টপিকঃ তবে কি আমদানি-ই শ্রেয়!

আজকের (২৭-জুন-২০০৭) এ ইত্তেফাকের অর্থনীতি কলামে বর্তমান বাজেটের কিছু বিশ্লেষণ করে একটা প্রবন্ধ এসেছে। মনে হলো, সংগ্রহে রাখার মত একটি বিশ্লেষণমূলক একটা উদাহরণ। প্রবন্ধটিও বেশ চমৎকার লাগলো।

ইউনিকোডে রূপান্তরের জন্য এস. এম. মাহবুব মুর্শেদের লেখনী ও পরিবর্তক ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে কি আমদানিই শ্রেয়!

‘শিল্প উৎপাদন করা তোমাদের কাজ নয়, সেটা আমাদের কাজ। তোমরা আমদানি শুল্ক কমিয়ে দাও, আমরা তোমাদেরকে সস্তায় পণ্য দেব।’ লিখেছেন- রাফিয়া শিকদার

আমদানিকে উৎসাহিত করার একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে ২০০৭-০৮ অর্থ বছরের বাজেট প্রস্তাবে। চলতি অর্থ বছরের বাজেটে কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও ফিনিসড্ পণ্যের আমদানি শুল্ক যথাক্রমে ৫, ১২ ও ২৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০, ১৫ ও ২৫ শতাংশে পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্পূরক শুল্কের ১৫ ও ২০ শতাংশের দুটি স্তর একীভূত করে ২০ শতাংশের প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার সকল আমদানির ওপর বর্তমানের ৪ শতাংশ উন্নয়ন সারচার্জ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও ফিনিসড্ পণ্য আমদানিতে এখন যথাক্রমে ২৪, ৩১ এবং ৪৯ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। ১ জুলাই থেকে তা হবে ৩০, ৩৫ এবং ৪৫ শতাংশ। অর্থ হচ্ছে, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের শুল্ক যথাক্রমে ৬ ও ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। অপরদিকে ফিনিসড্ পণ্যের শুল্ক ৪ শতাংশ কমবে। তাই শিল্প স্থাপনের চেয়ে আমদানিই শ্রেয়।

১৯৪৮ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত শুল্ক ও কর বিষয়ক সাধারণ চুক্তি বা ’গ্যাট’ আলোচনায় শিল্পোন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল বিশ্বকে এ কথাই বলত। শিল্প উৎপাদন করা তোমাদের কাজ নয়, সেটা আমাদের কাজ। তোমরা আমদানি শুল্ক কমিয়ে দাও। আমরা তোমাদেরকে সস্তায় পণ্য দেব। প্রয়োজনে আমরা অর্থ সাহায্য দেব।’ এফবিসিসিআইসহ দেশের প্রভাবশালী চেম্বারগুলো বলেছে, এর ফলে দেশীয় শিল্পে ব্যবহৃত হয় এমন ৪০০টি কাঁচামালের শুল্ক ৬ শতাংশ বাড়বে। প্রায় এক হাজার মধ্যবর্তী পণ্যের শুল্ক ৪ শতাংশ বাড়বে। কিন্তু টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের ওপরই বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত। শুল্ক কাঠামোর এ পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে নিশ্চিতভাবেই দেশীয় শিল্পের দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরও দুর্বল হবে। অঙ্কের বিচারে কাঁচামালের শুল্কহার ৬ শতাংশ বেড়েছে শুধু তাই নয়। এর অর্থযেসব দেশীয় শিল্প বিদেশী পণ্যের চেয়ে ৬ শতাংশ প্রতিযোগিতা সামর্থ্য নিয়ে এযাবত টিকে ছিল সেগুলো এখন বন্ধ বা সংকুচিত হয়ে যাবে। সাথে সাথে নতুন কর্মসংস্থানের পরিবর্তে কিছু কর্মজীবী কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। এমনিতেই দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভাল নয়। চলতি ২০০৬-০৭ অর্থ বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে ৩৮.৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে। যা পূর্বের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬.৫ শতাংশ কম। প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কোন দিক-নির্দেশনাও নেই।

