টপিকঃ নন্দনে থাকবে না প্রিয়াঙ্কা
![]()
সুত্রঃ প্রথম আলো
নন্দনে থাকবে না প্রিয়াঙ্কা
‘আহা রে! আমার মানিক নতুন জামা কিনছে, নন্দন পার্কে সংবর্ধনা নিব। আইজ সকালে জামা পইরা কয়, মা একটু ঢিলা হয়, তুমি ঠিক কইরা দিও। কে নিব সংবর্ধনা, কে পরব নতুন জামা? সব শেষ হইয়্যা গেল.....’−এই আহাজারী এক হতভাগী মায়ের, যাঁর সামনে মেয়ের মরদেহ−নিথর, নীরব।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরের সামনে বিলাপ করতে করতে লুটিয়ে পড়লেন সামসুন্নাহার খুশী। মেয়ে প্রিয়াঙ্কার প্রাণহীন শরীর দেখিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘ঘরের মইধ্যে ঢুইক্যা আমার মানিকেরে শেষ করছে। দ্যাখো দ্যাখো, গলাটা কী কালো হইয়্যা গ্যাছে।’
গতকাল বুধবার দুপুরে ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী সাদিয়া নওশীন প্রিয়াঙ্কার রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছেলে জীমকে স্কুল থেকে আনতে মা সামসুন্নাহার বাসা থেকে বের হন। এ সময় বাসায় কেউ ছিল না। ছেলেকে নিয়ে দুপুর ১২টার দিকে ফিরে এসে তিনি মেয়েকে আর জীবিত ফিরে পাননি।
উইলস লিটল ফ্লাওয়ারের স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানের ছাত্র রওনক শিহাব জীম জানায়, ‘স্কুল থেকে এসে দেখি দরজা বাইরে থেকে আটকানো। বাসায় ঢুকেই আপুর ঘরে যাই। দেখি নাই। মাকে বললাম, মা বলল, বাথরুমে দ্যাখ। বাথরুমেও পাইনাই। পরে পেছনের ঘরে দেখি আপু মাটিতে পড়ে আছে। গলায় ওড়না পেঁচানো। ওড়নায় অনেকগুলো গিট্টা (গিঁট) ছিল।’
প্রিয়াঙ্কার মা কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ‘বাসা থেকে বাইর হওয়ার সময় দেখছি, মেয়ে শুইয়া শুইয়া পেপার পড়ে। আইস্যা দেখি, মেয়ে আমার চিরতরে শুইয়া আছে। যদি এমন বুঝতাম, তাইলে মেয়েরে আমার সঙ্গে নিয়া যাইতাম। স্কুলে দিয়া আসতাম, নিয়া আসতাম। কোনো দিন কোনো আঁচড় লাগতে দেই নাই। আইজ আমার মেয়েরে ঘরে ঢুইক্যা কে মারল?’
প্রিয়াঙ্কার মায়ের চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল স্বজনেরাও। কিন্তু সান্ত্বনার ভাষা ছিল না কারোরই। সবার অপেক্ষা প্রিয়াঙ্কার বাবার জন্য। মেয়ের খবর শুনেই কর্মস্থল সিলেট থেকে রওনা দিয়েছেন বাবা সুলতান ফারুক। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত তিনি এসে পৌঁছাতে পারেননি।
প্রিয়াঙ্কার মা জানিয়েছেন, মেয়ে যা চাইত, ওর বাবা কোনো কিছু না করতেন না। নিজে দুরে থাকতেন, তাই ছেলেমেয়ের যেন কোনো অযত্ন না হয়, সে ব্যাপারে সব সময় তাগিদ দিতেন সুলতান ফারুক। বলতে বলতে কন্ঠ বুজে আসে দুঃখী মায়ের। তিনি বিড়বিড় করে বলেন, ‘আমি তুলার মইধ্যে রাইখ্যা মেয়েরে মানুষ করছি। আমার গলা ধইর্যা সে বলছিল, মা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমি কিন্তু খুব সুন্দর একটা জামা পরমু। মেয়ের শখ মিটাতে মৌচাক মার্কেট থেকে জামা কেনা হয়েছিল। আগামী ২১ জুলাইয়ের সংবর্ধনায় সেই জামাটা কে পরবে?’ মায়ের আফসোস ঘা দেয় সবার বুকে।
এসএসসিতে পাস করা সেরা মেধাবীদের একজন প্রিয়াঙ্কা। প্রথম আলো-ডিজুস আয়োজিত সারা দেশে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগরীর কৃতী শিক্ষার্থীদের আগামী ২১ ও ২২ জুলাই নন্দন পার্কে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে প্রিয়াঙ্কা নাম নিবন্ধন করেছে। ২১ জুলাই নন্দন পার্কে সংবর্ধনা পাওয়ার কথা ছিল প্রিয়াঙ্কার। কিন্তু সেই সংবর্ধনায় ভিকারুননিসা নুন স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থী প্রিয়াঙ্কাকে পাওয়া যাবে না।


