সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন ??? (২৫-০৭-২০০৭ ১৭:১২)

টপিকঃ সঠিক রাজনীতিই সংকট মোচনের চাবিকাঠি ড. মীজানুর রহমান শেলী

সঠিক রাজনীতিই সংকট মোচনের চাবিকাঠি ড. মীজানুর রহমান শেলী।

[url=http://www.jugantor.com} যুগান্তর অবলম্বনে[/url]

রাষ্ট্রে ও সমাজে রাজনীতির কেন্দ্রীয় ও সর্বব্যাপী ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। যে কোন সংগঠিত সমাজে রাজনীতি এক অমোঘ প্রক্রিয়া। সুষ্ঠু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রকাশিত হয় এবং শাšি-পূর্ণভাবে সমন্বিত হয়। এসব গোষ্ঠী-স্বার্থ বিচিত্র এবং ভিন্ন। সমাজের সব শ্রেণীর ও গোষ্ঠীর স্বার্থ এক এবং অভিন্ন নয়। প্রায়ই এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপ¯ি’ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, জেলেদের স্বার্থ এবং চাষীদের স্বার্থ এক সূত্রে গাঁথা নয়, ব্যবসায়ী শ্রেণীর স্বার্থের সঙ্গে ক্রেতা ও ভোক্তাদের স্বার্থের থাকে প্রচুর অমিল। এসব কিছুর সু¯’ সমন্বয় ঘটাতে পারে একমাত্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত সুসংগঠিত ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি। সমাজের গোষ্ঠী ও শ্রেণী-স্বার্থ প্রকাশের এবং তার সমন্বয়ের প্রক্রিয়া হিসেবে রাজনীতি অমোঘ। এই প্রক্রিয়া জীবনের সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িত যে এর জন্য কোন অনুমতির প্রয়োজন হয় না। সমাজের অন্য সব ক্ষেত্রে উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য রাজনীতি অবশ্য প্রয়োজনীয় এক প্রক্রিয়া।
আফ্রিকা মহাদেশের এক খ্যাতিমান রাষ্ট্রনায়ক কোয়ামে এনক্রুমা। ঔপনিবেশিক শাসনের বির“দ্ধে দীর্ঘ ও সফল সংগ্রামের পর স্বাধীন ঘানার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। রাজনীতি সম্পর্কে তার স্মরণীয় উক্তি এখনও বা¯-বজ্ঞান সমৃদ্ধ বলে বিবেচিত হয়। তিনি বলেছিলেনÑ ‘রাজনীতির রাজ্য খুঁজে বের করো, বাকি সব জিনিস তার সঙ্গে যুক্ত হবে।’ প্রেসিডেন্ট এনক্রুমা তার নিজের রাজনৈতিক জীবনের এই উপদেশ বিশ্ব¯-ভাবে অনুসরণ করতে পারেননি। ফলে ঘানা সার্বিক অবক্ষয়ের শিকারে পরিণত হয়।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ যেসব গুর“তর সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে তার মূলে আছে একই ধরনের ব্যর্থতা। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উন্নয়শীল একটি দেশে রাজনীতির কেন্দ্রীয় গুর“ত্বের তাৎপর্য বুঝতে বিফল হয়েছেন। ফলে জনকল্যাণ ও জাতীয় উন্নয়নের জন্য যেসব সংগঠন, কাঠামো ও পদ্ধতি অবশ্য প্রয়োজন তা মজবুত ও টেকসই করতে তারা দরকারি ব্যব¯’া গ্রহণ করেননি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন যথার্থই বলেছেন : ‘যেসব রাষ্ট্র ও সমাজ আগেই আধুনিকায়িত হয়েছে এবং যারা পরে আধুনিকায়নের স্বাদ পেয়েছে উভয়ের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রথমেই রাজনৈতিক সংগঠনের সমস্যাগুলোর প্রতি নজর দেয়া এবং আধুনিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা খুবই জর“রি। এমনটা করলে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া ব্যাপক অ¯ি’তির জš§ দেয় না।’
