টপিকঃ বাংলার ভৌগোলিক পরিচয়ঃ তিন

বাংলার ভৌগোলিক পরিচয়ঃ দুইhttp://forum.projanmo.com/topic53521.html



>বাংলার ইতিহাস রচনা করেছে বাংলার ছোট বড় অসংখ্য নদনদী। এই নদনদীগুলিই বাংলার প্রাণ;  বাংলাকে গড়েছে, বাংলার আকৃতি-প্রকৃতি নির্ণয় করেছে যুগে যুগে, এখনও করছে। এই নদনদীগুলিই বাংলার আশীর্বাদ এবং প্রকৃতির তাড়নায়, মানুষের অবহেলায় কখনও কখনও বোধ হয় বাংলার অভিশাপ —নীহারঞ্জন রায়ের এই উক্তিতে বাংলার ভূপ্রকৃতিতে নদীর গুরুত্ব খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
বাংলার বিস্তীর্ণ ভূভাগ নদীবাহিত পলিদ্বারা গঠিত এবং পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব বাংলার কিছু অংশ ছাড়া বাংলার প্রায় সবটাই ভূতত্বের আলোকে নবসৃষ্ট (new alluvium)। পশ্চিম, উত্তর ও পূর্বদিকের সীমান্তবতী পর্বতমালা ছাড়া বাকি সবটাই সমতলভূমি এবং এই সমগ্র ভূভাগই নদীমালার বদ্বীপ বা ডেল্টা বলে মত প্রকাশ করেছেন।
>ওল্ডহাম – পশ্চিমে হুগলী নদী হতে পূর্বে মেঘনা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগকেই  গঙ্গা – ব্ৰক্ষ্মপুত্র নদী মালার ডেল্টা ।
বাংলার ভূমিগঠনের ভূতাত্বিক বিশ্লষণ করে কোন অংশ মূলত ‘ডেল্টা সে বিষয়ে বাগচী আরও তথ্য পরিবেশন করেছেন। বাকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম এবং মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমাংশ, ছোটনাগপুর পর্বত শাখারই বিস্তৃতি, এই ভূভাগের অন্তঃস্থলে কঠিন উপরিভাগে সামান্য পলি; মেদিনীপুরের পূর্বাংশ পিডমন্ট' (Piedmont) সমভূমি। উত্তরে তরাই অঞ্চল থেকে দক্ষিণে পদ্মার প্রবাহ এবং পশ্চিমে গঙ্গা-পদ্মা থেকে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত ভূভাগ, কিংবা ব্ৰহ্মপুত্র-সুরমা অন্তর্বর্তী ভূভাগ মূলত পাললিক প্রকৃতির, তবে অপেক্ষাকৃত প্রাচীন। উত্তর-পূর্বে ও পূর্বে অবস্থিত সিলেট-ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম পর্বতমালা টারশিয়ারী পাহাড়। উত্তরে পদ্মা, পশ্চিমে ভাগীরথী, পূর্বে মেঘনা এবং দক্ষিণে সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগ মূলত প্লাবন সমভূমি এবং গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র দ্বারা গঠিত বদ্বীপ বা ‘ডেল্টা ।
তাই ভূপ্রাকৃতিক গঠন বৈশিষ্ট্যের আলোকে বাংলার পাচটি ভাগ ধরা যায়:
১. উত্তর বাংলার পাললিক সমভূমি,
২. ব্ৰক্ষ্মপুত্র-মেঘনা অন্তবতী ভূ-ভাগ,
৩ ভাগীরথী মেঘনা অন্তবতী বদ্বীপ,
৪. চট্টগ্রামাঞ্চলের অনুচ্চ পার্বত্য এলাকা এবং
৫. বর্ধমানাঞ্চলের অনুচ্চ পার্বত্য এলাকা ।
উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে বাংলার ভূপ্রকতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নদীমালার। প্রধান নদীগুলোর স্রোতধারাই বাংলাকে মূলত চারটি বিভাগে বিভক্ত করেছে :
