টপিকঃ আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৫)

ক্লাস:

এইখানে ক্লাস এর অভিজ্ঞতা অভূতপূর্ব। সত্যিকারের ভার্সিটিগুলোতে মনে হয় এমনই হয়। আমি বাংলাদেশে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ছিলাম। ঢাকা ভার্সিটিতে দুইবার এও টিকলাম না। জগন্নাথ এর ওয়েটিং লিস্টে আসায় ওয়েট করতে থাকলাম কিন্তু সবুরের ফল আর মিঠা হলো না। শেষ মেষ ঠাই মিলল ইউ.আই.ইউ তে। ঐখানকার পড়াশুনার এক্সপেরিয়েন্স আর এম.এস.ইউ এর এক্সপেরিয়েন্স এর মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। এরা জানে কিভাবে পড়াতে হয়, পড়াশুনা যে কেবল মাত্র লেকচার, এক্সাম আর এসাইনমেন্ট এই সীমাবদ্ধ না তা এখানে এসেই জেনেছি। প্রথম রেজিস্ট্রেশন এর সময় এডভাইজর বলল "টেক দা মিউজিক অর থিয়েটার ক্লাস, ইউ আর নিউ, ইউ শুড হ্যাভ সাম ফান। ইট উইল অলসো হেলপ ইউ"। শুইনা আমার গায়ে জ্বর আসে আর কি। বেটা কয় কি? এই জিনিস কেমনে আমারে হেলপ করব? সব আউল ফাউল কথা। জীবনে এগুলার ধারে কাছে ছিলাম না, আর এখন এইখানে আইসা এগুলা করতে হইব? জীবনেও পারমু না। আমি চাইলে চেঞ্জ করতে পারতাম কিন্তু কোনো এক অজানা লজ্জায় তার সামনে আমি আমার দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারিনি। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল, থিয়েটার নিয়ে হতাশ মনে এসে পরলাম। সেমিস্টার ফাইনালের অভিনয়ের পর সবার সেই হাত তালি আমার আজ ও মনে পরে। সে কথায় আসছি পরে। মোট ক্রেডিট নিলাম ১২ টা। এই কয়টা নিতেই হবে। ইন্টারন্যাশনাল আন্ডার গ্রাড স্টুডেন্টদের মিনিমাম ১২ ক্রেডিট নিতেই হয়। চারটা সাবজেক্ট। প্রতিটা সাবজেক্ট এই মিনিমাম ২ টা বই। CLS 101 এ মোট ৭ টা বই (প্রত্যেক বই থেকে দুই-তিনটা গল্প, কোনো মানে হয়)। আমার তো মাথায় হাত, এত বই কিভাবে কিনব? সব বই কিনতে খরচ পরবে প্রায় ৬৫০ ডলার। এখানে যে সেকেন্ড হ্যান্ড কেনা যায় অথবা বই ভাড়া নেয়া যায় তা আমার জানা ছিল না। আর তাতেও খরচ একেবারে কম পরে না। অর্ধেক তো লাগবেই। তো আমি বই ছাড়াই বেশিরভাগ ক্লাস এ যাই। দুইটা কিনছি। একদিন CLS 101 এর প্রফেসর ক্যাথিলীন অফিসে ডেকে বললেন, কি ব্যাপার তুমি বই আন না কেন? আমি সরাসরি বললাম দেখো আমি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট। I-20 তে বই এর বাজেট লেখা ছিল বছরে ৯০০ ডলার, সেখানে এক সেমিস্টার এই লাগছে ৬৫০ ডলার, আমি পোষাতে পারছি না। উনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, "আমি জানি তোমরা এখানে এসে অনেক সমস্যায় থাক, তুমি এক কাজ কোর, আমার কাছে এই সাবজেক্ট এর সব বইয়ের এক্সট্রা আছে, তুমি আমার থেকে কালকে এসে নিয়ে যেও"। ওনার এই উপকারের জন্যই আর কারো পড়া পড়ি আর না পড়ি, ওনারটা সবসময় পড়ে গেছি। তবে আর্ট গ্যালারী ভিজিট করে যে কোনো দুইটা ছবির উপরে ক্রিটিক্স লেখার একটা এসাইনমেন্ট ছিল, ঐটাতে সাফল্যের সাথে আমি অকৃতকার্য হই। একমাত্র উল্টাপাল্টা আকিবুকি ছাড়া আমার নধর দুই চোখ আর কিছুই দেখতে পাই নাই। সেমিস্টার শেষে বই গুলো ফেরত দিয়ে আসি। হয়ত আমার মত অন্য কারো কাজে লাগবে।

বইয়ের কথার সাথে যার কথা অবশম্ভাবী আসে তিনি হলেন আর্কিটেকচার এর প্রফেসর শন। যে দুইটা বই আমি কিনছিলাম তার একটা ওনার সাবজেক্ট এর। এই বান্দা প্রথম ক্লাসে এসেই বলে "বই দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নাই, বই থেকে আর্কিটেকচার শেখা যায় না। আর্কিটেকচার তোমাকে বুঝতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে। এই পৃথিবীর প্রতিটা জিনিসের মধ্যে আছে আর্কিটেকচার। একটা পেন্সিল তৈরীতে আর্কিটেকচার লাগে আবার একটা প্লেন তৈরীতেও আর্কিটেকচার লাগে। আমরা গড এর একটা বিশাল আর্কিটেকচারাল প্লান এর অংশ, বই বাদ। যেহেতু কোর্সে কারিকুলামে একটা বই রাখতেই হয় তাই রাখা। আমি তোমাদের আর্কিটেকচার শিখাবো প্র্যাকটিকালি"। উনি আরো সুন্দর করে বলছিলেন, আমার যতটা মনে আছে বললাম। প্রফেসর শন পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে ঘুরছেন, বাংলাদেশেও এসেছিলেন। উনি পৃথিবীর নানান জাতির নানান ধরনের আর্কিটেকচারাল ডিজাইন, ডেভলপমেন্ট বুঝাতে উনি নিজের তোলা ছবি ব্যবহার করতেন। ওনার বেশিরভাগ ক্লাস রুমে না হয়ে ক্যাম্পাস এর নানান বিল্ডিং এর সামনেই হতো। উনি বিল্ডিং ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বা সামনে দাড়িয়ে তার ডিজাইন নিয়ে আলোচনা করতেন। অন্য কোনভাবে করলে কোনো বিশেষ সুবিধা হত কিনা তা নিয়ে বলতেন। অনেক কিছুই যদিও এন্টেনার উপর দিয়ে যেত............

আরেকটা সাবজেক্ট ছিল ওয়েব ডিজাইনিং। এই প্রফেসর জীবনেও উপস্থিতি নিতেন না তাই তিন চার দিন যেয়ে শুরু হলো মিস দেয়া। সৌদি'র এক সিনিয়র স্টুডেন্ট রিটেক নিয়েছিল এই কোর্সটা, ওর সাথে আমার গ্রুপ পড়ে তাই বেশ ভালো ভাবেই পাস করে যাই নাহলে ফেল ছিল নিশ্চিত।

চলবে......
আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ১)
আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ২)
আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)
আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৪)

দিনের পর দিন............