কালো ব্যাজ ধারণ করতে পারি?ছোটবেলাতে ছন্দময় ছড়াগুলো পড়তে দারুন লাগতো। কবিতাগুলোতেও থাকতো ছন্দের ছড়াছড়ি। কিন্তু ইদানিং কঠিন ভাবওয়ালা কবিতাগুলো আর কাছে টানে না। আমর মনে হয়, এরকম সিরিয়াস বিষয়ে মন টানাতে হলে তো কিছু চটুল বিজ্ঞাপনের মত ছন্দের আকর্ষণ থাকতে হবে। না হলে কবিতা হারাবে বেশ কিছু পাঠক।
যা হোক, মাঝে মাঝেই বিভিন্ন জায়গায় ছড়াকারদের যে কোন বিষয়ে মজার মজার ছন্দের উপস্থাপনা দেখে মুগ্ধ হই ... আর ভাবি, এই রকম একটা বিষয়ে এমন ছন্দ আসলো কীভাবে। ইদানিং দেখি প্রজন্ম ফোরাম বা সচলায়তন ব্লগেও ছান্দসিক ছড়াকারের ছড়াছড়ি। দেখে মনে কোনে একটু ইচ্ছা জাগে ... ইশ্ আমিও যদি পারতাম অমন ছন্দ মিলাতে। তারপর হঠাৎ ....দেখি আমার কীবোর্ড থেকেও ছন্দময় লেখা বের হচ্ছে। আমি নিজেই তাজ্জব! যা হোক, ওগুলো কী ছাইপাশ বের হয় তা জানিনা, তবে একদিন প্রজন্ম ফোরামের এডমিন ঘোষনা করল যে ছড়িয়াল ভাইরাসে লোকজন আশংকাজনকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। বুঝলাম ... তাহলে আমার সেই লেখাগুলোও ওনার কাছে ছড়ার মত মনে হয়।
একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যে, ছন্দ লিখতে বসেই কিছু কথা/শব্দ উল্টাপাল্টা করতে হয়, কিছু প্রতিশব্দ ব্যবহার করতে হয়। তাই ভাবলাম ফর্মূলাটা লিখে ফেলি, ভবিষ্যতে কখনো যদি আবার ছন্দাঘাত করতে ইচ্ছা হয় আর, সে সময় বেরসিকের মত ছন্দের কোষ্ঠকাঠিন্য ঘটে তবে এই ফর্মূলার জোলাপটা খেয়ে নেব। কীভাবে ছন্দ লিখি সেটাই এই লেখায় খুঁজে পেতে চেষ্টা করবো বলে ভাবছি।
অন্ত্যমিল
প্রথম যে জিনিষটা জরুরী সেটা হল অন্ত্যমিল। এবং অন্ত্যমিলগুলোর পার্থক্য সমান হতে হলে ভাল হয়। অর্থাৎ প্রতি লাইনে বা প্রতি দুই/তিন/চার লাইনে। যেমন:
সবাই শুধু মিল খোঁজে ছড়ার এই ভবে
মিল করতেই হবে যে তা কে বলেছে কবে?
মিলের কথা যদি বলো মনে পড়ে যায়,
Meal charge ছিল বেশি Hall-এ থাকার সময়।
প্রথম দিকে শুধু এই ব্যাপারটাই লক্ষ্য রেখে ছড়া লিখতাম (লেখার মকশো করতাম)। কিন্তু ওতে কেমন জানি অপূর্ণতা রয়ে যেত ছন্দের মধ্যে।
ধ্বনিমাত্রা
দারুন ছন্দ হবে যদি প্রতিটা অন্ত্যমিলের মাঝের মোট শব্দাংশের সংখ্যা সমান হয়। ভাষাতত্ত্বে আমি বিশেষ দক্ষ নই। তাই একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা সহজে বোঝার চেষ্টা করি:
ধ্বনির কথা যদি তুমি একটু বুঝতে চাও,
ধ্বনিতত্ত্বের জোলাপটা মাথায় পুরে নাও।
প্রথম লাইনে: ধ্ব-নির্ ক-থা য-দি তু-মি এক্-টু বুঝ্-তে চাও = মোট ১৩টা ভিন্নরকম শব্দাংশ রয়েছে।
দ্বিতীয় লাইনে: ধ্ব-নি-তত্-ত্বের জো-লাপ্-টা মা-থায়্ পু-রে নাও = মোট ১২টা ভিন্নরকম শব্দাংশ রয়েছে।
এখানে শব্দাংশের সংখ্যা বাড়িয়ে ছন্দ ভাল মেলার জন্য আমি দ্বিতীয় লাইনে একটা শব্দ পাল্টিয়ে দেব। জোলাপ এর বদলে ফর্মুলা লিখব। জো-লাপ্ = ২টি শব্দাংশ; আর, ফর্-মু-লা = ৩টি শব্দাংশ। দেখি কেমন শোনায় ...