উত্তর,
পশ্চিম,
মধ্য ও
পূর্বভাগ।
প্রত্যেকটি ভাগেরই যেমন রয়েছে নিজ নিজ ভৌগোলিক সত্তা, তেমনি রয়েছে ঐতিহাসিক সত্তা। যুগে যুগে নদীর খাত পরিবর্তিত হওয়া, পুরোনো নদী মজে যাওয়া, নতুন নদীর সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাছাড়া সমভূমিতে নদীর এই প্রক্রিয়া অধিকতর বলে অনেকেই মনে করেন ।
>অষ্টাদশ শতকে রেনেলের, সপ্তদশ শতকে ফানডেন ব্রোকের এবং ষোড়শ শতকের জাও দ্য বারোসের নকশায় বাংলার নদীগুলোর গতিপথ অনেকটা স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে। এই তিনটি নকশার তুলনামূলক বিচারে এই তিন শতাব্দীর মধ্যে নদীর গতিপথের পরিবর্তন আমাদের কাছে অনেকটা স্পষ্ট। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বের অবস্থা জানতে প্রাচীন সাহিত্যে ও লিপি-মালায় নদীসমূহের প্রবাহপথের যে সামান্য ইঙ্গিত পাওয়া যায় তা থেকে প্রাচীন যুগে তাদের অবস্থিতি ও পরিবর্তন সম্বন্ধে কিছু ধারণা করা সম্ভব। তবে সে ধারণা কোনমতেই পূর্ণ বা স্পষ্ট নয়।
>বাংলার নদনদীর মধ্যে গঙ্গাই প্রধান। রাজমহল পাহাড়ের উত্তর-পশ্চিমে তেলিগড় ও সিক্রিগলি সংকীর্ণ গিরিবত্মই উত্তর ভারত থেকে গঙ্গার বাংলায় প্রবেশপথ এবং গিরিবত্ব ছেড়ে রাজমহলকে স্পর্শ করে গঙ্গা বাংলার সমতলভূমিতে প্রবেশ করেছে। সমতল ভূমিতে যাত্রা শুরু করেই গঙ্গার দুটি প্রধান প্রবাহ লক্ষ করা যায়— একটি পূর্ব-দক্ষিণগামী, নাম পদ্মা,  অন্যটি সোজা দক্ষিণমুখী, নাম ভাগীরথী।
>ভাগীরথী বর্তমানে জঙ্গীপুর, লালবাগ, কাটওয়া, নবদ্বীপ ও কলিকাতার পাশ-দিয়ে ডায়মন্ড হারবারের নিকটে সমুদ্রে পড়ছে। পদ্মা, বর্তমানে গঙ্গার মূল প্রবাহ, পূর্বদক্ষিণগামী হয়ে বাংলাদেশের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং চাদপুরের নিকটে মেঘনার সাথে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে জলপ্রবাহ উৎসারিত করছে।
জলবিজ্ঞানের (Hydrography) দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগীরথীই গঙ্গার প্রথম ও আদি প্রবাহ বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। >টলেমি (দ্বিতীয় শতক) গঙ্গার পাচটি মুখের কথা উল্লেখ করেছেন এবং সর্বপশ্চিমের মুখ থেকে সর্বপূর্বের মুখের দূরত্ব প্রায় চার ডিগ্রি নিরূপণ করেছেন।
ভাগীরথী ও পদার মুখের দূরত্ব প্রায় তাই; সুতরাং ঐ সময়েই এই দুটি মুখের অবস্থিতির কথা প্রামাণ করে।
>স্পষ্টতই গঙ্গার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব বাহিনী দুটি প্রবাহকেই কৃত্তিবাস (১৪১৫-১৬) যথাক্রমে ছোটগঙ্গা ও বড়গঙ্গা বলে উল্লেখ করেছেন এবং প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য ও লিপিমালার প্রমাণে গঙ্গা-ভাগীরথীই প্রাচীনতরা ও পুণ্যতোয়া নদী সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নাই ॥
