পরীক্ষার্থী নম্বর পেয়েছেন ৫১। কিন্তু উত্তরপত্রের প্রথম পাতায় (টপশিট) এক এবং পাঁচ বরাবর বৃত্ত ভরাট করেছেন পরীক্ষক। কম্পিউটার কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সতর্ক না হলে বা ভুল ধরতে না পারলে ৫১ পাওয়া ওই পরীক্ষার্থী ১৫ পেতে পারেন, পাচ্ছেনও।
আবার এমনও দেখা গেছে, পরীক্ষক নম্বর দিয়েছেন ৫৪, প্রধান পরীক্ষক একই খাতায় দিয়েছেন ২৮। নিয়ম অনুযায়ী এত ব্যবধান হলে খুঁজতে হবে তৃতীয় পরীক্ষক।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের ভুল আর বিভ্রান্তির কারণে পরীক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন, কিছু ভুলের তাৎক্ষণিক সমাধান মিললেও চাপা পড়ে যাচ্ছে বেশির ভাগ ঘটনা।
পরীক্ষার খাতা দেখা ও ফল প্রস্তুতের সঙ্গে জড়িত একাধিক সুত্র জানায়, খাতার নম্বরে যোগ-বিয়োগে ভুল, টপশিট ও খাতার ভেতর নম্বরে তারতম্য এবং পরীক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবের বিপরীতে নম্বর না দেওয়ার ঘটনা ঘটে আসছে। গত এসএসসি পরীক্ষায় এমনও দেখা গেছে, একজন প্রধান পরীক্ষক খাতা দেখেছেন ৮২টি, এর মধ্যে ৪০টিতে ২৫ এবং ৪২টিতে ২৬ নম্বর দেওয়া হয়েছে।
কেবল ঢাকা শিক্ষা বোর্ড হিসাব কষে দেখেছে, প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এ ধরনের ভুলভ্রান্তির সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। গত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও প্রচুর ভুল ও অসংগতি ধরা পড়ে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ছাড়াও অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ খাতায় এ ধরনের অসংগতি ও ভুলত্রুটি থেকে যায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তবে আইনের মাধ্যমে নম্বর দেওয়ার বিষয়টি সুরক্ষিত থাকায় এ নিয়ে পরীক্ষার্থী বা অভিভাবক বেশিদুর এগোতে পারেন না।
ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দু-একটি ঘটনা তাঁর কাছে আসার পর তিনি বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। এরপর জানতে পারেন কিছুসংখ্যক পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্বহীনতার কথা।
এক প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, যদি পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকের দেওয়া নম্বরের মধ্যে ১৩ শতাংশের বেশি গরমিল হয়, তাহলে প্রয়োজনে পাঁচজন পরীক্ষককে দিয়ে ওই খাতা মূল্যায়ন করা হবে। এরপর দোষী যে-ই হোন, তাঁকে খাতা দেখার ব্যাপারে কালো তালিকাভুক্ত করা ছাড়াও প্রয়োজনে মামলা করা হবে।
জানা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের ভুলভ্রান্তি আমলে নেওয়া হয় না। পরীক্ষার ফল প্রস্তুতের শেষভাগে এগুলো ধরা পড়ে, তখন একেকজন পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষককে ঢাকায় কম্পিউটার কেন্দ্রে ডেকে এনে ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে না। সে ক্ষেত্রে ছোটখাটো ভুলত্রুটি কম্পিউটার কেন্দ্রগুলো শুধরে দেয়। আর শেষভাগে ফল প্রকাশের তাড়াহুড়ো থাকায় বেশির ভাগ ভুল থেকেই যায়।
এ প্রসঙ্গে কম্পিউটার কেন্দ্রের একজন সিস্টেম অ্যানালিস্ট বলেন, একজন পরীক্ষক যদি ২৮ নম্বর এবং প্রধান পরীক্ষক ৫৪ নম্বর দেন, তাহলে শেষ মুহুর্তে সাধারণত কিছুই করার থাকে না। একটি খাতার জন্য পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষককে ডেকে এনে তা সংশোধন করা অনেকটা দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, এ বছর থেকে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ নিয়ম করেছে, পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকের দেওয়া নম্বরের ব্যবধান ১৩ শতাংশের বেশি হবে না, গতবার পর্যন্ত ১০ শতাংশ ব্যবধান মেনে নেওয়া হতো। কিন্তু এবারও দেখা গেছে, বেশ কিছু খাতায় বোর্ড নির্ধারিত ১৩ শতাংশের বেশি ব্যবধান ছিল।