সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন অয়ন খান (১৬-০২-২০১০ ২১:৩২)

টপিকঃ 1st Protest in Gazipur,1971

The true story of a freedom Fighter.

প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধঃ ১৯৭১

১৯৭১ সনের ১১ ই মার্চ। আমি তখন গাজীপুর মেশিন টুলস ফ্যাক্টরীতে চাকুরী করি। হঠাং শুনতে পাই যে আমাদের অফিসের একটি গাড়ি ছিনতাই হয়ে গেছে। কি হল গাড়ীর তাই ভাবতে লাগলাম। এরই মধ্যে জানতে পারলাম ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা গাড়িটি নিয়ে গেছে। একজন বেটে মতো ছাত্র নেতা আছে সেই গাড়ি তার দায়িত্বে আছে। তখন সেখানে থেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য গেলাম। সেখানে এস, এম, হলে একটি টিনের লম্বা ঘর ছিল। সেখানে একটা সাইডে অফিসের মতো আছে, সেখানে ১০/১২ টি গাড়ি এভাবেই যোগার করে আনা হয়েছে। সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম সেখানে বড় বড় ছাত্র নেতা তখন লোকমুখে ছাত্রনেতৃত্বের চার খলিফা নামে পরিচিতি ছিল যথাক্রমে আবদুর রব, সাজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী সহ অনেক নেতাই উপস্থিত। আবদুর রব তখন তাদের দলনেতা। তখন আবদুর রব সাহেবের কাছে গিয়ে বললাম গাড়ীটি ফেরত দিলে ভাল হয় কারণ আমার সরকারী চাকুরী করি, আমাদের আসা যাওয়ার অসুবিধা হবে।  তখন তিনি বললেন ঠিক আছে নিয়ে যান। এমন সময় তিনি বললেন, মেশিন টুল্স ফেক্টরীর পাশেই তো অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরী। সেখানে আপনাদের যোগাযোগ কিরকম। সেখানে তো আর্মস তৈরী হয়। আমি বললাম-“হ্যা তৈরী হয়,তবে এখন যে অবস্থা তাতে শ্রমিকদের সহযোগীতায় কয়েক ট্রাক আর্মস আমরা দিতে পারি, ওদের সাথে আমাদের ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে। তবে দিব যে, ক্যান্টনমেন্টের রাস্তা তো বন্ধ। আরিচা রোড দিয়ে আসার চেষ্টা করা যেতে পারে।" -রব সাহেব বললেন ঠিক আছে।
এদিকে ইউনিভার্সিটি মাঠে মহিলারাও গাঁদা বন্দুক নিয়ে অনুশীলন করতে শুরু করেছে। কিন্তু আর্মস তো নেই। তখন রব সাহেব বললেন; “ঠিক আছে আজকে চলে যান, আমরা একটু বঙ্গবন্ধুর সাথে আলাপ করি নেই। তারপর সুবিধাজনক স্থানে নির্দেশ মতো পৌছে দেবার ব্যবস্থা করবেন। কাল বা পরশু আসেন এরমধ্যে বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে আলাপ করে আপনাকে জানাবো।” আমরা সেই অনুয়ায়ী একদিন পর আসলাম তখন জানলাম বঙ্গঁবন্ধু হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমান শেরাটন) নানা আলোচনায় ব্যস্ত । বঙ্গঁবন্ধুর ব্যস্ততার জন্য কোন নির্দেশনা পেলাম না। এভাবে  আরো কিছুদিন চলতে চলতে এলো ১৯ সে মার্চ ১৯৭১ইং। আমাদের জন্য একটি অন্যন্য সাধারন দিন কারণ এদিনই প্রথম ছোট আকারে হলেও পাকিস্তানীদের সাথে প্রথম সরাসরি প্রতিরোধ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়।
৭ই মার্চ সেই বিখ্যাত ভাষন এর নির্দেশনা অনুযায়ী পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গঞ্জে  সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন এর নিেের্দশ অনুযায়ী  জয়দেবপুরে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ করি। এরপর বঙ্গঁবন্ধুর নির্দেশের অপোয় প্রতিদিন প্রস্তুত হয়ে থাকলাম। দিনের পর দিন দেশের উত্তেজনা বাড়তে থাকলো। এমন সময় আনুমানিক ১৮ই মার্চে শুনতে পারলাম যে, জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট অভিমুখে পাকবাহিনী আসতে পারে এবং বাঙ্গালী সৈনিকদের হাতিয়ার হস্তগত করে নিতে পারে। এমতাবস্থায় আমরা আমাদের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ এর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেই যে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে কোন প্রকারেই যেন, পাক মিলিটারী জয়দেবপুরে পৌছাতে না পারে।  