ধ্বনির কথা যদি তুমি একটু বুঝতে চাও,
ধ্বনিতত্ত্বের ফর্মুলাটা মাথায় পুরে নাও।
উপরের হিসাবটা সম্ভবত পুরাপুরি ঠিক নয়। কারণ শব্দাংশ কোনটা একটু বড় কোনটা একটু ছোট আছে। কাজেই আরও ভাল হয় যদি শব্দাংশকে উচ্চারণে প্রয়োজনীয় সময় অনুযায়ী একটা মাণ দেয়া যায়।
সুতরাং অন্ত্যমিল মেলানোয় লাইন সংখ্যার চেয়ে শব্দাংশের সংখ্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সঠিক ভাব ফুটানোর জন্য লাইনের মাঝে বা শেষে যতিচিহ্ন ব্যবহার করতে হয়। ওগুলোতে দেয়া বিরতিটুকুও এভাবে হিসাবের মধ্যে ঢুকিয়ে তারপর সেই অনুযায়ী লিখলে ছড়াটা পড়ার সময় দারুন ছান্দসিক মনে হবে।
উচ্চারণের মাত্রা
অন্ততপক্ষে অন্ত্যমিলের শব্দটির ক্ষেত্রে উচ্চারণের মাত্রা একরকম হলে ভাল শোনায়।বল = খেলার বল হলে উচ্চারণটা হল বল্ এর মত .. অর্থাৎ ল-টার উপরে জোর কম, ব-টাই বেশি শোনা যায়। কিন্তু যদি, বল = কথা বলো এর মত হলে উচ্চারণে ল-টা বেশি প্রাধান্য পায় এবং কানে বাজে।
অন্ত্যমিল দেয়ার সময় শ্রুতিমাধুর্যের জন্য এই উচ্চারণের মিল/অমিলের ব্যাপারটাই খেয়াল করা জরুরী বলে মনে হয়। ঝড়-এর সাথে বড় অন্ত্যমিল করতে চাইলে এই ধরণের গ্যাঞ্জাম লাগবে ... যেমন:
ইদানিং মাঝে মাঝে রাতে আসে ঝড়
ভিজতে নাই মানা হয়েছি যে বড়।
কারণ ঝড়-এ 'ঝ'-টা উচ্চারণের কেন্দ্রে, 'ড়' টা কম উচ্চারিত। অপরদিকে 'বড়' তে 'ড়'-টাই উচ্চারণে প্রাধান্য পায়। তাই অন্ত্যমিলটা ভাল হয় না। কিন্তু যদি এমন হয়,
ইদানিং মাঝে মাঝে রাতে আসে ঝড়
ভিজতে করে মানা বিয়ে করার পর।
যা বলতে চাচ্ছি বুঝাতে পারলাম কি? নিজের জোলাপ হিসেবে কাজ চলবে মনে হয় .... ...
