জনগণের মনের ভাষা বুঝতে হলে
ফকির ইলিয়াস
------------------------------------
বাংলাদেশের মানুষ আরেকটি তাণ্ডবলীলা দেখলেন। কতিপয় মৌলবাদী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঢাকার বায়তুল মোকাররম পুরানা পল্টন এলাকায় প্রকাশ্যে তাদের পেশিশক্তি দেখাল। তারা পুলিশ, সাংবাদিক, নিরীহ জনতা সবার ওপরই আক্রমণ চালিয়েছে। লাঠিসোঁটা নিয়ে যেন পূর্বপ্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল। টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে এসব দৃশ্য দেখে আমার আশির দশকের কথাই মনে পড়েছে বারবার। সে সময়ও মসজিদ ছিল এসব মৌলবাদীর আস্তানা। তারা মিছিল-সমাবেশ করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করত। পুলিশ ধাওয়া করলে আবার গিয়ে ঢুকে যেত মসজিদে। পুলিশ মসজিদে যাবে না এটাই ছিল তাদের ভরসা।
একই দৃশ্য আবারও দেখল দেশবাসী। তারা মসজিদের জায়নামাজ আর কার্পেট পর্যন্ত পুড়িয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। একদিকে আক্রমণ চলছে আর অন্যদিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন। এসব জঙ্গিবাদীর নেতা মওলানা ফজলুল হক আমিনী। তিনি হুমকি দিয়েছেন তারা সরকার পতনের আন্দোলন করছেন না। তবে দরকার হলে তাও করবেন।
ভেবে অবাক হই, এরকম হুমকি-ধমকি দেয়ার পরও এখন বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী নেতারা রয়ে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরে। একই অবস্খা আমরা দেখেছি আশির দশকে। বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্রদের সংগঠিত করে একটি পক্ষ রাষ্ট্র কাঠামোর বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুতি নিয়েছে। আর এ পক্ষটিকে কৌশলে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামায়াত।
৯ এপ্রিল ২০০৮ মাসের প্রথম সপ্তাহে যে পরিকল্পিত সমাবেশ হাঙ্গামা করা হলো এর পেছনে কারা? কি তাদের উদ্দেশ্য? খুঁজলেই জবাবটি স্পষ্ট পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে হরকাতুল জিহাদ, জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গিবাদী সংগঠনের আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল ঘরে তুলেছে জামায়াত। এখনও তারা তা তুলতে তৎপর যে রয়েছে তাও আবার বোঝা গেল এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে। ইতিমধ্যেই জামায়াতের আমীর নিজামী বিবৃতি দিয়ে নারী উন্নয়ন সংশোধনের দাবি জানিয়ে মৌলবাদী সংস্খাগুলোর আন্দোলনকে সমর্থন করে, এর পেছনে যে তাদের ইন রয়েছে সেটা জাহির করেছেন।
কিন্তু কথা হচ্ছে দেশে জরুরি অবস্খা জারি থাকা অবস্খায় এরা এ সমাবেশ আহ্বান করল কীভাবে? এদের অনুমতি দেয়া হলো কীভাবে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি ইস্যু এখন খুব জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। প্রথমটি হচ্ছে দুই নেত্রীর মুক্তি। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। দুই নেত্রীর মুক্তির লক্ষ্যে দুটি প্রধান দল সরকারের সঙ্গে খণ্ড খণ্ড সংলাপও চালিয়ে যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকার ওয়ান ইলেভেনের চেতনা অনুন্নত রেখে দুই নেত্রীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে তা খুবই ষ্পষ্ট। বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের উক্তি থেকে তা মনে করাটা খুবই স্বাভাবিক। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সরকার রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জনগণের দাবির শক্তি বহির্বিশ্বের মিত্র দেশগুলোর চাপ এ দুটি দিক সামনে রেখে এগুচ্ছে।
ঠিক এমনি একটি সময়ে সেই পুরনো জঙ্গি মদদদাতা গোষ্ঠীটি সক্রিয় হয়ে ওঠার কারণ কি? কারণ হচ্ছে জনরোষকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলা। অবাক হওয়ার মতো কথা হচ্ছে ১১ এপ্রিলের এ জঙ্গি আক্রমণের নেপথ্য মদদদাতাদের বিরুদ্ধে সরকার এখন পর্যন্ত কঠিন কোন ব্যবস্খা নেয়নি। কেন নেয়নি বা নিচ্ছে না তা থেকে যাচ্ছে রহস্যাবৃত।
সংলাপের কার্যক্রমের আওতায় জামায়াতের সঙ্গেও সরকার বৈঠক করেছে। পার্থক্য হচ্ছে এই আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির দুই সভানেত্রীকে জেলে রেখে সরকার দল দুটির সঙ্গে বৈঠকে বসলেও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মুক্ত রেখেই সরকার চালাচ্ছে সংলাপ। যদিও জামায়াতের দুই বড় নেতা (যারা জোট সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন) তাদের মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির অনেক ফিরিস্তি পত্রপত্রিকায় বেরিয়েছে।
এসব বিষয় চোখে পড়ছে বলেই মানুষ ক্রমশ বিশ্বাস হারাচ্ছে বর্তমান সরকারের ওপর থেকে। আর সরকারও আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বাধা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে বাধা দিয়ে বিভিন্নভাবে বিতর্কে জড়াচ্ছে। অন্যদিকে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির হোতারা প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে সরকারের প্রতি।
পয়লা বৈশাখ থেকে ভারত-বাংলাদেশ ট্রেন সার্ভিস চালু হয়েছে। সেই ট্রেন লাইনের পাশে বোমা পুঁতে রাখা হয়েছে তেমন সংবাদও আমরা পত্রিকায় দেখছি। এরা কারা? কি তাদের উদ্দেশ্য? এই ‘মৈত্রী’ এক্সপ্রেস চালু হওয়ার ঐতিহাসিক উদ্যোগে অনেকেই খুশি হতে পারেনি। কেন পারেনি তা বর্তমান সরকারকে ভেবে দেখতে হবে।
সরকারি বরাদ্দকৃত চাল পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী। তিনি দেশের কৃষিমন্ত্রী ছিলেন। অত্যন্ত মানবদরদী এই নেত্রী চাল পেতে সরকারি লাইনে দাঁড়িয়ে আবারও প্রমাণ করতে চেয়েছেন দেশের জনগণ কত অসহায়। না, বেশ কয়েক স্খানে লাইনে দাঁড়িয়েও চাল পাননি মতিয়া চৌধুরী। ওয়ান ইলেভেনের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত সরকারের আমলে তো এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। তাহলে হচ্ছে কেন?
জনগণের মনের ভাষা পড়তে হলে জনতার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে গ্রামে-গ্রামান্তরে। জনগণের মনের আকুতি বুঝতে হলে সফর করতে হবে প্রত্যন্ত অঞ্চল। তা না হলে জনপ্রত্যাশা পূরণ করা যাবে না। বাংলাদেশের মানুষ সম্প্রীতিপূর্ণ ভবিষ্যৎ চান। সৌহার্দ্যপূর্ণ শান্তির গণতন্ত্র চান।
এবারের বাংলা নববর্ষ পালনে দেশজুড়ে যে প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেছে তা সেটাই প্রমাণ করে। বৈশাখী ঝড়ের মতোই উথলে উঠতে পারে বাঙালি জাতি। অতীতে বারবার তেমনটি হয়েছে। আবারও বলি, সম্প্রদায়িক দানব শক্তির টুঁটি চেপে ধরে শান্তি প্রতিষ্ঠার এটাই সময়। যারা বাংলা সংস্কৃতি, সভ্যতা মানে না তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল নয়। তাদের অতীত আচরণ ভুলে গেলে চলবে না।
নিউইয়র্ক, ১৬ এপ্রিল ২০০৮
------------------------------------
দৈনিক সংবাদ। ১৮এপ্রিল ২০০৮ শুক্রবার প্রকাশিত
অফলাইন
নামাজ পড়তে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগে। আপনি আজকের নামাজ পড়েছেন কি???জনগন বলতে আমি আপনি সবাই।
আপনি কি আমার মনের কথা বোঝেন?
আসলে যারা পত্রিকাতে রিপোর্ট লেখে তারা অনেক কিছুই নিজের মন গড়া লিখে থাকে।
সত্য মিথ্য মিশ্রিত।
আপনি এখানে অনেক কিছু লিখেছেন। যার অনেক কিছু আমি সমর্থন করি। কারণ ইসলাম জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসকে সমর্থন করে না।
আরেকটি কথা, আপনি যে ধর্মেরই হোন না কেন, নিজ ধর্ম সঠিক ভাবে পালন করুন আর নাই করুন, অন্যকে আঘাত দিতে পারেন না।
সমস্যাটা এখানেই শেষ নয়।
অফলাইন