সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন যাপিত সময় (০৩-০৫-২০১৩ ২০:১১)

টপিকঃ আবাস (২য় অংশ)

১ম অংশ

তবে বিপত্তি বাঁধল যখন ছোট চাচা কানাডায় স্কলারশিপ পেয়ে গেলেন। উনার বাইরে যাবার প্রবল আগ্রহ থাকলেও বাকী ভাইরা বাধ সাধেন, বিশেষ করে রাবেয়ার বাবা তো একদমই চাচ্ছিলেন না যে ছোট ভাই বিদেশ যাক। ছোট চাচার এক কথা, তিনি যাবেনই। তার মতামতের মূল্য কেউ যখন দিচ্ছেই না, তিনি অভিমান করেই সিদ্ধান্ত নিলেন একবার গেলে আর ফেরত আসবেননা। তিনি দাবী করলেন, বাড়ির মাঝে তার যে ভাগ আছে সেটা আলাদা করে দেয়া হোক, তিনি ওটা বিক্রী করে দিয়ে পুরো টাকাটা ক্যাশ নিয়ে চলে যাবেন। অবস্থা দেখে তখন সবাই অনেক বুঝিয়েছিল, বাড়ি ভাঙ্গার দরকার নেই, সবাই মিলে টাকাটা দিয়ে দেবে, উনি পড়াশুনা করে আবার ফেরত আসুক। কিন্তু ছোট চাচা মানতেই চাইলেননা। অগত্যা তার অংশ তিনি বিক্রি করে একেবারেই চলে গেলেন, অভিমান করে আর কখনো যোগাযোগও করেননি। এর পর বাকী ভাইরাও একে একে যে যার বাড়ির অংশ আলাদা করে ভাগ করে ফেলার দাবী জানালো। একজন একান্নবর্তী পরিবারে আর খাপ খাওয়াতে পারছেননা, একজন অন্য জায়গায় চাকুরী নিয়ে চলে যাবেন এসব নানা কারণ দেখিয়ে সবাই আলাদা হয়ে যেতে চাইলেন। আর কী করা? সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে যার অংশ আলাদা করে নেবে। শুধু রাবেয়ার বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন মায়ের কবর সহ অংশটুকু তিনি নিয়ে উনি ওখানেই থাকবেন। তাই বাড়ির মাঝে তার অংশটুকু আর ভাঙ্গা হলনা।

কিন্তু গাছটা তো আর রাখা চলেনা। মা মারা গেলে সবাই তখন আবেগের চোটে তাঁর কবর উঠোনের মাঝে দিলেও এখন  গাছটা কেটে ফেলা ছাড়া আর কিছু করার নেই। মজার ব্যাপার হল, সবাই নিজের অংশ আলাদা করে ফেলার জন্য উঠেপড়ে লাগলেও, এখন এসে দেখা গেল গাছ কাটতে সবার আপত্তি। কেউ আর সাহস করে গাছ কাটার কথা বলতেও পারছেনা, আবার গাছ কাটতে কারো মন সায়ও দিচ্ছেনা। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত রাবেয়ার মা-ই সিদ্ধান্ত নিলেন, যেহেতু তিনিই বাড়ির বড় বৌ, তাই তারই কিছু করা উচিৎ।

কাজেই একদিন রাবেয়া  সন্ধ্যায় ছাদ থেকে নেমে হাতমুখ ধোবার জন্য কলতলার দিকে এগোতেই খেয়াল করে মা গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন কথা বলছেন। কে হতে পারে দেখার জন্য রাবেয়া একটু সামনে এগিয়ে যায়। আশ্চর্য, কেউই তো নেই! কার সাথে কথা বলছে মা? রাবেয়া খেয়াল করল যে, বাতাসের নাম গন্ধ পর্যন্ত নেই, কিন্তু পুরো গাছটার ডাল গুলো যেন তিরতির করে কাঁপছে। হঠাৎই রাবেয়া যেন বুঝতে পারে, তাহলে কি মা দাদীর সাথে কথা বলছে? রাবেয়া সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়েই থাকে। মা অনেক্ষণ ধরে কী কী যেন বললেন। থমকে থমকে কেঁদেও উঠলেন। অনেক্ষণ পর হঠাৎই যেন গাছটা স্থির হয়ে গেল। আর কোন নড়াচড়া নেই। তারও আরো অনেক্ষণ পর মা চোখ মুছে ঘরে ঢুকলেন। রাবেয়া তখন উঠে গিয়ে গাছটার কাছে দাঁড়াল। বেশ খানিক্ষণ কি করবে বুঝে উঠতে পারলনা। তারপর কি মনে করে গাছটার গায়ে একটু হাত রাখল। হিম শীতল হয়ে আছে গাছটার শরীর। খানিক্ষন রাবেয়া সেভাবেই থাকল। তারপর পায়েপায়ে বাড়ির ভেতর এসে ঢুকল।

