টপিকঃ কক্সবাজারের মুক্তিযুদ্ধে নারী

যেভাবেই বলি না কেন এটাই সত্য, মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। আর এই ইতিহাস বিনির্মাণে নারীর ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ যা, নানাভাবে উপেক্ষিত এখনো। '৭১-এ নারীর অবদানের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সম্ভ্রমহানি আর হাসপাতালের সেবিকার চরিত্রের কথা। তাও আবার গল্পচ্ছলে, সেটাও নির্বাকই থাকে। '৭১-এর ইতিহাসেও রয়েছে লিঙ্গবৈষম্য। স্বাধীন দেশে নারীর মহান আত্মত্যাগ কিংবা শহীদের তালিকা অথবা বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের বহু ঘটনা রয়ে গেছে দৃষ্টির আড়ালে। মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনার ইতিহাস এমন একটি বিষয় যা কেউ স্বীকার করতে চায়না। কক্সবাজারের অনেক নারীকে নির্যাতন করা হয়েছে কিন্তু কেউ প্রকাশ করতে চায়না। তার পরও প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক কক্সবাজারের অধিবাসী ও জন্মগ্রহণকারী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেণ কিংবা পাক বাহিনীল লালসার শিকার হয়েছেন তাদের মধ্যে শিখা রানীর অন্যতম। শিখা রানী খুরস্কুলের মেয়ে। তার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে অস্ত্র হাতে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। মহেশখালীর দুর্ধর্ষ রাজাকার মৌলভী জকরিয়া তাকে ধরে নিয়ে পাক বাহিনীর লালসার শিকার করিয়ে সর্বশেষ ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেছিলেন।
দেশ স্বাধীন হবার পর তখন ভারতীয় সেনাদের একটি দল অবস্থান নিয়েছিল কক্সবাজার সার্কিট হাউসে। কক্সবাজার মহকুমা প্রশাসনিক পরিষদের প্রশাসক ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা এবং পরবর্তীতে মহকুমার গভর্নর অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম। মুক্তিযোদ্ধা জওহর লালের পরিবারের পক্ষ থেকে ভারতীয় সেনাদের নজরে নেওয়া হয় এ ঘটনাটি। আওয়ামী লীগের সাবেক দলীয় সংসদ সদস্য, কঙ্বাজার মহকুমার তদানীন্তন গভর্নর ও বর্তমানে গণফোরাম নেতা অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের সামপ্রতিক প্রকাশিত 'বাংলাদেশের রাজনীতি-আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতি' নামের বইতে এ ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন- মৌলভী জাকারিয়া মহেশখালী দ্বীপের গোরকঘাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। ৭০'র প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে যখন সবাই জান বাঁচাতে ব্যাকুল তখনই শিখা রাণীকে বিয়ে করেন এই মৌলভী জাকারিয়া। মুক্তিযোদ্ধা জহর লাল এসে অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামকে অভিযোগ করেন, 'আমার ভাগ্নিকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন-নতুবা আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নেব। এমনকি তখন মৌলভী জাকারিয়ার বংশের কাউকে অক্ষত রাখব না।' অবশেষে তাই করা হলো। রাজাকারের ঘর থেকে শিখাকে উদ্ধার পুর্বক নেওয়া হলো কারাগারের কাস্টডিতে। একদিন গভীর রাতে কক্সজারে অবস্থানরত ভারতীয় সেনারা কারাগারে ঢুকে সেই শিখা রানিকে বের করে নিয়ে আসেন। ভারতীয় সেনাদের নিকট গোপন সংবাদ ছিল-শিখা রানিকে জোরপূর্বক আটক রাখা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তা সত্য নয়। পরে ভারতীয় সেনা কমান্ডার অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের নিকট এসে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এই জন্য যে- 'আমরা একটা অন্যায় করে ফেলেছি। আপনি এখানকার এ সময়ের প্রশাসক কিন্তু আপনার অনুমতি না নিয়ে রাতের আঁধারে কারাগারে ঢুকে মেয়েটিকে বের করে এনেছি। পরে আমরা নিশ্চিত হয়েছি আপনি যে ব্যবস্থা নিয়েছেন তার যথার্থ রয়েছে।' লেখক অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম লিখেছেন-তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বিধায় আইন ভঙ্গ করায় দুঃখও প্রকাশ করেছেন। পরে অবশ্য শিখাকে নিয়ে পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হলো-এখানে আর নয়। শেষপর্যন্ত মান-সন্মান রক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা জওহর লালের বোন শান্তি রানি তার কন্যা শিখাসহ অন্যান্যদের নিয়ে পাড়ি জমান ভারতে।
প্রিনছা খেঁ
