আধুনিক কবিতা নিয়ে শামীম ভইয়ের বন্ধুর সংজ্ঞাটা কিন্তু বেশ ভালই!! উইকিপিডিয়ায় "আধুনিক কবিতা"-র উপর কোন আর্টিকেল নেই। এই সংজ্ঞাটা তুলে দিলে কেমন হয়!! সংজ্ঞা যাই হোক না কেন এই আধুনিক কবিতা নামক জিনিসটা পড়তে গেলেই মাথাটা পুরা আউলা হয়ে যায়। “আধুনিক” আর “আউলা” দুইটা শব্দই “আ” দিয়ে শুরু। বেশ অন্তমিল আছে, তাই না! এই অন্তমিল জিনিসটাকেই আমার কাছে কবিতার প্রাণ মনে হয় তা সে যেরকমই হোক না কেন (মধুসূদন দত্তের সনেটের ছন্দ কিংবা সত্তেন্দ্রনাথ দত্তের জাদুকরী ছন্দ বা রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের ধ্রুপদী-বিদ্রোহী ছন্দ নতুবা সুকুমার রায়ের ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ)। যে কোন কবিতায় ছন্দের উপস্থিতি যে সেটাকে অনেক বেশী সুখপাঠ্য করে তোলে তা নিয়ে মনে হয় না কারও মধ্যে কোন দ্বিমত আছে। অবশ্য গদ্য টাইপের কবিতার যারা প্রচণ্ড ফ্যান এক্ষেত্রে তাদের যুক্তিটা এরকম - ছন্দের দিকে নজর দিতে গেলে অনেক সময় কবিতার বিষয়বস্তুর গুরূত্ব কমে যায়, ফলে বিষয়বস্তু দুর্বল হয়ে পড়ে। একটা কবিতা পড়ে যদি মাথাই আউলা হয়ে যায় তবে পাঠকের কাছে তার বিষয়বস্তুর কতটা গুরূত্ব থাকে সেটা বোঝার সাধ্য আমার নিউরনের নাই। উপরে যেসব বড় বড় কবির নাম বলেছি তাদের তো অধিকাংশ কবিতাই ছন্দবদ্ধ, তাতে কি তাদের কবিতার মানের বা বিষয়বস্তুর এতটুকু হানি ঘটেছে! এ ব্যাপারেও মনে হয না কারও দ্বিমত আছে! জসীমউদ্দীনও তার কবিতাগুলোতে চমৎকার ভাবে পল্লীর বিষয়বস্তুকে ছন্দে ছন্দে তুলে ধরেছেন। তাই আমার তো মনে হয় না ছন্দ বিষয়বস্তুর গুরূত্ব কমায় বা বিষয়বস্তুর প্রকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারে। অনেকে আবার এর বিপক্ষে জীবনানন্দ দাশের “আবার আসির ফিরে” বা শামসুর রাহমানের “স্বাধীনতা তুমি” কবিতাগুলেকে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। কবিতাগুলোতে ছন্দের ঝংকার নেই ঠিক কিন্তু যে চমৎকার ভাব মাধুর্য রয়েছে তা কখনই বিরক্তির উদ্রেক করে না। বরং সুখপাঠ্য কবিতাগুলোর তালিকায় এগুলো উপরের সারিতেই রয়েছে। ছন্দ নিয়ে এতো বকবক করলাম যখন রবীন্দ্রনাথের চমৎকার একটা ছন্দবদ্ধ কবিতা লিখেই শেষ করি। কবিতাটি “সোনার তরী” কাব্য থেকে নেয়া...
**ঝুলন**
আমি পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা
নিশীথবেলা।
সঘন বরষা, গগন আঁধার
হেরো বারিধারে কাঁদে চারিধার---
ভীষণ রঙ্গে ভবতরঙ্গে ভাসাই ভেলা;
বাহির হয়েছি স্বপ্নশয়ন করিয়া হেলা
রাত্রিবেলা॥
ওগো, পবনে গগনে সাগরে আজিকে কী কল্লোল!
