টপিকঃ আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)

কাজ শেষ হত রাত ৯ টায়। এরপর রুমে আসার পর শুরু হত পড়াশুনা। ক্লান্তিতে চেয়ারে বসে থাকাই ছিল দায়। চেয়ার থেকে বিছানায়, বিছানায় বসা থেকে শোয়া, তারপর কম্বল জড়িয়ে পড়া। কতদিন বইয়ের উপরেই ঘুমাইছি তার ঠিক নাই। ক্লাস ছিল সকাল ৯ টায়। ঘুম থেকে এলার্ম ছাড়া উঠেছি মনে পরে না। এলার্ম সেট করতাম তিনটা। একটা একঘন্টা আগে, ঐটা ঘুম থেকে উঠার সময় হইছে এইটা নিজেকে জানানোর জন্য। দ্বিতীয়টা ৩০ মিনিট আগে, এটা ঘুম থেকে উঠার জন্য, তৃতীয়টা ১৫ মিনিট আগে ইমার্জেন্সি এলার্ম, যদি দ্বিতীয়টা মিস করে যাই এই জন্যে। বেশিরভাগ সময় তৃতীয় এলার্ম এই উঠতাম। ভাবতাম এমনে পড়াশুনা চালাব কেমনে? তখন কি জানতাম সামনে আসছে আরো দুর্দিন.....

ডর্ম লাইফ:

আমি থাকতাম নর্থ হেজেস এ.........রেসিডেন্ট হল গুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে বহুতল। এটার একটা জমজ আছে......সাউথ হেজেস। ভার্সিটিতে দুইটা রেসিডেন্ট হল ছিল যেখানে ছেলে-মেয়ে একসাথে থাকত। নর্থ হেজেস এর মধ্যে একটা। ডর্মের বেজমেন্টে একটা গ্রোসারী শপ যেখানে তিন ডাবল দামে সব বিক্রি হয়, ওয়াশিং মেশিন, পুল টেবিল, টেবিল টেনিস, বিরাট এক এলসিডি টিভি, ডিভিডি প্লেয়ার, কিছু মুভির ডিভিডি, লাউঞ্জ, কম্পিউটার সেন্টার- এখানে ফ্রি পিসি, ল্যাপটপ সার্ভিসিং করানো যেত, গান রুম- কারো ফায়ার আর্মস থাকলে (অনেকেরই ছিল, শিকার মন্টানায় জনপ্রিয়) এখানে রেখে যেত। রুমে কোনো আর্মস নেয়া নিষেধ। এছাড়া প্রতি তলায় একটা রিডিং রুম আর লাউঞ্জ ছিল। প্রতিটা লাউঞ্জেই এলসিডি টিভি, ডিভিডি প্লেয়ার আর মিউজিক সিস্টেম ছিল। প্রত্যেক ফ্লোর এর জন্য একজন অথবা দুইজন আর.এ ছিল, যাদের কাজ কোনো প্রবলেম হলো ব্যবস্থা নেয়া। আমি থাকতাম ৮ তলায়। মোট ১২ তলা। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই জানালা দিয়ে তাকালে চোখে পরত তুষার ঢাকা নীল্ পাহাড়। মন ভালো হওয়ার জন্য এই একটা জিনিসই যথেষ্ট। তবে সুন্দর জিনিসগুলো একা দেখলে মজা নষ্ট হয়ে যায় অনেকটাই। রুম এমন আহামরি কিছু না.........ছোট একটা রুমে দুইটা সিঙ্গেল বেড, দুইটা কাবার্ড, একটা পড়ার টেবিল ব্যাস। এই রুম আর সাথের মিল প্লানের জন্য চার মাসে গুনতে হয়েছিল ৩২০০ ডলার। আমার রুমমেট ছিল এক লোকাল আমেরিকান ছেলে বেন, যে মাসে ৭ দিন ও রুমে থাকত না। তাই রুমে বলতে গেলে আমি নিজের মতই থাকতাম। বেন সকালে ক্লাস শেষে মাঝেমধ্যে রুমে আসত.......সেই সময় আমি থাকলে টুক টাক কথা হত আমাদের কালচার নিয়ে, আমেরিকার যুদ্ধ মনোভাব নিয়ে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে আমি আজ পর্যন্ত যতগুলো আমেরিকান এর সাথে মিশেছি, এরা কেউ মুসলিম বলে আমাকে এড়িয়ে যায় নাই। আর মুসলিমরা সব সন্ত্রাসী এই থিওরিতেও তারা বিশ্বাসী না। মন্টানায় রিপাবলিকানদের সাপোর্টার বেশি হলেও তাদের শুরু করা যুদ্ধকে সাপোর্ট করে এমন কারো সাথে আমার দেখা বা কথা হয় নাই। বেনের সাথে ধর্ম নিয়েও কথা হত, তখনি প্রথম আমি উপলব্ধি করি যে আমার নিজের ধর্ম সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই কম। তাও যতটুকু সম্ভব ওকে বলার চেষ্টা করছি। ও খ্রিস্টান হলেও প্রাকটিসিং ছিল না। বেন ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট এ পড়ত। আমাকে বলত নিজের বিজনেস শুরু করার স্বপ্নের কথা। আমার ধারণা আমেরিকানদের জব করার প্রতি আগ্রহ কম। এখন যেখানে জব করি সেখানে একজন আমাকে প্রায়ই বলে "ইউ আর নট গোয়িং টু রিচ এনি হয়্যার, ইফ ইউ কন্টিনিউ হোয়াট ইউ আর ডুইং নাউ"। মনে মনে বলি "আমার বাস্তবতা তোরে কেমনে বুঝাই"।

