টপিকঃ জামায়াতের দাবি: যুদ্ধের সময় তাদের কেউ খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ করেনি
খবর: প্রথম আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯
জামায়াতের দাবি
যুদ্ধের সময় তাদের কেউ খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ করেনি
নিজস্ব প্রতিবেদকবাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দাবি করেছে, তাদের নেতাদের যুদ্ধাপরাধী আখ্যা দিয়ে বিচারের দাবি তোলা সংবিধান ও আইনের দৃষ্টিতে আপত্তিকর। দলটি বলেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয় যুদ্ধের পরই। আর কোনো তালিকাভুক্ত যুদ্ধাপরাধী পালিয়ে থাকলে পরে তার বিচার হয়। কিন্তু যেসব জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করা হচ্ছে, তাদের কারও নামে স্বাধীনতার পর কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।
গতকাল রোববার বিকেলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বর্ধিত সভায় এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, জামায়াতের কোনো নেতা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, লুটতরাজ বা অগ্নিসংযোগের মতো কোনো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বিচারের আগেই জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধী বলে যে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে, তা সংবিধান, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতির পরিপন্থী।
জামায়াতের মতে, ‘স্বাধীনতার স্থপতি, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ সরকারের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান নিজে যেখানে যুদ্ধাপরাধী প্রশ্নের ইতি ঘটিয়েছেন, এমনকি যেখানে দালাল আইন বাতিল হয়ে গেছে, সেখানে অযৌক্তিকভাবে বিনা প্রমাণে স্বাধীনতার ৩৮ বছর পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে জড়িত করে নানা রকম মিথ্যা কথা বলা হচ্ছে।’
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ (বিচার) আইন অনুযায়ী বিচারের দাবিরও সমালোচনা করেছে জামায়াত। দলটি মনে করে, এই আইনের অধীনে বিচার হলে বিচারের নামে প্রহসন হবে এবং তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মানবাধিকারবিরোধী পদক্ষেপ হবে। জামায়াতের যুক্তি, ‘বাদীপক্ষের নিযুক্ত বিচারকের আদালতে কখনো সুবিচার পাওয়ার আশা করা যায় না।’রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে প্রস্তাবে বলা হয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে এসব বাহিনী সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
যুদ্ধাপরাধ দুই পক্ষেই হতে পারে বলেও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধী তারাই, যারা যুদ্ধ করতে গিয়ে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অসহায় মানুষকে হত্যা তথা গণহত্যা করে এবং ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে।প্রস্তাবে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর স্বাধীনতা-উত্তর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার ১৯৫ জনকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্ণিত করে। ’৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এদের বিচারের কথা ঘোষণা করে সরকার। এই তালিকায় কোনো বেসামরিক ব্যক্তি বা বাংলাদেশির নাম ছিল না।
এদের বিচারের জন্য সংসদে ’৭৩-এর ১৯ জুলাই আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ (বিচার) আইন ১৯৭৩ করা হয়। কিন্তু ’৭৪ সালের ৯ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনা শেষে একটি চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে ‘ক্ষমা’ করে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। সুতরাং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ উদ্ভূত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুর ইতি ঘটে।
প্রস্তাবে দাবি করা হয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেয়নি কিংবা রাজনৈতিক বিরোধিতা করেছে কিংবা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগিতা করেছে কিংবা কোনো অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি দালাল আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় লক্ষাধিক লোককে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্য থেকে ৭৫২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ‘৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দালাল আইনটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।
সাধারণ ক্ষমতা বিষয়ে প্রস্তাবে বলা হয়, সাধারণ ক্ষমায় হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধকে ক্ষমা করা হয়নি। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর দালাল আইন বলবৎ থাকা অবস্থায় দুই বছর এক মাসে ওই চার অপরাধের জন্য ওই আইনে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। সম্ভবত এ কারণেই জিয়াউর রহমান আইনটি বাতিল করেন।
প্রস্তাবে বলা হয়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ ও তার পরামর্শদাতারা এই জোট ভাঙার জন্য কৌশল হিসেবে যুদ্ধাপরাধী ইস্যুটি সামনে নিয়ে আসে। সংবাদপত্র, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ছাড়াও সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম গঠন করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে জামায়াতের বিরুদ্ধে একটি ‘প্রচার যুদ্ধ’ চালায়।জামায়াত বলেছে, ‘যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যারা চিহ্ণিত হয়, তাদের বিচার হয় যুদ্ধের পরই। অবশ্য কোনো তালিকাভুক্ত যুদ্ধাপরাধী পালিয়ে থাকলে যখনই সে ধরা পড়ে তখনই বিচার হয়। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব চিহ্ণিত যুদ্ধাপরাধী পালিয়েছিল, পরে যখনই তারা ধরা পড়েছে, তখনই তাদের বিচার হয়েছে। এখনও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। তারপরও জামায়াত কেন এত বড় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে−জানতে চাইলে দলের জ্যেষ্ঠ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্বামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। আজ আর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাব না।
(টীকা: বরাহ = শুয়োর)

লেখাটি CC by-nc-nd 3. এর অধীনে প্রকাশিত

:clap::clap: