টপিকঃ “আই অ্যাম জিপিএ-৫” ও সরল সত্য

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলার মত শিক্ষিত আমি নই।ছোটবেলা থেকেই খারাপ ছাত্র ছিলাম,এখনও তাই আছি।তবু ইচ্ছে করলো কিছু লিখি।নিজের জীবনের গল্পটার সাথেই না হয় মেলাই।
তখন ক্লাস টেনে পড়ি।ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষার খাতা দেখানো শুরু করেছেন স্যারেরা।উচ্চতর গণিত পরীক্ষার খাতা দেখানো হবে আর কিছুক্ষণ পর।আমি মজা করে একটা সাদা খাতায় লিখলাম,  “আমি যদি উচ্চতর গণিতে ৬১’র এক মার্কও বেশি পাই তাহলে আমার “...”কে আমি অমিতাভকে দিয়ে দেবো।”
ঐ “...” জায়গায় একটা মেয়ের নাম ছিল।ঐ মেয়েকে নিয়ে অমিতাভ আর আমার কিছু মজার স্মৃতি আছে।অতি হাস্যকর ছেলেমানুষি একটা লাইন!তখন জীবনটা এমন ছেলেমানুষি করার মতই ছিল।সেই কাগজে সাক্ষী হিসেবে আলভী,হায়দার,আমিতাভ নিজেও আরও কে কে যেন সাইনও করে দিলো।
আমি মনে মনে নিশ্চিন্ত।৬১ মার্কের বেশি যা অ্যান্সার করেছিলাম সব ভুল গেছে।এর চেয়ে বেশি পাওয়ার তো কথাই নাই।আমি গণিতে ভয়াবহ রকমের খারাপ।টেনে টুনে ৬১ মার্কের সঠিক অ্যান্সার করেছি।এর চেয়ে বেশি আমার দ্বারা সম্ভব ছিল না। স্যার খাতা দেখালেন।আমি ৬১ পেয়েছি। ৬০ না ৬২ না, কাটায় কাটায় ৬১!

এই ঘটনা বলার কারণ হল স্কুলের স্যারদের খাতা দেখার একটা নমুনা দেয়া।এত পরিচ্ছন্ন খাতা দেখা হতো যে যারা আজকে ঐ স্কুল থেকে বের হয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বা মেডিকেলে পড়ছে তাদেরও ফেলের স্বাদ নিতে হয়েছিলো। পুরো অঙ্ক ঠিকঠাক করা শুধু উত্তরের জায়গায় সংখ্যার পাশে ‘টাকা’ কথাটা লিখিনি পুরো অঙ্কে ‘০’ পেয়েছি।আড়াই পাতা প্যারাগ্রাফে ‘০’ পেয়েছি শুধু মাঝখানে কোন এক জায়গায় ছোট একটা প্যারা করেছি বলে।অ্যাপ্লিকেশনে ‘০’ পেয়েছি কত নম্বর উত্তর সেটা লিখিনি বলে।আরও অসংখ্য উদাহরণ আছে।
তাই যখন দেখি আজকের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ নিয়ে এত কথা,এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয় তখন এসব কিছুটা মাথার উপর দিয়ে যায়, কিছুটা বুকের ভেতর দিয়েও যায়।

এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে লিখলে আরও একটা বিশাল গল্প হয়ে যাবে।তাই ছোট করে বলি।সমাজ পরীক্ষা দেয়ার পর যে গোল্ডেন মিস হয়ে গেলো সেটা বুঝেছিলাম।পুরো একটা সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিই নি।১০ মার্ক শেষ।রসায়নেও যে A+ পাবো না বুঝতে পেরেছিলাম।হলও তাই এই দুটো সাবজেক্টের জন্য গোল্ডেন মিস বাট “আই অ্যাম জিপিএ ৫” থুক্কু “আই ওয়াজ জিপিএ ৫”!  যেমন ভেবেছিলাম তেমনি তো হয়েছে।কই?দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তো ঠিকই আছে।
কিন্তু ঘটনা এখানে শেষ না।

