টপিকঃ তার সাথে যদি দেখা না-হতো

http://img19.imageshack.us/img19/8157/98634325.jpg

গত মে মাসের মাঝামাঝির কথা। সিলেটের একটি স্কুলে শিশু-কিশোর সংগঠন জোনাকীর আসরের বর্ষপূর্তি উৎসব চলছে। আমি এবং অন্যরা মিলে রুমে বসে পুরস্কার বক্সে উপর নিবিঁড় মনে লিখতেছি। হটাৎ পনের কি ষোল বছরের একটি মেয়ে ছুটতে ছুটতে এসে বলল,হারে..আপনি এখানে..কতক্ষন ধরে আমি আপনাকেই খুজছি। আমি দেখলাম মেয়ের চোখ দুটো উত্তেজনায় চকচক করছে। ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না। আমি বললাম তোমাকে দেখতে খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে-যাইহোক বলো কি জন্য খুজছো। মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, আপনি একটা সংগঠন চালান অথচ আপনার সম্ভবত একটা বিশ্রী অভ্যাস আছে,আপনি মনে হয় খুব মনভুলো মানুষ,এভাবে মনভুলো হলে চলে..? আমি মেয়েটির কথার কোন মাথামন্ডুই খুজে পেলাম না। আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, আমি কি বড় ধরনের কোন অন্যায় করে ফেলেছি। সে বলল, ঠিক অন্যায় নয় তবে আপনার আনমনা স্বভাবের জন্য অবশ্যই লজ্জিত হওয়া উচিত..এতে আপনি রাগ করুন অথবা না করুন।

সে কথা বলল নিচু গলায়,অথচ বলার ভঙ্গিতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। কোনো আড়ষ্টতা নেই। মেয়েটা ষ্মার্ট,বেশ সুন্দরীও-কথা বলার ধরণ দেখে মনে হলো পড়ালেখায় সম্ভবত ফার্স্টগার্ল। আমি বললাম,আমি লজ্জিত হয়েই তোমার কথাগুলো শোনার জন্য অপেক্ষা করছি। সে বলল,এই নিন আপনার সেট, এতো দামী মোবাইল সেটটা পাশের রুমে ফেলে এসেছেন..অথচ আপনার সেদিকে একটুও খেয়াল নেই। আমি হকচকিয়ে গেলাম। আক্রমন এইদিক থেকে আসবে ভাবিনি। বললাম সরি..সত্যিই বিরাট ভুল হয়ে গেছে..তবে আমি বিশ্বাস করি এরকম ভুল করা মুঠেই উচিত হয়নি। কথা শুনে সে হেসে ফেলল, বাচ্চা মেয়েদের এক ধরনের হাসি আছে যার নাম কুটকুট হাসি..ঠিক সেই হাসিটা সে হাসলো। আমি ব্রেঞ্চ থেকে উঠে কলমটা তার দিকে বাড়িয়ে বললাম, লিখতে লিখতে একদম টায়ার্ড হয়ে গেছি, আমি একটু বাইরে থেকে আসি..তুমি ওদের সাথে একটু লিখতে সহযোগিতা করো। আমার কথাটা শুনে মনে হলো সে প্রচন্ড একটা হোচট খেলো। আমি বললাম, কি হলো এই সামান্য সহযোগিতাটা করতে পারবে না। সে আমতা আমতা করে বলল, আসলে..?। আমি বললাম, আসলে..আসলে কি..?। সে করুণ কন্ঠে বলল,আমাকে দেখতে বেশ শিক্ষিত মনে হলেও আসলে আমি এক বঞ্চিত মেয়ে, মাত্র ৪র্থ শ্রেণী পর্যস্ত লেখাপড়া করেছি।তার কথাশুনে মনের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়লো, ও মাই…বলো কি..? দেখতে অন্যদের চেয়েও বেশ ষ্মার্ট তুমি..শুধু ..শিক্ষাটা ছাড়া। আমার কথা শুনে সম্ভবত সে রেগে গেল। কঠিন গলায় বলল,আমি পড়ালেখা জানিনা শুনে মনে হলো আৎকে উঠলেন,আমি জানি এখন আমার সাথে কথা বলতে আপনার সম্মানে বাধবে..আসলে আপনাদের মত মানুষদের চেনা বড়ই কঠিন,মাইকে বঞ্চিতদের জন্য কথো দরদ দেখান কিন্তু আপনাদের ভিতরের চেহারা বড়ই ভিন্ন। আমি সহজে প্রভাবিত হই না সেদিন হলাম। বললাম, আমি আৎকে উঠিনি তবে কিছুটা অবাক হয়েছিলাম,আসলে তুমি অযথাই আমাকে ভুল বুঝতেছো। সে বলল, হয়েছে…হয়েছে আর দরদ দেখাতে হবে না, আগে নিজের ভিতর পরিষ্কার করুন তারপর জনসেবা করবেন। এই কথা বলেই সে রুম থেকে চলে গেল। আমি আনমনা হয়ে বসে রইলাম। রাজ্যের সব যন্ত্রনা যেন আমার হৃদয়ে মোচড় দিতে লাগলো।