অফলাইন
অফলাইন
কালো ব্যাজ ধারণ করতে পারি?আগে পড়িনি ... দারুন একটা লিংক দিয়েছেন। এজন্য আপনাকে উত্তম জাঝা।
অফলাইন
কালো ব্যাজ ধারণ করতে পারি?নিজের জন্যই সংগ্রহে রাখলাম:
লিংকের জন্য আলমগীর ভাইকে অশেষ ধন্যবাদ।
সচলায়তনে শেখ জলিল লিখেছেন:
কবিতার প্রাথমিক ছন্দ/ শেখ জলিল
প্রথমেই বলতে হয় আমি ছন্দ বিশারদ নই কিংবা বাংলার ছাত্রও ছিলাম না। কবিতা লিখতে গিয়ে যতটুকু শিখেছি, তার বেশি জানি না। হাতের কাছে তেমন বইও নেই যা পড়েছিলাম আগে। সেই যে মাহবুবুল আলম-এর বাংলা ছন্দের রূপরেখা, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের-এর আধুনিক কবিতার ছন্দ কিংবা কবি আব্দুল কাদির-এর ছন্দ সমীক্ষণ কোনো বই-ই নেই এখন আমার কাছে। তাই ভুল হলে প্রথমেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
কবিতার প্রাথমিক ছন্দ মূলত তিনটি- স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত। আবহমানকাল ধরে এই তিন ছন্দেই ছড়া, কবিতা, গান বা গীতিনাট্য লেখা হয়ে আসছে। ছন্দ বুঝতে হলে সিলেবল বা ধ্বনির সাথে আগে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলা ধ্বনিকে মোটা ভাবে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় ।
১. একক ধ্বনি :
যে ধ্বনিতে শুধু একটি মাত্র একক স্বরধ্বনি থাকে । ব্যঞ্জনধ্বনি থাকতে পারে তবে তা শেষে থাকে না । স্বরান্তধ্বনি নানাবিধ হতে পারে :
১.১ যেকোনোএকক স্বরবর্ণ। যেমন: অ , আ , ই , ঈ , উ , ঊ , ও , এ
১.২ ব্যঞ্জনবর্ণ + একক স্বরবণ ।
যেমন: থ (থ্ + অ) , চ (চ্ +অ) , কি (ক্ + ই) , কে (ক্ + এ) , ছি (ছ্ + ই) , সু (স্ + উ) ,
১.২ ব্যঞ্জনবর্ণ + ব্যঞ্জনবর্ণ + একক স্বরবণ ।
যেমন : ক্ষ (ক্ + ষ্ + অ ) , হ্মী(হ্ + ম্ + , ব্লু (ব্ + ল্ + উ , প্রী (প্ + র্ + ঈ)
১.৪ ব্যঞ্জনবর্ণ + ব্যঞ্জনবর্ণ + ব্যঞ্জনবর্ণ + একক স্বরবর্ণ । যেমন: স্ক্রু (স্ + ক্ + র্ + উ) , ন্দ্র (ন্ + দ্ + র্ + অ)
২. যুগ্মধ্বনি :
যে ধ্বনিতে যুগ্ম স্বর এককভাবে বা ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় থাকে । যুগ্মধ্বনিও নানারকমের হতে পারে ।
২.১ যুগ্ম স্বরধ্বনি । যেমন : ঔ (ও + উ) , ঐ (ও + ই)
২.২ ব্যঞ্জনবর্ণ + যুগ্ম স্বরধ্বনি । যেমন : বৌ (ব্ + ও + উ) , সৈ (স্ + ও + ই)
২.৩ ব্যঞ্জনবর্ণ + ব্যঞ্জনবর্ণ + যুগ্ম স্বরধ্বনি । প্রৌ (প্ + র্ + ও + উ )