এরপর শুরু হল কলেজ জীবন।ইহা একখান গল্প বটে!সেই গল্পও না করলাম।শুধু বলতে পারি একটা লাইন জানতাম, “Without college, no knowledge.”  তাই আমি ‘মাঝে মাঝে’ কলেজে যেতাম Knowledge  নেয়ার জন্য।প্রথম দুটো পিরিয়ড খুব কষ্টে শেষ করেই কমনরুমে কেরাম খেলতে যেতাম,চিপায় গিয়ে আমার মত কয়জনের সাথে বিড়ি ফুঁকতাম,ছুটির পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা “তাকে” সময় দিতাম।এরপর বিকেলের আড্ডা,ঘোরাফেরা,তাশ, রাতে সারা রাত জুড়ে ফোন, মেসেজিং তো আছেই।কি মজা রে!
এই মজার ফল আমি হারে হারে,সাধারণ সুদে,চক্রবৃদ্ধি সুদে,সুদ-আসলে দিয়েছি এবং এখনও দিয়ে যাচ্ছি।জানি, সারাজীবনই হয়তো দিয়ে যেতে হবে।

কেন যেন হঠাৎ করে শুরু হয়ে গেলো এইচ.এস.সি পরীক্ষা!আমি অস্ত্র ছাড়াই যুদ্ধে গেলাম এবং প্রথমদিন বাংলা ১ম পত্রের সাথে যুদ্ধ করে এসে মাকে কাপুরুষের মত বললাম, “আমি আর পরীক্ষা দিব না।” তার কারণ লিখিত পরীক্ষায়ই আমি ১৭ মার্ক ছেড়ে দিয়ে এসেছি।নৈর্ব্যক্তিকে আরও ১০ শেষ।এইসব পরীক্ষা দেয়ার কোন মানে হয় না। কিন্তু মা-বাবা,বন্ধু-বান্ধব,স্যার- সবাই যখন বোঝানো শুরু করলো তখন সাহস করে দিতে থাকলাম।
ওটা তো ছিল প্রথম পরীক্ষা।বাকি গুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়!স্কুলে যে বন্ধু গুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে লিখতাম তারা আজ এক মনে লিখে চলেছে আর আমি প্রায় কিছুই লিখতে পারি না।৭৫ এর মধ্যে অ্যান্সার করি ৩০,৩৫,৪৫।এর বেশি পারি না।পুরো দুই বছরে রসায়ন বই খুলেও দেখিনি।কিছুই জানিনা, কিছুই পারি না।রসায়ন পরীক্ষার দিন পেছনের জনকে বললাম, “ভাই, তুই আমাকে একটা পরীক্ষায়ও হেল্প করতেসিস না।আজকে যদি না দেখাস তো এক ঘণ্টা পর সাদা খাতা জমা দিয়ে চলে যাবো।” ও বোধহয় বুঝতে পারলো আমার অবস্থা।পুরোটাই ওর নকল করে লিখলাম এবং আমার পুরো জীবনে রসায়নের বারো দুগুনে চব্বিশটা বাজালাম।
যাই হোক,এত কিছুর পর দেখলাম উদার হস্তে গণনা করেও কোনভাবেই রেজাল্ট ৪ এর উপর আসে না।৩.৫ থেকে সর্বোচ্চ ৪। এর ওপর পাওয়া অসম্ভব। রেজাল্টের দিন কল্যাণপুরের একটা বাসায় চার বন্ধু একসাথে ছিলাম।রেজাল্ট দিলো দুপুর বেলা।রাশেদ এক সাবজেক্টের জন্য গোল্ডেন পায়নি দেখে মরার মত পড়ে আছে, কামাল গোল্ডেন পেয়ে আগের মতই আছে,মুইদ এক সাবজেক্ট খারাপ করে বিছানায় পড়ে ঘুমাচ্ছে। আর আমি এখনও রেজাল্ট দেখিনি।দেখার ইচ্ছাও নাই। কি দেখবো? জানিই তো কি হবে।ওসব দেখে কি হবে?সব আশা শেষ।হয়তো কোন সাবজেক্টে ফেল করেছি! ওরাই দেখলো আমার রেজাল্ট।আমি চুপচাপ বিছানায় শুয়ে ছিলাম।বার বার করে কানের কাছে এসে বলছে- তোর রোলটা বল,রোলটা বল। এক সময় বললাম।কিছুক্ষণ পর আমার ঘরে এসে বলল, “তুই ৪.৪০ পাইছিস।”  আমি অবাক হয়ে বললাম, “কি কস? কেম্নে সম্ভব???”