>রেনেলের মানচিত্রে ভাগীরথী নদী জঙ্গীপুর, মুর্শিদাবাদ, কাসিমবাজার, বুরহামপুর পলাশী, কাটুওয়া, আহগদ্বীপ, নুদিয়া, মির্জাপুর, বাশবারিয়া, হুগলী, চন্দননগর, সেরামপুর, কলিকাতা, বজবজ ও ফলতা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগরে পড়ছে।
>বিপ্রদাসের মনসামঙ্গল” কাব্যে (১৪৯৫) ভাগীরথীর প্রবাহের সুন্দর বর্ণনা রয়েছে ।
>ফান্‌ডেন ব্রোক (১৬৬০)-এর মানচিত্রেও ভাগীরথী সুতি, কাসিমবাজার, পলাশী, নদীয়া, ত্রিবেণী, সাতগাও, হুগলী, ব্যান্ডেল, চন্দননগর, কলিকাতা প্রভৃতি শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে।
>এই তিনটি সূত্রের বিবেচনায় একথা বলা যায় যে পনেরো শতক থেকে সতেরো শতক পর্যন্ত ভাগীরথীর পতিপথ কলিকাতা পর্যন্ত খুব একটা বদলায় নি। কিন্তু সমুদ্রে উৎসারিত হওয়া প্রবাহ বিভিন্ন ছিল।
বিপ্রদাসের বর্ণনায় আদিগঙ্গা প্রবাহই কলিকাতার নিম্নভাগে মূল প্রবাহ ছিল বলে মনে হয় এবং ফান্‌ডেন ব্রোকের নকশায়ও তা দেখানো হয়েছে। কিন্তু রেনেলের মানচিত্রে (শতাব্দীকাল পর) এই প্রবাহকে সনাক্ত করাই কষ্টসাধ্য। এই পরিবর্তন এ কথাই প্রমাণ করে যে আদিগঙ্গা সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে বা অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই মজে যায়। ভাগীরথীর একটি প্রবাহ যে বারুইপুর, জয়নগর-মজিলপুর হাতিগড়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো তারও প্রমাণ পাওয়া যায় ।
>আদিগঙ্গা’ চলাচলের অযোগ্য হলে নবাব আলীবদী বর্তমানের সোজা দক্ষিণমুখী পথটি খুলে দেন বলে কথিত আছে। খুব সম্ভবত আলীবর্দী আদি গঙ্গার চাইতে পুরোনো খাতেই নতুন প্রবাহ পথ সৃষ্টি করেন এবং এ পথই সরস্বতীয় প্রাচীনতর খাতের দক্ষিণাংশ ।
>বিপ্রদাসের বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে সপ্তগ্রামের নিকটে ভাগীরথী থেকে সরস্বতী ও যমুনা প্রবাহ বের হয়ে সাগরে পড়েছে । তার বর্ণনায় সপ্তগ্রাম সমৃদ্ধ নগর এবং সরস্বতী ও যমুনা বেশ প্রতাপশালী নদী হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে। সরস্বতী সাতগাঁওর নিকটে ভাগীরথী থেকে নির্গত হয়ে সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত হতো এবং দামোদর প্রবাহকে অতিক্রম করে তাম্রলিপ্ত বন্দরের কিছু উত্তরে (তামলুক) রূপনারায়ণের সাথে মিলিত হতো ।
>পুরাণসমূহের গঙ্গা, ব্রহ্মোত্তর , বঙ্গ এবং তাম্রলিপ্ত দেশ সমূহের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বলে উল্লেখ আছে।
>পদ্মাপুরাণে ত্রিবেণীর নিকটে তিনটি নদীর—গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী-মিলনের কথা আছে।