আধুনিকায়ন ও রাজনৈতিক উন্নয়ন জাতি গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সু¯’ জাতি গঠনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে এক সূত্রে গ্রথিত। এই এলাকার ইতিহাস, অর্থনীতি ও সমাজ বিবর্তন জাতীয়তাবাদের ধারাবাহিক উšে§ষের ভিত্তি রচনা করে। জাতীয় অধ্যাপক মরহুম আবদুর রাজ্জাকের বিশ্লেষণে এই সত্য ফুটে উঠেছে। তার ভাষায়, ‘১৯৪৭ সালের আগে বাংলার অধিকাংশ অধিবাসী ভারত ও পাকি¯-ান রাষ্ট্রের বাইরে এক স্বতন্ত্র কাঠামো রচনায় অনি”ছুক ছিলেন না। পরিশেষে বর্তমান বাংলাদেশের বাঙালিরা পাকি¯-ান রাষ্ট্রের অš-র্ভুক্ত হওয়ার সিদ্ধাš- নেন যদিও তা বিনা শর্তে নয়। (স্বতন্ত্র চেতনার) এই শর্তগুলো অমান্য করে পাকি¯-ানের শাসকচক্র। ফলে শুর“ হয় বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জনের আন্দোলন, যার পরিণতিতে বাংলাদেশ নামের জাতীয় রাষ্ট্রের পত্তন ঘটে।’
অধ্যাপক রাজ্জাক আরও বলেন, ‘দুনিয়ার স্বল্প উন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সমজাতিক। আমাদের ভাষা প্রতিবেশী বিরাট ভারতীয় রাষ্ট্রের একাংশেরও ভাষা। আমাদের ক্ষেত্রে এটি একটি জাতির ভাষা, জাতীয় ভাষা। সীমাšে-র ওপারে আমাদের প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে এটি একটি আঞ্চলিক ভাষা, অত্যš- গুর“ত্বপূর্ণ ভাষা কিš' জাতীয় ভাষা নয়। ১৯৪৭-এর পর দুই এলাকার সাহিত্য দৃশ্যমানভাবেই নিজ নিজ স্বকীয়তায় ভূষিত।ঃ বাংলাদেশে যে জাতি বাস করে তার জাতীয়তাবাদ এর স্বতন্ত্র চেতনার পরিণতি। পুরো দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের বা এর কোন কোন অংশের সঙ্গে আমাদের ধর্মীয় এবং শ্রেণী কাঠামোর অনেক মিল রয়েছে, কিš' এসব অতিক্রম করে যা বলিষ্ঠ অ¯ি-ত্বে বিদ্যমান তা হলো আমাদের স্বতন্ত্র স্বরূপ আর এ পরিচিতি রক্ষায় আমাদের সুস্পষ্ট সংকল্প। নিঃসংশয়ে একাল জাতীয় রাষ্ট্রের কাল এবং সমকালীন সমস্যাগুলো জাতীয় রাষ্ট্রের সমস্যা হিসেবেই বিবেচিত।’
‘বাংলাদেশ শুধু ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক একাÍতায় ভূষিত নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে এদেশ যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো লাভ করে তার বিভিন্ন ¯-রের মধ্যে বিরাট কোন তফাৎ ছিল না।’ অধ্যাপক রাজ্জাক যথার্থই বলেছেন, ‘১৯৪৭-এর পরে উ”চ বর্ণ হিন্দু সামš--জমিদারদের অপসারণ ঘটে। আবার ১৯৭১-এ বাঙালির সফল মুক্তি সংগ্রামের পর অবাঙালি পুঁজিপতিরা পাকি¯-ানে চলে যায়। এর ফলে কায়েমি স্বার্থের তেমন প্রাবল্য না থাকায় বাংলাদেশের
কাছে বাধাবন্ধনহীনভাবে সমাজ গঠনের এক সুবর্ণ সুযোগ আসে।’
কিš' দুঃখের বিষয়, রাজনৈতিক ব্যব¯’াপকদের ব্যর্থতায় এ সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সাড়ে তিন দশকে দেশ সংসদীয় গণতন্ত্র, একদলীয় শাসন, সামরিক শাসন, রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যব¯’া ও আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করে। এসব রাজনৈতিক পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার টানাপোড়েন সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেশ অনেকটা অগ্রগতি অর্জন করে। কিš' এই দুই ক্ষেত্রের উন্নয়ন যতটা বিপুল ও গতিমান হতে পারত তা হয়নি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বছরে গড়পড়তা চার শতাংশে ¯ি’ত থাকে। অবশ্য গত অর্থবছরে এই হার নানা সংকট সত্ত্বেও ৬.৫ শতাংশে দাঁড়ায়। নিঃসন্দেহে এই
অর্জন দেশের জনগণের অর্জন। কিš' এখনও অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবন কাটায়। শিক্ষা ও স্বা¯ে’্যর ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধিত হলেও তা কাক্সিক্ষত মাত্রায় অর্জিত হয়নি।