ডর্ম লাইফ এ আমি কয়েকটা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম। প্রথমটা হলো খাওয়া দাওয়া। ডর্ম এ থাকার কারণে ডাইনিং এ আমার মিল প্লান ছিল। এছাড়া ওই একই জায়গায় আমি কাজ করতাম। কিন্তু সমস্যা ছিল যে আমি কিছুই খেতে পারতাম না। আমাদের খাদ্যাভাস থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সেই খাবারের সাথে আমি মন্টানা ছাড়ার আগ পর্যন্ত মানিয়ে নিতে পারিনি। ডর্ম এ রান্না করার অনুমতি না থাকায় প্রথম দিকে ওই খাবারই ছিল একমাত্র রিজিক। ওরা মূলত সমস্ত সবজি কাচা খায় (ভালো করে ধুয়ে)। যা আমরা বাঙালিরা কখনই খেয়ে অভ্ভস্ত নই। সালাদ বারে থাকত আরো ১৮ রকমের সবজি, ব্রেড, মেয়নেজ, সিদ্ধ ডিম, চার রকমের চিজ, ৬ প্রকার সালাদ ড্রেসিং, পর্ক, টার্কি, বিফ (টার্কি, বিফ শুধু বয়েল করা থাকার কারণে তাও খেতে পারতাম না)। বার্গার বারে থাকত বিফ আর পর্ক বার্গার, চিপস, ভেজিটেবল পিজা, চিজ পিজা, পেপারণী পিজা, ২-৩ রকমের ডেজার্ট, লিকুইড চকলেট, বাটার আর ব্রেড। লাইন এ প্রধান ডিশ গুলো সার্ভ করা হত। এটার মেনু প্রতিদিনই চেঞ্জ হত। এখানে থাকত চিকেন ফ্রাই, চিকেন বারবিকিউ উইংস, শ্রিম্প ফ্রাই, স্টেক, ব্রাউন রাইস, গ্রেভি ভেজিটেবলস, চিজ এ রান্না করা ম্যাকারনি, বুরিটোস, ডিম এ ভাজা পাউরুটি। এগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হত। এছাড়া অন্যান্য দেশের, মূলত মেক্সিকান আর স্প্যানিস কিছু নাম না জানা খাবার ও মাঝে মাঝে থাকত। বেভারেজ এ ছিল ২ ফ্লেভার এর কোক, ৩ ফ্লেভার এর পেপসি, স্প্রাইট, কোল্ড কফি, ম্যাঙ্গ জুস, আপেল জুস, অরেঞ্জ জুস, মিক্সড ফ্রুট জুস, ৪ রকমের কফি, চকলেট মিল্ক, ২% মিল্ক, স্কিম মিল্ক, সয়াবিন মিল্ক, আইসক্রিম (বার & কোন), ৪ রকমের কফি আর ১০ রকম ফ্লেভার এর চা !!!!! দুনিয়া তে যে এত রকম চা আছে ঐটাই আমার ধারনায় ছিল না। আরো বেশ কিছু খাবার ছিল যা মনে আসছে না। আর এর সবকিছুই ছিল আনলিমিটেড। যত পর তত খাও। এছাড়া সকালে কনডোতে অর্ডার মোতাবেক ডিম ভাজা পাওয়া যেত। তাও প্রায় ৯/১০ রকমের তো হবেই। সবজি দিয়ে ডিম ভাজা, পর্ক দিয়ে ডিম ভাজা (চিকেন আর বিফ ছিল না), মাশরুম আর অলিভ দিয়ে ভাজা, গ্রিন পিপার আর রেড পিপার দিয়ে ভাজা, ডিম পোচ, শুধু ডিমের সাদা অংশের ভাজা, অথবা তিনটা ফুল ডিম আর দুইটা ডিমের সাদা অংশ আর কত কি। যে যার ইচ্ছা মত ডিম নিতে পারত। আমি সর্বোচ্চ একজনকে একসাথে ১৪ টা ডিমের ভাজি নিতে দেখেছি। এত রকমের খাবার এর মধ্যে আমার মেনুতে ছিল সকালে তিনটা ডিম ভাজা আর পাউরুটি, সাথে চকলেট মিল্ক, আইসক্রিম। বাকি সময় চিকেন বারবিকিউ উইংস (এইটা সবচেয়ে প্রিয় ছিল আর এইটা মাসে দুই বার এর উপরে বানাত না), বিফ বার্গার, চিপস, ভেজিটেবল পিজা, চিজ পিজা, চিকেন ফ্রাই, ডিম এ ভাজা পাউরুটি। আপনারা ভাবতে পারেন এত কিছু থাকতে এত অল্প জিনিস খাওয়ার মানে কি? ব্যাপার হলো উপরে মেইন ডিশ যেগুলো বললাম ওগুলো একই দিনে সব থাকত না, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রান্না হত। এমন দিন ও গেছে যেইদিন আমার খাওয়ার মত কোনো মেইন ডিশ ছিল না। ভার্সিটির প্রথম দিকে ছাত্র কম থাকায় বেশ কিছু দিন তেমন কিছুই আইটেম ছিল না তখন পিজা আর চিপসই ছিল সম্বল। যেগুলো খাওয়ার মত ওগুলাও এত বাজে ভাবে রান্না করত যা বলার বাইরে। খাওয়া নিয়ে অভিযোগ শুধু ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদেরই না খোদ আমেরিকান স্টুডেন্টদেরও ছিল। অনেকেই বাইরে খেত। কিন্তু প্রথম যাওয়ার পর সবকিছুকেই টাকা দিয়ে গুন দিতাম (মধ্যবিত্ত সবাই যা করে)। প্রতিবেলায় ৫ ডলার (নিম্নে) খরচ করে খাওয়ার আত্মা আমার হয় নাই। খাওয়া দাওয়ার এই চরম ডিজাস্টার থেকে আমাকে রক্ষা করে রাশেদ ভাই, যিনি বুয়েট থেকে ইন্ডাসট্রীয়াল ইন্জিয়ারিং এ অনার্স করে এখানে মাস্টার্স করছেন। আমাকে হাতে ধরিয়ে রান্নাও উনি শিখান। মন্টানায় যত দিন ছিলাম উনি আমাকে আপন ছোট ভাইয়ের মতই আদর করেছেন।

