টপিকঃ গহীন বান্দরবান: পর্ব-৮

পর্ব-৭ এর লিংক

পর্ব-৮ঃ ঠুসাই পাড়া/ঠুইসা পাড়া (বানান নিয়ে একটু গন্ডগোল আছে)

পাহাড়ের কাছে আসতেই আতঁকে উঠলাম। ভীষন খাড়া পাহাড়। আজ সারাদিন এত হাঁটা হাঁটছি যে, পা আর চলছিল না। অল্প অল্প করে উঠতে লাগলাম। হাতে লাঠি থাকার কারনে রক্ষে, নইলে এবড়ো থেবড়ো পাহাড়ী রাস্তায় কখন যে কি দুর্ঘটনা ঘটে যেতো, আল্লাই জানে!

কোন রকমে পাহাড়টা পার হলাম। কিন্তু ঠুসাই পাড়ার দেখা নেই। গাইড বললো, এইতো আর অল্প, চলে এসেছি। হাতে পানির বোতল ছিল, মনটা চাইছিল বোতল দিয়ে ওর মাথা ভাঙ্গি। যাই হোক, সামনে হাঁটতে লাগলাম। এখানে আশেপাশে কয়েকটা ঘর দেখতে পেলাম, পাড়ার নামটা ঠিক মনে পড়ছে না। ঠুসাই পাড়া নাকি এ পাড়া পার হয়ে গেলেই পড়বে। বিশ্রাম নেয়ার জন্য এখানে কিছুক্ষণ বসলাম। বোতলে যতটুকু পানি অবশিষ্ট ছিল, সব একটানে শেষ করে ফেললাম।

http://farm9.staticflickr.com/8798/17542477583_13ec44faa8_b.jpg

http://farm9.staticflickr.com/8899/17542483523_5bfa0db37a_b.jpg
পাহাড়ের উপরে ঘর, এখানেই আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছিলাম

দুঃখের বিষয় হলো, এত কিছুর পরও আমাদের আরেকটা পাহাড় উঠতে হলো। এখানকার সব পাড়াই পাহাড়ের উপরে। সম্ভবত পাহাড়ি পানির ঢল যাতে ঘরবাড়ির কোন ক্ষতি করতে না পারে সে জন্যই ঘরবাড়ি গুলো পাহাড়ে উপরে বানানো, আর বন্যপ্রানীর ভয় তো আছেই।

ঠুসাই পাড়া যতই কাছাকাছি আসতে লাগলো, ভেতর থেকে আলাদা রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। মনে মনে ভাবলাম, ওখানে পৌঁছানো মাত্রই চিৎপটাং হয়ে শুয়ে থাকবো কয়েকঘন্টা। আর কোন কথা হবেনা।

অবশেষে আমরা পৌঁছালাম। পাড়ায় ঢুকতেই ছোট্ট একটা দোকান। ঘড়িতে তখন প্রায় বেলা দুইটা। ক্ষুধার জ্বালায় তখন ভয়ংকর খারাপ অবস্থা। আমরা ছায়া দেখে মাটির উপর একজায়গায় বসলাম। মন চাইছিল সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ি। গাইডকে দিয়ে পাড়ার ভেতর থেকে খাবার পানির বোতল ভরে নিয়ে আসলাম।

আর দোকান থেকে কয়েক প্যাকেট বিস্কিট আনলাম। যতদূর মনে পড়ে পাঁচ টাকা দামের বিস্কিটের প্যাকেটগুলো বিশ টাকা করে কিনতে হয়েছিল। কিন্তু এরকম এক জায়গায় বিস্কিট কিনতে পেরে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। পঞ্চাশ টাকা চাইলেও না করতাম না। বিস্কিট খেয়েই ক্ষুধা নিবারণ করতে হলো কেননা গাইড এখন নতুন করে খাবার রান্না করবে, রান্নাবান্না শেষ হলে তারপর খেতে পারবো, সে অনেক সময়ের ব্যাপার।

http://farm8.staticflickr.com/7773/17542474783_d44d6a39cb_b.jpg
ঠুসাই পাড়ার প্রবেশপথ, একপাশে দোকান

পাহাড়ি এলাকায় সবচাইতে বড় সমস্যা হচ্ছে পানির সমস্যা। কিন্তু ঠুসাই পাড়ার সব লোকজন মিলে দূর পাহাড় থেকে পাইপের লাইনের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করে রেখেছে যেখানে চব্বিশ ঘন্টা পানি আসতেই থাকে। আশেপাশের পাড়া থেকেও লোকজন এখানে আসে পানি নিয়ে যাবার জন্য। খাবার পানি, গোসলের পানি, ঘরের নিত্য নৈমিত্তিক কাজ চালানোর জন্য পানি, সব ধরনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সবাই এখান থেকেই পানি নিয়ে যায়। আর পানির এ সুব্যবস্থার কারনে আমাদের মত টুরিস্টদের এ পাড়াতেই রাখা হয়।

আমাদের রাখা হয়েছিল পাড়ার কোন এক প্রধানের বাসায়। টিনের চাল আর চার পাশে বেড়া দেয়া। গাইডকে বললাম যাতে বন মোরগ রান্না করে। প্রতি কেজি সম্ভবত তিনশ টাকা করে, সঠিক মনে নেই। আর আমাদের সাথে নিয়ে যাওয়া ডিম, ডাল তো ছিলই। গাইড আসা মাত্রই রান্না শুরু করে দিয়েছে। আমরা সবাই গোসল সেরে নিলাম। শীতল ঠান্ডা পানি, গায়ে দিলেই পুরো শরীর সতেজ হয়ে যায়। গোসল সেরে বিছানায় আসতেই দুচোখে যেন রাজ্যের ঘুম নেমে আসলো। রান্না হতে এখনো ঢের বাকী, এর মধ্যে হালকা পাতলা ঘুম হয়ে যাবে।

ঘুম থেকে যখন উঠলাম তখন বিকেল প্রায় শেষ হয়ে গেছে, রান্না আগেই শেষ হয়ে গেছে, আমাদের ঘুমের অবস্থা দেখে গাইড আর আমাদের ডাক দেয়নি। খেতে বসতে গিয়ে দেখলাম পাহাড়ি চাল রান্না করা হয়েছে, ইয়া বড় বড় লাল লাল ভাত, ডিম ভাজা, মুরগী আর ডালের সাথে পাহাড়ি চাল কুমড়া ভাজি করা হয়েছে। রান্নার অবস্থা যাই হোক না কেন, ক্ষুধার চোটে চোখ বন্ধ করে শুধু খাবার গিলতে লাগলাম। এখন সবকিছুই অমৃতের মত লাগছে।

http://farm8.staticflickr.com/7741/17542468253_9e21736e14_b.jpg

সন্ধ্যেবেলা কিছু করার ছিলনা, চারিদক এত অন্ধকার যে কোথাও যাবার ব্যবস্থা নেই। পাড়ার লোকেরা বেশিরভাগই খ্রিস্টান, সন্ধ্যা হতেই সবাই তাদের প্রার্থনা ঘরে গিয়ে জমা হলো। আমরা এ ঘরে বসে তাদের গান আর ঢোলের আওয়াজ শুনতে পেলাম। মনে হচ্ছিল ছোটবেলায় স্কুলে সমাজ বইয়ে আদিবাসীদের বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের বর্ননা ছিল তা আমার চোখের সামনে ঘটছে। আমরা কেউই প্রার্থনা ঘরের ভেতরে ঢুকি নাই, বাইরে থেকেই দেখছিলাম।

রাতে বসেই গাইডকে নিয়ে সিন্ধান্ত হলো, আমরা ভোর পাঁচটা বাজে ঘুম থেকে উঠে অমিয়খুম এর উদ্দেশ্যে রওনা দিব যাতে সকালে সুর্য্য উঠার আগেই অনেকদূর রাস্তা এগিয়ে যেতে পারি। আর রোদের মধ্যে পাহাড়ি রাস্তা চলা অনেক কঠিন, রোদ ওঠার আগে যতদূর যেতে পারি ততই মংগল।

ঠুসাই পাড়াতে আরেকটা বলার মত বিষয় হচ্ছে এর টয়লেট গুলো। আমরা যতদূর জানতাম, এরকম দূর্গম এলাকায় প্রাকৃতিক কাজ গুলো প্রাকৃতিক পরিবেশেই সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু ঠুসাই পাড়াতে শুধুমাত্র আমাদের মত ট্যুরিস্টদের জন্য আলাদা করে বাঁশের বেড়া দিয়ে টয়লেট বানানো আছে। আর ঘরে বালতিতে পানি রাখা আছে। সময়মত বদনা করে পানি নিয়েই গেলেই হয়।

টয়লেটের এমন সুব্যবস্থা দেখে আমরা সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বলা বাহুল্য, আমরা সবাই অতি সত্ত্বর সে টয়লেটের সদ্ব্যবহার করে ফেলেছিলাম। আর ঐ পাড়ায় লোকেরা অনেক শুকর পালন করে।  ভয়ে ছিলাম কখন এসে টয়লেটে হানা দেয়, ভাগ্য সুপ্রসন্ন বিধায় কোন ঝামেলা ছাড়াই ওই পাড়ার ফাইভ স্টার কোয়ালিটির টয়লেটে শান্তিমতই কাজ সারতে কোন সমস্যাই হয়নি।

চলবে...

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-৮

আরেকটা চমৎকার পর্ব। পরের পর্বের জন্য অপেক্ষায় রইলাম।

লেখাটি CC by 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-৮

smile খুব সুন্দর
ভাল লাগায় ভরপুর :

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-৮

রেজওয়ানুর ভাই এবং ছবি আপুকে মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
পর্বটা মনে হয় বেশি বড় করে ফেলেছি!

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন বোরহান (২৯-০৫-২০১৫ ০৯:৩৮)

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-৮

এই পর্বটা বেশ ভালো হয়েছে, quite an adventure, eh!

IMDb; Phone: Huawei Y9 (2018); PC: Windows 10 Pro 64-bit

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-৮

আরেকটা চমৎকার পর্ব। আরও বেশী করে ছবি দেবেন। ছবি গুলো খুব সুন্দর । thumbs_up

আল্লাহ আমাকে কবূল করুন

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-৮

বোরহান লিখেছেন:

এই পর্বটা বেশ ভালো হয়েছে, quite an adventure, eh!

More to come.. Behold and keep your eyes open...

জারাহ লিখেছেন:

আরেকটা চমৎকার পর্ব। আরও বেশী করে ছবি দেবেন। ছবি গুলো খুব সুন্দর । thumbs_up

ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য। ভ্রমনের এই পর্যায়ে এত বেশি শারীরিক পরিশ্রম হয়েছিল যে ছবি তোলার কথা মাথায় ছিলনা। ইনশাল্লাহ পরের পর্ব হবে ছবিময় পর্ব।

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-৮

চমৎকার  লেখা smileএই রকম ফাইভ স্টার কোয়ালিটির টয়লেট যদি পুরো বান্দরবন জুরে থাকতু তাহলে কতুই না ভাল হতু big_smile

অন্যের কাছ থেকে যে ব্যবহার প্রত্যশা করেন আগে নিজে সে আচরন করুন।

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-৮

faysal_2020 লিখেছেন:

ঠুসাই পাড়ার সব লোকজন মিলে দূর পাহাড় থেকে পাইপের লাইনের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করে রেখেছে যেখানে চব্বিশ ঘন্টা পানি আসতেই থাকে

অনেক পাহাড়ি গ্রামেই এমনটা করে, চমৎকার ব্যবস্থা।

faysal_2020 লিখেছেন:

কিন্তু ঠুসাই পাড়াতে শুধুমাত্র আমাদের মত ট্যুরিস্টদের জন্য আলাদা করে বাঁশের বেড়া দিয়ে টয়লেট বানানো আছে।

এটা খুবই ভালো লক্ষন, সেই অনেক বছর আগে যখন বগা লেকে এই বিষয়টা দেখেছি।

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের নিমন্ত্রণ।