পরদিন সকালের কথা, রাবেয়া বাড়ির গেটের সামনে এসে খেলছিল, একটু পর বিন্তিরও আসার কথা। হঠাৎ কে যেন রাবেয়ার নাম ধরে ডেকে উঠল। রাবেয়া তাকিয়ে দেখে লাঠিতে ভর দিয়ে একজন বুড়ি তার দিকে তাকিয়ে ফোকলা মুখে হাসছে। বুড়ির গায়ের রঙ ধবধবে সাদা। গায়ের শাড়ীটাও দুধ সাদা রঙের। রাবেয়া তাকাতেই হাতের ইশারায় ডাক দিল। রাবেয়া যাবে কি যাবেনা খানিকক্ষন ইতঃস্তত করে বুড়ির কাছে এগিয়েই গেল। কাছে যেতেই বুড়ি খপ করে হাত চেপে ধরল,
- বল্‌, তুই আমাকে তোর নিজের বাসায় তোর কাছে রাখবি? না রাখলে খুব রাগ করব কিন্তু!
রাবেয়া ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠল,
- আহ্‌, লাগছে তো। ছাড়োনা! তোমাকে আমার বাসায় রাখব কেন? আমি কি তোমাকে চিনি?
-চিনিস্‌ না? চিনিস তো! শোন আমাকে তোর কাছে রাখিস হ্যাঁ? লক্ষী মেয়ে না তুই! নে এটা তোর জন্য এনেছি।
এই বলে বুড়িটা রাবেয়ার হাতে গোল কী একটা গুঁজে দেয়। রাবেয়া তাকিয়ে দেখে বেশ বড় সাইজের একটা কমলালেবু। কিন্তু কি আশ্চর্য ব্যাপার, পুরোপুরি সাদা রঙের!
- আরে, এটা কোথায় পেয়েছ?
রাবেয়া প্রশ্নটা করে মুখ তুলে তাকিয়েই দেখে কেউ নেই। আশ্চর্য তো!, বুড়িটা গেল কোথায়? রাবেয়া এদিক ওদিক তাকিয়ে অনেক খুঁজল, কোথাওই বুড়িকে দেখতে পেলোনা। ভয়ে ভয়ে কমলাটা নাকের কাছে নিয়ে শুঁকে দেখল। আহ্‌, কী সুঘ্রাণ! রাবেয়া কমলাটা ছিলে নিয়ে একটা কোয়া মুখে দিল। আহ্‌, কী স্বাদ!! নিমিষের মধ্যে সে কমলাটা শেষ করে ফেলল। আহ্‌, এই স্বাদ সারা জীবনে কি ভোলা যাবে! রাবেয়া যেন নিশ্চিত হয়ে যায়, তার দাদীই হয়তো ঐ বুড়ির বেশ ধরে এসেছিল।

