টপিকঃ বাংলার ভৌগোলিক পরিচয়ঃ দুই

বাংলার ভৌগোলিক পরিচয়ঃ এক
http://forum.projanmo.com/topic53517.html

পূর্ববতী ইউরোপীয় ভ্রমনকারীরা বেঙ্গালা, বেঙ্গেলা, বাঙ্গালা রাজ্য ও ঐ নামের একটি শহরের কথা উল্লেখ করেছেন। >মার্কোপোলো (১৩ শতক) উপমহাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বাঙ্গালা নামে প্রদেশের বৈশিষ্ট্যসূচক ভাষাভাষী প্রতিমা উপাসক জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেছেন ।
>ওভিংটনের বর্ণনায় আরাকানের উত্তর-পশ্চিমে ‘বেঙ্গালা’ রাজ্যের এবং ঐ রাজ্যের সীমান্তবতী প্রথম শহর চাটিগামের উল্লেখ রয়েছে।
> ব্ল্যুভের (Bleav) ১৬৫০-এর এবং সসেনের (Saussen) ১৬৫২ -এর মানচিত্রে চট্টগ্রামের নিকটবতী বেঙ্গালা’ শহরের অবস্থিতি প্রামাণ করে।১২ রেনেল এই নামের শহরের উল্লেখ করেছেন কিন্তু এর অবস্থিতি সম্পর্কে নিঃসন্দেহ ছিলেন না।