সেইজন্য টঙ্গী সংগ্রাম পরিষদ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন সমূহে আমরা এই বলে ত্বরিত সংবাদ পাঠাই এই বলে যে, পাক বাহিনীকে ঠেকানোর জন্য টঙ্গী জয়দেবপুর রুটে সাধ্যমত ব্যারিকেড দেওয়া হোক। যা ওইদিনই কার্যকর করা হয়েছিল। এদিকে আমাদের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা দুটি ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাই। প্রথম দলটি জয়দেবপুর রাজবাড়ী ক্যান্টনমেন্টের বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়কের সাথে গোপন কূটনৈতিক আলোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই দলে প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মরহুম মোতালেব, মরহুম ছোট নজরুল, বড় নজরুল, মরহুম হাবিবুলাহ সাহেব, মোজাম্মেল, শহীদুলাহ বাচ্চু সহ আরো অনেকে। এখানে উলেখ্য যে ১৯৭১ সালের ১৮ই মার্চ, ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধিগন জয়দেবপুর রাজবাড়ী ক্যান্টনমেন্টের তৎকালীন ৪র্থ রেজিমেন্টের তৎকালীন মেজর শফিউলাহ সাহেবের (পরবর্তিতে বীরউত্তম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার) সাথে একাধিক বার আলোচনার মাধ্যমে স্বাধীনতার স্বপে একাত্মতা প্রকাশের চেষ্টা করেন।  কিন্তুু দুঃখের বিষয়, তাদের বারবার প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবষিত হয়। কারণ ক্যান্টনমেন্টের অধিনায়ক আমাদের প্রতিনিধির কাছে বলতেন যে, সামরিক বাহিনীর কিছু নিজস্ব নিয়মকানুন আছে এবং অন্যান্য রেজিমেন্টের সাথে যোগাযোগ এবং সুনিদিষ্ট নির্দেশের প্রয়োজন আছে।  তিনি বহু জায়গার সামরিক যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। বিলম্বে হলেও ক্যান্টনমেন্টের অধিনায়ক তথা বেঙ্গল রেজিমেন্টের সমস্ত বাঙালী সৈনিকেরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহন করেন।
আমাদের তৃতীয় দলটি ছিল পাকবাহিনীকে সশস্ত্রভাবে মোকাবেলা করার জন্য।  সশস্ত্র দলে ছিলাম আমি কামরুল, এ, বি, এম গোলাম মোস্তফা ও গিয়াসউদ্দিন সহ আরো অনেকে। আমরা সবাই গাজীপুর মেশিন টুলস্ ফ্যাক্টরীতে কর্মরত ছিলাম। আমাদের ফ্যাক্টরীর নিরাপত্ত্বার জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য পূর্বেই হস্তগত করি এবং প্রাথমিক প্রশিন গ্রহন করতে থাকি। ১৯শে মার্চে আমাদের গাজীপুরের ক্যান্টনমেন্টের কূটনৈতিক প্রতিনিধির মাধ্যমে জানতে পারলাম, সশস্ত্র পাকবাহিনী ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সমস্ত ব্যারিকেড ভেঙ্গে জয়দেবপুর অভিমুখে আসছে। এ খবর পেয়ে আমরা সশস্ত্র দল ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়ে জয়দেবপুর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সন্মুখে অবস্থ্না গ্রহন করি। কল্পনাতীতভাবে হঠাৎ একটি জীপে করে পাঁচ ছয়জন বাঙ্গালী সিপাই এবং সম্ভবত একজন নন কমিশন্ড অফিসার আমাদের অবস্থানের সামনে দিয়ে জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাচ্ছিলেন। সুযোগ বুঝে আমাদের সহযোগীদের মধ্যে ১৫/২০ জন তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং তাদের পাঁচ ছয়টি রাইফেল এবং একটি চাইনীজ এল, এম, জি ছিনিয়ে নেয়। পরে উক্ত জীপের সব বাঙ্গালী সিপাই আমাদেরকে অনুরোধ করেন যাতে অস্ত্রগুলো ফেরত দিয়ে দেই এবং গ্রামে গ্রামে ঘুরে বলতে থাকেন যে, অস্ত্রছাড়া তারা ক্যান্টনমেন্টে গেলে সামরিক আইনে কর্তৃপ তাদেরকে মেরে ফেলবে। এদিকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিলেও,আমরা তখনও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রচালনায় অপারগ ছিলাম। ভাগ্যবশত ছুটি কাটানোরত একজন বাঙ্গালী মিলিটারী আমাদের দলে তখন যোগদান করেন এবং এল, এম, জি টি তুলে নেন। সেই সাথে তিনি জয়দেবপুর অভিমুখে আসতে থাকা পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে পজিশনও নেন