তারপর আরো দশ বছর পরে রাবেয়ার বিয়ে হয়ে গেলো। একে একে আরিফ, রাসেল আর রেশমার জন্ম দিলেন। কিন্তু তিনি তার দেয়া কথা ভোলেননি। তার বাড়ির উঠোনে ঠিকই তিনি একটা জাম গাছের চারা পুঁতেছেন। যদিও তিনি নিশ্চিত ছিলেননা, দাদী আসলেই ফেরত আসবেন কীনা? কিন্তু একদিন সন্ধ্যায় খেয়াল করেন, কোনো বাতাস নেই কিন্তু জাম গাছটার ডালপালা তিরতির করে কাঁপছে। রাবেয়া নিশ্চিৎ হয়ে যান, হ্যাঁ, দাদী  ফেরত এসেছেন। সেই গাছ আজ ডালপালা ছড়িয়ে বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। রাবেয়া কতবার তার তিন ছেলেমেয়েকে তার এ গল্পের কথা বলেছেন, কিন্তু ওরা কেউ এটা বিশ্বাস করতে চায়না। তারা বলে, রাবেয়া নাকী বাতাসে গাছ নড়াচড়া করাকে ভুল ভাবেন। সাদা রঙের কমলালেবু? ওটা তো অসম্ভব ব্যাপার! ওটা নিছকই রাবেয়ার শিশু মনের কল্পনা ছিল। রাবেয়া কিছুতেই তার ছেলে মেয়েকে তার এ গল্পগুলো বিশ্বাস করাতে পারেননি। বাধ্য হয়ে তাই সেই চেষ্টা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। এখন রাসেল আর রেশমা তো দেশের বাইরেই চলে গিয়েছে, একমাত্র আরিফই তার কাছে আছে। এখন সেও এ বাড়ি ভেঙ্গে ডেভেলপারকে দিয়ে দেবে বলছে, এ গাছটাও কেটে ফেলা হবেতো বটেই। রাবেয়া আর কষ্টটুকু সহ্য করতে পারেননা...

...

নাজনীন রুমে ঢুকতেই আরিফ জিজ্ঞেস করে,
- কী, মাকে আবার বললে নাকি ডেভেলপারের কথা?
- বললাম তো, কিন্তু কী লাভ বলো? মাতো তার সেই পুরান আমলের ধ্যান ধারণা নিয়েই পড়ে আছেন। আমি আর উনাকে বোঝাতে পারবনা। তুমি দেখ, কাজ হয় নাকি।
- আচ্ছা, কাল তাহলে আরেকবার বোঝানোর চেষ্টা করব, দেখি কী হয়...
হঠাৎ রাবেয়ার ঘর থেকে কাঁচের জগ পড়ে ভেঙ্গে যাবার শব্দ আসে। আরিফ, নাজনীন ছুটে এসে দেখে রাবেয়া মাটিতে পড়ে গেছেন। হার্ট এটাক নাকি? একটুও দেরী না করে তৎক্ষনাৎ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল...

রাবেয়া মারা গেলেন রাত চারটার দিকে। রাসেল আর রেশমা দুজনকেই ফোনে জানিয়ে দেয়া হল। রেশমা মনে হয় জ্ঞানই হারিয়ে ফেলল নাকি? রাসেল তৎক্ষণাৎ প্লেনের টিকেট বুকিং দিল, অন্তত মায়ের দাফনটুকু তো নিজ হাতে করবে...


শেষ অংশ

গর্ব এবং আশায় ভরা বুক! কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত, সমুন্নত শির!
আমি তুমি সবাই মিলে এক, একই লাল সবুজের কোলে সবার নীড়।

Re: আবাস (২য় অংশ)

সুন্দর গল্প।চলুক

এখনও শিখছি। আরো শিখতে চাই। পরে নাহয় শেখানো যাবে। আপাতত শেয়ার করতে পারি

Re: আবাস (২য় অংশ)

এত তাড়াতাড়ি মেরে ফেল্লা কেন কষ্ট লাগছে

গল্প ভাল লেগেছে
চলুক

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর

Re: আবাস (২য় অংশ)

এ পর্বটাও সুন্দর হয়েছে। তবে রাবেয়াকে এত তাড়াতাড়ি না মারলেও পারতেন।

Re: আবাস (২য় অংশ)

তাহ্‌সান কাব্য, ছবি আপা আর ইলিয়াস ভাইকে ধন্যবাদ...

ছবি-Chhobi লিখেছেন:

এত তাড়াতাড়ি মেরে ফেল্লা কেন কষ্ট লাগছে

গল্প ভাল লেগেছে
চলুক

ইলিয়াস লিখেছেন:

এ পর্বটাও সুন্দর হয়েছে। তবে রাবেয়াকে এত তাড়াতাড়ি না মারলেও পারতেন।

ছোটগল্প তো, আগামী পর্বেই শেষ হয়ে যাবে...

গর্ব এবং আশায় ভরা বুক! কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত, সমুন্নত শির!
আমি তুমি সবাই মিলে এক, একই লাল সবুজের কোলে সবার নীড়।