মাইকেল জ্যাকসন
খ্যাতি, অবিচার আর কুৎসার বিষে মৃত্যু যাঁর
জুলিয়ান ভিগো
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি আর আমার ভাই নিউ অরলিন্সের বাসস্টপে স্কুলবাসের জন্য দাঁড়াতাম। আরেকটি ছেলেও আসত ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে। আমরা একসঙ্গে স্কুলে যেতাম মাইকেল জ্যাকসনের ‘অব দ্য ওয়াল’ গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে। পরে বাসস্টপ থেকে স্কুল পর্যন্ত চলন্ত বাসে নাচাটাই আমাদের অভ্যাস হয়ে গেল। ওই দুই বছর আমার স্কুলের যাওয়া-আসার পথের সঙ্গী ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। মাকে খুব ভয় পেতাম। তারপরও বাড়িতে থাকার পুরো সময়টা কেটে যেত মাইকেলের গান শুনে: ‘চালিয়ে যাও, সমস্ত শক্তি দিয়ে, থেমো না...থেমো না, যতক্ষণ তুমি পারো’।
মাইকেলের মৃত্যুতে গত বৃহস্পতিবার থেকে তাই খুবই মুষড়ে পড়েছি। তারকাদের নিয়ে মেতে থাকা বা তাদের জন্য আবেগ বোধ করার মতো লোক আমি নই। তার পরও আমার এক বন্ধু যখন বলেই ফেলল, ‘এমন লোককে নিয়ে মন খারাপ করার কী আছে’, তখন মনে আঘাত পেলাম। আমাদের বিচারব্যবস্থা নিয়ে খুব একটা ভক্তি আমার নেই। কিন্তু একে বাতিলও করা যায় না। আদালত যেখানে শেষপর্যন্ত মাইকেলকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন, সেখানে কেন এত নিন্দা-মন্দ? কেন এক দশক ধরে শিশুকামিতা নিয়ে এত মাতামাতি? এবং কেনই বা বিশেষ করে মাইকেলের বিরুদ্ধে শিশুকামিতার মিথ্যা অভিযোগ? পরে প্রমাণিত হয়েছে যে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ কেবল মিথ্যাই নয়, এসব অভিযোগের উদ্দেশ্য ছিল জ্যাকসনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া! এটা সম্ভব হয়েছে জ্যাকসনের শিশুসুলভ সারল্যের জন্য।
তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগকারী শেরিফ শেল্ডন জ্যাকসনকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য নিজের সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন। এমনকি কয়েকজন মা তাঁদের শিশুদের ব্যবহার করে জ্যাকসনের কাছ থেকে টাকা হাতানোর ফন্দি এঁটে অনেক দূর সফলও হয়েছিলেন। পরে বিভিন্ন সময় এসব অভিযোগের অসারতা তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করেন বা ধরা পড়ে। জ্যাকসনের প্রতি ক্ষুব্ধ আদালত পর্যন্ত রায় দিতে বাধ্য হন যে সবই ছিল সাজানো অভিযোগ।
তাই সিএনএনে জ্যাকসনের মৃত্যুর সংবাদ প্রচারিত হতে দেখে সবচেয়ে খারাপটার জন্যই প্রস্তুত হই। না তারা আমাকে হতাশ করেনি। বুর্জোয়ারা শিল্পীদের যেসব বিশেষণে অভিহিত করে, তার সবগুলোই তারা মাইকেলের নামের সঙ্গে জুড়ে দিতে ভোলেনি: ‘ছিটগ্রস্ত’, ‘উদ্ভট’, ‘আত্মকেন্দ্রিক’। যে ড্যান আব্রামস আরেক কৃষ্ণাঙ্গ তারকা ওজে সিম্পসনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ পেশ করে বিখ্যাত হয়েছিলেন, তাঁকেই দেখা গেল জ্যাকসনের ‘ছিটগ্রস্ততা’ নিয়ে নির্মম কথা বলে যেতে। আব্রামসের মতো লোক, যিনি প্যাট বুকাননের মতো হিটলারভক্তকে কর্মচারী রাখেন, তাঁর মতো ছিটগ্রস্ত আর কে আছে? সিএনএন, এমএসবিসির মতো জনপ্রিয় চ্যানেলগুলোতে সেদিন একে একে এসেছিলেন জ্যাকসনের কুৎসা রচনাকারীরা। এঁদের মতো লোকেরাই আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে জ্যাকসনকে মানসিকভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। শিশুকামিতার অভিযোগে বিচারের শুরুতে যে জ্যাকসনকে দেখা যায় আদালতের সামনে ভ্যানের ওপর নাচতে, বিচারের মাঝখানে তাঁকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়। আর বিচার শেষে যে জ্যাকসনকে আমরা পাই, সেই জ্যাকসন ভঙ্গুর, কাবু এবং রুগ্ণ দেহের এক মানুষ। কিন্তু আদালতে জয়ী হয়ে এলেও মার্কিন মিডিয়ার চোখে জ্যাকসন এখনো এক শিশুকামী। মৃত্যুর পরও এই অপবাদ থেকে তাঁর রেহাই মেলেনি।
গত কয়েক দিনে আমি মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে যা-ই পেয়েছি, তা-ই পড়েছি ও দেখেছি। পড়েছি আদালতের রায়, সংবাদ প্রতিবেদন এবং দেখেছি তাঁকে নিয়ে করা বেশির ভাগ ভিডিও। এসব করতে গিয়ে ব্যক্তি জ্যাকসনকেও আমি ভালোবেসে ফেলেছি। জীবনে কারও ভালোবাসা বা সদয় আচরণ তিনি পাননি। না তাঁর বাবা-মা, না মার্কিন মিডিয়া, না মার্কিন বিচারব্যবস্থা; কেউ তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পর সিএনএন যাঁকে তাঁর সম্পর্কে বলতে বসিয়েছে, তিনিও মিথ্যা অভিযোগগুলো আবার বলতে ভুললেন না। এই নির্দয় জগতের প্রতি তিনি শোধ নিয়েছেন তাঁর বাসভবন নেভারল্যান্ডকে শিশুস্বর্গ হিসেবে সাজিয়ে। যে আনন্দের আস্বাদ থেকে তিনি শৈশবে বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁর সন্তানদের জন্য নেভারল্যান্ড ভরিয়ে তুলেছেন সেই সব স্বপ্নের উপকরণ দিয়ে।
মাইকেল জ্যাকসনের সিদ্ধান্তগুলোকে আমার ‘ছিটগ্রস্ত’ বা ‘আত্মকেন্দ্রিক’ বলে মনে হয়নি। মনে রাখতে হবে, সারাটা জীবন তাঁকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে। পরিবারের জন্য স্বাভাবিক জীবন এবং এমনকি ভক্তদের নিরবচ্ছিন্ন চাপ থেকে নিজেকে শারীরিকভাবে বাঁচানোর জন্যই তাঁকে এসব করতে হয়েছে। এবং আলবৎ বলব, বিখ্যাত হওয়ার দিন থেকেই তাঁর জীবনের স্বাভাবিকতা জানালা দিয়ে পালিয়ে গেছে। ১৯৮২ সালে থ্রিলার অ্যালবামের সাফল্যের মুহূর্ত থেকে তিনি দেখতে পেলেন, কোটি কোটি ভক্তের মধ্যে তিনি বন্দী। এ সপ্তাহের টাইম পত্রিকায় ডেনাল্ড রাম্প তাই বিশদভাবে লিখেছেন, “আমরা ছিলাম আটলান্টা সিটির ট্রাম্প তাজমহলে। হাজার হাজার মানুষ সেখানে আক্ষরিকভাবে আমাদের দিকে দৌড়ে এল। সঙ্গে ২০ জন দেহরক্ষী থাকা সত্ত্বেও আমরা বিপজ্বনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়লাম। মাইকেল হাঁটুতে ভর দিয়ে ভিড় থেকে বেরিয়ে যেতে গেলেন। আমি ভেবেছিলাম, তিনি পড়ে গেছেন। কিন্তু প্রায়ই তাঁকে এ রকমটা করতে হয়। তাঁকে জিজ্ঞেস করি, ‘মাইকেল, সব সময়ই কি এ রকমটা হয়?’ উত্তর আসে, ‘হ্যাঁ, এটা তো কিছুই না। জাপানে আরও খারাপ হয়েছিল’।’’
এসব থেকেই আমার মনে হয়, মাইকেলের জীবনে স্বাভাবিকতা আনার সুযোগ ছিল না। একদিকে মিথ্যাচার, অপবাদ, আদালতের হয়রানি; অন্যদিকে মিডিয়ার কুৎসা ও খ্যাতি আর ভক্তদের বাড়াবাড়ি। তাই এ রকম চার হাত-পায়ে পালানোটাই যেন ছিল তাঁর ‘স্বাভাবিক’ জীবন।
মাইকেল জ্যাকসনের মধ্যে এক সুন্দর মানবমনের অস্তিত্বকে আমরা দেখতে ভুলে গিয়েছি। সারাটা জীবন যে ভয়ানক শক্তির হাতে তিনি পীড়িত হতেন, কেবল মঞ্চের নাচের মধ্য দিয়েই তিনি তাদের হাত থেকে নিজের মুক্তি কিনে নিতেন। জীবনের শেষ দিকে আক্ষরিকভাবেই মিডিয়া ও জনসাধারণ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখেন তিনি। সারল্যের সুযোগে সবাই তাঁর সঙ্গে এত প্রতারণা করেছে যে তিনি আর কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। তার