আইএমএফের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা (আইএফসি) ১৯৯৮ সালে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করে যে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর টেক্সটাইল খাত বেশ শক্তিশালী। টেক্সটাইল শিল্প স্থাপন করার চেয়ে আমদানি করে চাহিদা পূরণই বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে। তাই বাংলাদেশ সরকার টেক্সটাইল খাতে মূলধনী ঋণ নিরুৎসাহ করাই যুক্তিযুক্ত। কাল্পনিক তথ্যনির্ভর তাদের এ রিপোর্ট টেক্সটাইল শিল্পে ঋণ প্রদান বেশীদিন বন্ধ রাখতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশ এখন কাপড় আমদানির পাশাপাশি রপ্তানিও করছে। দাতাগোষ্ঠীর চাপ উপেক্ষা করে সাফল্য অর্জন করার এটিই বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র উদাহরণ। তারপরও প্রতিবারের বাজেটেই দাতাগোষ্ঠীর স্বাবলম্বী বিরোধী পরামর্শের ছোঁয়া থাকে। এবারও তাই ঘটেছে। অন্ততঃ শিল্প খাতের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত স্পষ্ট। কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের শুল্কহার বাড়িয়ে সাময়িকভাবে সরকারের কিছু শুল্ক হয়তো বাড়বে, বিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে দেশীয় শিল্পের ওপর চাপ বাড়বে যা অনেকের নিকট সহনীয় না-ও হতে পারে। শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রুগ্ন শিল্পের সংখ্যা বাড়বে। একটি নতুন সংকট সৃষ্টি হবে। দেশের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের স্বার্থে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের বর্ধিত শুল্ক পুনর্বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে বস্ত্র খাতসহ মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর যে ১০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে তাও প্রত্যাহার করা উচিত। নতুবা তৈরি পোশাক খাত নিয়ে ১৯৯৮ সালে আইএফসি’র গবেষণা প্রতিবেদনের বাস্তবায়নই নতুন করে শুরু হবে। যা পোশাক খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। ২০০৫ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত যে এগিয়ে যাচ্ছিল তা বাঁধাগ্রস্ত হবে। দেশীয় রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো নগদ সহায়তা, বন্ড, স্বল্প সুদে ঋণসহ বিভিন্ন সুবিধা পাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু এ সুবিধা ভারত বা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় একেবারেই সামান্য। বলা হচ্ছে সরকারি খাতে পাটশিল্প চলবে না। প্রতিবছর সরকারি পাটকলগুলোতে ৩০০ কোটি টাকা লোকসান দেয়। অথচ ভারতে অধিকাংশ পাটকলই সরকার পরিচালিত ও লাভজনক। ফলশ্রুতিতে পাটজাত দ্রব্যের বিশ্ব চাহিদার ৪৫ শতাংশই ভারত পূরণ করছে।

উন্নত দেশ এবং তাদের চাঁদায় পরিচালিত দাতা সংস্থাগুলোর অর্থসাহায্যে এসব দেশের তথাকথিত উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালিত হওয়ায় এ সুযোগটি তারা সহজে নিতে পেরেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি বড় উদাহরণ। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে শিল্পপণ্যের আমদানি শুল্ক যেখানে ছিল ৩৫০ শতাংশ সেখানে ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে তা ৭০ শতাংশে নেমে আসে। বর্তমানে যা সম্পূরক শুল্কসহ সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ এবং আগামী বাজেটে ৪৫ শতাংশের প্রস্তাব করা হয়েছে। দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে সরকার হয়তো বলবে আর কতদিন দেশীয় শিল্পকে এভাবে সংরক্ষণ করা। তাদের মুক্তবাজার অর্থনীতির আলোকে বাইরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে হবে। উত্তর শুধুএকটাই, এত অধৈর্য হলে চলবে না। আজকের শিল্পোন্নত দেলগুলো দেশীয় শিল্পকে একটানা ৫০ বছর এরচেয়ে অনেক বেশী সুবিধা দিয়েছে। তারপর তারা ডব্লিউটিও চুক্তি করেছে। ধাপে ধাপে সুবিধা প্রত্যাহার করছে। কৃষিখাতে তারা এখনও ব্যাপক সুবিধা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। তদুপরি ডব্লিউটিও’র কারণে শুল্ক বা ভর্তুকি হ্রাসে গরিব দেশগুলোর ওপর এখনও কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তাই দেশীয় শিল্প সংরক্ষণ অব্যাহত রাখতে হবে। শিল্পগুলো যাতে ধাপে ধাপে মুক্ত প্রতিযোগিতা সামর্থ্য অর্জনে সমর্থ হয় সেজন্য শুল্ক সুবিধাসহ অন্যান্য প্রণোদনায় ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

শামীম'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত