আশার আলোয় ভরা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী জীবন
ফকির ইলিয়াস
==================================
বসন্তের ঘনঘটা এখন যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়ায়। শীত বিদায় নিয়েছে। আর কদিন পরই গ্রীষ্মের আগমনী। এখানকার গাছে গাছে এখন সবুজ পাতা বের হতে শুরু করেছে। শীতকালে বৃক্ষগুলো পাতাশূন্য হয়ে পড়ে। বসন্ত আসার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় সবুজের অবগাহন। নানা রঙের ফুলগুলো দেখলে মন ভরে যায়। ‘পার্ক এবং বিনোদন বিভাগের’ কর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন পুষ্প পরিচর্যায়। সমসাময়িক নানা রঙের ফুলের টব স্থাপন করা হয় পার্কের কোনায় কোনায়। বলা যায় এটাও এক ধরনের বাণিজ্য। পর্যটক, নাগরিক সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা।
গ্রীষ্ম আসার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি কমিউনিটিও জাগতে শুরু করে। এ সময়ের বড় আকর্ষণ হচ্ছে বিভিন্ন সংগঠনের ‘বনভোজন’ অনুষ্ঠান। এছাড়া ‘বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন অব নর্থ আমেরিকার’ আয়োজনে ফুটবল টুর্নামেন্টও আয়োজিত হয়। জুলাই-আগস্ট মাসের প্রায় প্রতি রোববারই চলে এ প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন টিম ইউরোপের সেরা বাঙালি ফুটবল খেলোয়াড়দেরও এ টুর্নামেন্টে আমন্ত্রণ জানায় তাদের পক্ষে খেলার জন্য। ১০-১২টি টিম প্রতি বছরই এ টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। রাষ্ট্রীয় অর্থ এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ‘সোনালী এক্সচেঞ্জ’ এ টুর্নামেন্টের গ্র্যান্ড স্পন্সর হয় প্রতি বছরই।
গেল কিছু দিন থেকে বাঙালিদের সংগঠনে একটি নতুন উদ্যোগ শুরু হয়েছে। তা হচ্ছে নিজ নিজ অঞ্চলের কৃতী ছাত্রছাত্রী, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ভালো ফল করছে, তাদের সংবর্ধনা প্রদান। নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি আমেরিকানদের এই যে সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে, যা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করছে এ প্রজন্মকে। উৎসাহ পাচ্ছে অন্যরাও। একটি কথা আমাদের মানতেই হবে, বাঙালিরা অভিবাসন গ্রহণ করে যে দেশে অবস্থান করবেন, তাদের চলতে হবে সে দেশের মূলধারার সঙ্গেই।
কিন্তু এর প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর প্ররোচনা। বড় দলগুলো ইন্ধন জুগিয়ে তাদের শাখা গঠন করেছে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। তারপর সেসব শাখা দল পরস্পর হানাহানিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এ পরবাসেও। ফলে মূলধারার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার স্বপ্নটি ব্যাহত হয়েছে নানাভাবে।
ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী বাংলাদেশ সরকার বিদেশে বাংলাদেশের রাজনীতি বন্ধের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে সাধারণ প্রবাসীদের মাঝে। সরকার বলেছে, বিদেশে যেসব রাজনৈতিক দল শাখা লালন করবে, তাদের নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন করবে না। প্রবাসী সমাজও চাইছে বিদেশ থেকে এসব শাখা রাজনীতির প্রথাটি বন্ধ হোক। শীর্ষ রাজনীতিকরা প্রবাসীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেয়ার জন্য নানাভাবে যে কোন্দল ছড়ান, এর অবসান হোক।
যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি সংগঠনগুলো চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে স্বদেশে। সম্মিলিতভাবে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার মতো বড় বড় প্রজেক্টসহ বৃত্তি প্রদান, বিভিন্ন মানবাধিকার, মানবকল্যাণমূলক সংস্থাগুলোকে সহযোগিতা প্রদানের মতো কাজও করা যেতে পারে। এদিকে স্থানীয় নেতাদের মনোযোগ কম বলাই চলে। তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত তারা চেয়ার দখলের প্রতিযোগিতায়। একটি সামাজিক সংগঠনের নির্বাচনের জন্য সদস্য ফি দিয়ে সদস্য সংগ্রহ পর্যন্ত করেন তারা। দেখা গেছে, কোনো কোনো সংগঠনের সম্মিলিত নির্বাচনী ব্যয় মিলিয়ন ডলারও অতিক্রম করে গেছে। অথচ এ অর্থ দিয়ে নিজ মাতৃভূমির কল্যাণে বড় কিছু করা সম্ভব অনায়াসে।
বিশ্বের অর্থনীতির মন্দা প্রভাব এখন পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রেও। খাদ্যদ্রব্যসহ নিয়মিত ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে ভীষণভাবে। চাঁদপুরী ইলিশ, যা আগে ৪ ডলার/পাউন্ডে বিক্রি হতো এর দম এখন ৭ ডলার প্রতি পাউন্ড। ৫০ পাউন্ড চালের বস্তা যেখানে ছিল ১৫ ডলার, তা এখন হয়েছে ২৫ ডলার। মার্চ-এপ্রিল ’০৮ মাসে এ দ্রব্যমূল্যের তীব্র ঊর্ধ্বগতি থমকে দিয়েছে বাংলাদেশি অভিবাসীদের জনজীবন। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে গ্রোসারিগুলো বেচা-বিক্রির পরিমাণ ১০ শতাংশ কমেছে ইতিমধ্যেই।
এ তীব্র মন্দা কাটিয়ে উঠতে বুশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাইলট ট্যাক্স রিবেট বিল পাস হয়েছে। যারা ২০০৭ সালের ইনকাম ট্যাক্স প্রদান করেছেন, তেমন মধ্যবিত্তরা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত রিবেট চেক পাবেন মে-জুন ’০৮ মাস নাগাদ। বুশ প্রশাসনের বক্তব্য হচ্ছে, এ অর্থ খরচ করে প্রতিটি পরিবার অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা পাবে।
একজন নাফিস আহমদের অস্কার বিজয় কিংবা একজন নোরা আলীর ‘মিস আমেরিকা জুনিয়র’ হওয়ার খ্যাতি এ অভিবাসী বাংলাদেশি সমাজেরই। সুষ্ঠু পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ প্রজন্মের অনেকেই বিদেশে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বহুজাতিক-বহুভাষিক যুক্তরাষ্ট্রে আশার হাত যেমন অবারিত, তেমনি আছে কঠিন আইনি প্রক্রিয়াও। দীর্ঘদিন থেকে, অবৈধদের সাধারণ ক্ষমা দেয়া হবে, এমনটি শোনা গেলেও এর কোনো সুরাহা এখন পর্যন্ত হয়নি। এ বছরই বিদায় নেবেন প্রেসিডেন্ট বুশ। জানুয়ারি ’০৯-তে ক্ষমতায় আসবেন নতুন প্রেসিডেন্ট। সে সময় পর্যন্ত বিষয়টি কি এভাবেই ঝুলে থাকবে, তার কোনো উত্তর নেই কারও কাছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কিছু অপরাধমূলক কাজেও জড়িয়ে পড়েছে অনেক অভিবাসী বাঙালি। ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, বড় ধরনের প্রতারণা, চুরি-ডাকাতির মতো হীন কর্মেও যোগ হয়েছে কিছু নাম। কেউ কেউ সাজাপ্রাপ্তও হয়েছে। তারপরও আশার উদীপ্ত আলো হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের অনেকেই সুশিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত হয়ে উঠছে। শেখে নিজে বাংলা সভ্যতা-সংস্কৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাংলা স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ সে সাক্ষ্যই দিয়ে যাচ্ছে।
----------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক ডেসটিনি / ৬ মে ২০০৮ মংগলবার প্রকাশিত
অফলাইন