অন্যদিকে রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্যের ফলে সৃষ্টি হয়েছে মারাÍক দ্বন্দ্বের। কয়েকটি গুর“ত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে কাক্সিক্ষত মৌলিক ঐকমত্য সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন ধারার জাতীয় নেতৃবৃন্দের ঐতিহাসিক মর্যাদা সম্পর্কেও মতপার্থক্য রয়ে গেছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধারার রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সামঞ্জস্য আসেনি। এসবই সুষ্ঠু রাজনীতির অভাবের ফল।
সু¯’ ও বলিষ্ঠ রাজনীতি না থাকায় রাজনীতি কালো টাকা ও সন্ত্রাসী পেশিশক্তির পণবন্দিতে পরিণত হয়। অবৈধ পথে অর্জিত অর্থসম্পদ দিয়ে অসাধু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীরা রাজনীতিকে দুষ্ট ও বিকৃত করে তোলে। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় তারা। ফলে গণতন্ত্র ও নির্বাচন সার ব¯'হীন রূপ নেয়।
এরই সঙ্গে ঘটে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয়। নিবির্চার দলীয়করণ ও ব্যাপক দুর্নীতি, বিচারব্যব¯’া, প্রশাসন এবং আইন প্রণয়নকারী সং¯’াগুলোকে নির্জীব ও অক্ষম করে ফেলে। মূল্যবোধের মরাÍক অবক্ষয় সমাজের উপরিতলে বিকৃত ও দুর্নীতিগ্র¯- মানসিকতার ব্যাপক বি¯-ৃতি ঘটায়। সু¯’ রাজনীতির অভাব এবং তার ফলে রাষ্ট্রীয় সং¯’াগুলোর দুর্বলতা ও অক্ষমতা মৌলবাদভিত্তিক জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এসব কিছুর পরিণতিতে ১১ জানুয়ারির জর“রি অব¯’া জারি ও নতুন তত্ত্বাবধায়ক বা অš-র্বর্তীকালীন সরকারের সূচনা হয়। রাজনীতির সাম্প্রতিক ধারাটির যতি”েছদ ঘটে।
জর“রি অব¯’ায় এবং নির্দলীয় সরকারের আওতায় রাজনীতি আপাতত অনুমিত নয়। এমনকি ঘরোয়া রাজনীতিও নয়। কিš' বিভিন্ন স্বার্থের প্রতিযোগিতা ও তার সমন্বয়ের প্রক্রিয়াগুলো কোন অনুমতির ধার ধারে না। তাই তেমনভাবে দৃশ্যমান না হলেও এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
প্রচলিত ধারার রাজনীতিশূন্য এ সময় অত্যš- গুর“ত্বপূর্ণ এবং নাজুক সময়। সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে যে সরকার এখন দেশ চালা”েছ তার ওপর রাজনীতির দাবি অক্ষুণœ রয়েছে। তার সামনে যে চ্যালেঞ্জ তাও মূলত রাজনৈতিক। এ সরকারের প্রধান দায়িত্ব হ”েছ, যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি এবং যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তার মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা। ১১ জানুয়ারির
আগের যে দুষ্ট এবং বিকৃত রাজনীতি তাতে ফেরত যাওয়া কারও কাম্য নয়। সবাই মনে করেন,
মনোভঙ্গি এবং রাজনৈতিক কাঠামো ও পদ্ধতির সংস্কারমূলক পরিবর্তনের মাধ্যমে বলিষ্ঠ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে। কাজটি সহজ নয়।
অরাজনৈতিক হিসেবে পরিচিত এই সরকারের দায়িত্ব সুষ্ঠু রাজনীতির ভিত্তি ও আবহ তৈরি করা। এজন্য দরকার সঠিক রাজনীতির। ইতিহাস সাক্ষী, অর্থনৈতিক বা সামাজিক ভুল শোধরানোর উপায় থাকে কিš' রাজনৈতিক বিভ্রাšি- ও ভুলের পরিণতিতে দেশ ও জাতি বিপর্য¯- হয়। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের আগে থেকে মীরজাফর, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, ইয়ার লতিফ ও রায়দুর্লভ প্রমুখ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে শামিল হয়ে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌলা ও তার বিশ্ব¯-
সহচরদের ভুল ও দুর্বলতার সুযোগ নেয়। ফলে যা ঘটে তা সবাই জানেন, শুধু বাংলা নয় সারা উপমহাদেশ ১৯০ বছর ঔপনিবেশিক শাসকদের গোলামি করতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, রাজনীতির কেন্দ্রীয় গুর“ত্বকে অস্বীকার করে জাতীয় সুরক্ষা ও উন্নয়ন সম্ভব নয়।

কৃতজ্ঞতাঃ মুর্শেদের ইউনিকোড লেখনী ও পরিবর্তক

"We want Justice for Adnan Tasin"