দে দোল্ দোল্।
পশ্চাত্ হতে হাহা ক'রে হাসি
মত্ত ঝটিকা ঠেলা দেয় আসি,
যেন এ লক্ষ যক্ষশিশুর অট্টরোল।
আকাশে পাতালে পাগলে মাতালে হট্টগোল!
দে দোল্ দোল্।
আজি জাগিয়া উঠিয়া পরান আমার বসিয়া আছে
বুকের কাছে।
থাকিয়া থাকিয়া উঠিছে কাঁপিয়া,
ধরিছে আমার বক্ষ চাপিয়া,
নিঠুর নিবিড় বন্ধনসুখে হৃদয় নাচে;
ত্রাসে উল্লাসে পরান আমার ব্যাকুলিয়াছে
বুকের কাছে॥
হায়, এতকাল আমি রেখেছিনু তারে যতনভরে
শয়ন-'পরে।
ব্যথা পাছে লাগে---- দুখ পাছে জাগে
নিশিদিন তাই বহু অনুরাগে
বাসরশয়ন করেছি রচন কুসুমথরে;
দুয়ার রুধিয়া রেখেছিনু তারে গোপন ঘরে
যতনভরে॥
কত সোহাগ করেছি চুম্বন করি নয়নপাতে
স্নেহের সাথে।
শুনায়েছি তারে মাথা রাখি পাশে
কত প্রিয়নাম মৃদুমধুভাষে,
গুঞ্জরতান করিয়াছি গান জ্যোত্স্নারাতে;
যা-কিছু মধুর দিয়েছিনু তার দুখানি হাতে
স্নেহের সাথে॥
শেষে সুখের শয়নে শ্রান্ত পরান আলসরসে
আবেশবশে।
পরশ করিলে জাগে না সে আর,
কুসুমের হার লাগে গুরুভার,
ঘুমে, জাগরণে মিশি একাকার নিশিদিবসে
বেদনাবিহীন অসাড় বিরাগ মরমে পশে
আবেশবশে॥
ঢালি মধুরে মধুর বধূরে আমার হারাই বুঝি,
পাই নে খুঁজি।
বাসরের দীপ নিবে নিবে আসে,
ব্যাকুল নয়ন হেরি চারি পাশে
শুধু রাশি রাশি শুষ্ক কুসুম হয়েছে পুঁজি;
অতল স্বপ্নসাগরে ডুবিয়া মরি যে যুঝি
কাহারে খুঁজি॥
তাই ভেবেছি আজিকে খেলিতে হইবে নূতন খেলা
রাত্রিবেলা
মরণদোলায় ধরি রশিগাছি
বসিব দুজনে বড়ো কাছাকাছি,
ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া মারিবে ঠেলা;
আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে ঝুলনখেলা
নিশীথবেলা॥
দে দোল্ দোল্।
দে দোল্ দোল্।
এ মহাসাগরে তুফান তোল্
বধূরে আমার পেয়েছি আবার, ভরেছে কোল।
প্রিয়ারে আমার তুলেছে জাগায়ে প্রলয়রোল।
বক্ষশোণিতে উঠেছে আবার কী হিল্লোল!
ভিতরে বাহিরে জেগেছে আমার কী কল্লোল!
উড়ে কুন্তল, উড়ে অঞ্চল,
উড়ে বনমালা বায়ুচঞ্চল,
বাজে কঙ্কণ বাজে কিঙ্কিণী--- মত্তরোল।
দে দোল্ দোল্।
আয় রে ঝঞ্ঝা, পরানবধূর
আবরণরাশি করিয়া দে দূর,
করি লুণ্ঠন অবগুণ্ঠন-বসন খোল্।
দে দোল্ দোল্।
প্রাণেতে আমাতে মুখোমুখি আজ
চিনি লব দোঁহে ছাড়ি সব লাজ,
বক্ষে বক্ষে পরশিব দোঁহে ভাবে বিভোল।
দে দোল্ দোল্।
স্বপ্ন টুটিয়া বাহিরিছে আজ দুটি পাগল।
দে দোল্ দোল্।
সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন sfaisal2005 (31-01-2007 00:55)
It's our choices that make us who we are.