টপিকঃ কেন উচ্চশিক্ষায় অস্থিরতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কোনো কোনো বিভাগে ২ বছরে থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সেশনজট চলছে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চস্বীকৃত শিÿাপ্রতিষ্ঠান।
স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানা প্রকার নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা চলতে থাকায় এমন এক জট তৈরি হয় যে জন্য বহু ছাত্রের জীবন থেকে মূল্যবান বছরগুলো ঝরে যেতে থাকে। চাকরির বয়স পেরিয়ে যায়। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন এই পরিস্থিতি চলতে থাকে তখন দেশের মেধাবী সন্তানরা উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি দিতে থাকে ইংল্যান্ডে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সুইডেন, ফিনল্যান্ড, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর এবং প্রতিবেশি দেশের চেন্নাই, মাদ্রাজ কলকাতার আলীগড়ে। এসব মেধাবী অবশ্যই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। এভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য বিরাজ করায় দেশ থেকে প্রচুর মুদ্রা চলে গেছে, এখনো যাচ্ছে। মেধা চলে গেছে বিদেশে। মেধা এখনো চলে যাচ্ছে। তবে দেশে কিছু সেশনজটমুক্ত উন্নত মানের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ায় অনেক মেধাবী শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। আর এই সুযোগ নিতে খরচ করতে হচ্ছে বহুল পরিমাণে অর্থ।
দেশের সব মেধাবীর এই ধরনের সুযোগ লাভের সামর্থ্য নেই। তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তারা তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভর্তি হয়। তারা নিয়মিত ক্লাস করতে চায়, পরীক্ষা দিতে চায়, যথাসময়ে রেজাল্ট হোক আশা করে। কারণ যথাসময়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাই থাকে তাদের লক্ষ্য। তারা চায়না মাত্রাতিরিক্ত ছাত্রশিÿক রাজনীতি, হরতাল, ভাংচুর ইত্যাদির কারণে তাদের পড়ালেখা বন্ধ থাকুক, পিছিয়ে যাক পরীক্ষা, বিলম্বিত হোক ফল প্রকাশ কার্যক্রম; কিন্তু তাদের চাওয়াটাই শেষ কথা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গত ১৯৮০ সাল থেকে বারবার হানাহানি, খুন-খারাবি রক্তাক্ত ঘটনার মধ্যে বন্ধ ঘোষিত হয়েছে। নির্ধারিত একাডেমিক ক্যালেন্ডারে গড়বড় ঘটেছে। ছাত্রত্ব শেষ করতে করতে পেকে গেছে চুল, বিসিএস পরীক্ষা বা চাকরির বয়স শেষ হয়েছে। এ জন্য যারাই দায়ী থাকুক, দায়বহন করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গত ২০-২৩ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে ব্যবহার করে বিক্ষোভ ও ভাংচুরের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগীয় শহরের কলেজগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল; কিন্তু পরিস্থিতি শীতল হয়ে আসায় বন্ধ ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়। শুধু ঢাবি, জাবি, রাবি, চবি, শাবি, বাকৃবি, চমেকসহ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অপেক্ষায় রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৬ দিনের ছুটি ঘোষিত হয়েছে। ঢাবির প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ৬৬ দিনের ছুটির কারণে বিভিন্ন অনুষদের মোট ৬৩০টি পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। এমনিতেই বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২০০ দিনই বন্ধ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে একবার পরীক্ষা স্থগিত হলে সেগুলো পুণঃগ্রহণ করা বেশ সময় সাপেÿ। আবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও সব অনুষদে সঠিক সময়ে হয় না। ফলে এই অনিবার্য চাপ এবং ঝুঁকি এসে পড়ে ছাত্র এবং অভিভাবকের ওপর। উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাওয়া যেমন ছাত্রদের অধিকার তেমনি এই সময় অনুযায়ী সেশন শেষ করাও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অন্যতম দায়িত্ব। সেই দায়িত্বটুকু পালনের পরিবেশ রক্ষা হলেই ছাত্রদের অধিকার ও রক্ষিত হয়। কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিÿক-ছাত্র রাজনৈতিক দলীয়করণ, ছাত্র-শিক্ষক সংগঠনগুলোর আভ্যন্তরীণ কোন্দল রাজনৈতিক দলগুলোর আহূত ধর্মঘট, হরতাল কর্মসূচি, একশ্রেণীর শিক্ষকের কর্মবিরতি, ক্লাস না নেয়া, সময়মতো পরীক্ষা না দেয়া, সময়মতো খাতা না দেখা, জমা না দেয়া, ফলাফল ঘোষণা না করা ইত্যাদি প্রবণতা হ্রাস করা গেলে আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেশনজট মুক্ত করা সম্ভব।
মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমবোধ জাগ্রত থাকলে তারা নিজ দেশের শিক্ষা, ঐতিহ্য ও সম্পদ নষ্ট করতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার যে মান ও ঐতিহ্য ছিল তা আজ আগের মতো নেই। কোনো দূরভিসন্ধিমূলক চক্রান্ত কোনো সিন্ডিকেট যে এর পেছনে কাজ করছে না একথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তোতাপাখির মতো আমরা বুলি আওড়াই, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড কিন্তু নানা দায়িত্বহীন কর্মকান্ড জাতির মেরুদন্ড দুর্বল হচ্ছে এ বিষয়টি অনেকের ধর্তব্যের মধ্যে নেই। আমাদের দেশের একশ্রেণীর রাজনৈতিক দলের নেতা দুই হাতে লুটপাট করে সন্তানদের বিদেশে পড়ায়, অনেক শিক্ষকের সন্তান ও এদেশে পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বেশিরভাগ সাধারণ ও মধ্যবিত্তের ছেলে-মেয়েরা। কাজেই তাদের দিকে তাকিয়ে সব মহলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পরিবেশ সব সময় বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে।
আমরা আমাদের দেশের পাবলিক ভার্সিটিগুলোতে যে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়ে বন্ধ হতে দেখি, পৃথিবীর কোথাও এরকম কান্ড হয় না। পৃথিবীতে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় যেসব দেশ উন্নত সেসব দেশে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার জায়গাটা রাখা হয় যাবতীয় ঝঞ্ঝাটমুক্ত পরিবেশে। কারণ এটি হচ্ছে জাতির চালিকাশক্তি, ভবিষতের সম্পদভান্ডার।
শিক্ষার জায়গাটি কলুষমুক্ত করলে শিক্ষা যথাযথ হয় না। এটা আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোও ভালো বোঝে। তাদের দেশপ্রেমবোধ ছোটবড় সবার মধ্যেই খাঁটি। আর এদেশের মানুষ বুঝে না একদিনের পড়া বন্ধ হওয়া মানেই অনেকটুকু পিছিয়ে যাওয়া। পিছিয়ে পিছিয়ে পিছলে গিয়ে কি সহজে সামনে এগোনো যায়?

তথ্য সূত্র: দৈনিক ডেসটিনি

বাংলা আমার মা,বাংলা আমার মাতৃভাষা
[img]http://forum.projanmo.com/uploads/2007/12/542_flagmobile.gif[/img]