>ধোয়ীর পবনদূত কাব্যে ভাগীরথী থেকে সরস্বতী ও যমুনা নদীর বিভক্তির কথা উল্লিখিত হয়েছে।
> আইন-ই-আকবরীতেও ত্রিবেণী ও ত্রি ধারায় প্রবাহিত সরস্বতী, যমুনা ও গঙ্গার উল্লেখ আছে
> দশম একাদশ শতাব্দীর পূর্বের কোন সূত্রে ত্রিবেণীর পবিত্রতার উল্লেখ না থাকাতে এই অনুমান সম্ভবত যুক্তিসংগত যে ভাগীরথীর এই ত্রিধারায় বিভক্তি অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের ঘটনা।
>ফাহিয়েনের বর্ণনায় তো-মো-লি-চি রাজ্যে ঐ শহরের নিকটেই (যা ছিল একটি সমৃদ্ধিশালী সমূদ্র বন্দর) গঙ্গা সাগরে পড়তো বলে যে উল্লেখ আছে বা তৃতীয় শতাব্দীর কং তাই-এর বর্ণনায় তামলিপ্ত নগরের নিকটে সাগরের সঙ্গে গঙ্গার মিলনের যে উল্লেখ আছে তা ভাগীরথীর সর্ব পশ্চিম ধারা সরস্বতীকেই চিহ্নিত করেছে বলে অনুমান করা হয়েছে ।
> পরে সরস্বতী এই পথ পরিবর্তন করেছে এবং তাম্রলিপ্তি বন্দর পরিত্যক্ত হওয়ার হয়তো তাই প্রধান কারণ । অষ্টম থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে কোন এক সময়ে সরস্বতী-ভাগীরথী এই খাত পরিত্যাগ করে সপ্তগ্রামের নিকট খাতে প্রবাহিত হতো।
তের শতকে মুসলমান আধিপত্য বিস্তারের কিছুকাল পর থেকেই চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত হুগলীর সপ্তগ্রাম দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার শাসনকেন্দ্র ছিল। পরবর্তীতে নদীর পথ পরিবর্তন এই শহরেরও বিলুপ্তির কারণ হয়েছে এবং নতুন প্রবাহের সৃষ্টির ফলেই হুগলীর প্রাধান্য এসেছে এই অঞ্চলে ।
> নীহাররঞ্জন রায় ভাগীরথীর গতিপথের তিনটি পর্যায়ের কথা বলেছেন :
১. প্রাচীনতম রাজমহল পার হয়ে সাওতালভূমি ছোটনাগপুর, মানভূম, ধলভূম হয়ে সোজা দক্ষিণে সাগরে পতিত হত। এই প্রবাহের সঙ্গেই অজয়, দামোদর এবং রূপনারায়ণ এসে মিলতো এবং এই প্রবাহের দক্ষিণতম সীমায় তাম্রলিপ্তি বন্দর ।
২. বর্তমান কালিন্দী-মহানন্দা খাতে প্রবাহিত হয়ে গৌড়কে ডানে রেখে পরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম বাহিনী হয়ে প্রথম পর্যায়ের খাতের কিছু পূর্বেদিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অষ্টম শতাব্দীর আগেই এই পরিবর্তন ঘটে ।
৩. এই পর্যায়ে তাম্রলিপ্তি পরিত্যক্ত—অর্থাৎ পশ্চিমতর প্রবাহ পরিত্যক্ত—কলিকাতা বেতড় পর্যন্ত ভাগীরথীর বর্তমান প্রবাহপথ এবং বেতড়ের দক্ষিণে আদিগঙ্গা পথের প্রবর্তন হয়। আদিগঙ্গা পরিত্যক্ত হওয়ার পর আবার পুরোনো সরস্বতী খাতে ভাগীরথীকে প্রবাহিত করা হয় ।
গঙ্গার অন্য প্রবাহ-দ্বিধাবিভক্তির পর দক্ষিণ-পূর্বগামী প্রবাহ-পদ্মা, কৃত্তিবাসের বড় গঙ্গা । আঠারো শতকে রেনেলের মানচিত্রে বা সতেরো শতকে ফান ডেন ব্রোকের মানচিত্রে পদ্মাকেই গঙ্গার মূল প্রবাহ বলে মনে হয়; এই সময়ে ভাগীরথীকে বেশ ক্ষীণ দেখানো হয়েছে ।
পনেরো শতকেও পদ্মাই ছিল গঙ্গার মূল প্রবাহ, তা কৃত্তিবাসের বর্ণনা থেকে এবং বড়গঙ্গা নামকরণ থেকেই বোঝা যায় ।
ষোল শতকে আবুল ফজলের বর্ণনায়ও পদ্মাকে গঙ্গার প্রবাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
> চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (১৩৪৬-৪৭) ইবনে বতুতা সদকাওয়ান বন্দরে এসেছিলেন, যার অদূরে গঙ্গা ও যমুনা (যুন) মিলিত হয়েছে । ইবনে বতুতার সদকাওয়ান’কে চট্টগ্রাম বলেই সনাক্ত করা হয়েছে এবং তার গঙ্গা যে বর্তমানের পদ্মা এবং 'যুন' বা যমুনা বলে ব্রহ্মপুত্রকে বোঝান হচ্ছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
>দ্বাদশ শতাব্দীর কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত’ কাব্যেও গঙ্গার এই প্রবাহের কথা উল্লিখিত হয়েছে। কবি বরেন্দ্রের সীমা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, করতোয়া এর পূর্বসীমায় এবং গঙ্গা এর দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং রামপাল গঙ্গা অতিক্রম করেই বরেন্দ্রে প্রবেশ করেছিলেন ।
গঙ্গা নামে যে বর্তমান ‘পদ্মার প্রবাহকেই বোঝানো হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। একাদশ শতাব্দীর সিদ্ধাচার্য ভুসুকুর রচনায় পদ্মার উল্লেখ আছে বলে নীহাররঞ্জন রায় মত প্রকাশ করেছেন ।
এর পূর্বেও যে দক্ষিণবাহী গঙ্গা ভাগীরথী থেকে পূর্বগামী পদ্মার উৎপত্তি-কাহিনী লোকস্মৃতিতে ছিল তা বৃহদ্ধর্ম, পুরাণ, দেবী ভাগবত, মহাভাগবত পুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থের উল্লেখ থেকে বোঝা যায়।
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার অধিপতি চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্রের (৯৩০-৯৭৫ খ্রি:) ইদিলপুর তাম্রশাসনে সতত-পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত কুমার তালক মণ্ডলে ভূমিদান করা হয়েছিল ।
এই তাম্রলিপিতে উল্লিখিত ‘পদ্মাবতী বিষয়কে পদ্মার তীরবর্তী বিষয় এবং কুমারতালক’ কুমার নদীর (পদ্মা-উৎসারিত মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে গড়াই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে গড়াই, মধুমতী, শিলাদহ, বালেশ্বর প্রভৃতি বিভিন্ন নামে হরিণঘাটায় গিয়ে সমুদ্রে পড়েছে) অববাহিকায় অবস্থিত ভূভাগ বলে সনাক্ত করা হয়েছে ।
>>তাই বলা যেতে পারে যে, ইদিলপুর লিপিতেই রয়েছে ‘পদ্মার’ প্রাচীনতম উল্লেখ ।
দশম শতাব্দীর পূর্বে ‘পদ্মা'র কোন উল্লেখ না পেলেও অনুমান করা যায় যে, এর অবস্থিতি ছিল। টলেমি গঙ্গার পাচটি প্রবাহের কথা উল্লেখ করেছেন ,তার মধ্যে তৃতীয় প্রবাহটি কাম্বেরীখন (Kamberikhon) ও কুমার নদীর (কৌমারক) প্রবাহ অভিন্ন বলে অনুমান করা হয়েছে ৫৬ প্রাচীনকালে গঙ্গার দক্ষিণমুখী ভাগীরথী প্রবাহই অধিক প্রবল ছিল, তাই ঐ নদীর সঙ্গেই অধিক স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে।