৩. হসন্তধ্বনি : যে ধ্বনির শেষে হল চিহ্ন বা হসন্ত চিহ্ন থাকে । এই ধ্বনি উচ্চারনগতভাবে দীর্ঘও গঠনগতভাবে জটিল হয় । একক স্বরধ্বনি , যুগ্ম স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি - সবকিছুই থাকতে পারে । তবে শর্ত একটাই , শেষে হসন্ত( ্ ) ধ্বনি থাকতে হবে ।
যেমন: কাক (ক্ + আ + ক্) , টাক (ট্ + আ + ক্ ), প্রাক্ (প্ + র্ + আ + ক্ ), ক্রৌন্ (ক্ + র্ + ও + উ + ন্ ), স্ত্রৈন্ (স্ + ত্ + র্ + ও + ই + ন্ )
স্বরবৃত্ত : একক , যুগ্ম ও হসন্ত এই তিনটি ধ্বনিই এক (১) মাত্রা ।
মাত্রাবৃত্ত : একক ধ্বনি এক (১) মাত্রা । যুগ্ম ও হসন্ত ধ্বনি সবসময়েই দুই (২) মাত্রা ।
অক্ষরবৃত্ত : একক ধ্বনি সবসময়েই এক (১) মাত্রা । যুগ্ম ও হসন্ত ধ্বনি শব্দের শুরুতে বা মধ্যে বসলে এক (১) মাত্রা আর শব্দের শেষে বসলে দুই (২) মাত্রা ।
স্বরবৃত্ত বা লৌকিক ছন্দ এসেছে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। এই ছন্দ নাকি মানুষের ভেতর আপনাআপনি খেলে। তাইতো খনার বচন, আদি ছড়া এই ছন্দে সমৃদ্ধ। শ্বাসাঘাত বা একবারে উচ্চারিত অংশই এর একক মাত্রা। একটি ছড়ার লাইন দিয়ে একে বোঝানো যেতে পারে-
আয় ছেলেরা/ আয় মেয়েরা/ ফুল তুলিতে/ যাই
১+৩/১+৩/১+৩/১
ফুলের মালা/ গলায় দিয়ে/ মামার বাড়ি/ যাই
২+২/২+২/২+২/১
এখানে শ্বাসাঘাত বা একবারে যাতোটুকু উচ্চারিত হয়েছে তাতোটুকুকে একমাত্রা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাস দাঁড়িয়েছে এমন-
৪/৪/৪/১
৪/৪/৪/১
অথবা আর একটি ছড়া-
ঐ দেখা যায় তাল গাছ
১+২+১/১+২ (ব্যতিক্রম-এখানে গাছ-কে ২ মাত্রা ধরা হয়েছে)
ঐ আমাদের গাঁ
১+৩/১
ঐ খানেতে বাস করে
১+৩/১+২
কানা বগীর ছা
২+২/১
অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাস দাঁড়িয়েছে এমন-
৪/৩, ৪/১, ৪/৩, ৪/১......এভাবেই চলে আসছে কবিতায় স্বরবৃত্ত ছন্দের খেলা।
এবার আসি মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কথায়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতাগুলো একটু টেনে টেনে পড়লেই ছন্দটা কানে বাজে বেশি। যারা গান করেন তাদের বুঝতে সুবিধা হবে- স্বরবৃত্ত যদি চলে কাহারবা বা ঝুমুর তালে তবে মাত্রাবৃত্ত চলবে দাদরা বা তেওড়া তালে। বেশ আগে থেকেই কবিরা এ ছন্দে কবিতা লিখে আসছেন। আধুনিক অনেক ছড়াকাররাও এ ছন্দ নিয়ে বেশ খেলছেন।
সন্ধি বিচ্ছেদে যেমন শব্দকে ভাঙতে হয়, তেমনি এ ছন্দেও শব্দকে ভেঙ্গে মাত্রার একক নির্ণয় করতে হয়। যারা স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনি বোঝেন তাদের জন্য এ ছন্দ বুঝতে সুবিধা হবে। যেমন- সন্ধান=সন্+ধান=২+২=৪ মাত্রা, অভিধান=অ+ভি+ধান=১+১+২=৪ মাত্রা বা মৃত্যু=মৃত্+তু=২+১=৩ মাত্রা, শৈত্য=শৈত্+ত=২+১=৩ মাত্রা অথবা ল=লক্+খ=২+১=৩ মাত্রা,
আব= আ+বক্+খ=১+২+১=৪ মাত্রা বা কবিতা=ক+বি+তা=১+১+১=৩ মাত্রা, সুচরিতা=সু+চ+রি+তা=১+১+১+১=৪ মাত্রা। অর্থাৎ সংযুক্ত বর্ণের সংযোগ অংশের একবারে উচ্চারিত অংশ বা ধ্বনিকে সব সময় ২ মাত্রা ধরা হয়। যেমন একটি কবিতায়-
এইখানে-- তোর/ দাদীর --কবর
২+১+১--২/ ১+২--১+২=৬+৬
ডালিম --গাছের/ তলে
১+২--১+২/ ১+১=৬+২
তিরিশ বছর/ ভিজায়ে-- রেখেছি
১+২--১+২/ ১+১+১--১+১+১=৬+৬
দুই --নয়নের/ জলে
২--১+১+২/ ১+১=৬+২
অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাসটা এ রকম--৬+৬, ৬+২, ৬+৬, ৬+২।
অথবা আর একটি কবিতায়-
আমাদের/ ছোট নদী/ চলে বাঁকে/ বাঁকে
১+১+২/১+১--১+১/১+১--১+১/১+১=৪+৪+৪+২
বৈশাখ/ মাসে তার/ হাঁটু জল/ থাকে
২+২/১+১--২/১+১--২/১+১=৪+৪+৪+২
অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাসটা এ রকম--৪+৪+৪+২, ৪+৪+৪+২।
ছন্দের যাদুকর নামে খ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কেমন করে স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত নিয়ে খেলেছেন, এমনকি একই কবিতায় দুই ছন্দের ব্যবহারও করেছেন- সে গল্প পরের লেখায় বলার ইচ্ছে রইলো।
আমাদের তৃতীয় প্রাথমিক ছন্দ হলো অক্ষরবৃত্ত। এই অক্ষরবৃত্ত ছন্দ নিয়ে আধুনিক কবিরা সবচেয়ে বেশি খেলায় মেতেছেন আজকাল। পয়ার থেকে চতুর্দশপদী, অমিত্রাক্ষর, মুক্তক, গদ্যছন্দ কতভাবেই না এই ছন্দ ভাঙছেন তাঁরা কবিতায়- তার ইয়ত্তা নেই। তবে বোঝার দিক দিয়ে এই ছন্দ সবচেয়ে সোজা। শুধুমাত্র অক্ষর গুণে গুণে এই ছন্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। একক অক্ষর বা সংযুক্ত অক্ষরকে ১ মাত্রা ধরা হয়। তবে কখনো কখনো সংযুক্ত অক্ষরকে ২ মাত্রাও ধরা হয়। সেটা নির্ভর করবে কবির লেখার বানান-রীতির উপর। আরও একটি সহজ নিয়ম হলো হসন্ত বর্ণ স্বরবৃত্তে ১ মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে ২ মাত্রা, অক্ষরবৃত্তে শব্দের প্রথমে বা মাঝখানে ১ মাত্রা কিন্তু শেষে ২ মাত্রা হবে। এবার আসা যাক ছন্দ বিশ্লেষণে। পয়ার চর্চার যুগে পুঁথি সাহিত্যের একটি কবিতায়-
১.
লাখে লাখে সৈন্য মরে/ কাতারে কাতার
২+২+২+২/ ৩+৩
শুমার করিয়া দেখে/ চল্লিশ হাজার
৩+৩+২/ ৩+৩ অথবা
২.
ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ/ হাঁটিয়া চলিল
৩+৩+২/ ৩+৩
কিছুদূর গিয়া মর্দ/ রওনা হইল
৪+২+২/ ৩+৩
অর্থাৎ ছন্দবিন্যাসটা এ রকম-
প্রথমটির ৮/৬, ৮/৬ এবং দ্বিতীয়টিরও ৮/৬, ৮/৬
কিংবা মুক্তক ছন্দে রচিত জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতায়-
অর্থ নয়, কীর্তি নয়,/ সচছ্লতা নয়-
২+২+২+২/ ৪+২
আরো / এক বিপন্ন বিস্ময়
২/ ২+৩+৩
আমাদের অন্তর্গত / রক্তের ভিতরে
৪+৪/ ৩+৩
খেলা করে
২+২
অর্থাৎ ছন্দবিন্যাসটা এ রকম- ৮/৬, ২/৮, ৮/৬, ৪
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে কবিতাগুলোতো একটা অষ্টক রীতি বা ৮ মাত্রা মিলানোর প্রচেষ্টা রয়েছে সর্বদা। এটাই হলো পয়ারের রীতি। আর হ্যাঁ, যেখানে ৮ মাত্রা মেলেনি সেখানে কিন্তু জোড় মাত্রা মেলাতে হবে, বিজোড় নয় কখনো। এটাই হলো অক্ষরবৃত্তের প্রাথমিক নিয়ম।
অফলাইন
তাদের আমি পিট্টি দিব

হায় হায় একি কথা
পড়ে হয় মাথা ব্যথা
এতো শত ফর্মূলা
পড়ে মাথা হলো চুলা 
নিয়মের গ্যাঁতাকলে
পরুম না কোন বলে
ছড়া শুধু পড়ে যাই
ছন্দটা খুজে পাই
যখন ছন্দ লেখি
বার বার পড়ে দেখি
যদি লাগে মজাদার
হয়ে যাই ছড়াকার


অফলাইন
আমার ছুটি প্রয়োজন, রুটিন বাধা জীবন ভালো লাগছে না। এতো সব নিয়মে লিখি না তো ছড়া
নিয়মগুলা পড়ার পর চোখ ছানাবড়া
নিয়মের গ্যাড়াকলে হবে মহা প্যাচ
এর চেয়ে ভালো হয় পালাই তুলে লেজ
এইভাবে কবিতা হবে না লেখা
নিয়মটা আমার কাছে লাগে কেন বাকা
আমি ভাই বোকাসোকা মাথা মোটা মানুষ
লিখি তবু ছন্দ, উড়ে যেন ফানুস
শামীম ভাই গুরু মানুষ দিছে ফর্মূলা
মানতে পারি না আমি আত্মভুলা
জলিল ভাই যা দিছে, পড়ে লাগে ভয়
নিয়ম মেনে লিখলে আমি হারিয়ে ফেলি খৈই
অফলাইন
শামীম লিখেছেন:
এজন্য আপনাকে উত্তম জাঝা।
কবিতা/ছড়া আমার পোষায় না (মাথা গরম হয়ে যায়।)
অট:এই জাঝার ব্যপারটা আমাকে একটু বুঝান তো। শরমে সচলে কাউকে জিজ্ঞাস করি না। আরেকটা হলো বিপ্লব।
সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন আলমগীর (১৮-০৫-২০০৮ ১৪:২৮)
অফলাইন
আমার কাছে অমিত্রাক্ষর ছন্দই বেশী ভালো লাগে। কি অসাধারণ সব কবিতা অমিত্রাক্ষর ধরে উঠে এসেছে। ভাবের প্রকাশই আলাদা হয়ে যায়। নিচে গুণের একটা গুণ গাইলাম ।
আগ্নেয়াস্ত্র
নির্মলেন্দু গুণ
--------
পুলিশ স্টেশনে ভিড়, আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের
সন্দিগ্ধ সৈনিক। সামরিক নির্দেশে ভীত মানুষের
শটগান, রাইফেল, পিস্তল এবং কার্তুজ, যেন দরগার
স্বীকৃত মানত্; টেবিলে ফুলের মত মস্তানের হাত।
আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি
কোমল বিদ্রোহী, প্রকাশ্যে ফিরছি ঘরে,
অথচ আমার সঙ্গে হৃদয়ের মতো মারাত্মক
একটি আগ্নেয়াস্ত্র, আমি জমা দিই নি।
------------
আলমগীর লিখেছেন:
অট:এই জাঝার ব্যপারটা আমাকে একটু বুঝান তো। শরমে সচলে কাউকে জিজ্ঞাস করি না। আরেকটা হলো বিপ্লব।
অটঃ
এইটা মনে হয় মার্কিং সিস্টেম। ৫-এ মার্কিং হতে পারে।
ভালো লাগলে সামহ্যোয়ার-ইনে যেমন ৫ দেয়, তেমনি সচলে বিপ্লব দেয়।
আরেকটা হতে পারে; আমরা যেমন পরীক্ষা খারাপ হলে বলতাম, আলমগীর ভাই অ্যানালগে বাঁশ দিয়েছেন
, তেমনি এইখানে বিপ্লব। বিশেষণ হিসেবে।
সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন রুমন (১৮-০৫-২০০৮ ১৫:০২)
অফলাইন
The Ultimate fun zone 

ও মোর খোদা, কবিতা লেখার এতো নিয়ম
, মনে বাসনা ছিল দুই একটা লিখার, এই যাত্রায় মনে হয় হবেনা
। কবিতার এই জটিল ভাষার চাইতে সি++ এর ভাষা কত্ত সোজা)
। 
অফলাইন
আমার ছুটি প্রয়োজন, রুটিন বাধা জীবন ভালো লাগছে না। নিয়ম কানুন চিন্তা না করি , আমনে কবিতা লিখতে শুরু করেন। ![]()
জুয়েল লিখেছেন:
ও মোর খোদা, কবিতা লেখার এতো নিয়ম
, মনে বাসনা ছিল দুই একটা লিখার, এই যাত্রায় মনে হয় হবেনা
। কবিতার এই জটিল ভাষার চাইতে সি++ এর ভাষা কত্ত সোজা)
।
অফলাইন
কালো ব্যাজ ধারণ করতে পারি?জুয়েল লিখেছেন:
ও মোর খোদা, কবিতা লেখার এতো নিয়ম
, মনে বাসনা ছিল দুই একটা লিখার, এই যাত্রায় মনে হয় হবেনা
। কবিতার এই জটিল ভাষার চাইতে সি++ এর ভাষা কত্ত সোজা)
।
আরে ভাই কবিতা দেখলেন কোথায় ... ওগুলোতো ছড়া লেখার জন্য দিয়েছিলাম... শেখ জলিল ভাইয়ের লেখায় যদিও কবিতা বলেছেন, তবে আধুনিক কবিতা ওভাবে কেউ লেখে বলে চোখে পড়ে না ... এখনকার কবিতাগুলো ভাবসর্বস্ব 
অ.ট.
আলমগীর লিখেছেন:
অট:এই জাঝার ব্যপারটা আমাকে একটু বুঝান তো। শরমে সচলে কাউকে জিজ্ঞাস করি না। আরেকটা হলো বিপ্লব।
এটা একটা ইতিহাস ...
.... সামহোয়্যারইন হতে উৎপন্ন ভাষা।
জাঝা: জারীর নামক একজন বিশিষ্ট (!) চিন্তাবিদ পোস্টকারী ছিলেন সামহোয়্যারইন-এ। উনার একটি বিশেষ আরবী শব্দ মিশ্রিত কবিতায় প্রথম এই জাঝা ব্যবহার করেন। প্রশ্নোত্তর মন্তব্যে জানা গেল জাঝা'র অর্থ হল উত্তম পুরষ্কার। 
বিপ্লব: সাংবাদিক বিপ্লব রহমান ভাই সবসময় সবাইকে মন্তব্যে ৫ দিতেন। তাই ৫-এর প্রতিশব্দ হয়ে গেল বিপ্লব। সচলায়তনে বিপ্লবে দেখবে বিপ্লব রহমান ভাইয়ের স্কেচ। 
সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন শামীম (১৮-০৫-২০০৮ ১৫:৫০)
অফলাইন
আইডিফোরামে স্বাগতম 


তাইতো বলি..
শামীম ভাইয়ের এত ছন্দ কোত্থেকে আসে..
যাহোক, যা বলার মুনাপু আর কাতার ভাই বলে দিসেন 
আমি কোন নিয়ম জানিনা, কোন সূত্র জানিনা ..
নিজের কাছে উচ্চারণ করতে যেমনটা ভালো লাগে, পারলে সেরকম লিখি, না পারলে লিখিনা । এই কাজটা করতে গিয়ে অনেক সময় ই বাক্যের মান ও খারাপ হয়ে যায় । কখনও বাংলিশ মিশ্রন, কখনও শব্দের উল্টাপাল্টা অবস্থান..