> গ্যাস্টালদির মানচিত্রে (১৫৬১) চাটিগামের পশ্চিমে বেঙ্গালার অবস্থিতি দেখানো হয়েছে।
> পর্তুগীজ-ভার্থেমা, বার্বোসা (১৫১৪) বা জাও দ্য ব্যারোসের (১৫৫০) বর্ণনায় ‘বেঙ্গালা রাজ্য ও ‘বেঙ্গালা’ শহরের উল্লেখ রয়েছে।
‘বেঙ্গলা শহরের অবস্থিতি সম্পর্কে পণ্ডিতবর্গের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও ‘বেঙ্গালা’ রাজ্য যে বাংলাদেশ অঞ্চলকে বোঝাতো সে বিষয়ে তেমন কোন সন্দেহ নেই ।মোগল আমলে এই ভূভাগই সুবা বাঙ্গালা’ বলে চিহ্নিত হয়েছিল।
>আবুল ফজল এই প্রদেশের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, বাঙ্গালা পূর্ব-পশ্চিমে অর্থাৎ চট্টগ্রাম থেকে তেলিয়াগড় পর্যন্ত ৪০০ ক্রোশ এবং উত্তর-দক্ষিণে, অর্থাৎ উত্তরে পর্বতমালা হতে দক্ষিণে হুগলী জেলার মন্দারণ পর্যন্ত ২০০ ক্রোশ বিস্তৃত ছিল । এই সুবা পূর্বে ও উত্তরে পর্বতবেষ্টিত এবং দক্ষিণে সমূদ্রবেষ্টিত ছিল। এর পশ্চিমে সুবা বিহার। কামরূপ ও আসাম সুবা বাঙ্গালার সীমান্তে অবস্তিত ছিল ।
>প্রাচীনকালে এখানকার রাজারা ১০ গজ উচু ও ২০ গজ বিস্তৃত প্রকাণ্ড আল’ নির্মাণ করতেন; এ থেকেই বাঙ্গাল’ এবং বাঙ্গালাহ’ নামের উৎপত্তি ॥
>নামের উৎপত্তি সম্পর্কে আবুল ফজলের এই ব্যাখ্যা সবাই স্বীকার করে নেন নি। রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, ‘এই অনুমান সত্য নহে। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী এবং সম্ভবত আরও প্রাচীন কাল হইতেই বঙ্গ ও বাঙ্গাল দুইটি পৃথক দেশ ছিল এবং অনেক প্রাচীন লিপি ও গ্রন্থে এই দুইটি দেশের একত্র উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সুতরাং বঙ্গ দেশের নাম হইতে ‘আল’ যোগে অথবা অন্য কোন কারণে বঙ্গাল অথবা বাং নামের উদ্ভব হইয়াছে, ইহা স্বীকার করা যায় না। বঙ্গাল দেশের নাম হইতেই যে কালক্রমে সমগ্র দেশের বাংলা এই নামকরণ করা হইয়াছে, এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই |
বর্তমানকালে বাংলাদেশের অধিবাসিগণকে ‘বাঙ্গাল’ নামে অভিহিত করা হয় । তাহা সেই প্রাচীন বঙ্গাল দেশের স্মৃতিই বহন করিয়া আসতেছে ।
রমেশচন্দ্র মজুমদারের অনুমানও যে নিঃসন্দেহ নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখনও এমন কোন যুক্তি প্রদর্শন করা সম্ভব হয়নি যাতে একথা প্রামাণিত হয় যে বঙ্গাল থেকে বাঙ্গালা’র উৎপত্তি। প্রাচীন যুগে বঙ্গাল’ দেশের নাম উল্লেখ আছে। তবে তা থেকে সারা দেশের নামকরণ হবার মতো গুরুত্ব তার ছিল, এমন কথা বলার কোন অবকাশ নেই। বাংলার প্রাচীন জনপদসমূহের মধ্যে বঙ্গাল'-এর তুলনায় বঙ্গ’ অধিক খ্যাতিমান ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই এবং বঙ্গ জনপদের মধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার অনেক ভৌগোলিক সত্তাই অন্তর্ভুক্ত ছিল। (এর মধ্যে ছিল বঙ্গাল, সমতট, চন্দ্রচীপ এমনকি সম্ভবত হরিকেল) ।
তাই বঙ্গ থেকে না বঙ্গাল’ থেকে সারা দেশের নাম বাঙ্গালা হয়েছে        এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া  সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে নীহারঞ্জন রায়ের মতামত উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি আবুল ফজলের ব্যাখ্যাকে একেবারে অযৌক্তিক মনে করেন নি। নদীমাতৃক বারিবহুল দেশের বন্যা ও জোয়ারের স্রোত রোধের জন্য ছোটবড় বাধ (আল) বাধা কৃষি ও বাস্তুভূমির যথার্থ পরিপালনের পক্ষে অনিবার্য। তাই তিনি বলেছেন, আবুল ফজলের ব্যাখ্যার অর্থ এই যে বঙ্গদেশ আল বা আলিবহুল, যে বঙ্গদেশের উপরিভূমির বৈশিষ্ট্যই হইতেছে আল সে দেশই বাঙ্গালা বা বাংলা দেশ। এই আলগুলিই আবুল ফজলের সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
>আকবরের রাজত্বকালে এই অঞ্চল বাঙ্গালা’ নামে অভিহিত হয়েছে । আকবরোত্তর যুগে তাই বিদেশীরাও  এই একই নামই ব্যবহার করেছে। বাঙ্গালাহই তাদের ভাষায় হয়েছে ‘বেঙ্গালা’ বা ‘বেঙ্গল । আকবর-পূর্বযুগেও ‘বেঙ্গলা'র উল্লেখ পাওয়া যায় মার্কোপোলোর লেখনীতে। সুতরাং বেঙ্গালা’ বা বাঙ্গালা’ নাম মুগলপূর্ব যুগেই খ্যাতিলাভ করেছিল অনুমান করা যুক্তিসঙ্গত । মুগলযুগ থেকেই এর বহুল প্রচার এবং ইউরোপীয়দের মাধ্যমেই এই নাম রূপ নিয়েছে ‘বেঙ্গালা’, ‘বেঙ্গলা’ বা ‘বেঙ্গল' এ ॥


>বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বাংলাদেশ বিজয়ের সময় ‘বাঙ্গালা’ নামে একক কোন দেশ ছিল না।
>ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ মুসলমানদের বাংলা বিজয়ের ইতিহাস রচনার সময় বাঙ্গালা’ নামের উল্লেখ করেন নি; বরং বরেন্দ্র, রাঢ় এবং বঙ্গ নামে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলকে চিহ্নিত করেন। মিনহাজের বর্ণনায় বাংলা সম্বন্ধে তার ভৌগোলিক জ্ঞানের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি লখনৌতি ও বঙ্গকে পৃথক পৃথক ভাবে উল্লেখ করেছেন এবং যথাক্রমে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলা এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাকে বুঝিয়েছেন। বঙ্গের সাথে সমতট (সকনত)-এর উল্লেখও তিনি করেছেন ।
>মিনহাজের পরবর্তী ঐতিহাসিক জিয়া-উদ-দীন বরনী সর্বপ্রথম বাঙ্গালা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সমগ্র দেশ নয়, এর অংশ বিশেষের উল্লেখ প্রসঙ্গে । (ইকলীম লখনৌতি বা দিয়ার লখনৌতির পাশাপাশি ইকলীম বাঙ্গালা’ বা দিয়ার বাঙ্গালা’র উল্লেখ করেছেন এবং নিঃসন্দেহে তিনি পূর্ব বাংলাকেই নিদের্শ করেছেন) ।
> পরবর্তী ঐতিহাসিক শামস-ই-সিরাজ আফীফ সুলতান শামস-উদদীন ইলিয়াস শাহকে শাহ-ই-বাঙ্গালা’ শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান বা সুলতান-ই-বাঙ্গালা’ রূপে আখ্যা দিয়েছেন। সুলতান ইলিয়াস শাহ সমস্ত বাংলাদেশে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। তার পূর্বে অন্য কোন মুসলমান শাসক দীর্ঘকাল বাংলার সমগ্র ভূখণ্ড শাসন করেছেন এ কথা জোর করে বলা যায় না। ইলিয়াস শাহ বাংলার তিনটি শাসনকেন্দ্ৰই (লখনৌতি, সাতগাও এবং সোনারগাও) নিজ আধিপত্য বিস্তার করেন এবং বাংলায় স্বাধীন সুলতানির প্রকৃত ভিত্তি স্থাপন করেন এবং এই স্বাধীনতা প্রায় দু’শো বছর ধরে অক্ষুন্ন ছিল। তাই ইলিয়াস শাহ মুসলমান সুলতানদের মধ্যে প্রকৃত অর্থেই প্রথম শাহ-ই-বাঙ্গালা’ বা সুলতান-ই-বাঙ্গালা ।

সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, আফীফ বাঙ্গালা’ বলতে সারা বাংলাদেশকে অর্থাৎ আবুল ফজলের বাঙ্গালা’ বা ইউরোপীয়দের ‘বেঙ্গালা’ বা ‘বেঙ্গলকে বুঝিয়েছেন। তাই ইলিয়াস শাহের সময় থেকেই প্রথম বাঙ্গালা তার ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এর আগে, এমন কি মুসলমান-পূর্ব যুগে, এই ব্যাপক অর্থে ‘বাংলা’ বা ‘বাঙ্গালার ব্যবহার পাওয়া যায় না। ঐ সময়ে বঙ্গ বা বঙ্গাল দ্বারা বাংলার অংশবিশেষকে নির্দেশ করা হতো। তাই বাঙ্গালা’ নামের প্রচলন ইলিয়াস শাহের সময় থেকেই শুরু হয়েছে একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে ।

>তবে সুকুমার সেন বঙ্গ থেকে বাঙ্গালা’ বা বঙ্গালহ'র উৎপত্তি হয়েছে, বাঙ্গালা’ নামটি মুসলমান অধিকারকালে সৃষ্ট এবং ফারসি বঙ্গালহ থেকে পর্তুগীজ বেঙ্গালা ও ইংরেজি ‘বেঙ্গল’ এসেছে বলে মত পোষণ করেন।


-----------------ক্রমশ

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