এবং আমরা সবাই আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করে রেললাইনের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থান করি। কিন্তুু অবস্থানটি সুবিধাজনক মনে না হওয়ায় আরো পশ্চিমে বাজার সংলগ্ন একটি ব্যাংকের পাশে বিভিন্ন গর্তে আমরা সবাই পূর্বমূখী হয়ে অস্ত্রসহ অবস্থান করি। আনুমানিক একঘন্টা পর জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টস্থিত পাক মিলিটারীরা আমাদের পরিত্যক্ত রেললাইনের উপর অবস্থান নেয়। অবশ্য আমাদের সঠিক অবস্থান তখনও টের পায়নি। আমি ওদের সবচেয়ে কাছে স্থানীয় একটি ব্যাংকের নিকটে, একটি ডোবার ঢালে পজিশন নেই এবং আমি দেখলাম ওরা আমাদের টার্গেটের আওতার মধ্যেই আছে।  এমতাবস্থায় আমি গুলি ছুড়তে থাকি এবং সেই সঙ্গে সবাই পূর্বমূখী হয়ে অনবরত গুলি ছুড়তে থাকে। অতর্কিত আক্রমনের জবাবে পাকবাহিনীরাও আমাদের দিকে অনবরত গুলি ছুড়তে থাকে। ঝাঁকে ঝাঁেক গুলির মুখে আমরা টিকতে পারলামনা। পিছু হটে গিয়ে নিরাপদ অবস্থানে চলে গেলাম এবং পাকবাহিনীও জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে চলে যায়। বেলা ১২টার সময় সময় খবর পেলাম যে, আমাদের দুজন গুলির মুখে প্রাণ হারিয়েছে এবং অসংখ্য আহত হয়েছে। আহতদের মির্জাপুর কুমুদিনি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আমরা সেখানে আহতদের দেখতে মির্জাপুর কুমুদিনি হাসপাতালে যাই। আমাদের সাথে ছিলেন মরহুম মোতালেব, জনাব এ, বি,এম, গোলাম মোস্তফা,জয়দেবপুর গ্রামের আরো দুইজন এবং আমি কামরুল হক ইউসুফী। মোতালেব কিভাবে যেন একটা এ্যাম্বুলেন্স যোগাড় করে আনল। সেই  এ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে শহীদদের লাশ নিয়ে আমরা ঘুরপথে জয়দেবপুর চৌরাস্তা হয়ে মির্জাপুর- মিরপুর হয়ে ঢাকায় সরাসরি বঙ্গঁবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়িতে আসি এবং বঙ্গঁবন্ধুকে লাশ দেখাই।
এখানে উলেখ্য যে, উত্ত্বাল আন্দোলনের একপযার্য়ে বঙ্গঁবন্ধুর সাথে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ওয়াদা করেছিল যে, আর কোন গোলাগুলি,হত্যা হবেনা। গনরোষের কথা বিবেচনায় পাকিস্তানী বাহিনীর কর্মকান্ড ব্যারাকের ভিতরে সীমাবদ্ধ রাখার কৌশল নিয়েছিল। এ লাশ দিয়েই পাকিস্তানীদের আর গুলি না করার অঙ্গীকার ভঁঙ্গ হয়। বঙ্গঁবন্ধু আবার মৃতদেহ দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং সাথে সাথে উনার পি, এ কে ডেকে বললেন, সেই মুহুর্তে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকতে এবং পরদিন “আবার কেন গুলি হলো” এই হেডলাইনে যেন এই নিউজ আসে। সেসময় সেখানে আমরা ছাড়াও আরও ১৪/১৫ জনলোক ও সাথে একজন বিদেশী লোকও উপস্থিত ছিল। পরদিন সমস্ত জাতীয় দৈনিক পত্রিকার শিরোনামে তা উঠেছিল।
বঙ্গঁবন্ধুর নির্দেশে আমরা একই পথে জয়দেবপুর প্রত্যাবর্তন করি এবং মাগরীবের পর শহীদদের আত্মীয়দের কাছে তাদের লাশ ফিরিয়ে দেই। মূলতঃ এটিই ছিল পাকবাহিনীর সাথে বাঙ্গালীদের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ। তারপর আমি মেশিন টুলস্ ফ্যাক্টরীতে আর মাত্র কয়েকদিন গেলেও স্বাধীনতাযুদ্ধের অংশগ্রহন করতে চলে যাই । দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বিগত ৪০ বছরে আর সেখানে যাওয়া হয়ে উঠেনি। ইতিমধ্যে উপরোক্ত ঘটনাগুলো নানা জন নানা মতে অনেকটা ডালপালা বিস্তার করলেও মূল ঘটনাটির প্রত্য ও সক্রিয়দের মধ্যে আমি একজন ছিলাম। তাই ইতিহাসের স্বার্থে ঘটনাগুলি স্মৃতিতে যতটুকু পাওয়া যায় তাই তুলে রাখতেই এই লেখার অবতারণা।

                                    নিবেদক
তাং-   
কামরুল হক ইউসূফী
বীর মুক্তিযোদ্ধ
উইং কমান্ডার (লোহারবন)
যোগাযোগের ঠিকানা মুছে দেয়া হল।
        মোবাঃ মুছে দেয়া হল।

সমন্বয়ক নোটঃ মূল পোস্টটি আসকি থেকে ইউনিকোডে রূপান্তর করে অপ্রয়োজনীয় তথ্যাদি মুছে দেয়া হল।