পরও তাঁর এই লুকিয়ে থাকাকে বলা হবে ‘ছিটগ্রস্ততা’? বড়দের প্রতারণায় আহত হয়ে তিনি শিশু ও পশুপাখির সঙ্গ ভালোবাসতে শুরু করেন। অথচ কী মর্মান্তিক, এ জন্য তাঁকে শুনতে হয় ‘বয়স্ক শিশু’র অপবাদ। যারা এসব বলে তারা ভুলে যায় ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ ও বর্ণবাদী বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর শিল্পীসুলভ অবদানের কথা, মানুষকে সচেতন করার প্রচেষ্টার কথা, মানবতাবাদী কাজে বিপুল সম্পদ দান করার কথা। কমপক্ষে ৪০টি দাতব্য সংস্থায় মাইকেল অর্থ দিয়েছেন। এসব না বলে শক্তিশালী মিডিয়া কেবলই আওড়ে চলেছে নিগারের টাকা কোথায় গেল বা কত ড্রাগ নিল কিংবা ‘কী হবে তাঁর শিশুদের’−এ জাতীয় কথাবার্তা। খারাপ কথার আকর্ষণ বেশি। এসবে আবারও প্রমাণিত হলো, কীভাবে মিডিয়ার সৃষ্টি করা ‘জনমত’ অনেক সময় যুক্তি ও প্রমাণের বিপরীতে মিথ্যায় আসক্ত হয়ে যায়।
তাই কাউন্টারপাঞ্চে ইশমায়েল রিডের লেখা ‘মাইকেল জ্যাকসন নিধন’-এ (দ্য পারসিকিউশন অব মাইকেল জ্যাকসন, http://www.counterpunch.org/reed06292009.html) তিনি সঠিকভাবেই অভিযোগ তোলেন, মিডিয়া ও রাজনীতিবিদদের আমরা আর ন্যায়-অন্যায় বিচারের ভার দিতে পারি না। কিন্তু বিপদ এটাই যে ‘শ্বেতাঙ্গ ইলেকট্রনিক জুরিরা নিজেদের আইনের ঊধ্র্বে স্থাপন করেছেন...কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি ল্যাটিনোদের অনুপস্থিতিতে মার্কিন দেশের গণমাধ্যমে চলছে শ্বেতাঙ্গ দাপট। এরা অনবরত নিয়োজিত কোনো কৃষ্ণাঙ্গ তারকাকে ছিন্নভিন্ন করতে; ঠিক যেমনটা দাসপ্রথার যুগে করা হতো কৃষ্ণাঙ্গদের দেহ নিয়ে।’ এই মিডিয়া আর তাদের তৈরি জনমতই যেন শেষ কথা বলার অধিকারী। এন্ড্রু সুলিভান আটলান্টিক পত্রিকায় কঠিন যুক্তি দিয়ে দেখান, মাইকেলের করুণ মৃত্যুতে আমাদেরও অজস্র দায় আছে। সুলিভান লিখেছেন, ‘তাঁর জন্য আমার দুঃখ হয়। কিন্তু আরও দুঃখ হয় সেই সংস্কৃতির জন্য যা তাঁকে সৃষ্টি করেছে এবং হত্যা করেছে। এটাই আমাদের সংস্কৃতি এবং তা জঘন্য রকম নির্মম ও প্রাণঘাতী। এর মূল্যবোধের গোড়ায় রয়েছে খ্যাতি ও বন্দনা, এর মূল প্রেরণা হলো বিত্ত ও টাকা। এই সংস্কৃতি মাইকেলকে চুষে ছোবড়া করে থুতুর মতো ছুড়ে ফেলেছে।’
মাইকেলের জীবন নিয়ে এখন আমার মনে হয়, যেন আমরা টিভি চ্যানেলে লটারি খেলার মধ্যে আছি। খেলাটি এ রকম: ‘আজ কে আমাদের নিরানন্দ সময়টা আমোদে ভরাবে’। দর্শকদের মাতিয়ে রাখার এই খেলাটা আসলে মিডিয়ার একটি কৌশল। আমরা জেনে বা না জেনে এর অংশ হয়ে যাই। দুঃখজনক যে, জ্যাকসনের জীবনের সুন্দর দিকগুলো ঢেকে রেখে নোংরা কুৎসাগুলো দিয়ে এই খেলায় আমাদের মাতিয়ে রাখা হয়েছে।
জ্যাকসনের মৃত্যু থেকে এখন আমার চাওয়া একটাই−যাতে আমরা বুঝতে পারি দৈনন্দিন জীবনে ব্যক্তি হিসেবে আমরা এমন অনেক কিছুই করি বা বিশ্বাস করি, যা আমাদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আমার আশা, মাইকেল সম্পর্কে যে সহিংসতা ও গল্পগাথা মিডিয়া সৃষ্টি করেছে, তা ছেড়ে তাঁর জীবনের ইতিবাচক দিকগুলি: তাঁর গানে ও নাচে যে স্বপ্ন, সৌন্দর্য, সৃষ্টিশীলতা ও ভালোবাসা ছড়িয়ে রয়েছে, তাতে আমরা মন দেব। এসবের আলোকেই তাঁকে মূল্যায়ন করব।
কাউন্টারপাঞ্চ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ।
জুলিয়ান ভিগো: কানাডার মন্ট্রিয়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।