টপিকঃ ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

কনকর্ড কমার্শিয়াল লাইনআপের একটি অনন্য সংযোজন। সুপারসনিক জেট, গতিময় ভ্রমন সবকিছু নিয়ে সাফল্যমন্ডিত একটি ক্যারিয়ার। কনকর্ড শুধুমাত্র একটি সাকসেলফুল নামই ছিল না, ছিল জাতীয় গর্বের একটি নাম। সব চাইতে নিরাপদ হিসেবে পরিচিত কনকর্ডের ১৯৭৬ সালে প্রথম ইনট্রো করার পর ২০০৩ সালে রিটায়ার করার আগ পর্যন্ত একটি মাত্র দুর্ঘটনার রেকর্ড আছে । আসলে, ওই একটি দুর্ঘটনার কারনেই শেষ হয়ে যায় কনকর্ডের ক্যারিয়ার। ফ্লাইটটি ছিল Air France Flight 4590

http://www.askthepilot.com/wp-content/uploads/2012/11/Concorde1.jpg

২৫ জুলাই, ২০০০ সালে টেকঅফ করার আগ মুহুর্তে হঠাৎ করেই Flight 4590 এর নীচে আগুন দেখা দেয়। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে জানানো হয় যে তারা আগুন দেখতে পাচ্ছে, টেকঅফ এবোর্ট করা হবে কিনা। শব্দের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন গতিতে চলা কনকর্ডের টেকঅফ গতিও কম নয় নেহায়েত, প্লেনের গতি তখন ৩২৮ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায়। অতটুকু স্পেসে এবোর্ট করতে পারবে না জেনে তারা নাকচ করে দেয় এবং আগুন জ্বলতে থাকা অবস্থায়ই টেক অফ করে। পরিনতি হয় ভয়াবহ, আগুন জ্বলতে থাকার কারনে কনকর্ড উচুতে উঠতে ব্যার্থ হয়, বাকা হয়েই যুদ্ধ করতে থাকে উচুতে উঠার। লক্ষ একটাই, কাছের লে বারগেট ( Le Bourget Airport) এয়ারপোর্টে ইমার্জেন্সী ল্যান্ড করা। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না কনকর্ডের। ককপিট থেকে বারবার একটি কথাই ভেসে আসছিল "Too Late, No Time" কিছুক্ষন পরে প্লেন স্টল হয়ে ক্র্যাশ করে কাছের একটি হোটেলের উপর।
৪জন হোটেল বাসী, ১০০ জন প্যাসেঞ্জার এবং ৯জন ক্রু সবাই মারা যান।


কি হয়েছিল ? ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট অনুযায়ী, ওইদিন কনকর্ডে বাড়তি প্রায় ৮১০ কেজি মালামাল ছিল, কনকর্ড সেফলি টেকঅফ করার জন্য ম্যাক্সিমাম টলারেন্স যা থাকার কথা তার থেকে ৮১০ কেজি বেশী তেমন গুরুতর কারন নয়, এর আগেও এক্সট্রা ওয়েট নিয়ে টেকঅফ করেছে তারা। যে প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আসতে থাকলো, কেন আগুন ধরলো রানওয়েতে থাকতেই। টেকঅফ করার আগমুহূর্তে প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার/ঘন্টায় থাকতে যখন আগুন দেখা যায়, ঠিক সেইসময়, কনকর্ডের বাম পাশের দুইটি ইঞ্জিনেই পাওয়ার লস হয়। মূলত এই কারনেই প্লেনটি টেকঅফের পরে আর অল্টিট্যুড গেইন করতে পারে নি।


এক্সিডেন্টের পরে রানওয়ে ইনস্পেকনে হঠাৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লু ধরা পড়ে। রানওয়েতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কনকর্ডের টায়ার। কোনভাবে টায়ার পাংচার হয়ে সেটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে, একটা বড় টুকরা ছিল প্রায় সাড়ে ৪ কেজির কাছাকাছি। রেকর্ড ঘেটে দেখা গেল কনকর্ডের টায়ার অনেক বেশী শক্ত বানানো হয় যাতে করে বাড়তি গতির স্ট্রেস নিতে পারে টেকঅফ, ল্যান্ডিং এর সময়, ২৪ বছরে তেমন কোন গুরুতর ঘটনা ঘটে নি। কিন্তু এই প্লেনটির টায়ার গুরুতর ভাবে পাংচার হয়েছে। ধারনা করা হলো এটিই ছিল সূত্রপাত। শুরু হলো খোজা কেন টায়ারটি পাংচার হলো।


রানওয়ে ঘেটে পাওয়া গেল সেই ক্লু, ১৭ ইঞ্চি লম্বা একটি মেটাল স্ট্রিপ পড়ে আছে রানওয়েতে। রেকর্ড ঘেটে দেখা গেল, কনকর্ডের ঠিক আগে টেক অফ করা একটি ডিসি-১০ (বাংলাদেশ বিমানে যেটি বহুল ব্যাবহৃত) প্লেন থেকে ওই স্ট্রিপটি পড়ে যায়। সাধারনত কনকর্ড টেকঅফ করার আগে রানওয়ে একবার ভাল করে চেক করা রুটিন প্রসিডিউর। কোন কারনে সেদিন সেটি করা হয় নি। ফলাফল: ১১৩ জনের মৃত্যু এবং একটি সফল ক্যারিয়ারের শেষ।


প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার গতিতে চলার সময় স্ট্রিপটি আঘাত করে কনকর্ডের টায়ারকে। আর তাতেই পাংচার হয়ে যায় টায়ারটি। তো ? কনকর্ডের প্রতিটি টায়ার সাধারন টায়ার থেকে দ্বিগুন লোড নিতে সক্ষম, কোন সমস্যাই হওয়ার কথা ছিল না তাদের টেকঅফ বা পরে ল্যান্ডিং করতে। তাহলে আগুনের সূত্রপাত হলো কিভাবে ?


টায়ার পাংচার হয়ে যাওয়াটা সমস্যা নয়, কিন্তু প্রায় সাড়ে ৪ কেজি ওজনের একটি টুকরা যদি প্লেনকে আঘাত করে তবে সেটা গুরুতর কিছু করতেও পারে। ইনভেস্টিগেশনে দেখা গেল, টায়ারের টুকরাটি যখন প্লেনের নীচের দিকে আঘাত করে তখন একটা শকওয়েভ তৈরী হয়, আর সেই শকওয়েভে গ্যাসট্যাংকের দুর্বল জায়গাটি ফেটে গ্যাস লিক করা শুরু করে। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, গ্যাস লিক থেকে আগুন ধরতে হলে কোন ইগনিশন হতে হবে, সেটা কোথায় হলো।


ইনভেস্টিগেটররা মোটামুটি একটি সমাধানে পৌছালেন যে টায়ারটি প্লেনের নীচে আঘাত করার সময় লোয়ার পার্টের কোন ইলেকট্রিক ওয়্যারে আঘাত করে আর তারটি ছিড়ে যায়। আগুনের সূত্রপাত সেখান থেকেই।


মোটামুটি শেষ পর্যায়ে, কনকর্ড হয়তো কাছাকাছি অন্য একটি এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতে পারতো, কিন্তু ওই আগুনে প্রথমেই সেকেন্ড ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে, সেটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন পাইলট, এর পরে আগুনের গরমে প্রথম ইঞ্জিনটি সার্জড হয়ে বিকল হয়ে পড়ে, সেটি আর চালু হয় নি। কনকর্ডের ডিজাইন এধরনের গতির ভিন্নতা সহ্য করার মত করে তৈরী করা হয় নি। মোটামুটি ১০০ ডিগ্রীতে বেকে গিয়ে আরো খানিকটা এগিয়ে গিয়ে আছড়ে পরে একটি হোটেলের উপরে।


কনকর্ডের ২৭ বছরের গৌরবময় যাত্রা, অনন্য গতি, সবকিছু থেমে যায় ২০০৩ এ। সবচাইতে বেশী সেফটি রেকর্ড হাতে থাকা কনকর্ডের ইতি টেনে দেয় ডিসি-১০ এর ইঞ্জিন থেকে পড়ে যাওয়া মেটাল স্ট্রিপ।

Up Next: China Airlines Flight 611

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

দারুণ পোস্ট!

আমার সকল টপিক

কোনো কিছু বলার নেই আজ আর...

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

অসাধারণ !

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

National Geographic - এর Air Crash Investigation Series একটি অসাধারণ প্রজেক্ট, এই প্রজেক্ট এর একটি ঘটনা ব্লগে দেখতে পেয়ে আমি আনন্দিত। এয়ার ফ্রান্সএর এই ভয়াবহ ঘটনাটির বিবরণ সুন্দর হয়েছে।

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

clap প্রথম পোস্ট এর পর ২য়টাই বেশ সাবলিল আর তথ্যসমৃদ্ধ ছিলো বলে মনে হচ্ছে । নেক্সট এর অপেক্ষায়.....

নিবন্ধিতঃ১১/০৩/২০০৯ ,নিয়মিতঃ১০/০৩/২০১১, প্রজন্মনুরাগীঃ১৯/০৫/২০১১ ,প্রজন্মাসক্তঃ২৬/০৯/২০১১,
পাঁড়ফোরামিকঃ২২/০৩/২০১২, প্রজন্ম গুরুঃ০৯/০৪/২০১২ ,পাঁড়-প্রাজন্মিকঃ২৭/০৮/২০১২,প্রজন্মাচার্যঃ০৪/০৩/২০১৪।
প্রেম দাও ,নাইলে বিষ দাও

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

খুব ভালো মানের লেখা...

  “যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ, ঋণং কৃত্ত্বা ঘৃতং পিবেৎ যদ্দিন বাচো সুখে বাচো, ঋণ কইরা হইলেও ঘি খাও.

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

আগেরটা থেকে এটা ভাল হইসে!  cool
নেক্সট পার্ট এর অপেক্ষা  smile

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

দারুন লেগেছে thumbs_up পরের পর্বের অপেক্ষায় smile

One can steal ideas, but no one can steal execution or passion. - Tim Ferriss

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

Jemsbond লিখেছেন:

clap প্রথম পোস্ট এর পর ২য়টাই বেশ সাবলিল আর তথ্যসমৃদ্ধ ছিলো বলে মনে হচ্ছে । নেক্সট এর অপেক্ষায়.....

Jol Kona লিখেছেন:

আগেরটা থেকে এটা ভাল হইসে!


আসলে হাডসনের দুর্ঘটনাতে তেমন কিছু ইনভেস্টিগেশন ছিল না তুলনামূলক, সে তূলনায় কনকর্ড বেশী প্যাচালো কাহিনি।
কাজেই তথ্য বেশী  worried

১০

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

ডিসকভারিতে যে ক্রাশ ইনভেস্টিগেশনগুলো দেখায়, সেগুলোর কি কোন ইউটিউব চ্যানেল আছে?

১১

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

রাশেদুল ইসলাম লিখেছেন:

ডিসকভারিতে যে ক্রাশ ইনভেস্টিগেশনগুলো দেখায়, সেগুলোর কি কোন ইউটিউব চ্যানেল আছে?


Seconds From Disaster,  Air Crash Investigation সার্চ করুন, পেয়ে যাবেন। আর টরেন্টে দেখলাম পুরো সিজন ধরে নামিয়ে ফেলা যায়, এখন থেকে সেটাই করবো ভাবছি। মুভির থেকে এগুলো বেশী এক্সাইটিং

১২

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

মেহেদী৮৩ লিখেছেন:

মুভির থেকে এগুলো বেশী এক্সাইটিং

এবং দেখে অনেক কিছু জানা ও শেখা যায়। কিভাবে ছোট্ট একটা ভুলের জন্য কত বড় মাশুল দিতে হয়।

১৩

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২: Air France Flight 4590

সুন্দর লিখেছেন

লেখাটি LGPL এর অধীনে প্রকাশিত