তবে বর্তমানে পদ্মাই যে অধিক প্রবল-প্রবাহ সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বহুদিন আগে থেকেই যে, পদ্মা এই রূপ ধারণ করেছে তা অনুমান করা যায় রেনেল, ফানডেন ব্রোক প্রমুখের মানচিত্র থেকে।
অন্তত চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই এর এই প্রবল রূপ ছিল তা ইবনে বতুতা, দ্যা ব্যারোস, আবুল ফজল প্রমুখের বর্ণনা থেকেও বোঝা যায়। তবে ঠিক কখন থেকে গঙ্গার এই প্রবাহটি প্রবলতা লাভ করেছে বলা কঠিন । তেমন কঠিন এই প্রবাহের গতিপথের যে পরিবর্তন ঘটেছে তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা ।
রেনেলের জরিপকালে (১৭৬৪-৭৭) পদ্মা জাফরগঞ্জের কাছে আত্ৰেয়ী ও করতোয়ার মিলিত স্রোত এবং যমুনার সঙ্গে মিলিত হতো এবং দক্ষিণাভিমুখে প্রবাহিত হয়ে চাদপুরের প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত দক্ষিণ শাহবাজপুরের দ্বীপের কাছে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে সাগরের দিকে প্রবাহিত হত। ফানডেন বোকের মানচিত্রে (১৬৬০) পদ্মার স্রোতকে ফরিদপুর এবং বাখরগঞ্জের পশ্চিমে দেখানো হয়েছে। হয়তো তখন গড়াই-মধুমতি প্রবাহই পদ্মার প্রধান প্রবাহ ছিল ।
শতাব্দীকাল পূর্বে দ্যা ব্যরোসের নকশা অনুসারে পদ্মার প্রবাহ রামপুর ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গার খাত ধরে ঢাকা পার হয়ে মেঘনায় গিয়ে মিশতো।
ট্রাভার্নিয়ার ও মির্যা নাথানের সাক্ষ্যে অনুমান করা হয়, সতেরো শতকে পদ্মা ধলেশ্বরীর খাতে বা এর সমান্তরাল এক খাতে প্রবাহীত হতো । তবে দ্বিতীয় শতাব্দীতে টলেমির বর্ণনায় গঙ্গার পাঁচটি মুখের পূর্বাঞ্চলীয় একটি মুখ যে পদ্মার ছিল এমন অনুমান করা অসঙ্গত হবে না।
গঙ্গা-পদ্মা প্রবাহ বাংলা ভূ-প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং এই প্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে আরও অনেক নদ-নদী । বিস্তীর্ণ সমতলভূমির উপর প্রবাহকালে নদীর গতি পরিবর্তন যেমন স্বাভাবিক তেমনি নতুন নতুন প্রবাহ দ্বারা শাখানদী সৃষ্টি করাও স্বাভাবিক বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এককালের ভৈরব প্রবাহ তেমনি একটি শাখা নদী। রামপুর বোয়ালিয়ার কাছে পদ্মা থেকে নির্গত হয়ে দক্ষিণমুখে প্রবাহিত হয়ে হরিণঘাটা মোহনায় সাগরে পড়তো। এখন অবশ্য জেলঙ্গী ও মাথাভাঙ্গা ভৈরবের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে একে তিন ভাগে ভাগ করেছে। মাথাভাঙ্গা, কুমার, নবগঙ্গা ও তিস্তা এমনি পদ্মার শাখা নদী
----------ক্রমশ--------

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