টাঙ্গাইল শহরের পাগল করা ভিড় ফেলে অনেক দূরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ব্যতিক্রমী শিক্ষায়তন ভারতেশ্বরী হোমস যেন এক টুকরো হারানো পৃথিবী। নিরিবিলি পরিবেশে জ্ঞানচর্চা আর সমৃদ্ধ মানুষ গড়ার এক নিরন্তর সাধনা চলছে এখানে। প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীরা ভুলতে পারেন না এখানকার স্বর্নোজ্জল স্মৃতিগুলো। হোমসের দরজায় এসে দাঁড়ানোর পর আমার সফরসঙ্গী হোমসের সাবেক ছাত্রী মাহমুদা সাঈদ খুকুর মুখ দেখে সেটাই মনে হচ্ছিল। গার্ডরুম থেকে বেরিয়ে বিনয়ের সাথে নমস্কার করলেন নিবারণ চন্দ্র মণ্ডল। হোমসের দীর্ঘদিনের এক পুরনো কর্মী তিনি। পাশ থেকে খুকু আস্তে করে বললেন, দারোয়ান নিবারণের বয়স এখন ৮০। খুকু যখন ছাত্রী ছিলেন, তখনও নিবারণকে দেখেছেন তিনি।
ফটকেই হোমসের কর্মীরা আমাদের স্বাগত জানালো। তাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম খোলা মাঠে। সবুজ মাঠ ঘিরে কংক্রিটের রাস্তা, তারপর ক্লাশরুম, অফিস ঘর। প্রতিদিন ভোরে এই পথ মুখরিত হয় এক হাজার ছাত্রীর কুচকাওয়াজে। এদের মধ্যে ৬৭ জন পড়ছে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে। আর তাদের তত্ত্বাবধায়নের কাজটি করেন ৬৮ জন শিক্ষক যাদের মধ্যে পুরুষ মাত্র ৮ জন!
১৯৪৪ সালে ঢাকা থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে মির্জাপুরে ভারতেশ্বরী হোমস প্রতিষ্ঠা করেন টাঙ্গাইলের তখনকার জমিদার 'দানবীর' হিসেবে খ্যাত রণদা প্রসাদ সাহা। নারীকে নিজের ভাগ্য গড়ার অধিকার দেওয়ার স্বপ্ন থেকে তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। হোমসের নাম রাখেন প্রপিতামহী ভারতেশ্বরী দেবীর নামে।
ভারতেশ্বরী হোমসের নাম শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার জন্য সুবিদিত। তবে এটুকুই শেষ নয়। হোমসের উপাধ্যক্ষ উলফাতুন্নেসা বলেন, "শৃঙ্খলার পাশাপাশি পারস্পরিক সহনশীলতা ও ত্যাগের মানসিকতা তৈরিরও তালিম দেওয়া হয় এখানে। হোমসের প্রাত্যহিক জীবনে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী কিংবা সামাজিক অবস্থান কোনো বিষয় নয়। এখানে সবাই সমান।"
দুপুরের খাবারের সময় হোমসের ছাত্রী সাওরিন স্মৃতিকে (১৫) একটি ঘণ্টা বাজাতে দেখা গেল। ঘন্টা বাজতেই সারিবদ্ধভাবে খাবার ঘরে প্রবেশ করল মেয়েরা। হাসিমুখে সাওরিন জানালো, এটা দুপুরের খাবারের ঘণ্টা। ঘণ্টা শুনেই মেয়েরা ডাইনিং হলে খেতে আসে।
মেয়েদের সঙ্গে আমরাও প্রবেশ করলাম ডাইনিং হলে। বিশাল এই খাবার ঘরে ২০০ মানুষ একসঙ্গে বসে খেতে পারে।
হোমসে ছাত্রীরাই সব কাজ করে। যে কোনো কাজে বিভিন্ন শ্রেণী থেকে ৩০ জন ছাত্রীর একটি দল তৈরি করা হয়। প্রয়োজনে দলের সদস্যরা ক্লাশ বাদ রেখে সেই কাজ করে।
মজার বিষয় হচ্ছে , একটু আধটু ক্লাশ ফাঁকি দিলে এখানে 'অনুপস্থিত' গণ্য করা হয় না। এটা অনেক দিনের প্রথা। ছাত্রীরা পরে বাদ পড়া ক্লাশের পড়া তৈরি করে নেয়। তারা পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুতি নিয়ে রাখে আগে থেকেই।