বাংলায় ২৭ মার্ক ছেড়েও A! রসায়নে সব কিছু দেখে লিখেও A! মনে হচ্ছিলো ওটা আমার রেজাল্টই না,অন্য কারো রেজাল্ট।মন থেকে খুশি হতে পারিনি কিন্তু নির্লজ্জ আর বোকার মত বলেছি, “বাঁইচা গেছস!ভাবসিলাম পরের বছর আবার পরীক্ষা দিব।আর দিতে হবে না।” 
ভুল। আমি বাঁচতে পারিনি।কোথাও বাঁচতে পারিনি।পরবর্তী প্রত্যেকটি জায়গায় আমাকে করুণভাবে মরতে হয়েছে।ঢাকা ভার্সিটি, জগন্নাথের ভর্তি পরীক্ষায় পাশও করতে পারিনি,রাজশাহীতে সিরিয়াল হাজার হাজার দূরে,কুমিল্লা,সিলেট, হাজী দানেশ- কোথাও নেই আমি। শুধু একটা জায়গায় একটু খানি জায়গা পেয়েছিলাম-ইসলামিক ইউনিভার্সিটি,কুষ্টিয়া। সেটাও ওয়েটিং লিস্টে।এর কারণ রসায়ন অ্যান্সার করতে হয় নি।গণিত ডিপার্টমেন্ট ছিল তো।ঐ একটা জায়গায়ই রসায়ন ছিল না।তাই বোধহয় এটুকু এসেছিলো।পরে অবশ্য ম্যাসেজ দিয়েছিলো- সিট খালি আছে নাকি।কিন্তু ততদিনে এখানে ভর্তি হয়ে গেছি।
যাই হোক, এখন যদি আমাকে কেউ ইন্টারের বই থেকে প্রশ্ন করা শুরু করে তাহলে আমি হয়তো কিছুই পারবো না।আমার এই না পারার পেছনে দায়ী আমি নিজেই কিন্তু এটাতে খুব সুক্ষ ভাবে হলেও শিক্ষা ব্যবস্থার হাত ছিল।আমি যেটা না রেজাল্ট সেটা আমাকে বুঝতে দিলো না। কিন্তু ছেলেগুলোকে যে সব প্রশ্ন করা হল সেগুলো জানতে তো এসএসসি পাশ করা লাগে না।ঐ রিপোর্টের পেছনে কোন কারসাজি আছে কি না কে জানে।এটা সত্য যে কিছু ছেলে মেয়ে অবশ্যই আছে যারা সব পরীক্ষায় পাশ করলেও এসব জানে না।শুধু তাদেরকেই উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে শিক্ষার ভাবমূর্তি নষ্ট করা হল নাকি পুরো ব্যাপারটাই সেট-আপ ছিল কে জানে? কিন্তু যদি রিপোর্টটা পুরো সত্য হয় এবং এরা জিপিএ ৫ পেয়ে যায় তাহলে অবশ্যই Something is going wrong! যতই রিপোর্টারকে গালাগালি করেন এই সত্যের(যদি সত্য হয়) হয়তো দরকার ছিল। 
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় এক মেয়ে গণিত না কি যেন একটা পরীক্ষা দেয় নি।পরীক্ষার দিন সে তার প্রেমিক সহ পুলিশের কাছে ধরা পরে।বাকি পরীক্ষা গুলো দেয় এবং রেজাল্ট ৪.৬০। কিছু কি সত্যিই ভুল হচ্ছে না আমাদের?
স্কুলের যে স্যারদের সঠিক মূল্যায়নে আজ ঐ স্কুলের ছেলেরা এত দূর যাচ্ছে সেই তাদেরকেই বাধ্য করা হচ্ছে বেশি করে মার্ক দিয়ে দেয়ার জন্য।ফেল না করানোর জন্য।৭৫ পেলে সেটা ৮০ করে দেয়ার জন্য।এসব সত্য।এই সত্য আড়ালে লুকিয়ে আছে। 
অনেকের দেখলাম হাসি নিয়ে খুব সমস্যা হচ্ছে।নেপালের রাজধানী নেপচুন বললে আর পিথাগোরাসকে ঔপন্যাসিক বললে হেসে ফেলা খুব স্বাভাবিক।কিন্তু এসব দিয়ে ট্রল করে ঐ ছেলেগুলোকে আরও অপমানিত না করে ঐ আড়ালের সত্যটাকে পাল্টানো দরকার। একদিন হয়তো পাল্টাবেও।যেদিন দেখবে জিপিএ ৫ পাওয়া ছেলেগুলোর অনেকেই কোন কাজে লাগছে না।ভালো থাকুক বাংলাদেশ।

লেখাটি CC by 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত