টপিকঃ বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার প্রাচীন চিরচেনা সেচ কৃষিযন্ত্র

বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার প্রাচীন চিরচেনা সেচ কৃষিযন্ত্র
>>সেচ (Irrigation): 
বাঁধ, নালা, খাল ইত্যাদির মাধ্যমে অথবা অন্য কোন যান্ত্রিক উপায়ে শুকনো ক্ষেত-খামারে পানি সরবরাহ কে সেচ দেওয়া বলে।মানুষ প্রথমে কিসের মাধ্যমে সেচের প্রচলন করে তা অজানা হলেও সেচ কার্যক্রম এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় বহু হাজার বছর পূর্ব থেকেই চালু হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। সম্ভবত পানির বিতরণ, নিয়ন্ত্রণ এবং মজুতের জন্য খাল, নালা, বাঁধ, সংরক্ষিত জলাধার ইত্যাদির প্রথম প্রচলন হয়েছিল প্রাচীন মিশরে।এর পর বিভিন্ন যান্ত্রিক সরল যন্ত্রের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এশিয়ার এ অঞ্চলে সেচের প্রাচীন দুটি সেচযন্ত্র হল--- দোলনা সেচনি ও দোন।

১।সেচযস্ত্র: দোলনা সেচনি/সেঁউতি 

http://abblog.net/wp-content/uploads/2015/03/180px-IrrigationSwingBasket.jpg

২।সেচযন্ত্র: দোন/দোংগা

http://abblog.net/wp-content/uploads/2015/03/sm1-300x300.jpg 

১।দোলনা সেঁউতি/সেচনি:
প্রাচীন কালে পানি নেবার বা রাখার পাথরের বালতি বা কাঠের বালতি হতে এই যন্ত্রের উদ্ভাবন হয়েছে বলে ধরা হয়ে থাকে। কোন পানির আধার(নদী, খাল, বিল-----) হতে চিকন/সরু খাল/নালা/দাড়া কেটে অনেক দূরে পানি নিয়ে যাওয়ার পদ্ধতি বহু প্রাচীন একটি পদ্ধতি। আর পানির আধার হতে বালতি দিয়ে চিকন/সরু খাল/নালা/দাড়া-য় পানি দিলে সেই পানি নালা বেয়ে নিরদিষ্ট ফসলের জমিতে পানি গিয়ে পড়ত। বালতি দিয়ে নালায় পানি দেওয়া খুব সময় সাপেক্ষ বেপার। পরে সেই কাঠের বা লোহার বা আধুনিক টিনের চৌকোনা বা গোল বালতি কে দড়ি দিয়ে বেঁধে এই সরল যন্ত্রটি তৈরি করে সেচ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করে তোলার এই কাজ প্রথম কোন কালে হয়েছে তা বলা অসম্ভব।   
>>তৈরির কলা কৌশলঃ

এ জন্য প্রথমে দরকার একটি টিনের( মুড়ির টিন/তেলের টিন) বালতি। কিছু বাঁশের লাঠি আর লম্বা দড়ি/সুতলি। এবার লাঠি ও দড়ি ব্যবহার করে এই টিন কে চারটি দড়ির পাট দিয়ে দুই দিকে বালতির উপর নিচে লাঠির সাহায্যে বেঁধে নিতে হবে।(দোলনা সেচনি --এতে হাতাওয়ালা একটি ঝুড়ি বা বেলচার মতো সেচনিতে ৪টি রশি বাঁধা থাকে।)
>> ব্যবহারঃ

এই দোলনা সেচনি দিয়ে পানি সেচ দিতে দুই জন মানুষ দরকার হয়। দুই পাশের দুই করে চারটি দড়ি দুই হাতে করে দুই পাশে পানির আধারের(নদী, খাল, বিল-----) কাছেদুজন লোক মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং প্রত্যেকে দুই হাতে ঝুড়ির এক পাশের দুটি রশি ধরে।( উভয়ে এক সময়ে সেচনি দুলিয়ে পানি ভরে এবং তা টেনে তুলে জমিতে পানি সেচে দেয়।) এবার হাতে ধরা রশিকে একবার ঢিল দিয়ে উপরের রশিকে টেনে ধরে বালতিকে পানিতে ফেলা হয় এবং দড়িতে টান দিয়ে পানি ভর্তি বালতি পানিকে টেনে উপরের খালে ফেলা হয়। এই বালতির রশি টানার মাঝেই রয়েছে একে ব্যবহারের সমস্ত কলাকৌশল। তাই মানুষ দুটিকে হতে হয় দুজনের পরিপূরক।   
যন্ত্রটি বাঁশ বা পাতলা টিনের তৈরি, বানানো সহজ এবং চালাতে তেমন কোন প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হয় না। এটি দিয়ে জলাশয়ের ও শস্যক্ষেতের ০.৯-১.২ মিটার (৩-৪ ফুট) নিচ থেকে সেচ দেওয়া যায়।পরিবারের মহিলা এবং অল্পবয়সীরাও যন্ত্রটি চালাতে পারে।


২।দোন:

দোন  একমুখ বন্ধ ও অন্যমুখ খোলা কিস্তি আকৃতির কাঠের বা টিনের যন্ত্র।স্থানীয়রা কাঠের দোনকে পানি সেচের দোংগা বলে জানে।
>>তৈরির কলা কৌশলঃ
কাঠের দোন তৈরি করতে প্রথমে ২.৪-৩.৬ মিটার (৮-১২ ফুট) লম্বা ভাল গাছ নির্বাচন করে গাছের কাঠের মাঝের অংশের কাঠ কেটে নিয়ে তার মাঝখানের ডিঙ্গি নৌকার মত করে নিতে হবে এবং এক মুখ কেটে মুক্ত করে দিতে হবে। এর পর রশি দিয়ে বদ্ধ মাথা/পাশ একটা সরু বাঁশের সাহায্যে রশি দিয়ে বেঁধে নিলেই এটি পানি সেচের জন্য তৈরি।
আর অটোমেটিক ভাবে টিনের তৈরি পাওয়া যেত। 
>> ব্যবহারঃ
বন্ধমুখ কাঠের লম্বা দন্ডের সঙ্গে একটি প্রয়োজন মত বাঁশের লাঠি কষে রশি দিয়ে সেই বাঁশের লাঠিকে (লম্বা করে ইংরেজি টি( T ) অক্ষরের মত বাঁধা ) লম্বা করে মাটিতে পুতা খুটি হতে  আড়া আড়ি ঝুলিয়ে বাঁধা বাঁশের একপান্তে বেঁধে দেওয়া হয়। যা   লিভার হিসেবে কাজ করে। লিভারের অন্য প্রান্তে খোলা মুখে দিকে একটি বড় পাথরখন্ড বা শুকনো মাটির পিন্ড বা ইট বেঁধে রাখা হয়।যা ঐ প্রান্তকে সহজে পানিতে ডুবন্ত প্রান্তকে উপরে উঠাতে সাহায্য করে। শরীরের ওজন দিয়ে দোনের বন্ধ অংশ পানিতে ডুবানোর পর ছেড়ে দিলে লিভার এটাকে টেনে তোলে, ফলে দোনের মধ্যে উঠে আসা পানি সরাসরি জমিতে চলে যায়।
এই কৌশলে সেচের খরচ কম। দোন প্রায় ২.৪-৩.৬ মিটার (৮-১২ ফুট) লম্বা এবং ০.৯-১.২ মিটার (৩-৪ ফুট) পর্যন্ত গভীরতা থেকে পানি তুলতে পারে। এটি একজন লোক দিয়ে চালানো যায়। চালকের শক্তির ওপর পানি তোলার পরিমাণ নির্ভর করে। ছোট ও প্রান্তিক চাষিদের ছোট জমিতে ভূপৃষ্ঠের পানির উৎস থেকে সেচের জন্য দোন উপযোগী।
>> শেষ কথাঃ
এক সময় গ্রাম বাংলার কৃষিতে সেচযন্ত্র হিসেবে কাঠের দোনের ও দোলনা সেচনি/সেঁউতির ব্যাপক চাহিদা ছিল।এতে করে পানি সেচ দিতে শ্রমিক ছাড়া কোন প্রকার খরচ হয়না। তাছাড়া এ গুলি বহন করাও যায় সহজে।কিন্তু আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি আবিস্কারের ফলে দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে কাঠের দোন ও টিনের সেউতি।

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ

Re: বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার প্রাচীন চিরচেনা সেচ কৃষিযন্ত্র

এখনো বিলুপ্ত হয় নাই? এগুলারে ঘার ধরে বিলুপ্ত করা উচিত, প্রচুর কায়িক পরিশ্রম এগুলোতে, কৃষকদের পিঠে ব্যাথা থেকে শুরু করে বহু সমস্যা হত আগে।

Re: বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার প্রাচীন চিরচেনা সেচ কৃষিযন্ত্র

প্রথমটাকে অামাদের এদিকে বলত খুচি, অার দ্বিতিয় টিকে বলত ডোঙ্গা।

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের নিমন্ত্রণ।

Re: বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার প্রাচীন চিরচেনা সেচ কৃষিযন্ত্র

ধন্যবাদ অনেক তথ্যবহুল পোষ্ট।সময়ের সাথে সাথে মানুষের প্রয়োজনের তাগিদে তার চাহিদার পরিবর্তন হয়েছে।হয়ত আর কিছুদিন পর এইগুলো দেখার জন্য আমাদের আর গ্রামের ক্ষেত খামারে নয় যেতে হবে লোকশিল্প যাদুঘরে।

অন্যের কাছ থেকে যে ব্যবহার প্রত্যশা করেন আগে নিজে সে আচরন করুন।

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার প্রাচীন চিরচেনা সেচ কৃষিযন্ত্র

সুন্দর পোষ্ট

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর