টপিকঃ হারিয়ে যাচ্ছে বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রের ঐতিহ্য
হারিয়ে যাচ্ছে বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র চৌমুহনীর বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র চৌমুহনী। নোয়াখালী খাল, ছাতার পাইয়া খাল, ফেনী খাল ও পৌরন বিবি খালের মোহনায় এ বাণিজ্য কেন্দ্রটি গড়ে ওঠে শতাধিক বছর আগে। চার খালের মোহনায় অবস্থান বলে নামকরণ করা হয় চৌমুহনী। নৌযানই ছিলো এখানকার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। বৃটিশদের শাসনামলে এখানকার ব্যবসায়ীদের বেশীর ভাগই ছিলো হিন্দু সমপ্রদায়ের। মাড়ওয়াড়ীদের ব্যবসায়ীক কর্মকান্ডও এখানে ব্যাপতি ছিলো। হাতেগোনা ক'জন ছিলো মুসলমান ব্যবসায়ী। পাক ভারত ভাগাভাগির পর প্রভাবশালী হিন্দু ব্যবসায়ীরা ক্রমান্বয়ে ভারতে চলে যেতে থাকে। এধারা বর্তমানেও অব্যাহত আছে। এদের কেউ কেউ রাতের আঁধারে পালিয়ে আবার কেউ সর্বস্ব বিক্রি করে ভারতে পাড়ি জমায়।
সরিষার তেল, প্রকাশনা শিল্প, সুপারী, ধান, মরিচ, বাদাম ও নারিকেলের ব্যবসার জন্য চৌমুহনী প্রসিদ্ধ ছিলো। কলিকাতা থেকে নৌ পথে বড় বড় সওদাগরী নৌকায় এখানে আসতো বিভিন্ন পণ্য। আর নৌকা বোঝাই পাট যেতো কলকাতায়। ভৈরব, আশুগঞ্জ ও চাঁদপুরের সঙ্গে প্রতিনিয়ত নদী পথে বাণিজ্য চলত। ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের গদিতে সন্ধ্যার পর পাইকারদের লম্বা লাইন পড়ে থাকতো। এক সময় চৌমুহনীতে পাটের ব্যবসা ছিলো জমজমাট। পাট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চৌমুহনীতে গড়ে ওঠে ডেল্টা জুট মিল। আমিন জুট মিল ও আদমজী জুট মিলের পাট ক্রয় কেন্দ্র ছিলো চৌমুহনীতে। ব্যক্তি মালিকানায় এখানে গড়ে ওঠে পাটের বেল মেশিন। আড়ৎদাররা তাদের পাট বেল করে তা মিলে সরবরাহ করত। সরিষার তৈলের জন্যও চৌমুহনী প্রসিদ্ধ ছিলো। স্বাধীনতা পূর্ব কালেই এখানে ৩২টি তেলের মিল ছিলো। গোটা পাকিস্তানে কোথাও এত তেলের মিল ছিলো না। এখানকার উৎপাদিত তেল ভোলা, বরিশাল, চাঁদপুর, ভৈরব, নরসিংদি, সিলেট, শ্রীমঙ্গলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হতো। স্বাধীনতা পূর্বকাল থেকে বর্তমান সময়েও প্রকাশনা শিল্পের জন্য চৌমুহনী বিখ্যাত। চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরে পুঁথিঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়েছিলো। পরবর্তীতে বই প্রকাশনী, পপুলার লাইব্রেরী, রেখা প্রকাশনী, মিনার প্রকাশনী, আজিজিয়া লাইব্রেরীসহ অনেক প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিঘরের মাধ্যমে শুরু হওয়া যাত্রাকে সমৃদ্ধ করে ।
এক সময় কুমিল্ল্লার দক্ষিণাঞ্চল ও বৃহত্তর নোয়াখালীর ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখরিত ছিলো চৌমুহনী। এখন ব্যবসায়ীরা গদির পরিবর্তে উড ফার্নিচার ব্যবহার করে। ভুড়িওয়ালা বাবু, মিয়াদের এখন আর দেখা যায় না। দোকানে আর ফড়িয়াদের লম্বা লাইন পড়ে থাকে না। স্বাধীনতা উত্তর কালে পর্যায়ক্রমে গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাজারগুলো সমপ্রসারন এবং সেখানকার ব্যবসায়ীদের ঢাকা চট্টগ্রামের সাথে সরাসরি ব্যবসা, চৌমুহনীর শ্রমিকদের সঙ্গে স্থানীয় এবং বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যবসায়ী ও পণ্য পরিবহনকারীদের মতবিরোধ, দখলদারদের কবলে পড়ে খালগুলো নালায় পরিণত হওয়ার পাশাপাশি সবগুলো নৌকাঘাট দখল হয়ে যাওয়ায় নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
এছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, দেশি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের চাহিদা হ্রাস, সরিষার তেলের পরিবর্তে সয়াবিন তেলের ব্যবহার, অবৈধভাবে অন অনুমোদিত নোট বই ছাপা, নকল বইয়ের জমজমাট ব্যবসা, হলুদ মরিচ থেকে শুরু করে ভেজাল রান্ন্না উপকরণের ব্যবসা, ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এজেন্টের মাধ্যমে এতদাঞ্চলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিকট একই মূল্যে পণ্য সরবরাহ, শ্রমিক অসন্তোষ প্রভৃতি কারণে ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি পুলিশকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে ব্যাপকহারে উৎপাদিত হচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত পরিবেশ বিনাশী পলিথিন। মাদকের ব্যবসা কখনও কমে আর বাড়ে কিন্তু বন্ধ হয়না।
- সূত্র: সাইফুল্যাহ কামরুল http://www.noakhaliweb.com.bd/reveal/reveal.php#