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর কম্পিউটার কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ইউসুফ পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকদের ভুল ও অবহেলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক একটি ব্যাপার। শিক্ষা বোর্ডগুলো বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মন্ত্রণালয় সুত্র জানায়, বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে এসেছে এবং খুব শিগগির এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যে ভুল শোধরানো যায় না: প্রতিটি পরীক্ষার পর হাজার হাজার শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত নম্বর না পাওয়া বিষয়ের খাতা চ্যালেঞ্জ করে। কিন্তু সাধারণত এতে সুফল পাওয়া যায় না। নির্ধারিত ফি দিয়ে খাতা চ্যালেঞ্জের পর শুধু যোগ-বিয়োগে অসংগতি থাকলেই তা শোধরানো হয়। কিন্তু কোনো পরীক্ষার্থীর নম্বর বাড়ানো বা কমানোর এখতিয়ার শিক্ষা বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের নেই।
শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালায় সুস্পষ্ট বলা আছে, ‘পরীক্ষক/প্রধান পরীক্ষক কর্তৃক প্রদত্ত নম্বর কোনো অবস্থাতেই সংশোধন বা পরিবর্তন করা হবে না।’ ওই নীতিমালায় আরও বলা আছে, ‘উত্তরপত্র কোনো অবস্থাতেই পরীক্ষার্থী, তার আত্মীয়স্বজন অথবা কোনো ব্যক্তিকে দেখানো যাবে না।’
ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা বোর্ডের অধ্যাদেশ অনুসরণ করে ওই নীতিমালা করা হয়েছে এবং ওটা সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষকের দেওয়া নম্বর বাড়ানো বা কমানো যাবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি অধ্যাদেশটির সংশোধন হওয়া উচিত, কারণ পরীক্ষার্থী বঞ্চিত হয়েছে এটা বোঝার পরও বোর্ডের কিছু করণীয় থাকছে না।’
ঢাকা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. মো. জয়নুল আবেদীন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, বোর্ড কম্পাউন্ডে পরীক্ষামূলকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন কেন্দ্র করে দেখা যেতে পারে। পরীক্ষকেরা এখানে এসে মনোযোগের সঙ্গে খাতা মূল্যায়ন করলে ভুলভ্রান্তির সংখ্যা হয়তো কমবে। তিনি আরও বলেন, বোর্ড থেকে বের হয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে লাখ লাখ খাতা যাওয়ার পর কার্যত বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এ বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর কম্পিউটার কেন্দ্র সুত্র জানায়, ফল প্রকাশের সঙ্গে জড়িত কম্পিউটার কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট লোকজন পরীক্ষকদের এসব ভুলের সঙ্গে নিয়মিত পরিচিত। এ জন্য তাঁরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরীক্ষার্থীদের স্বার্থে পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন। এর ফলে খুব বেশি পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তবে এ বিষয়টির সমাধান হওয়া জরুরি।
সূত্রঃ প্রথম আলো

অফলাইন
যুদ্ধের কী দরকার!যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় .. .. কারো মাথায় বাস্তবসম্মত কোন সমাধানের পরামর্শ আছে?
অফলাইন
এর একমাত্র সমাধান হতে পারে যে, কতটুকু লিখলে কত নাম্বার দিতে হবে তা বাধ্যতামূলক করে দেয়া![]()

অফলাইন
যুদ্ধের কী দরকার!সেভারাস লিখেছেন:
এর একমাত্র সমাধান হতে পারে যে, কতটুকু লিখলে কত নাম্বার দিতে হবে তা বাধ্যতামূলক করে দেয়া
এর কাছাকাছি বিষয়ে আমার একটা লেখা ছিল। -- ঐ লেখাটা দিয়েই আমার ব্লগানো শুরু হয়েছিলো।
অফলাইন