টপিকঃ নেটিভ আমেরিকান প্ৰবাদ প্রবচন

নেটিভ আমেরিকান প্ৰবাদ প্রবচন
অনেকদিন ধরে  লোক মুখে প্রচলিত জনপ্রিয় উক্তি যার মধ্যে সরল ভাবে জীবনের কোনো গভীরতর সত্য প্রকাশ পায় সেগুলো  প্রবাদ বা প্রবচন নামে অভিহিত হয়ে থাকে। কোনো স্বচ্ছন্দ, আন্তরিক কথাবার্তায় বা বর্ণনায় বক্তব্যকে চমকপ্র করে ইঙ্গিত ময় করে তোলার ক্ষেত্রে সাধারণত প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার হয়ে  থাকে । নতুন অর্থে এর ব্যবহার হয় না বললেই চলে।
>হোপিনেটিভ আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের কিংবদন্তির সংগ্রাহক ও লেখক এক্কহার্টমালোটকি, মিথ, কিংবদন্তি, গাথা আরো নানা প্রকারের মৌখিক সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে বলেছেন মৌখিক শিল্পকর্ম।
দেশজ প্রবাদ-প্রবচনগুলি সেই দেশের সংস্কৃতির মন্থন থেকেই উঠে এসেছে। এই প্রবচনগুলি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় দেশজরা প্রকৃতির কত কাছাকাছি ছিল । প্রকৃতি ও দৈবশক্তি এই দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে তাদের জ্ঞান ও বিশ্বাসতন্ত্র । তার সঙ্গে আছে গভীর ইতিহাস সচেতনতা। যেমন --
“যে মানুষের কোনো ইতিহাস নেই, তারা বাফেলোঘাসের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতন। অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী।”--‘স্যু’
>>নিচে নেটিভ আমেরিকান প্ৰবাদ প্রবচনের কিছু উধহরন তুলে ধরা হল---

>>আদিবাসীদের প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার কয়েকটি উদাহরণ --
* প্রতিটি গাছপালাই হল আমাদের ভাই-বোন, আমরা যদি মন দিয়ে শুনি, তাদের কথা শুনতে পাব।—আরাপাহো

*প্রতিটি পশুপাখিই তোমার চেয়ে বেশি বোঝে —নেজপার্স
* বসন্তে ধীরে পা ফ্যালো! জননী প্রকৃতি গৰ্ভিনি।—কাওয়া
*আমরা ধরিত্রী মাতার থেকে তৈরি এক ধরণিতেই ফিরে যাব।–সেনানডোয়া

>>দেশজদের কিছু সামাজিক শৃঙ্খলার শিক্ষাও আছে, যা মানুষকে সুপথে পরিচালিত করে। একটা সুস্পষ্ট ‘সৎ' এবং অসৎ’ ভেদাভেদ করার রীতি তাদের সমাজে আছে। যেমন—
*সোজা ছুটে যাওয়া তীরের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ভালো ভালো মোকসিন (জুতো) -এর পদচিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়।一স্যু
*আমাদের প্রথম শিক্ষক হল, আমাদের হৃদয়।--সাইনি
*দিন ও রাত্রি কখনও একত্ৰিত বসবাস করতে পারে না।–অঙ্গাত
*মিথ্যাবাদীর কথা শোনা যেন, গরম জল পান করার শামিল।-অঙ্গাত
*ন্যায় এবং অন্যায়-দুইয়ের ওপরই বৃষ্টি সমভাবে পড়ে —হোপি।
*একজন সৎ দলনেতা (চিফ)। কখনও কারও কাছে কিছুচায় না। বরং দেয়। —মোহক
*মন দিয়ে শোনো। না হলে তোমার জিহ্বা তোমাকে বধির করবে।-অঙ্গাত
*তোমার ক্ৰোধ-কে কখনও তোমাকে বিষিয়ে দিতে দিয়ে না। —হোপি

>>দেশজদের অনেক রকম প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে, খাদ্যভাব ও শত্রুর প্রতিনিয়ত আক্রমণ তাদের জীবন যাত্রাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে।বিশ্বাসঘাতকতা করেছে লোভের  বশবতী হয়ে। কিছু প্রবাদে এই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
*রাতের গভীরে সব বিড়ালই বাঘ।—জুনি।
*কোথাও একটা কয়োটি অপেক্ষা করে থাকে। এবং কায়োটি সবসময়ই ক্ষুধার্ত হয় -নাভাহো
*ক্ষুধার্তমানুষ নেকড়ের সঙ্গে-ও যেতে পারে। —ওকলাহোমা।

>>হাতে কলমে শিক্ষা, স্বাবলম্বী ও স্বাধিকার সম্পর্কে দেশজরা খুব সচেতন, কিছু প্রবাদে তার পরিচয় স্পষ্ট—-অঙ্গাত
*আমাকে কিছু বললে আমি ভুলে যাব, কিছু দেখালে সেটা মনে নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমাকে কাজে নিযুক্ত করো, তবে দেখবে, আমি ঠিক অনুধাবন করতে পেরেছি। -অঙ্গাত
*প্রতিটি মানুষের নিজের তির নিজেই বানানো উচিত।—উইনেবেগো ।
*এক বৃষ্টিতে ফসল ফলে না।—ক্রিয়ল।
*মুখের বাজপাত কম থাকাই শ্রেয়। বরং হাতে শক্তিশালী বিদ্যুৎলত ধারণ করা।— অ্যাপাচে |
>>প্ৰতিবেশীর আচরণ বিধি সম্পর্কিত প্রবচন---
*যে পাত্ৰটি তুমি গতরাতে পড়শির থেকে ধার করেছ, তাতে রান্না করা কিছুটা খাবার পড়শিকে পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো।-অঙ্গাত
*পড়শির চরিত্ৰ তুমি তখনই বিচার করবে, যখন তার মোকসিন পরে তুমি দুই রাত হাঁটবে। --সাইনি
>>জীবনদর্শন, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মৃত্যু সম্পর্কিত প্রবাদ---
*মনুষ্যজাতি নিজের জীবন জাল নিজে বোনো না, আমরা এই জালের একটি সুতো মাত্র। আমরা জীবন জালের প্রতি যা ব্যবহার করব, তা আমাদের নিজেকেই প্রভাবিত করবে। প্রতিটি বস্তুই একে অপরের সঙ্গে গভীর বন্ধনে আবদ্ধ।—চিফ সিয়াটল (নেটিভ চিফ)
*পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত খুঁজলাম। জলের গভীর তলদেশ, আকাশের শেষ সীমা, এমনকি পর্বতের শেষ খাজটুকুও খুঁজতে বাকি রাখিনি। তবুও এমন কাউকে পেলাম না যে আমার বন্ধু নয়।—নাভাহো
*জীবন কখনও মৃত্যুর থেকে পৃথক নয়। তা শুধু দেখতেই ওরকম লাগে।—ব্ল্যাকফুট
>>ইতিহাসবোধ সম্পর্কিত চেতনা ও বিশ্ববন্ধুতা এবং সংরক্ষণ---
*কোনো নদী তার উৎসে ফেরে না, যদিও প্রতিটি নদীর-ই কোথাও না কোথাও একটা শুরু আছে। ---অঙ্গাত
*একটা গল্প বলার জন্য হাজার কণ্ঠের প্রয়োজন হয়।--অঙ্গাত
*আমাদের পিছনে ফেলে আসা চিহ্নগুলিই আমাদের চিনিয়ে দেবে।--অঙ্গাত
*পৃথিবীকে যখন স্পর্শ করি, জগতের সুরে নিজেকে মিলিয়ে দিতে চাই।—ওগলালা
*সুৰ্য আমরা এই বসত জমি পূর্বপুরুষের কাছ থেকে উত্তরাধিকারী সূত্রে পাইনি, বরং আমাদের সন্ততিদের কাছ থেকে তা ধার করে ব্যবহার করছি।--অঙ্গাত
*শ্বেতাঙ্গদের প্রতি দেশজদের মনোভাব----
*যখন সাদা মানুষগুলো এই দেশটা আবিষ্কার করল, তখন আমাদের মানুষরা আগে থেকেই দেশটা চালাচ্ছিল। কোনো কর দিতে হত না। কারও কোনো ঋণ ছিল না। মেয়েরা সবাই নিপুণ ভাবে ঘরের কাজ করত। আর সাদারা ভাবল কিনা, এই সুন্দর ব্যবস্থাটাকে বুঝি আরও ভালো করবে।— প্রাচীন চেরোকি।
>>স্বভূমি থেকে উচ্ছেদের বেদনা----
*এবার স্বভূমি থেকে আস্তে আস্তে বিদায়ের পালা। এই দেশ, এই ভূমি মহানপুরুষ আমাদের দিয়ে গিয়েছিল আমাদের পিতৃপুরুষকে। যে মাটি আমাদের জন্ম দিয়েছে, তাঁকে ফেলে চলে যাওয়ার যে কী বেদনা! ওই শ্বেতাঙ্গদের তাড়নায় ছেলেবেলাকার সব চিহ্নগুলো থেকে বিদায় নিতে হবে।—এক চেরোকি চিফ ।
সুত্র----- নেটিভ আমেরিকান সংস্কৃতিক রূপরেখা –নন্দদুলাল আচার্য রুমি ভট্টাচার্য

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