অবাক হয়ে দেখতে থাকি
শামীম ভাইয়ের ছন্দজ্ঞান
হচ্ছে মনে, ঘুরছে বুঝি
লোডশেডিঙে বন্ধ ফ্যান
ঘুরিং ফিরিং এদিক ওদিক
কারন অনু-সন্ধানে
হঠাত দেখি কেমন যেন
এই টপিকে মন টানে
এসেই দেখি, কান্ড একী
দিছেন বিরাট ফিরিস্তি
সূত্র আছে , গুনলে হবে
বিশ বা পঁচিশ-তিরিশ টি
ঘুরলো মাথা এসব দেখে
জলদি পালাই খুব দূরে
পারবো না ভাই, মাফ করে দ্যান,
আমার মত বুদ্ধুরে--(

অনলাইন
রুমন লিখেছেন:
আমরা যেমন পরীক্ষা খারাপ হলে বলতাম, আলমগীর ভাই অ্যানালগে বাঁশ দিয়েছেন
এখন তো আবার বোকার মতো বলব বাশ কি?
উত্তর নিষ্প্রয়োজন।
শামীম লিখেছেন:
প্রশ্নোত্তর মন্তব্যে জানা গেল জাঝা'র অর্থ হল উত্তম পুরষ্কার।
বিপ্লব: সাংবাদিক বিপ্লব রহমান ভাই সবসময় সবাইকে মন্তব্যে ৫ দিতেন। তাই ৫-এর প্রতিশব্দ হয়ে গেল বিপ্লব। সচলায়তনে বিপ্লবে দেখবে বিপ্লব রহমান ভাইয়ের স্কেচ।
থ্যাংকস শামীম ভাই।
আমি ভাই ছন্দ এখনও কিছু বুঝি না, অমিত্রাক্ষর বাদে।
অফলাইন
হেহেহে...আর তাকাবি???দেখ...ক্যামনে ভেঙ্গাই ...হেহেহে



আমার চোখে ঘুম ছিল না গভীর রাতে ...
এতো নিয়ম পড়লে তো রবীন্দ্রনাথ তো বলতেন-
আমার চোখে আর কোন দিন ঘুম আসবে না




অফলাইন
ছন্দ কিভাবে মেলাতে হয় বুঝলাম। কিন্তু আমার মাথা থেকে কিছু আসবে বলে মনে হয় না। 

অফলাইন
কালো ব্যাজ ধারণ করতে পারি?সামিউল লিখেছেন:
ছন্দ কিভাবে মেলাতে হয় বুঝলাম। কিন্তু আমার মাথা থেকে কিছু আসবে বলে মনে হয় না।
দুই পক্ষ আছে হেথায় - মাথা এবং ছন্দ,
এই দুয়ের মিল ঘটাতে নেইকো কোনো দ্বন্দ্ব।
সব বুঝেও মাথা থেকে ছন্দ না এলে,
সমস্যা কি ছন্দ পাড়ে মাথা দিয়ে দিলে।
এ্যাত কিছুর পরেও যদি বুঝতে না পারো,
সবই ভেঙ্গে বলছি তবে একটু সবুর করো।
দুই বস্তুর মিলন তুমি যদি চাও করতে,
দুইটিকেই এক স্থানে ধরে হবে আনতে।
মাথা স্থির ছন্দ সেথায় যদি না আসে,
ছন্দ দেখে সেথায় তবে মাথা আগাও হেসে।
ছন্দ যদি তুমি না লিখতে পারো,
ছড়া দেখলেই তবে বেশি বেশি পড়ো।
অফলাইন
!!! ইন্ট্রাপিড আইবেক্স !!! শামীম ভাই এই কয়দিনে ছন্দ নিয়া এত গবেষনা করে ফেললেন 
অফলাইন
ধ্রুবক অন্ধকার, দৈব রাজপথে আমার চিহ্ন, আমি নৈশ ঈশ্বর যেন আরেক ধ্রুবতার জন্ম.শামীম এবং আলমগীর ভাই বেশ চমৎকার তথ্য দিয়েছেন..অনেক কিছু নতুনভাবে আরো ভালভাবে জানতে পারলাম..ধন্যবাদ রইল.

অফলাইন