চলবে......

দিনের পর দিন............

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)

প্রবাস জীবন কতটা কষ্টের তা আপনার লেখনিতে ফুটে উঠেছে।

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)

আপনার লেখার হাত চমৎকার ! ৭ টি পর্বই এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেছি ।

একটা কথা বলার আছে : যদি এতগুলো থ্রেড না খুলে একই থ্রেডে দিতেন , আমার মনে হয় ভালো হত । সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত ।

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)

লম্বা হলে আমরাই পড়তে চাইনা, তাঁতেই আরণ্যক ভাই আর আমার দাবি বেশী প্যারা

একজনকে ফাস্টফুডের দোকানে বলা হল পিজা কি ৪ পিচ করা হবে নাই আট পিস??
ওনার জবাব ডাক্তার কম খেতে বলেছে বিধায় ৪ পিস করেই দাও  lol lol

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)

কণিষ্ক লিখেছেন:

আপনার লেখার হাত চমৎকার ! ৭ টি পর্বই এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেছি ।

একটা কথা বলার আছে : যদি এতগুলো থ্রেড না খুলে একই থ্রেডে দিতেন , আমার মনে হয় ভালো হত । সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত ।

আমার মত তাই না ভাই ।

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)

কণিষ্ক লিখেছেন:

আপনার লেখার হাত চমৎকার ! ৭ টি পর্বই এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেছি ।

একটা কথা বলার আছে : যদি এতগুলো থ্রেড না খুলে একই থ্রেডে দিতেন , আমার মনে হয় ভালো হত । সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত ।

এক থ্রেডে দেওয়া সম্ভব নয়। একের পর এক লেখা যায় না ......
আরেকজনের মন্তব্যের জন্য অপেক্ষা কড়তে হয়।
তবু মডারেটর/এডমিন গণ চাইলে এটাকে একটা টপিকে করে দিতে পারেন আমার আপত্তি নেই  clap

দিনের পর দিন............

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)

প্রবাস জীবন আসলেই কি কষ্টের, তাই যদি হবে তবে আমরা এই সোনার হরিনের পিছনে কেন দৌড়াচ্ছি?

"We want Justice for Adnan Tasin"

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)

সব থ্রেডগুলার লিংক প্রত্যেকটি থ্রেডে দিয়ে দিলে খুব ভাল হত, মুভ করে করে পড়া যেত, পড়তে ভাল লাগছে  thumbs_up