প্রিনছা খেঁ ছিলেন রাখাইন সম্প্রদায়ের মেয়ে। কক্সবাজারের টেকনাফে আদিবাস তার। পাহাড়, পানি, অরণ্য আর সৈকতে তার বিহার, নিসর্গে তার বেড়ে ওঠা। সত্তরের নভেম্বরের জলোচ্ছ্বাসে সব হারিয়ে নিগ্রন্থ হয়ে যায় তিনি। সংগ্রাম যার সত্তা, সে অবলা হয় কী করে। অষ্টাদশী প্রিনছার ক্রর প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক দ্রোহী সত্তা। অক্লিষ্ট প্রিনছা জলোচ্ছ্বাসের পর আর্তের সেবায় আসা এক মেডিকেল টিমের সাথে যোগ দেয়। এক জাপানী দম্পতি, এক বৃটিশ তরুনী আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রের এই ছোট্ট মেডিকেল টিমে চাল চুলোহীন প্রিনছা হয়ে গেল এক সফেদ নার্স; ব্যস্থ হয়ে হয়ে উঠল দুুস্থের সেবায়। মেডিকেল টিমটি একাত্তরের ফেব্রুয়ারি চলে আসে পটুয়াখালীর উপকূল অঞ্চলের কুয়াকাটা সৈকত এলাকায়; সাথে প্রিণছাও। পরে এপ্রিল শুরুতে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় নিয়োজিত হয় প্রিনছা ও তার মেডিকেল টিম। পরে মেডিকেল টিম আলাদা হয়ে যায় পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে।...১৯৭১ সালের মাঝামাঝিতে প্রিনছার স্থান হয় শক্র ক্যাম্পে। শক্র ক্যাম্পে পাক-আর্মির দুই বাবুর্চির সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রিনছা হয়ে গেলেন তৃতীয় বাবুর্চি। ক্যাম্পে কাঠ সংগ্রহকারী বাবুলের সঙ্গে তিনি গোপনে পরিকল্পনা করতে থাকেন। অক্টোবরে প্রিনছা ক্যাম্প অধিনায়ক সুবেদারকে জানালেন তিনি অসুস্থ, ঝালকাঠি যেতে চান ডাক্তার দেখাতে। এক হাবিলদার, এক সিপাইসহ বাবুল আর প্রিনছা এলেন ঝালকাঠি ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার যখন অসুখের জিজ্ঞেস করলেন, তখন প্রিনছা বললেন, তিনি গর্ভবতি গোপনে কথা বলবেন। পেছনের ঘরে গিয়ে তিনি ডাক্তারকে বললেন, আসলে তিনি অন্ত:সত্বা নন, কিন্ত পাকিস্তানি হাবিলদারকে যেন ডাক্তার বলে দেন, তিনি অন্ত:সত্বা, প্রতি চার দিন পরপর তাঁকে ডাক্তারের কাছে পরীক্ষার জন্য আসতে হবে। পরে ডাক্তারের কাছে গিয়ে প্রিনছা বললেন, তাঁর বিষ চাই। (কেন চান এটাও বুঝিয়ে বললেন) ডাক্তার কিছুদিন সময় নিয়ে ঝালকাঠি থেকে বিষ এনে দিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় খুবই যতœ করে রান্না করলেন প্রিনছা। তার আগে রান্নাঘরে দুই পাকিস্তানি বাবুর্চিকে খাইয়ে এসেছেন, খাওয়া শেষে সবাই অচেতন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রিনছা বাবুলের সঙ্গে পালিয়ে যান নাজিরপুলে। সেই ক্যাম্পের ৪২ জন শক্রর মধ্যে ১৪ জন অচেতন অবস্থায় মারা যায় আর বাকিদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। এ খবর শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে যায় প্রিনছা। তাই তিনি ঝালকাটির সহায়তাকারী ডাক্তারকে দোষারোপ করেছে। প্রিন্ছার বিশ্বাস ডাক্তার তার সাথে বেঈমানী করেছে, তাকে ভেজাল বিষ দিয়েছে। তা নাহলে সব শত্রু মরল না কেন? ৪৬
প্রিনছা খেঁ নামের ওই নারী মুক্তিযোদ্ধাকে ৩৬ বছর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার যথাযথ সম্মান দেয়া হয়নি, তেমন কেউ মনে রাখেনি। এর পরে কী হয়েছে এটা জানা নাই। ইতিহাসে এদের নাম আসে না কারণ এরা দলবাজ না। ঘুরেফিরে আসবে অল্প কিছু বিখ্যাত মানুষদের নাম। বছরের পর বছর ধরে আমরা এদের কথা শুনতে শুনতে কানের পোকা বের করে ফেলব। আসলে ভাঙ্গা গ্রামোফোনের পিনটা আটকে আছে কোথাও, এ থেকে আমাদের মুক্তি নাই। যেমনটা আমরা সম্মানিত করেছি উক্য চিং-কে...১০০ টাকা দিয়ে...।
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সকাল হতে কক্সবাজারের রুপ বদলায়। যারা ২৬ মার্চ জয় বাংলা ধ্বনিতে আকাশ ফাটায়-তাদের অনেকের কন্ঠ নীরব। আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী সমর্থকরা ছাড়া বাকীদের তৎপরতা কেমন যেন স্তিমিত। জনগণের পাশাপাশি মহকুমা অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীর মধ্যে দারুন শংকা জাগে। ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কন্ঠ সম্পূর্ণ ভিন্ন সংবাদ প্রচারিত হতে শুরু করল। চারদিকে থমথমে ভাব। দুপুরের দিকে কক্সবাজার শহরের বাজারঘাটার রাস্তায় ভীষণ হৈ-চৈ ও জটলা। সেদিন দুপুরের বাজারঘাটার জটলার বর্ণনা দিতে গিয়ে তৎকালীন কক্সবাজার মহকুমা অফিসের কর্মকর্তা রফিক আনোয়ার মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোর দু:সহ স্মৃতি নিয়ে আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘একাত্তরের মহাবিদ্রোহ: অগ্নিপুত্ররা কোথায়?-এ লেখেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানি ইপিআর ধরা পড়েছে। তাদের গোল পাহাড়ের ঢালুতে নিয়ে উৎসাহী (!) স্বাধীনতা সংগ্রামীরা জবাই করে দিলো। কক্সবাজারে বেড়াতে আসা ঊর্দুভাষী এক কলেজ ছাত্র ও তার বোন মেডিকেল ছাত্রীকে গণিমতের মাল হিসেবে পাওয়া গেছে। ভাইটিকে শেষ বিদায় জানিয়ে বোনটিকে নাকি টেকপাড়ায় উঠানো হয়েছে। কক্সবাজার শহরের উদুভাষী অভিবাসী ছিলনা বললেই চলে, ভারতের ইউপি থেকে আগত বিনয়ী শান্ত নম্র একজন ভদ্রলোক কক্সবাজারে বাস করতেন তাকে লোকে সাধারণত হাড্ডি কোম্পানী বলে ডাকত। হাঙ্গরের হাড় গুরো করার এক্টি ছিল। ভদ্রলোক খুবই দানশীল ছিলেন। ভারত থেকে সর্বস্ব হারিয়ে পাকওয়াতনে এসেছিলেন। কিন্তু ইয়াহিয়া-ভূট্টো জিঘাংসা মেটাতে গিয়ে এই নিরাপদ ভদ্রলোক গোলদিঘির ঢালূতে লাশ হয়েছিল, তার একটি মাত্র স্কুল পড়–য়া সুন্দরী মেয়ে কোথায় জানেনা। বাড়িঘর সবকিছু চোখের পলকে লুন্টিত হয়েছে।

পাকবাহিনী ও তার দোসরদের লালসার শিকার হতে হয়ে কল্পনা (একালের জনপ্রিয় অভিনেত্রী), চকরিয়ার জায়নুর বেগম, হ্নীলার সিমা, হ্নীলার ধইল্যার মা, মিস্ত্রিজান। এমনি আরও শত সহ¯জানা না জানা ঘটনা, গল্প রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও নারীর অবদানকে ঘিরে। এই লেখাটিতে নারীকে মুক্তিযুদ্ধে উৎসাহ প্রদানকারী, সেবিকা, ধর্ষিতা এসব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং এটি তাদের অন্যরকম অনন্য কিছু উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা মাত্র।

Re: কক্সবাজারের মুক্তিযুদ্ধে নারী

'৭১-এ নারীর অবদানের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সম্ভ্রমহানি আর হাসপাতালের সেবিকার চরিত্রের কথা।


অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সরাসরি সহায়তাও করেছেন, আশ্রয় দিয়ে খাদ্য দিয়ে, তাদের খবর সংগ্রহ করে এক স্থান থেকে এক স্থানে , অস্ত্র এক স্থান থেকে এক স্থানে নিতে সহায়তা করেছেন

"We want Justice for Adnan Tasin"

Re: কক্সবাজারের মুক্তিযুদ্ধে নারী

ধন্যবাদ। এটা পরিবর্তীতে যোগ করা হবে।

Re: কক্সবাজারের মুক্তিযুদ্ধে নারী

পুরুষ হোক আর নারী হোক তারা মুক্তিযুদ্ধা - এদের প্রত্যেক খুজে বের করে তাদের প্রাপ্য সন্মান দেওয় উচৎ ছিল অনেক আগেই। ধন্যবাদ শেয়ার করার জণ্য

Re: কক্সবাজারের মুক্তিযুদ্ধে নারী

ভাই.কিভাবে একটি গানের এলবাম ডাউনলোড করবো