ্ছন্দ আর স্বস্তির গুরুত্ব অপরিসীম, সম্পদের চেয়ে সৎকর্মশীল সন্তানের গুরুত্ব বেশি - ঠিক তেমনি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি জনগণের মাঝে সচেতনতা আর মানবিক মূল্যবোধের চর্চা যদি সমাজ জীবনের অপরিহার্য বিশ্বাস রুপে বিকশিত না হয় তবে নৈতিকতাহীন জাতির বিবেকের অন্তঃসারশূন্যতা আমাদেরকে অচিরেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করবে। মানবিক মূল্যবোধের চর্চাই মানুষকে সৎ আর সুন্দর হতে সাহায্য করে। আগামীতে মানবিকতাবোধে উজ্জীবিত সচেতন নাগরিকেরা দেশের ভবিষ্যৎকে মঙ্গল আলোয় উদ্ভাসিত করার পাশাপাশি অন্যদের মাঝেও এই মূল্যবোধের চর্চা ছড়িয়ে দিবে – এটাই সকলের প্রত্যাশা।