কিছুক্ষন পর পরিচিত অন্য মেয়েরা রুমে ঢুকলো, আমি তাদের হাতে কলম ধরিয়ে দিয়ে উদ্ধেশ্যহীন হাটতে লাগলাম। স্কুল মাঠে হইচই করে ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছে…আনন্দে সবাই উদ্বেলিত। শুধু আমার মনে আনন্দ নেই। আমার মন যেন কেমন অস্বস্তিতে ভুগতেছে। হটাৎ আমি লক্ষ করলাম সে মেয়েটি আরো একটি মেয়েকে নিয়ে স্কুলের মুল ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি কিছুটা দ্রুত হেটে তার পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু সে দেখেও না দেখার ভান করলো। তার এই এড়িয়ে চলার ভাবটা দুর করতে আমি হাত জোড় করে তাকে বললাম, আই এ্যম সরি..? আমি তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই। সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, আমিও সরি..আপনাকে কঠিন কথা বলার জন্য,আমি স্কুলের পাশেই থাকি। আসলে আমি আসছিলাম এখানে কিসের অনুষ্টান হচ্ছে তা দেখার জন্য..জাষ্ট আপনার সাথে ফান করলাম..তবে এ ধরনের লোক দেখানো প্রোগ্রাম এই স্কুলের বঞ্চিত ছেলেমেয়েদের জন্য না করে কোনো এলিট সোসাইটির জন্য করলে খুবিই উপভোগ্য হতো..এখন চলি বাই..বাই…?। সে সাথের মেয়ের সাথে কথা বলতে বলতে চলে গেল। সাথের মেয়ের সাথে কথো উচ্ছ্বসিত হয়ে কথা বলতেছে, শুধু আমার ব্যাপারেই তার এক ধরনের শীতলতা। হয়তো তার ধারনা হয়েছিলো, যে মহান আন্দোলনের নেতৃত্ব আমি দিয়ে যাচ্ছি..সেটা নিছক লোক দেখানো। তাই আমার ভূমিকা তার কাছে অস্পষ্ট মনে হয়েছে। কাজেই সে আমার প্রতি শীতল ভাব পোষন করতেই পারে। সেটাই স্বাভাবিক।

আমি জানি, সে শিক্ষিত, বঞ্চিত নয়। কিন্তু দরিদ্র,বঞ্চিতদের জন্য তার এই মহানুভতা আমাকে সত্যিই বিস্মিত করেছে। আমার এতোটাই চোখ খুলে দিয়েছে যে..এই চোঁখের স্বপ্নে আর কারো প্রবেশাধিকার নেই। আমরা এখন গঠনতন্ত্রে সংযোজন করে”নিড এ্যকশন” নামে জোনাকীর আসরের একটি অংগ প্রতিষ্টান গড়ে তুলেছি। যার মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের আত্মকর্মসংস্থান,শিক্ষা,চিকিৎসা সেবা সরাসরি নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত বিশাল প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই ব্যয়বহুল বিশাল প্রকল্প হয়তো হাতে নেয়া হতো না যদি তার মত মহান মানুষের সাথে দেখা না হতো। আমি বিলিভ করি,তার মত মহান মনের মানুষেরা এ জগতে দুটা তিনটা করে জন্মায় না। একটাই জন্মায়। সেদিন সমাপনী অনুষ্টানে ভাল বক্তব্য দিতে পারিনি। এক ধরনের শুণ্যতাবোধ আমার ভিতর জমা হয়েছিলো। কেবলি মনে হতে লাগলো। একটা মস্ত ভুল হয়ে গেছে। কী পরিমান শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এই মানুষটির প্রতি হয়েছিলো তা তাকে জানানো হয়নি। আমার একটাই শান্তনা, হয়তো আমার এই লেখা সে পড়বে। লেখা পড়ে নিশ্চয় আজ আমার বিপুল শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অনুভুব করতে পারছে। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে আমি সবসময় বঞ্চিত,অবহেলিতদের পাশে ছিলাম। যে ক’দিন বেচে থাকবো তাই থাকবো। বঞ্চিতদের পাশে আমি কিংবা জোনাকীর আসর থাকবে না তা কী কখনো হয়।

সে আমার হৃদয়ে জ্বেলে দিয়েছে যে অনিবার্ণ শিখা, ঝড় ঝাপটা যত প্রচন্ডই হোক না কেন সেই শিখা জ্বলতে থাকবে। কী সৌভাগ্য আমার। তার সাথে দেখা হয়েছিলো আমারই স্বপ্নঘেরা সংগঠন জোনাকীর আসরের একটি মহতী প্রোগ্রামে।

সুখের পৃথিবী..সুখের অভিনয়.যতই আড়াল করে রাখ, আসলে কেউ সুখী নয়।

Re: তার সাথে যদি দেখা না-হতো

সুলতান, আপনার লেখাগুলো বেশ উপভোগ্য। প্রায় প্রতিটি লেখায় বেশ চমকপ্রদ কিছু ব্যাপার থাকে যেটা শেষ পর্যন্ত অনায়াস টেনে নিয়ে যাচ্ছে। জোনাকী'র সাফল্য কামনা করছি আর তাঁর সাথে দেখা হলে আমার শুভেচ্ছা জানাতে ভুলবেন না কিন্তু!

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: তার সাথে যদি দেখা না-হতো

উদাসীন লিখেছেন:

সুলতান, আপনার লেখাগুলো বেশ উপভোগ্য। প্রায় প্রতিটি লেখায় বেশ চমকপ্রদ কিছু ব্যাপার থাকে যেটা শেষ পর্যন্ত অনায়াস টেনে নিয়ে যাচ্ছে। জোনাকী'র সাফল্য কামনা করছি আর তাঁর সাথে দেখা হলে আমার শুভেচ্ছা জানাতে ভুলবেন না কিন্তু!

ধন্যবাদ ভাই,  আমি এখানে অনেকদিন ধরে নিয়মিত সবার লেখাগুলি পড়ি, আপনাদের সবার কাছ থেকে আস্তে আস্তে লেখা কিভাবে লিখতে হয় শিখছি। তবে এখানে সবার মত গুছিয়ে লিখতে পারি না। যাইহোক দেখা হলে অবশ্যই বলবো ভাল থাইকেন

সুখের পৃথিবী..সুখের অভিনয়.যতই আড়াল করে রাখ, আসলে কেউ সুখী নয়।

Re: তার সাথে যদি দেখা না-হতো

মিঃ সুলতান আপনার পরিচয়টা জানতে পারলে .... টপিকগুলো পড়তে আগ্রহবোধ করতাম...........

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন দক্ষিণের-মাহবুব (১৯-০৮-২০০৯ ০৯:৩৮)

Re: তার সাথে যদি দেখা না-হতো

আমি এই লেখা পড়মু না। shame আগের টপিকের উত্তর না দিয়েই নতুন টপিকের শুরু। এ কেমন কথা!! surprised (নাকি ক্লাইমেক্স সৃষ্টি করছেন) উত্তর চাই আগের টপিকের।

Re: তার সাথে যদি দেখা না-হতো

ভাই দেখি খুব সুন্দর লেখেন।

Re: তার সাথে যদি দেখা না-হতো

দক্ষিণের-মাহবুব লিখেছেন:

আমি এই লেখা পড়মু না। shame আগের টপিকের উত্তর না দিয়েই নতুন টপিকের শুরু। এ কেমন কথা!! surprised (নাকি ক্লাইমেক্স সৃষ্টি করছেন) উত্তর চাই আগের টপিকের।

ভাই মাফ করন যায় না?

সুখের পৃথিবী..সুখের অভিনয়.যতই আড়াল করে রাখ, আসলে কেউ সুখী নয়।

Re: তার সাথে যদি দেখা না-হতো

অচেনা_পথিক লিখেছেন:

মিঃ সুলতান আপনার পরিচয়টা জানতে পারলে .... টপিকগুলো পড়তে আগ্রহবোধ করতাম...........

এটা আমার রিয়েল নাম। ভার্চুয়াল জগতে এখানেই প্রথম অর্জিনাল নিক ব্যবহার করলাম, বছর তিনেক ধরে ব্লগিং করলেও কোন ফোরামে এটাই হাতেখড়ি, নতুনত্বে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেস্টা করছি। আস্তে আস্তে লেখার মাধ্যমেই সবার সাথে পরিচিত + বন্ধু হতে চাই, আশা করি আগ্রহবোধে ভাটা পড়বে না। ভাল থাকবেন সবসময়।

সুখের পৃথিবী..সুখের অভিনয়.যতই আড়াল করে রাখ, আসলে কেউ সুখী নয়।

Re: তার সাথে যদি দেখা না-হতো

sultan লিখেছেন:
দক্ষিণের-মাহবুব লিখেছেন:

আমি এই লেখা পড়মু না। shame আগের টপিকের উত্তর না দিয়েই নতুন টপিকের শুরু। এ কেমন কথা!! surprised (নাকি ক্লাইমেক্স সৃষ্টি করছেন) উত্তর চাই আগের টপিকের।

ভাই মাফ করন যায় না?

না না কোন আমাদের ডিকশনারীতে ক্ষমা বা মাফ বলতে কোন শব্দ নেই। shame shame
আচ্ছা মাফ দিয়ে কি করে tongue খায় না মাথায় দেয়।
আমাদের অন্যান্য ভাই সবেরা গেল কোথায়। আমি কি একা হয়ে গেলাম নাকি?  confused