১৯৬৯ সালে এখান থেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন লিলিয়ান জিন্নাত। তিনি জানালেন, তাদের সময়ও এভাবেই চলতো হোমসের সব কাজ। তখনকার মতো এখনো ছাত্রীরা ভোর পাঁচটায় দিন শুরু করে আর ঘুমাতে যায় রাত সাড়ে ১০টায়। প্রতিটা দিনই তাদের চলে রুটিন মেনে। হোমসের এই শৃঙ্খলা নিয়ে ছাত্রী শিক্ষক অভিভাবক সবাই খুব গর্বিত।
উপাধ্যক্ষ উলফাতুন্নেসা বললেন,"আর সবকিছুর চেয়ে শৃঙ্খলার গুরুত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। তবে শৃঙ্খলাই সব নয়। আমি মেয়েদের সঙ্গে থাকতে পেরে খুবই আনন্দিত।"
উলফাতুন্নেসা নিজেও ভারতেশ্বরী হোমসের ছাত্রী ছিলেন এক সময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করার পর আবার এখানেই কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
হোমসের শিক্ষক হেনা সুলতানা ২০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন এখানে। তিনি বলেন, "আমার জন্য এটা একটা স্বপ্নের জায়গা। এখানে কোনো ধরণের সংস্কার কাজ করে না।"
হেনা তার আত্মজীবনীতে হোমসের প্রতিষ্ঠাতা রণদা প্রসাদ সাহা সম্পর্কে লিখেছেন- 'তিনি এমন একজন মানুষ যিনি অতীতের ধূসর সময় থেকে একটি গোলাপ তুলে এনে বর্তমান সময়ে তার সৌরভকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি সূর্যের দিক থেকে হেঁটে এসেছেন তার ছায়াকে পেছনে ফেলে। রণদা প্রসাদ সাহা একজন কালোত্তীর্ণ মানুষ।'
এখনও লেখেন কী-না জানতে চাইলে সুলতানা বলেন, "লিখি, কবিতা লিখি। ব্যক্তিগত কবিতা।"
সন্ধ্যা সমাগত। চারপাশ নীরব। আজ (বৃহস্পতিবার) সপ্তমী। ছাত্রীদের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। হোমসের মন্দিরে দুর্গা পূজা উদযাপনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে তারা। আশপাশের এলাকার পূজা দেখতে আমরা বের হলাম। সহকর্মী চিত্রগ্রাহক কামরুজ্জামান ও আমি লৌহজং নদীর পাড়ে পুণ্যার্থীদের দলে মিশে গেলাম। তখন সেখানে পূজার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ চলছিল।
বৃহস্পতিবার রাত ৮টা। ঢাকায় ফিরে আসছি। আমাদের মনে তখনও ভারতেশ্বরী হোমসের অতীত গৌরবের সুবাস।
ফেরার পথে গাড়িতে মাহমুদা স্মরণ করলেন ১৯৭১ সালের ভয়াবহতার কথা। আর পি সাহা ও তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহাকে একাত্তরের ৭ মে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে।
সেইসব দিনের স্মৃতি জানাতে গিয়ে মাহমুদা বলেন, ভবানীর বিয়ের স্মৃতি আমার মনে এখনও জীবন্ত। হোমসের ভেতরে তার বিয়ের আয়োজন হয়েছিল। ভবানী একটি ঘোড়ায় চড়ে পুকুরের পাড়ে অতিথিদের সঙ্গে দেখা করছিল।
পরে আর পি সাহার দান করা সম্পদ দিয়েই কুমুদিনী কল্যাণ ট্রাস্ট গঠিত হয়। তার মৃত্যুর পর মেয়ে জয়া পতি ট্রাস্টের দায়িত্ব নেন। ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এখন আর পি সাহার নাতি, ৩৯ বছরের রাজীব প্রসাদ সাহা।
রাজীব বলেন, "আর পি সাহা'র নাতি হিসেবে আমি গর্ব বোধ করি। এই ট্রাস্টের দায়িত্ব পেয়েও আমি গর্বিত। কোনো কিছুর বিনিময়েই এই ট্রাস্ট ছাড়ার কথা ভাবতে পারি না।"
সূত্রঃ বিডিনিউস২৪

অফলাইন